বগুড়ায় এক 'শ্রমিক লীগ' নেতা তার কয়েকজন ক্যাডারসহ এক ছাত্রীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করায় জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ করায় পরবর্তীতে মেয়েটি ও তার মা'কে তুলে নিয়ে একই ধর্ষক বর্বরোচিত নির্যাতন করে। এখানেই শেষ নয়, ওখানকার নারী কাউন্সিলর ধর্ষকের আত্মীয় হওয়ায় ধর্ষকদের হিম্মত আরও বেড়ে যায়। ধর্ষিতা ও তার গর্ভধারিণী মা'কে সমাজে চিহ্নিত করে লোকচোখে হেয় করার অভিপ্রায়ে মা, মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়েছে।
আমার ধারণা, ধর্ষকদের কোন জাত-পাত নেই; 'শ্রমিক লীগ' হলে ধর্ষণের আগ্রহ বাড়ে, অন্য দলের হলে আগ্রহ হ্রাস পায়—এমন কোন স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম কেউ আবিষ্কার করেছেন বলে জানা যায় না। তবে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলে ধর্ষণের আগ্রহ বাস্তবায়নে সাহসটা বেড়ে যায়।
কিন্তু ক্ষমতা কি ক্ষমতাসীনদের সব সময় রক্ষা করে? না, করে না। কারণ ক্ষমতাও কেন্দ্রাভিমুখ; যে কাজ কেন্দ্রের ভঙ্গুরতা সৃষ্টি করে সেই কাজকে ক্ষমতাও সমর্থন করে না। বিভিন্ন রাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুকে রক্ষা করলেও বহু শাসককে জনরোষে আমেরিকা পরিত্যাগ করেছে। তাই দলীয় সমর্থক, দলীয় নেতাদের কার্যক্রম যখন জনরোষের সম্মুখীন হয় তখন দলও সমর্থক, নেতাদের উপর অদৃশ্য আশীর্বাদ তুলে নেয়। এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী মরহুম আতাউর রহমান খান তাঁর 'প্রধানমন্ত্রীত্বের নয় মাস' বইটিতে উল্লেখ করেছেন যে, এলাকার একটি নির্বাচনে তাঁর প্রার্থী ছেলেকে প্রশাসনের সহায়তায় হারিয়ে দেওয়া হয়; ক্ষমতাসীন দলের সর্বোচ্চ ক্ষমতার নির্দেশে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর ছেলেকে হারিয়ে দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছিলো যে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। তাই সব সময় দলীয় নেতা, কর্মীদের ক্ষমতায় উৎফুল্ল হয়ে যা ইচ্ছে তাই করা, উল্লম্ফন দেওয়া বোকামি; কারণ দলের সুনাম ও ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়োজনে দল অবাঞ্ছিত নেতা, সমর্থকদের কুরবানী দিতে এক সেকেন্ডও দেরি করে না। প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন আতাউর রহমান খানও তাঁর ছেলের নিশ্চিত পরাজয় ঠেকাতে পারেননি।
ধর্ষণ হচ্ছে, পারস্পরিক সম্পর্কহীন ও সম্মতিবহির্ভূত যৌনকর্ম। বৈবাহিক বন্ধন ছাড়াও সম্পর্ক বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। যৌনকর্মীদের সাথে সম্মতিসূচক সম্পর্কটা তাৎক্ষণিক তৈরি হয়। ধর্ষণ এড়াতে পারস্পরিক সমঝোতায় সম্মতির একটি সম্পর্ক গড়ে নিতে হয়। অবশ্য বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যেও কারো অনিচ্ছায় যৌনকর্মে বাধ্য করা পাশ্চাত্যে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের দেশে হয় না; আমাদের দেশে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকলে অনিচ্ছায় বাধ্য করলেও কোন অভিযোগ থাকে না। বিবাহবহির্ভূত প্রেম-প্রীতির সম্পর্কও হতে পারে; সমঝোতায় যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ অভিধায় অভিযুক্ত করা হয় না।
