১৭ আগস্টের ‘সংবাদ’-এ একটি খবর পড়ে বিশ্বাসযোগ্য না হওয়াতে দু’বার পড়লাম। পাড়ার মাস্তানরাও আজকাল খালি হাতে মারামারি করে না, পিস্তল বা রিভলভার কোমরে থাকে; অথচ লাদাখ সীমান্তে চীন ও ভারতীয় সেনাবাহিনী অনেকক্ষণ যুদ্ধ করেছে পাথর ছোড়াছুড়ি করে। সংবাদের বর্ণনা মোতাবেক, ‘লাদাখ সীমান্তের পানগং হ্রদের পাড় দিয়ে গত মঙ্গলবার ভারতের মধ্যে প্রবেশের চেষ্টা করে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সেনারা। এ সময় দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে পাথর ছোড়াছুড়ির ঘটনাও ঘটে। এতে দু’পক্ষের সেনাসদস্য আহত হন।’ চীন ও ভারতীয় সেনাদের সংঘর্ষের ভিডিও ক্লিপে পরিলক্ষিত হয় যে, দু’পক্ষের কিছু সেনা একে অপরকে ঘুষি ও লাথি মারছে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার হতে পারে এ ব্যাপারে আইনস্টাইনকে প্রশ্ন করা হলে তার উত্তর ছিল, ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে জানি না, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ যে লাঠি এবং পাথর দিয়ে হবে তা বলতে পারি।’
আইনস্টাইনের এ অভিমতের অন্যতম কারণ হলো, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ ক্ষুদ্র দুটি পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহারে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি নামে দুটি শহর যেভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক বোমায় সম্ভাব্য ধ্বংসযজ্ঞের তুলনায় যৎসামান্য। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকির ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সঙ্গে সারা বিশ্ব এখনো যুদ্ধোত্তর ভয়াবহ পরিণতি দেখছে। পরমাণু অস্ত্র এখন আগের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী ও বিধ্বংসী। দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল এখন পৃথিবীর যে কোনো স্থানে আঘাত হানায় সক্ষম। তাই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক বা রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারে মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা মানুষ শুধু কল্পনা করতে পারে। কিন্তু যে বিপর্যয় হবে তা কল্পনার চেয়েও ভয়াবহ হবে। সুস্থ, সবল কিছু মানুষ বেঁচে গেলেও পরবর্তীতে বিকলাঙ্গ হয়ে যাবে বা প্রতিকূল পরিবেশে মারা যাবে। আবার অনেকের মত হচ্ছে, কিছু লোক বাঁচবে এবং তারা আবার পৃথিবীতে বংশবিস্তার করবে। তখন যুদ্ধ করার মতো স্বয়ংক্রিয় কোন মারণাস্ত্র না থাকলেও মানুষ যেহেতু স্বভাবগতভাবেই মারামারি করতে অভ্যস্ত সেহেতু তাদের মারামারির সম্বল হবে লাঠি আর পাথর।
তৃতীয় মহাযুদ্ধের আতঙ্কটা বেড়ে গেছে কয়েকজন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের উন্মাদনামূলক আচরণ ও কথাবার্তায়। এদের মধ্যে একজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, অন্যজন উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন। একজন হিটলারের আত্মম্ভরী আচরণে যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতে পারে তাহলে বর্তমানের কয়েকজন বিপরীতমুখী রাষ্ট্রনায়কের উদ্ধত ও অসংযত আচরণে বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কার ব্যারোমিটার বৃদ্ধি পাওয়াটাই তো স্বাভাবিক।
সিরিয়ার আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রুশ সামরিক বিমান যখন উড়ছিল তখন অনেকে আতঙ্কিত ছিল এ ভয়ে যে, সামান্য ভুলে এ দুই মহাশক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। সিরিয়ার আকাশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার যুদ্ধবিমান যে দূরত্ব বজায় রেখে বোমা ফেলেছে সেই দূরত্ব শুধু ত্রিশ সেকেন্ডে ঘুচে যেতে পারত। এ ত্রিশ সেকেন্ডের দূরত্ব কোন কারণে ঘুচে গেলে হয়তো বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি রণতরী থেকে ৫৯টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পর পুনরায় এমন হামলা হলে শক্তি ব্যবহার করে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারির উচ্চারিত হয়েছে রাশিয়া ও ইরানের যৌথ কমান্ড সেন্টার থেকে।
