বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে এখন শিশু নির্যাতনের খবর নিয়মিত প্রচার হচ্ছে। ছোট-খাটো চুরির অপবাদে শিশুদের নির্যাতনের কাহিনী জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আমরাও শুনে আসছি। তবে তখনকার সময়ে শাস্তির বিধান ছিলো নমনীয়। কিশোর ও যুবক বয়সে বাতাবি লেবু, তরমুজ, খেজুরের রস, ডাব, তাল ইত্যাদি চুরি করে দল বেঁধে খায়নি এমন লোক গ্রামে কম পাওয়া যাবে। ধরা পড়লে কান ধরে উঠবস করানো বা নাকে খত দেওয়া ছাড়া আর কোন কঠিন শাস্তি দেওয়ার কোন নজির ছিলো না। এখন আলু চুরির জন্য, সিগারেটের প্যাকেট লুকিয়ে রাখার কারণে, দোকান থেকে একটি বেগুনি বা পেঁয়াজি সরানোর অপবাদে গাছের সাথে বেঁধে যেভাবে নির্যাতন করা হয় তাতে মনে হয়, শিক্ষা মানুষকে সভ্য না করে বরং বর্বর করে তুলছে।
গত ১১ আগস্টে একটি মোবাইল চুরির অপবাদে ৭ বছরের এতিম শিশু জুয়েল ও আসিফকে নির্যাতনের ঘটনা যেভাবে 'সংবাদ' পত্রিকায় বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে, 'এবার কুষ্টিয়ায় ছেঁউড়িয়ায় মোবাইল চুরির অপবাদে আম গাছের সঙ্গে বেঁধে দুই শিশুকে অমানবিকভাবে পিটিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা'। পরের দিন ১২ আগস্টের সংবাদে চুরির অপবাদে নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা হচ্ছে— 'একশত টাকা চুরি করার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মুখে গামছা বেঁধে আবাসিক হলে আট বছরের শিশু সুমাইয়াকে অমানুষিক নির্যাতন করে মাদ্রাসার সুপার খাদিজা বেগমসহ তিন শিক্ষক'। তারপর দিন ১৩ আগস্টের সংবাদে একটি ফলোআপ খবর হচ্ছে, 'নির্যাতিত সেই শেফালীর অসময়ে জন্ম নেয়া শিশুটি বাঁচানো গেলো না'। উল্লেখ্য, নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় গরুচুরির অপবাদে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ শেফালী বেগমকে গাছে বেঁধে পেটানো হয়; এই নির্যাতনে পেটের শিশুটিও রেহাই পায়নি। বরগুনার তালতলী থানার এক গ্রামে মাছ চুরির অভিযোগে এক শিশুকে তার প্রতিবেশী পিটিয়ে হত্যা করে। আলু চুরির অভিযোগ এনে তিন শিশুকে গরু বাঁধার রশি দিয়ে পাঁচ ঘণ্টা বেঁধে রাখা হয়। প্রচণ্ড খিদের যন্ত্রণায় নাটোরের ১০ বছরের শিশু সাইদুল একটি ফলের দোকান থেকে আপেল চুরি করে ধরা পড়ে গেলে শিশুটির হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। রাজশাহীর পুঠিয়ায় মোবাইল ফোনের মেমোরি কার্ড চুরির দায়ে ১২ বছর বয়সী শিশু আরিফুল ইসলামকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। বাগেরহাটের মংলায় দিনমজুর শামীমের ১০ বছরের শিশু শাকিল রাস্তায় দুটি লোহার রড কুড়িয়ে পায় এবং তা একটি ভাঙারির দোকানে বিক্রি করতে গেলে বেধড়ক পেটানোর পর বেঁধে রোদে ফেলা রাখা হয়। ৫ আগস্ট বরগুনায় মাছ চুরির অভিযোগে রবিউল আউয়াল নামে ১১ বছরের এক শিশুকে শাবল দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