উন্নত দেশগুলোতেও ধর্ষণ হয়; ঐসব দেশে মেয়েরাও মাঝে মাঝে ধর্ষণ করে বলে শোনা যায়। তবে ঐসব দেশে জোর জবরদস্তি করে যৌনসম্পর্ক স্থাপনের ঘটনা খুবই কম। কারণ তাদের সমাজে অবাধ মেলামেশায় কেউ চোখ টাটায় না, কারো ঘরের বেড়া ফাঁক করে কেউ অন্যের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে না, কারো ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে মাথা ঘামায় না, দুই-তিন জন মিলে পরচর্চা করে না। তাদের সমাজ লিভটুগেদার মেনে নেয়; জনপ্রিয় ফুটবলার ম্যারাডোনার চার সন্তানের জন্মের পর সন্তানের মা'র সাথে ম্যারাডোনার বিয়ে হয়। এ কারণেই সম্ভবত পাশ্চাত্য বা ভিন্ন পরিবেশের দেশগুলোতে যত্রতত্র মেয়েদের উপর ছেলেদের ঝাঁপিয়ে পড়ার চিত্র খুব বেশি নেই।
আমাদের দেশে যৌন সম্পর্ক নিয়ে লাজ-লজ্জা এত বেশি যে, বানানো ছবি প্রচার করেও একটি মেয়েকে পরিবার, সমাজের রক্তচক্ষু থেকে বাঁচার জন্য আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য করা সম্ভব হয়। আমাদের সমাজে মেয়েদের পোশাক নিয়ে শুধু কটূক্তি করা হয় না, পরিধানের পোশাক পুরুষদের ধর্ষণে প্রলুব্ধ করার অভিযোগও করা হয়। কিন্তু প্রলুব্ধ করলেই প্ররোচিত হয়ে ঝাঁপ দেওয়ার অধিকার কে দিলো— এই কথাটি ঐ বিশেষ লোকগুলোর মনে উদয় হয় না। পোশাক নিয়ে কটূক্তি করার সময় তাদের মনে কি জাগে না যে, হিজাব পরা, বোরকা পরা মেয়েরাও তো ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকে। অন্যদিকে ছোট ছোট বাচ্চাদের যখন ধর্ষণ করা হয় তখন তো পোশাকে পুরুষদের প্রলুব্ধ করার বালাই থাকে না। শুধু খাবারের লোভ দেখিয়ে শিপন নামে এক ধর্ষক কয়েকদিন আগে তিন বছরের শিশু তানহাকে রাজধানীর বাড্ডায় ধর্ষণ ও হত্যা করেছে। যে সমাজে শিশুদের ভয়-ভীতির শিক্ষা দিয়ে বলা হয়, 'অপরিচিত লোকদের নিকট থেকে কিছু নেবে না', সেই সমাজে শিশুদের ভয়মিশ্রিত পথ চলা তখন থেকেই সাথী হয়ে যায়।
২ আগস্টের 'সংবাদ' পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার খবর হচ্ছে, "উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণ"। এই খবরের উপশিরোনাম করা হয়েছে, "শিশু থেকে গৃহবধূ কেউ রেহাই পাচ্ছে না, ধর্ষকদের মধ্যে রয়েছে বখাটে রাজনৈতিক কর্মী ও মসজিদের ইমাম"। চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তিতে মসজিদের ইমাম অহিদুজ্জামান ওরফে দিপু মোল্লার বিরুদ্ধে ইবতেদায়ি শাখার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ তাকে গ্রেফতারও করেছে। যারা মেয়েদের পোশাক নিয়ে কটূক্তি করে ধর্ষকদের দায় মেয়েদের পোশাকের উপর বর্তানোর চেষ্টা করে তারা বলুন তো, এখানে কোন্ পোশাক ইমামকে প্রলুব্ধ করলো? পাশ্চাত্যে এক গবেষণায় পরিলক্ষিত হয়েছে 'ন্যুড' ক্লাবগুলোতে লোকের আনাগোনা অপেক্ষাকৃত কম। তাই পোশাক নয়, বুদ্ধিমান মানুষের পদবাচ্য হতে হলে আমাদের সংযমের মাত্রার অনুশীলন করতে হবে।
৩ আগস্টে সংবাদ-এর খবর, 'চলন্ত ট্রাকে কিশোরীকে পালাক্রমে ধর্ষণ', 'তরুণী ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষকসহ দু'জন গ্রেফতার'। ধর্ষণ কি আগের দিনের কলেরার মতো মহামারী আকার ধারণ করলো? প্রেম-ভালোবাসা নেই বলেই কি ধর্ষণ বেশি হচ্ছে?