সমাজতন্ত্রের অবসানে সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত রাজ্যগুলো আলাদা হলে রাশিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্নায়ুযুদ্ধের সাময়িক বিরতিতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো স্বস্তির ঢেঁকুর তোলে। অন্যদিকে নিরীহ, দুর্বল ও স্বাধীনচেতা দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক শক্তির দম্ভে ভীত হয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক মোড়লগিরিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও আজ্ঞাবহ বলে প্রতীয়মান হয়; অসত্য অপবাদে ইরাক আক্রমণে অনাপত্তি দিতে নিরাপত্তা পরিষদ বাধ্য হয়। তবে এর একটি ভালো দিক ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাধাহীন একক শক্তি প্রয়োগে বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা দূরীভূত হয়ে যায়। দুর্বল দেশগুলো মার খেয়ে চুপ থেকেছে অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তোষামোদ করে চলেছে; আমেরিকা বলয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সাহস না থাকায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনাও ছিল না। কিন্তু পুতিন রাশিয়ার ক্ষমতায় আসার পর আবার শক্তি প্রদর্শন শুরু করেছে এবং দুই মহাশক্তির বিতণ্ডাও শুরু হয়েছে। ইউক্রেন-বিতর্ক থেকেই হাওয়া গরম হলেও রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে মিলে সিরিয়ায় আইএসের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সরানোর যে অভিসন্ধি করেছিল তা রাশিয়া ভণ্ডুল করে দেয়। হুট করেই যুদ্ধের ময়দানে রাশিয়ার আগমনে যুদ্ধের পরিস্থিতি একেবারেই বদলে যায়। অপছন্দের শাসক বদলানোর খেলায় মার্কিন সামরিক শক্তির ব্যবহার মধ্যপ্রাচ্যকে সংঘাতময় করেছে। আফগানিস্তান, ইরাক, মিসর, লিবিয়ার শাসক বদলানো এবং লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়ার আকাশে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া বিমান মহড়ায় রাশিয়া ছিল অনুপস্থিত। আকাশে রাশিয়া ন্যাটো জোটের মুখোমুখি হবে এ ধারণা ন্যাটোর কোন দেশ কখনও কল্পনাও করেনি। এ যেন অদূর ভবিষ্যতে সম্মুখসমরে নামার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রথম মহড়া।
বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার দ্বন্দ্বে যে কোনো সময় বেঁধে যেতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জোট ন্যাটোর প্রতিপক্ষ হতে পারে চীন ও রাশিয়া। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৮ মাসে অন্তত ৬৬ বার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও রাশিয়া।
সম্প্রতি এক বার্তায় ট্রাম্প বলেছেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সর্বকালের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে।’ অন্যদিকে রাশিয়া বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে মস্কোর বিরুদ্ধে ‘পুরোমাত্রায় বাণিজ্যিক যুদ্ধ’ ঘোষণা করা হয়েছে।
