বিগত কয়েক দিনের দৈনিক 'সংবাদ' পত্রিকা থেকে দেখা যায়, সম্প্রতি পবিত্র আল-আকসা মসজিদে প্রবেশাধিকারে ইসরাইল কর্তৃক বিধি-নিষেধ আরোপ করায় মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে। কয়েক দিন পূর্বে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে তিন আরব-ইসরাইলির হাতে দুই ইসরাইলি পুলিশ খুন হওয়ার পর ইসরাইলি বাহিনী ধাওয়া করে তিন হামলাকারীকে হত্যা করে। প্রথমে মসজিদের প্রবেশ-পথে মেটাল ডিটেক্টর বসিয়ে পঞ্চাশোর্ধ্বদের মসজিদে প্রবেশে মনিটর করছিলো, পঞ্চাশ বছরের কম বয়সী মুসল্লিদের আল-আকসা মসজিদে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করেছিলো। নামাজ আদায়ে এ ধরনের বাধা-নিষেধ মুসলিমদের নিকট মসজিদের জন্য অসম্মানজনক হিসেব গণ্য হচ্ছে; ইসরাইলের এরূপ পদক্ষেপ পবিত্র আল-আকসা মসজিদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত বিবেচনা করে আরব-ইসরাইলি ও প্যালেস্টাইনিরা প্রতিদিন বিক্ষোভ করছে। ক্ষোভ, বিক্ষোভের মাত্রা লক্ষ্য করে ইসরাইল মেটাল ডিটেক্টর সরিয়ে ওখানে আরও অত্যাধুনিক মনিটরিং যন্ত্রপাতি বসাচ্ছে।
কেন ইসরাইল একটি পবিত্র মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য এত মরিয়া? ১৯৬৭ সনে ইসরাইল এই এলাকায় প্রবেশাধিকার পাওয়ার পূর্বে শুধু মুসলমানেরাই এই মসজিদে নামাজ আদায় করত; ইহুদিদের প্রার্থনাগৃহ টেম্পল মাউন্ট চত্বরে প্রতিষ্ঠিত আল-আকসা মসজিদে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রার্থনার সুযোগ পেত ইহুদিরা।
জেরুজালেম কেন ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ, কেন আল-আকসা মসজিদে নামাজ পড়া নিয়ে ইসরাইলী সৈন্য ফিলিস্তিনীর উপর গুলি করে, কেন ফিলিস্তিনীরা ইন্তিফাদা আন্দোলন করে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে পাথর ছুঁড়ে, কেন ইহুদিরা আল-আকসা মসজিদ দখলের পাঁয়তারা করছে বলে মনে করা হচ্ছে— এসবের বিচার, বিশ্লেষণ প্রতিনিয়ত হচ্ছে। বিভিন্ন ধর্ম ও ইতিহাসের ব্যাখ্যায় জেরুজালেমের অধিকার নিয়ে একেশ্বরবাদী ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
জেরুজালেম পৃথিবীর প্রাচীনতম শহরগুলোর অন্যতম। আরবীতে এর নাম 'বায়তুল মুকাদ্দস' বা 'আল কুদস'। এখানে নির্মিত মসজিদ, মন্দির, চার্চসহ জেরুজালেম শহরটি বারবার বিভিন্ন আক্রমণকারী মানুষের আক্রমণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধ্বংস হয়েছে; আবার একজনের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ধ্বংসস্তূপের উপর আরেকজন স্বীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছে।