ড. নীলিমা ইব্রাহীম প্রেম-ভালোবাসার পক্ষে বলতে গিয়ে একবার বলেছিলেন, 'ক্ষমতা থাকলে আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে বেড়া দিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকাদের অভয়ারণ্য করে দিতাম; কারণ ঘটকালী করে বিয়ে দেওয়া বিচ্ছিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় কষ্টকর।' তবে প্রেম যেন ধর্ষণে পর্যবসিত না হয় সে ব্যাপারেও তিনি সতর্ক করেছিলেন। কারণ জোর করে প্রেম আদায়ের ঘটনায়ও ধর্ষণ ও মৃত্যু আছে। এমন সংবাদও দেখা যায়, প্রেমিক প্রবর তার কয়েকজন বন্ধুসহ নিজের প্রেমিকাকে ধর্ষণ করছে বা প্রেমের আবেগময় মুহূর্তে গোপনে করা ভিডিও ক্লিপ প্রকাশের ব্ল্যাকমেইলিং করে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা হচ্ছে। ১ আগস্টের 'সংবাদ'-এর সচিত্র সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, ফটোশপে বানানো অশ্লীল ছবি ফেসবুকে উত্ত্যক্তকারী কর্তৃক ছাড়ার কারণে লাকসামের স্মৃতি আক্তার আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে।
প্রেম কেন ধর্ষণে পর্যবসিত হয়— তার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় নানাবিধ কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। 'দৃষ্টিপাত' উপন্যাসের বিখ্যাত উক্তি, 'বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ'— ধর্ষণের ক্ষেত্রে 'বেগ'-এর দৌরাত্ম্য কতটুকু দায়ী তার চুলচেরা বিশ্লেষণ খুব বেশি নেই। তবে আবেগের তুলনায় গতি বা বেগের বৃদ্ধির কারণে সবাই যে অস্থির, এই মন্তব্যটি সহজে করা যায়। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে এখনো আবেগ বেগের চেয়ে বেশি ক্রীড়াশীল। কিন্তু ক্রীড়াশীল এই আবেগ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে অনুতাপে পর্যবসিত হয় এবং তা আমরা জানতে পারি শুধু অসহায় মুহূর্তে। একটু বয়সীরা বুদ্ধি খাটিয়ে পরিবেশকে পোষ মানাতে সক্ষম হলেও লোভী, ভোগীদের লালসা থেকে বাঁচতে কম বয়সীদের কিন্তু অনেক হিসেব নিকেশ করে পথ চলতে হয়।
শুধু ধর্ষকেরা নয়, ধর্ষণের জন্য পরিবার এবং সমাজও কম দোষী নয়। ছেলেদের প্রতি পরিবার, সমাজ এসব ক্ষেত্রে নমনীয়; কিন্তু মেয়েদের প্রতি খড়্গহস্ত। মেয়েদের উপর পরিবার এবং সমাজ যেভাবে গোয়েন্দার মতো নজর রাখে, ছেলেদের উপর তত নয়। এখনো সমাজের একটি কমন উক্তি হচ্ছে, 'ছেলেমানুষের ওমন একটু আধটু দোষ-ত্রুটি থাকতেই পারে'।
প্রচলিত আইন মেয়েদের পক্ষে হলেও আইন কাজে লাগিয়ে সম্মান ফিরে পাওয়া কঠিন; কারণ মামলায় জিতা সহজ হলেও সমাজে স্থান পাওয়া সহজ নয়। পাঁচকান করে অচ্ছুত হওয়ার ঝুঁকি কোন পরিবার নিতে চায় না।