এ ধরনের ঘটনা অসংখ্য। তথ্য, উপাত্ত, পরিসংখ্যান পর্যালোচনা বা বিশ্লেষণ এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। কারণ সংখ্যাটা মুখ্য হতে পারে না, একটি নির্যাতনের ঘটনাও সমস্ত বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সংস্কৃতির চর্চার অভাবে সমাজে শিক্ষার প্রতিফলন হচ্ছে না বিধায় মন, মানসিকতায় এখনো অন্ধকারের স্থবিরতা বিরাজ করছে। বর্ণিত ঘটনাগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে; এতদসত্ত্বেও সমাজের এই বিশেষ লোকগুলোর কোন বোধোদয় হচ্ছে না। এই শিশুরা অপাঙ্ক্তেয় সমাজে ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার, বিপক্ষ শক্তির দাপটে নিরুপায় ও অসহায় জীব। চুরির দায়ে সিলেটে শিশু রাজনের ওপর চালানো পাশবিক নির্যাতন এবং রাজনের মৃত্যুর ঘটনায় যেভাবে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র আন্দোলিত হয়েছিলো তাতে মনে হয়েছিলো এ ধরনের ঘটনা জনতার প্রতিরোধে আর ঘটবে না। রাজন হত্যা মামলার রায়ে প্রধান আসামি কামরুলসহ চারজনকে ফাঁসি ও সাতজনকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং খুলনায় শিশু রাকিব হত্যা মামলার রায়ে ২জনকে ফাঁসির আদেশ প্রদান করায় মামলা দুটির ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছা ও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক গুরুত্ব পেয়েছে। ঐতিহাসিক গুরুত্ব পেলেও বিচারালয় ও সরকারের ইতিবাচক এই কার্যক্রম কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নির্লিপ্ততা স্থায়ীভাবে ভাঙতে পারেনি বলে চুরির অপবাদে শিশু নির্যাতনও থেমে যায়নি।
দরিদ্র শ্রমজীবী শিশুদের তুচ্ছ কারণে বা চুরির অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে নির্যাতন করে মেরে ফেলার ঘটনা অব্যাহতভাবে বাড়ছে। তখনকার দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তা লক্ষ্য করেছেন। তাঁর 'পুরাতন ভৃত্য' কবিতার সেই বিখ্যাত চরণ আজও সমানভাবে প্রযোজ্য— "যা-কিছু হারায়, গিন্নি বলেন, 'কেষ্টা বেটাই চোর'।" কিন্তু রবিঠাকুরের কেষ্টাকে রশি দিয়ে গাছে বেঁধে পেটানো হয়নি। এখনকার মতো মর্মান্তিক শাস্তির নানাবিধ কৌশল কেষ্টার গৃহকর্ত্রীর জানা ছিলো না। পাকঘরের খুন্তি গরম করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া, হাত-পায়ের নখ সুঁচ দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করা, গরম পানি ঢেলে শরীর ঝলসে দেওয়া, জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে শরীর পুড়িয়ে দেয়া, লাঠির আঘাতে রক্তাক্ত করা, রশি দিয়ে বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে বেধড়ক পেটানো, পায়ুপথে বাতাস দেয়ার কৌশল বর্তমান সভ্য মানুষ কষ্ট করে আয়ত্ত করে শিশুদের উপর তা প্রয়োগ করছে। এই নির্যাতনকারীদের মাঝে মাঝে পত্র-পত্রিকায় পশুদের সাথে তুলনা করে পশুদের হেয় করা হয়ে থাকে; কারণ এ জাতীয় হিংস্র স্বভাব মানুষখেকো পশুদের মধ্যেও নেই। সত্যিকার অর্থে মানুষের চেয়ে হিংস্র কোন প্রাণী এ জগতে সৃষ্টি হয়নি। বহুদিন বুভুক্ষু না থাকলে বা আক্রমণের শিকার না হলে কখনো কোন পশু মানুষকে আক্রমণ করেছে বলে শুনা যায়নি। কিন্তু মানুষ বিনা কারণে পশু পেটায়— হালচাষ করার সময় কাহিল অবস্থায় হাল টানতে না পারলে কৃষক গরু পেটায়, লেজে মোচড় দেয়; মাহুত হাতির উপর চড়ে আরামে হাতি পেটায়; ঘোড়সওয়ার রাজপুতের মতো যে ঘোড়ায় চড়ে সেই ঘোড়ায় চাবুক মারে, রাস্তা-ঘাটে কুকুর, বিড়ালে বিনা কারণে মানুষ ঢিল মারে, লাঠি মেরে পা ভেঙে দেয়, সাপের কথা শুনলেই ছেলে, বুড়ো সবাই লাঠি নিয়ে বের হয়। মানুষ প্রতিমুহূর্তে মশা মারে, মাছি মারে, টিকটিকি মারে, ইঁদুর মারে, তেলাপোকা, ছারপোকা, পিঁপড়া সব মারে। বিনা কারণে পশু আর পোকামাকড় মারার মানুষের এই অসুস্থতা অভ্যাসের অবসান কোন কালে হবে বলে মনে হয় না।