অষ্টম শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত আল-আকসা মসজিদ জেরুজালেমে অবস্থিত। সময়-কাল বিবেচনায় ক্রমানুসারে সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্য নবী, পয়গম্বরের মাধ্যমে তওরাত, ইঞ্জিল, কোরআন নাজিল করেছেন। ইহুদিরা বাদশাহ সুলেমান কর্তৃক জেরুজালেমে খ্রিস্টপূর্ব ৯৫৭ অব্দে প্রতিষ্ঠিত তাদের প্রার্থনাগৃহ 'টেম্পল মাউন্ট' এবং জেরুজালেম শহরকে নানা কারণে তাদের পবিত্রতম স্থানরূপে বিবেচনা করে থাকে। এই টেম্পল মাউন্ট আবার ব্যাবিলিয়ন দ্বারা ধ্বংস হয় খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে; খ্রিস্টপূর্ব ৫১৬ অব্দে পুনরায় নির্মাণ করা হলেও ৭০ খ্রিস্টাব্দে আবার ধ্বংস হয়। এই সময়ে রোমান শাসকদের অত্যাচারে ইহুদিরা জেরুজালেম ছেড়ে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
জেরুজালেম ইহুদিদের আবেগে কতটুকু স্থান দখল করে আছে তা ইহুদিদের পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় থেকে অনুধাবন করা যায়। শুভেচ্ছা বিনিময়কালে একজন ইহুদি আরেকজন ইহুদিকে বলে, "জেরুজালেমে আবার দেখা হবে"।
হিব্রু ভাষায় লিখিত পাঁচ খণ্ডের বাইবেল বা তোরাহ (তওরাত) বা ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুযায়ী ইহুদি জাতির আদি পিতা আব্রাহামের সাথে প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে সম্পাদিত ঈশ্বরের একটি পবিত্র চুক্তি বলে তৎকালীন কেনান রাজ্য বর্তমান প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের নিরন্তর বসবাসের অধিকার ঈশ্বর কর্তৃক দেওয়া হয়। ইহুদি জাতির প্রতিষ্ঠা হয়েছে আব্রাহাম (হযরত ইব্রাহীম)-এর পুত্র ইসহাক এবং তাঁর পুত্র জ্যাকবের (আরবী নাম ইয়াকুব) বংশধরদের মাধ্যমে। জ্যাকবের আরেক নাম ইস্রাইল— স্বর্গীয় দূতের দেওয়া এই নাম। হিব্রু ভাষার ইহুদি জাতিগোষ্ঠীকে তাই ইস্রাইলীও বলা হয়।
ঈশ্বরের সাথে সম্পাদিত চুক্তি ও ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইহুদি জাতি ঈশ্বরের বিশেষ অনুগৃহীত ও পছন্দের জাতি। তৎকালীন মূর্তিপূজাবিরোধী আব্রাহামকে ডেকে ঈশ্বর বললেন, 'তোমাকে আমি আমার বিশেষ পছন্দের ব্যক্তির মর্যাদা দিলাম এবং তোমার মাধ্যমেই তোমার বিরাট বংশবৃদ্ধি ঘটিয়ে সেই বংশের লোকদের আমার পছন্দের জাতিতে রূপান্তরিত করে ইস্রাইল ভূমিতে স্থায়ী বসবাসের প্রতিশ্রুতি দিলাম'। ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাই জেরুজালেম ইহুদিদের নিকট পবিত্রতম স্থান। কোন ইহুদিকে অন্যত্র কবরস্থ করা হলেও জেরুজালেম থেকে একটু মাটি নিয়ে এখনো ঐ কবরের উপর ছিটিয়ে দেওয়া হয়। ইহুদিরা বিশ্বাস করে, জেরুজালেমের বাইরে কবরস্থ হলেও ইহুদিদের মরদেহ পাতাল অভ্যন্তরস্থ সুড়ঙ্গপথে জেরুজালেমে পৌঁছা অবধি গড়াতে থাকে।
ইসহাকের পুত্র জ্যাকব এবং জ্যাকবের বার পুত্রের বারটি বংশধারায় বারটি গোত্রকে একত্রিত করে ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত কেনান রাজ্যে (বর্তমান প্যালেস্টাইন) জেরুজালেমকে রাজধানী করে ইহুদি রাষ্ট্র সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত করেন রাজা ডেভিড (আরবী ও হিব্রু ভাষায় দাউদ)। কিং ডেভিডের মৃত্যুর পর তাঁর ইহুদি পুত্র রাজা সলোমন খ্রিস্টপূর্ব ৯৬২ সালে জেরুজালেমের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং জেরুজালেমে ইহুদিদের প্রার্থনাগৃহ টেম্পল মাউন্ট তৈরি করেন; তাই ইহুদিরাও জেরুজালেমে অবস্থিত টেম্পল মাউন্ট অভিমুখী হয়ে তাদের উপাসনা