মসৃণ ও নিরাপদ জীবন অবশ্য পৃথিবীর কোথাও নেই; শুধু কম আর বেশি। হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে চোট লাগবেই; চোটের সব ঘা আবার শুকায় না। মেয়েদের ক্ষেত্রে শুকাতে দেয়াও হয় না। কারণ আমাদের রক্ষণশীল পরিবার ও সমাজ ঘা বহনকারী মেয়েকে নর্দমার কীট মনে করে। এ অবস্থায় ঘা খাওয়া সাহসী মেয়েদের পক্ষে হামাগুড়ি দেওয়া সম্ভব হলেও তারা সমাজের অবহেলায় দৌড়ের গতি আনতে পারে না। তখন সমাজের নষ্টজীবদের অশালীন আচরণ, অকথ্য উচ্চারণে ভূতের চেয়েও দ্বিগুণ ভয় উত্থিত হয়।
মেয়েদের যে সর্বনাশটা নিয়ে মা-বাবা বা সমাজের এত চিন্তা-ভাবনা, এত সাবধানী হওয়া, এত শাসন, এত দুর্ভাবনা, এত আঁটঘাট বাঁধা— এতে কি সমাজ বা নারীর কোন উপকার হয়? সতর্ক চলাফেরা, গা-ঢাকা পোশাক-পরিচ্ছদও নারীদের লোভাতুর দৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে পারছে না। এক্ষেত্রে বরং বাধাহীন মেলামেশা মেয়েদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা নিতে পারে, তখন হয়তো এখনকার মতো অকস্মাৎ পাওয়া সুযোগ কাজে লাগানোর মনোবৃত্তিটা জন্ম নাও নিতে পারে।
অপরিপক্ব বয়সের প্রেমে খানিকটা হিপনোটিজম তো থাকেই, হিপনোটিজমে ভারাক্রান্ত হলে মাথাটা তখন কাজ করে না; বুদ্ধি বা মাথা তখন বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিটকেল চিন্তা, অদ্ভুত চিন্তা, পাগলাটে চিন্তায় মাথাটা বিদ্রোহ করে। মাথা বিভ্রান্ত হলে বুদ্ধি ঘোলাটে হয়ে যায় এবং বিক্ষিপ্ত চিন্তায় ভুল সিদ্ধান্তে পথচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এরূপ হিপনোটিজমের বিহ্বলতা থেকে বস্তুজগতে ফিরে আসার বুদ্ধিটুকু রপ্ত করা না থাকলে বিপদ হতে পারে।
প্রেম বা বন্ধুত্ব থেকে ঘোর আবেশ এসে গেলে বিচ্যুত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে, অনেক সময় তখন প্রেমও ধর্ষণে রূপ নেয়। কারণ ভালো লাগার শেষ নেই; একটা ভালো লাগা শেষ হলে আরেকটা ভালো লাগার স্টেজ চলে আসে। মনে রাখতে হবে, শুধু ধর্ষণ নয়, প্রেমের মধ্যেও তস্কর থাকে। ধর্ষকেরা দেয়াল ভাঙে, প্রেমের তস্করেরা সিঁধ কাটে। ফাঁদ পাতার এই স্তরটি খুব সেনসিটিভ, অল্পতে ইমপ্রেসড বা তুষ্ট হওয়ার এই পর্যায়ে বিচ্যুত হওয়ার বা বিচ্যুত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাই নিয়ন্ত্রিত আবেগ, সংযত বেগ না থাকলে উদ্ভূত আবহ যে দুর্বলতা সৃষ্টি করে ওখান থেকে বেরুনোর তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা অপরিহার্য।