একটি শিশু তার পরিবেশ দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয় এবং ঐ পরিবেশের চাপে ছোট-খাট চুরিও করে। তাই বলে যে কেউ ইচ্ছে করলেই কাউকে শাস্তি দিতে পারে না। ছোট-খাট বা বড় যে কোন চুরির অপরাধে রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিচারালয় ব্যতীত শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার অন্য কারো নেই। অপরাধের শাস্তি বিধানের পূর্বে আইন এবং বিচারালয়ও অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল কারণ ও অবস্থাবলীর যোগসূত্র বিশ্লেষণ করে থাকে। মনে রাখতে হবে যে, ভালো পরিবেশে এই একই শিশুর অপরাধপ্রবণতার কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণও হয়ে যায়। অপরাধপ্রবণ ও উচ্ছৃঙ্খল শিশুদের সংশোধনের সুযোগ থাকলে তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু আমাদের শিশু সংশোধনাগারগুলো ও তত্ত্বাবধায়কেরা জেলখানার সার্বিক অবস্থার চেয়েও জঘন্য।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কাউকে অত্যাচার করে মেরে ফেলা তো দূরের কথা, কাউকে সামান্যতম নির্যাতনও করা যাবে না, কারও প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ করা যাবে না অথবা কাউকে আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত বিচারালয় ব্যতীত শাস্তি দেওয়া যাবে না। আমাদের ইসলাম ধর্মে চোরের হাত কাটার বিধান রয়েছে; কিন্তু সামান্যতম সন্দেহও যদি থাকে যে, একমাত্র ক্ষুধার তাড়নায় চুরি করতে বাধ্য হয়েছে তাহলে চুরির সাথে সংশ্লিষ্ট চোরের হাত কাটা হয় না। ইসলামিক আইন কার্যকর করার ব্যাপারে হযরত ওমর (রা.)-এর কঠোরতা সর্বজনবিদিত। তাঁর আমলে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি চুরির অপরাধে হাত কাটার শাস্তি স্থগিত করে রেখেছিলেন। কারণ ক্ষুধার তাড়না উপলব্ধি করার ক্ষমতা হযরত ওমর (রা.)-এর ছিলো। পরিস্থিতির চাপে সংঘটিত অপরাধে কোন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি ইসলাম সমর্থন করে না। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের সঙ্গে নিজে যেমন কমনীয় ব্যবহার করেছেন ঠিক তেমনি অন্যদেরও কোমল ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।
কোন ধরনের শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও চুরির অপবাদে যত্রতত্র শাস্তি দেওয়ার ঘটনা প্রতিদিন পত্রিকায় আসছে, টিভি চ্যানেলগুলোতে তা আবার আলোচিতও হচ্ছে, ফেসবুকে নির্যাতনের মর্মান্তিক ভিডিওচিত্র ফলাও করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সমাজের অবক্ষয় এত মারাত্মকভাবে নেমেছে যে, সরকারের ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ ও মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন সত্ত্বেও চুরির অপবাদে শিশু নির্যাতন কমছে না। অন্যদিকে মানুষ স্বার্থোন্মত্ত হয়ে নিজে বাঁচার তাগিদে অন্যের বিপদে তাকিয়েও দেখছে না। কিন্তু এক সময় ছিলো, অপরাধ দেখলে সামাজিকভাবে অনেকে বাধা দিতো, নির্যাতিতের সহযোগিতায় এগিয়ে আসত; কিন্তু এখন কেউ এগিয়ে আসে না। কারণ প্রতিরোধকারীর বাঁচার অধিকার অল্প দিনের।