রাসায়নিক ও পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার নিয়ে আতঙ্কে রয়েছে পরাশক্তিধর দেশগুলোও। কারণ এই প্রযুক্তি জঙ্গি, সন্ত্রাসী অথবা কোন দেশের একনায়কত্বের হাতে চলে গেলে রাষ্ট্রনায়কোচিত বিবেচনার অভাবে পারমাণবিক বোমার প্রয়োগ হতে পারে। সন্ত্রাসী বা জঙ্গিগোষ্ঠীর বিস্তৃতি ও তৎপরতার প্রমাণ পাওয়া যায় ৮৩টি ইসলামপন্থি দলকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে আরব আমিরাতের ঘোষণা থেকে। অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রবণতা বিশ্বকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। আর কোন নতুন দেশে পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক আইন বানিয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে সামরিক হামলা পর্যন্ত হয়েছে। তবে প্রযুক্তিতে বলীয়ান হলেও নতুনভাবে পারমাণবিক শক্তিধর এ দেশগুলোও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ঝুঁকি নেয়ার সাহস করছে না। ভারত ও পাকিস্তান নব্বইয়ের দশকে পরমাণু শক্তি অর্জনের পর সীমান্তে অনেক লড়াই করলেও পূর্ণ যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার ঝুঁকি নেয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিরাজমান অস্থিরতার অবসান শীঘ্র হবে বলে কেউ প্রত্যাশা করে না। তেলের বিকল্প জ্বালানি এখনো আবিষ্কার হয়নি বলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বও কমছে না। মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বিষফোঁড়া ইসরায়েল। কিন্তু ইসরাইলকে জব্দ করার ক্ষমতা আরব দেশগুলোর না থাকায় ওখান থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। আরব দেশগুলো হাজার হাজার কোটির টাকার অস্ত্র কিনে শুধু মজুদ করছে, কিন্তু অস্ত্র সরবরাহকারীর বিশেষজ্ঞ না থাকলে চালাতে পারবে কি না সন্দেহ। তারা যে কত অদক্ষ তার প্রমাণ পাওয়া যায়, ইরাকের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলের আক্রমণ সম্পর্কে পূর্বাভাস না পাওয়ার অজ্ঞতা থেকে। ইরান আর ইরাকের আট বছরব্যাপী যুদ্ধের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় ইরাকের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা মেরে ইসরায়েলি বিমানগুলো নিরাপদে ফেরত যাওয়ার পর আগুন দেখে ইরাকি কর্তৃপক্ষ টের পায় যে তাদের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে তুলনামূলকভাবে সামরিক শক্তিতে বলীয়ান মিসরও ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে ইসরায়েলের কাছে পর্যুদস্ত হয়েছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এখন শুধু হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ গ্রুপ এবং ইরান একটু উচ্চকণ্ঠে কথা বলে। ইরাকের মতো ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাও বলেকয়ে ধ্বংস করার ক্ষমতা ইসরায়েলের রয়েছে। সৌদি আরবের প্ররোচনা থাকা সত্ত্বেও আমেরিকার সম্মতি না থাকায় ইরানের পারমাণবিক চুল্লি ধ্বংস করার আগ্রহ ইসরায়েল বাস্তবায়ন করতে পারছে না। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে রাশিয়ার তখনকার অজেয় টি-৭২ ট্যাঙ্ক যে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েল ঝাঁজরা করে সেই ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের জন্য আমেরিকার মতো মহাশক্তিধর রাষ্ট্রও ইসরায়েলের কাছে ধরনা দিয়েছিল। তবে ইসরায়েলি এ অপ্রতিরোধ্য শক্তি সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের সহায়ক হওয়ায় শুধু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি উপেক্ষা করে উত্তর কোরিয়ার বারবার ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ এবং প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের উসকানিমূলক বক্তব্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় পৃথিবীতেও কাঁপুনি ধরিয়েছে। শক্তির ভারসাম্য না থাকায় দুই অসম শক্তির লড়াইয়ে মার্কিন হামলার জবাবে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু শক্তি ব্যবহার ছাড়া গত্যন্তর নেই।