যে অগ্রহণীয় প্রস্তাবে 'না' বলতে পারবে না, তার বিপদ বডিগার্ড দিয়েও রক্ষা করা সম্ভব নয়। এই 'না' বলতে না পারার অপঘাতে তস্করের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ বারবার অপরিহার্য করে তোলে। বাঁধভাঙা আবেগ কাকে কখন কতটুকু খাবে তার কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই— ব্যাঘ্রের মতো ঘাড় মটকিয়ে একবারেই খেতে পারে, আবার অজগরের মতো ধীরে ধীরে গিলেও খেতে পারে।
তাই বলে প্রেম-ভালোবাসা বাদ দিয়ে সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনী হয়ে জড়ত্ব বেছে নেয়া প্রাণের বৈশিষ্ট্য নয়। সন্ন্যাসিনী একটা ক্যামোফ্লেজ বা ছদ্মবেশ। বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, আবেগে-আবদারে বিকিয়ে না দেওয়া, এমন আবহের সৃষ্টি না করা যাতে প্রেমিক ধর্ষক হয়ে উঠে।
আমাদের সমাজে 'সতীত্ব' শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়। পুরুষদের জন্য এর কোন উপযুক্ত শব্দও নেই। তাই আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় ধর্ষিতাদের বাঁচার অনুকূল পরিবেশ থাকে না। দেহ ভ্রষ্ট হলে মন ভ্রষ্ট হয় কি না এ নিয়ে শরৎচন্দ্র তাঁর 'গৃহদাহ' উপন্যাসে যে কাহিনীর বিন্যাস করছেন তা পাঠকদের নিকট খুবই উপাদেয়; কিন্তু বাস্তবে নয়। অচলা দোলাচিত্তে একবার স্বামী মহিমের প্রতি একনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করেছে, পরমুহূর্তে স্বামীর বন্ধু সুরেশের প্রতি অনুরক্ত হয়ে তার নিকট ছুটে গিয়ে রাত কাটিয়েছে। এই রাত কাটানোটা সমাজ নিতে চাচ্ছে না। দ্বিধাদীর্ণ এই অচলা সাহিত্যের বিশ্লেষণে 'শ্রেষ্ঠ চরিত্র' হলেও সমাজমানসে অপাঙ্ক্তেয়। সমাজ এবং পুরুষদের মনোজগত এখনো মেয়েদের দেহগত পবিত্রতা নিয়ে আপস করে না।
এসব ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য আর প্রাচ্যের মধ্যে একটি পার্থক্য সুস্পষ্ট। প্রাচ্যে সীতাকেও অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়; রাবণ সীতার শুধু একটি আঙুলের মাথা ধরে হরণ করেছিলো বলে অগ্নিপরীক্ষায় সীতার আঙুলের মাথাটি পুড়ে যায়। সীতার সতীত্বে রামের সন্দেহ না জাগলেও রাজ্য শাসনে প্রজাদের ভয় ছিলো বলে সীতাকে বনবাসে যেতে হয়। এত শুচিতা বা শুদ্ধাচারে পাশ্চাত্য স্পর্শকাতর নয়। এক্ষেত্রে তারা ওপেন, দুর্বল মুহূর্তের সংঘটিত ঘটনা লুকিয়ে তস্করকে পুনরায় লুণ্ঠনের সুযোগ দেয় না। ওখানে ধর্ষিতারা সমাজে অপাঙ্ক্তেয় নয়; সমাজের মূলস্রোতে তারা খুব সহজেই মিলে-মিশে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ইয়াজিদি নারী এখলাসকে ২০১৪ সনে অপহরণ করে নিয়ে আইএস-এর যোদ্ধারা তিন বছর ধরে প্রতিদিন