আমি নিজে অনেকটা বস্তি এলাকায় থাকি; আগে এগুলো দেখলে দূর থেকে চিৎকার করতাম, প্রতিবাদের চেষ্টা করতাম। তবে কোথাও কখনো সফল হইনি। কারণ আমার চিৎকারে কোন নির্যাতনকারী বা সন্ত্রাসীর সন্ত্রাস এক সেকেন্ডের জন্যও থামেনি। এখন কাউকে পিটাতে দেখলে তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করি। কারণ তিরানব্বই ও চুরানব্বই সনের চোখে দেখা অনেকগুলো ঘটনায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক এই সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছি। অনেকগুলো ঘটনার মধ্যে শুধু একটি ঘটনা পাঠকদের বলি। সন্ত্রাসীদের খোঁজ-খবর নিতে পুলিশ বস্তির এক সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ মহিলার সাথে কথা বলে যাওয়ার পরমুহূর্তে সন্ত্রাসীরা এসে মহিলাকে যেভাবে নির্যাতন করলো তা বর্ণনাতীত। অসহায় মহিলাটি 'বাঁচাও বাঁচাও' বলে কত চিৎকার করলো, কয়েকটি পিস্তল আর কিরিচের ভয়ে আমরা কেউ একটি কথাও বললাম না। প্রবীণ এই মহিলা তার অসহায়ত্বের গভীরতা তখনই ভালোভাবে বুঝতে পারলেন যখন তিনি দেখলেন যে, শতেক দর্শকও পাঁচজন মাস্তানের ভয়ে ভীত। তারপর মহিলা আর চিৎকার না করে নির্জীব হয়ে শুধু মার খেলেন। আসলে জটিল সমাজের এসব মানসিকতা মানুষদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
এ সকল নির্যাতন শুধু স্থানীয় প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে হয় না; বস্তির গরিব, নিঃস্ব লোকেরাও চুরির অপবাদে শিশুদের পেটায়। কারণ মানুষকে মেরে মানুষ আনন্দ উপভোগ করে। পাড়ার প্রহরীরা একদিকে মাস্তানদের সাথে ভয়ে সখ্যতা বজায় রাখে, অন্যদিকে নিরীহ কাগজ টোকাইকে তাদের সীমানায় দেখলেই লাঠির বাড়ি মারে। শত্রুতাবশত কাউকে শায়েস্তা করতে চাইলে শুধু 'চোর, চোর' বলে কয়েকটি চিৎকারই যথেষ্ট; মাস্তানদের হাত থেকে বাঁচার তাগিদে দৌড়রত ছেলেটির গায়ে কিল, ঘুষি, লাথি অনবরত পড়তে থাকবে। যারা মারছে তাদের হয়তো কেউ জানে না, কেন মারছে। জানার দরকার নেই, জানলে মানুষ মারার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে হবে।
কেন সমাজে এমন বর্বর আচরণ থামছে না এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। তবুও আমি আবার লিখছি। কারণ লেখা হয়েছে বলে লেখা বন্ধ করা যথার্থ নয়। বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিশুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনা থামছে না বলে অনেকের ধারণা। অন্যদিকে এতিম, নিরীহ, নিঃস্ব শিশুদের ওপর যখন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে তখন তারা প্রতিবাদ করতে পারে না, আইনের আশ্রয় নিতে পারে না, আর এই বিষয়টি নির্যাতনকারী ভালোভাবে অবহিত। সম্ভবত এ কারণেই শিশু নির্যাতনের ঘটনা থামছে না। অনেকের বিশ্বাস আমাদের রাজনৈতিক নেতারা এ ব্যাপারে জোরেশোরে কোন কথা বলেন না বলে জনগণের মধ্যে এ ব্যাপারে সচেতনতার সৃষ্টি হচ্ছে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অবশ্য স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেছেন, 'শিশু নির্যাতন করে কেউ পার পাবে না'। এছাড়াও বর্তমান সরকারের আমলে শিশু সুরক্ষায় আইনি কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে; নেয়া হয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগও। কোথায় কোন নির্যাতনের রিপোর্ট পেলেই নির্যাতনকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। রাজন হত্যার ত্বরিত বিচারও হয়েছে। সরকার এ ব্যাপারে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলেও সামাজিক অসুস্থতার