করে থাকে। শুধু 'বিলাপের দেয়াল' বা 'পশ্চিমের দেয়াল'ই টেম্পল মাউন্টের অস্তিত্বের শেষ নির্দেশনা হিসেবে এখনো আছে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে এই দেয়ালের দিকে মুখ করে ইহুদিরা একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশায় প্রচুর প্রার্থনা করেছে। নিজ, পরিবার ও জাতির সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করে এখনো ইহুদিরা বিলাপের দেয়ালের ফাটলে টাকা গুঁজে দিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে থাকে।
অন্যদিকে যীশুখ্রিস্টের জন্মও এই জেরুজালেমে। স্বাভাবিকভাবে জেরুজালেম খ্রিস্টানদের নিকটও গুরুত্বপূর্ণ। যীশু জেরুজালেমের বেথলেহেমে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই তিনি বড় হয়েছেন, এই জেরুজালেমে তাঁর শিষ্যদের ধর্মোপদেশ দিয়েছেন, এখান থেকে তাকে বন্দী করা হয়, এখানে বিচার করে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়, এই স্থানেই তিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে শেষ নৈশভোজে (লাস্ট সাপার) অংশগ্রহণ করেন। যীশু মাতৃগর্ভ থেকে বেথলেহেমের যে স্থানে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন সেই স্থানের উপর 'চার্চ অব নেটিভিটি' অবস্থিত। খ্রিস্টানদের নিকট 'চার্চ অব নেটিভিটি' সবচেয়ে পবিত্রতম। যীশুর পুনরুত্থানও জেরুজালেমের অলিভ পর্বত থেকে বলে খ্রিস্টানদের বিশ্বাস।
অন্যদিকে জেরুজালেম মুসলমানদের নিকট 'আল কুদস' বা পবিত্রতম শহর হিসেবে পরিগণিত। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের জন্য ঊর্ধ্বাকাশে যাত্রারম্ভের স্থান ও ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ আল আকসা এই নগরীতে অবস্থিত। তাই জেরুজালেম মুসলমানদের নিকটও গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্রতম স্থান। কাবা শরীফকে কেবলামুখী করার পূর্বে মুসলমানেরা আল-আকসাকে কেবলামুখী করে নামাজ আদায় করত। মসজিদুল আকসামুখী হয়ে মুসলমানদের তখন নামাজ পড়ার কারণে মুসলমানেরা ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইনদের নিকট থেকে জেরুজালেম দখল করে নেয়। এতদিন বাইজেন্টাইনদের হুকুমে ইহুদিদের জেরুজালেমে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিলো, মুসলমানেরা ইহুদিদের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং তাদের ধর্মীয় স্থানসমূহ পরিদর্শনে সম্মতি প্রদান করে। কিন্তু খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানদের নিকট থেকে জেরুজালেমের দখল নিলে ডোম অব দ্য রককে করা হয় চার্চ এবং আল-আকসাকে বানানো হয় রাজপ্রাসাদ।
ইহুদিদের অভিমত হচ্ছে, মসজিদুল আকসা নির্মিত হয়েছিলো ইহুদিদের ধ্বংসপ্রাপ্ত টেম্পল চত্বরে। তবে রোমান, খ্রিস্টান, পারসিয়ান বা ইহুদিদের শাসনামলের তুলনায় মুসলমানেরা অধিক সময় জেরুজালেম শাসন করেছে। এই তিন ধর্মের অসংখ্য লোক ধর্মীয় কারণে অতীতেও জেরুজালেম ভ্রমণ করেছে, এখনো ভ্রমণ করছে।