ধর্ষণ করেছে বলে বিবিসি বাংলায় এক সাক্ষাৎকারে এখলাস নিজেই বর্ণনা করেছে। সে কিন্তু আমাদের সমাজের মেয়েদের মতো আত্মহননের কথা ভাবেনি; সে পালানোর চেষ্টা করেছে এবং চেষ্টায় সফল হয়ে এখন জার্মানির একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। এখলাস পড়ালিখা করে আইনজীবী হতে চায়। ওদের সমাজ এদের অচ্ছুত ভাবে না বলেই ধর্ষিতাদের ঐ সকল সমাজে আত্মহনন নেই। আমাদের সমাজ পারলে প্রচারপত্র বিলি করে ধর্ষিতাকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়। সমাজের এই হীনমন্যতা না থাকলে ধর্ষিতা সঙ্গে সঙ্গে আইনের আশ্রয় নিতে সাহসী হয়ে উঠতো, ধর্ষণও কমতো।
মা-বাবার সাথে ছেলে-মেয়েদের অনতিক্রম্য দূরত্ব থাকে বলে যৌনসম্পর্কিত ঘটনা অমোচনীয় কলঙ্ক হিসেবে গণ্য করা হয়; কোন মেয়ে তাই একবার ভিকটিম হয়ে পরিবার, সমাজ, গোটা পৃথিবীর কাছে প্রচারের ভয়ে অচ্ছুত হওয়ার চেয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষকের নিকট বারবার ধর্না দিয়ে থাকে। তাই আমাদের দেশে ধর্ষকের বিচারের সাথে সাথে পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন হওয়া দরকার।
শুধু আত্মহনন নয়, আমাদের দেশে নিগৃহীত, ধর্ষিতাদের গোপনে মেরে ফেলার 'অনার কিলিংও' আছে; এটাকে ভেতরে ভেতরে অনেকে আবার সমর্থনও করে। অনার কিলিং পাকিস্তানে তো সামাজিকভাবে একটি জায়েজ কাজ। আমাদের দেশে অনার কিলিং যত্রতত্র না হলেও যেভাবে সংঘটিত কাজের নিন্দা করা হয় তা আত্মহত্যার প্ররোচনা ছাড়া আর কিছু নয়। "মরতে পারিস না, গলায় রশি জোটে না; আগে যদি জানতাম, কেটে সাগরে ভাসিয়ে দিতাম" এরূপ বাক্য ভরসার আশ্রয়স্থল পিতা-মাতা থেকেও অবিরল বর্ষিত হতে থাকে।
আমাদের সমাজে মাস্তানদের দৌরাত্ম্য মাত্রাতিরিক্ত। মেয়েদের চলাফেরায় অশালীন কথা বা একটি, দুইটি চড়-থাপ্পড় অহরহ হয়; কিন্তু সত্যতা প্রমাণ করে বিচার চেয়ে পরবর্তীতে আরও কঠিন বিপদে পড়ার আশঙ্কামুক্ত নয় বলে মেয়েরা সবকিছু গোপনে হজম করে।
সমাজের এই অবস্থায় কখন কোন্ সর্বনাশ ঘটে— এই চিন্তায় সব মা-বাবা উৎকণ্ঠিত থাকে বলেই প্রাপ্য স্বাধীনতা মেয়েদের দিতে সংকুচিত হয়ে পড়ে। সন্তানদের কষ্ট ভাবনা কোন মা-বাবাকে স্বস্তি দেয় না। একশত জনের নাকের ডগা দিয়ে দুজন তস্কর একটি মেয়েকে ছিনিয়ে নেয়ার বদমতলব আমাদের সমাজে হাসিল করতে পারে; এ কারণে সমঅধিকারে বিশ্বাসী প্রগতিশীল মা-বাবারাও মেয়েদের স্বাধীনতা দিতে উৎসাহী হয় না। শঙ্কা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তায় সময় গণনা করে জীবন কাটাতে হয় অভিভাবকদের। মনে হয়, ভয় নিয়ে বেঁচে থাকাটা একটা অভিশাপ।