কারণে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলেছে। অন্যদিকে সমাজের মানুষদের মানসিকতায়ও কোন পরিবর্তন আসেনি। ফলে নির্যাতন বন্ধে সরকারের প্রচেষ্টা নেয়া সত্ত্বেও শিশুর প্রতি সহিংসতার দৃশ্যমান কোন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না, বরং অত্যাচারের ভয়াবহতা ও নৃশংসতা বেড়েছে। সমাজের সচেতন লোকদের নির্লিপ্ততা শিশুদের উপর সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে তাই সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। শিশুদের প্রতি বড়দের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি ও সমাজের অস্থিরতা দূর করতে না পারলে আইন করেও নির্যাতনের এই নির্মমতা ঠেকানো যাবে না।
এসব ঘটনা প্রতিরোধে অনেকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ পারিবারিকভাবে যদি শিশু অধিকার ও শিশু সুরক্ষা আইনগুলো শেখানো হতো তাহলে শিশুর ওপর এ ধরনের নিষ্ঠুর নির্যাতন কমে আসতো। আমার কাছে এটা গ্রহণযোগ্য সমাধান বলে মনে হয় না। কারণ সুস্থভাবে খেয়ে পরে নিরাপদে বেঁচে থাকা সংশ্লিষ্ট শিশুর মৌলিক অধিকার সম্পর্কে অবগত হলেও তা দারিদ্র্যের কারণে অনেক মা-বাবা পূরণ করতে পারছে না। আমাদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কেও কম বা বেশি অনেকেই জানি, কিন্তু জানলেই পাওয়ার অধিকার প্রয়োগ করা সহজসাধ্য নয়।
অভাবের তাড়নায় খাবার বা সামান্য কিছু চুরির জন্য শিশুর প্রতি সহিংস আচরণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা আইন প্রয়োগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। ঘুষখোর, ডাকাত, ধর্ষক, সন্ত্রাসীদের মতো শিশুনির্যাতনকারীও ঘৃণ্য জীব— সমাজে এই মনোভাব যত প্রবল ও বেগবান হবে নির্যাতনের মাত্রা ততই কমবে। গণসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও শাস্তি নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। মানুষের মাঝে নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে ঘৃণাবোধ জন্মানোর বিবেক জাগ্রত করার জন্য নানা ধরনের প্রচার-প্রচারণা জরুরি। সমাজের বিবেকবান মানুষ সোচ্চার হলে অত্যাচারীর সাহস কমবে। জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণায় বর্তমান সরকার যে সকল পদক্ষেপ নিয়েছে তদ্রূপ পদক্ষেপ শিশু নির্যাতনের বিপক্ষেও নেয়া অপরিহার্য। সর্বস্তরে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের সরকারি, বেসরকারি, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগে স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা ইত্যাদিতে আলাপ, আলোচনা, বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে শিশু নির্যাতন রোধে জনমত গঠন সম্ভব এবং এক্ষেত্রে শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত, সামাজিক সংগঠন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। গণসচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অগ্রগণ্য। সংঘটিত ঘটনার ফলোআপ করে শাস্তি প্রদানে সহায়তা করা এবং শাস্তির মাত্রা ব্যাপকভাবে প্রচারে গণমাধ্যমের বিকল্প অন্য মাধ্যমগুলো তত কার্যকর ও ফলপ্রসূ নয়। স্কুলজীবনে 'চোরের আত্মকাহিনী' পড়েছিলাম। চোর ধরা পড়েছে, সবাই মারার জন্য দৌড়াচ্ছে। এক বাবা তার শিশুকে চোর দেখানোর আগ্রহ নিয়ে দৌড়ে জটলার মধ্যে উপস্থিত হলো। সবাই চোর মারছে; শিশুটি জিজ্ঞেস করলো, 'বাবা, চোর কই, এটা তো মানুষ'।