ট্রাম্প এ মর্মে হুমকি দিয়ে রেখেছেন যে, আর একটি আন্তঃমহাদেশীয় বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালালেই উত্তর কোরিয়াকে ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হবে। উত্তর কোরিয়াও পাল্টা হুমকি দিয়ে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি গুয়ামে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন, পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন ডুবোজাহাজ পাঠানো ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘থাড’ স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কয়েকটি দেশের শাসকের পতন দেখে কিম জং উন পরমাণু অস্ত্র পরিত্যাগে সম্মত নাও হতে পারেন; তার ধারণা, পারমাণবিক বোমা আছে বলেই তাকে ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান, মিসরের শাসকদের মতো খেয়ালখুশিমতো বদলানোর সাহস আমেরিকা দেখাবে না। অন্যদিকে রাশিয়া এবং চীন উত্তর কোরিয়াকে সব সময়ই নিজেদের মধ্যে একটি বাফার স্টেট হিসেবে বিবেচনা করে। তাই উত্তর কোরিয়াকে টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে এ দুটি দেশ যে তৎপর হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
কিম জং উনের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নাকি আরও কয়েকজন ছিলেন, জনগণের মধ্যে দেশরক্ষার উন্মাদনা সৃষ্টি করে সিংহাসনকে নিষ্কণ্টক করার বদমতলবে নাকি আমেরিকাকে শাসানোর এ অভিসন্ধি। বিশ্বাসযোগ্যও হতে পারে; কারণ ট্রাম্পের ধমকের পর কিম জং উন আর একটি গোলা ছোড়ার সাহসও করেনি, যে একটা ছুড়েছে তাও উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করতে পারেনি।
তাহলে কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে না? বিস্মিত হতে হয় যখন দেখি হাজার হাজার টন বোমা ফেলার পরও আইএস বা তালেবানদের শক্তি নিঃশেষ হয় না। আসলে এদের শক্তি শেষ করা হয় না। এর পেছনে অনেক হিসাব-নিকাশের মধ্যে প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে, পুরোনো অস্ত্রগুলোর আবর্জনা ডাম্পিং করার জন্য এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর পাওয়া যাবে না এবং সন্ত্রাসীদের তাদের দেশের বাইরে সীমিত জায়গায় আবদ্ধ করে রাখা। বর্তমান পৃথিবীতে শুধু ইসরায়েল অন্যের ভূখণ্ড দখল করে আছে; এর পেছনে ইসরায়েলের যুক্তি হচ্ছে, প্যালেস্টাইন বা তাদের পক্ষের কেউ যদি গুলি করে সেই গুলি যেন অধিকৃত ভূখণ্ডে থেকে যায়, ইসরায়েলের ভূখণ্ডকে আঘাত না করে। তদ্রূপ পরাশক্তিগুলোও হয়তো ভাবছে, আইএস এবং তালেবানদের সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত করা হলে তারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে তাদের ভূখণ্ডে আঘাত করতে পারে আরও কয়েকগুণ বেশি শক্তি নিয়ে। তাই নিশ্চিহ্ন না করে আইএস ও তালেবানদের নিজের ভূখণ্ডে দুর্বল করে রাখার অভিপ্রায়ে মাঝে মাঝে বোমা মারা হয়। বৃহস্পতিবারের ‘সংবাদে’ প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বিবৃতি থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হবে— আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্রে তালেবান বা যুক্তরাষ্ট্র কেউ হয়তো জিততে পারবে না এমন ইঙ্গিত দিয়ে লড়াই বন্ধে দরকষাকষির পথও খোলা রাখার কথা বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন।
ধ্বংসের ভয়াবহতা ভেবেও মহাশক্তিমান দেশগুলোর নির্বাচিত সরকারের সুবিবেচনায় পারমাণবিক যুদ্ধ না বাধানোর সম্ভাবনাই বেশি। তাই তো প্রচলিত অস্ত্রের বাইরে আজ পর্যন্ত কোন দেশ পারমাণবিক সামর্থ্য ব্যবহার করেনি। এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া তৃতীয় দেশে বোমা মারার আগে একজন আরেকজনকে অবহিত করে রাখে। আমার ধারণা, পরিপূর্ণ যুদ্ধ এড়ানোর স্বার্থে ভারতের সার্জিক্যাল অপারেশনও পাকিস্তানকে পূর্বে অবহিত করে করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভারত এবং চীন প্রচলিত অস্ত্রও বাদ দিয়ে দিয়েছে; লাদাখে তারা যুদ্ধ করেছে আদিম যুগের অস্ত্র পাথর দিয়ে।