একেশ্বরবাদী এই তিন ধর্মাবলম্বীদের আরও একটি ধর্মীয় স্থাপনা রয়েছে জেরুজালেমে। উমাইয়াদের শাসনামলে আবদেল মালিক ইবনে মারওয়ান কর্তৃক সপ্তম শতাব্দীতে তৈরি করা 'ডোম অব দ্য রক'ও (আরবীতে কুব্বাত আল সাখ্রাহ) জেরুজালেমে অবস্থিত। আমাদের নবী করিম (সা.) এখান থেকেই শবে-মেরাজ গমন করেন। অন্যদিকে এই স্থানটি নিয়ে ইহুদিরা বিশ্বাস করে যে, আব্রাহামের পুত্র ইসহাককে এখানেই কুরবানীর জন্য আনা হয়েছিলো। তোরাহ অনুসারে আব্রাহাম তাঁর দ্বিতীয় পুত্র ইসহাককে, পবিত্র কোরআন মতে প্রথম পুত্র ইসমাইলকে কুরবানী দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিলো। আল-আকসা এবং ডোম অব দ্য রক দুটিই আবার টেম্পল মাউন্টের চত্বরে প্রতিষ্ঠিত। সপ্তম শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত 'ডোম অব দ্য রক' কিন্তু মসজিদ নয়, নামাজের জন্য উপযোগী করেও তৈরি করা হয়নি; আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শবে মেরাজে গমনের যাত্রারম্ভের এই স্থানটিকে ঘিরে এই ভবনটির নির্মাণ। অন্যদিকে পৃথিবীর পত্তন (ফাউন্ডেশন স্টোন) এখান থেকে শুরু বলে ইহুদিরা বিশ্বাস করে। জেরুজালেম এক সময় মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে গেলে এই ডোমকে খ্রিস্টানেরা চার্চ হিসেবে ব্যবহার করে উপাসনা করেছে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইহুদিদের প্রতি হিটলারের অমানুষিক অত্যাচারের কারণেও তখন অধিকাংশ দেশ ইহুদিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলো। ফলে ইহুদিদের আদি নিবাস ও ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমিতে তাদের পুনর্বাসন শুরু হয়। এই পুনর্বাসনে বৃটেনের আপত্তি থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের সমর্থনে জেরুজালেমে ইহুদিদের বসতি স্থাপন ত্বরান্বিত হয়।
আরবদের সাথে ১৯৪৮ সনের যুদ্ধে ইসরাইল জেরুজালেমের অর্ধেক দখল করে নেয়; বাকি অর্ধেক থাকে জর্ডানের হাতে। ১৯৬৭ সনে মাত্র ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইল বাকি অর্ধেকও দখল করে। যুদ্ধে জয়ী হলেও ইসরাইলী সরকার মুসলমানদের ধর্মীয় পবিত্র স্থানসমূহে গমনাগমনে আগের ব্যবস্থাদির কোন পরিবর্তন না করে স্থিতাবস্থা বজায় রাখে। বিদ্যমান ব্যবস্থা মোতাবেক ইহুদিরা টেম্পল মাউন্ট (যদিও একটি দেয়াল ব্যতীত এর কোন অস্তিত্ব নেই) পরিদর্শনে যেতে পারলেও 'ডোম অব দ্য রক' বা আল-আকসা মসজিদে প্রার্থনা করতে পারবে না। ইহুদিরা দল বেঁধে কয়েকবার প্রার্থনা করার চেষ্টা করেছিলো, ফিলিস্তিনীরা আল্লাহু আকবর ধ্বনি তুলে, পাথর ছুঁড়ে তাদের প্রতিহত করেছে। ইহুদিদের টেম্পল মাউন্ট বা মুসলমানদের হারাম-আল-শরীফে প্রবেশের এগারটি দরজার মধ্যে দশটি দিয়ে মুসলমানেরা এবং একটি দিয়ে অমুসলমানেরা প্রবেশ করতে পারে। তবে সবগুলো দরজা ও এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ইসরাইলি পুলিশ। অতি ধার্মিক ইহুদিরা মনে করে যে, তাদের প্রার্থনাগৃহ দুইবার তৈরির পর দুইবারই বিজয়ী শাসকেরা ধ্বংস করেছে, তৃতীয়বার তৈরির এখনই সময়। এদের অনেকে টেম্পল মাউন্টে প্রার্থনা করার অধিকারও চায়। এখন ইহুদিরা শুধু 'পশ্চিমের দেয়াল' বা 'বিলাপের দেয়াল'-এ প্রার্থনা করতে পারে। বিরোধ, বিবাদ যাই থাকুক না কেন, ১১৮৭ সন থেকেই 'হারাম আল শরীফ' বা 'টেম্পল মাউন্ট'-এর পুরো এলাকাটি ইসলামিক ওয়াকফ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে।
ফিলিস্তিনীদের প্রতি সকলের আরও সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। যেই আরব দেশগুলো ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭, ১৯৭৩ সনে সংঘটিত একটি যুদ্ধেও ইসরাইলের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারল না সেই দেশগুলো কেন যে হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কিনছে তা বোধগম্য নয়। এখন সৌদি আরব কাতারের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণার জন্য কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে; অথচ ফিলিস্তিনীদের স্থায়ী কোন সমাধান এখনো হয়নি।
ফিলিস্তিনীদের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে উদ্বাস্তু হয়ে থাকা এবং জেরুজালেমের পবিত্র স্থানসমূহ নিয়ে ইসরাইলের সাথে আরব দেশসমূহের বহুবার যুদ্ধ হয়েছে; সর্বশেষ ১৯৭৩ সনে প্রথমে সিরিয়ার সাথে ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হয়, সিরিয়া যখন কুলিয়ে উঠতে পারছিলো না তখন মিশর ইসরাইল আক্রমণ করে। কয়েকদিন যুদ্ধ করে মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ঘোষণা দেন, "আমরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়তে পারি, আমেরিকার বিরুদ্ধে নয়"। কারণ আমেরিকা ইসরাইলকে রক্ষা করার নিমিত্তে অস্ত্র পাঠানোর সুবিধার্থে বিমানের মাধ্যমে এয়ার ব্রিজ তৈরি করে; প্রতি মুহূর্তে অস্ত্র নিয়ে তেলআবিবে বিমান অবতরণ করতে থাকে। বাধ্য হয়ে মিশর 'ক্যাম্প ডেভিড' চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইলের সাথে আপোষরফা করে তাদের সিনাই এলাকা ফেরত পায় এবং মিশরের পুনর্গঠনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রচুর সহায়তা প্রদান করে। মিশরের এই আপোষরফায় সিরিয়া বাধ্য হয়ে যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়, কিন্তু ইসরাইলের অধিকারে থাকা তাদের ভূখণ্ড গোলান হাইট আজ অবধি ফেরত পায়নি।
ফিলিস্তিনীদের আবাসভূমিতে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ফিলিস্তিনেরা উদ্বাস্তু; পার্শ্ববর্তী মুসলিম দেশগুলোতে তারা উদ্বাস্তু হয়ে বসবাস করে আসছে। কিন্তু উদ্বাস্তু হয়েও তারা কোন একটি দেশে দীর্ঘদিন থাকতে পারেনি; ইসরাইলের গোলার আঘাতের ভয়ে প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশ ফিলিস্তিনীদের দেশ থেকে দেশান্তরে তাড়িয়েছে। একসময় পাকিস্তানি সৈন্যরা জর্ডানে নিয়োজিত ছিলো; তখন জর্ডানের বাদশাহর আদেশে পাকিস্তানি সৈন্যরা ফিলিস্তিনীদের পিটিয়ে দেশছাড়া করেছিলো। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, কয়েকটি মুসলিম দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রেখে ইসরাইল দিব্যি ব্যবসা-বাণিজ্য করে যাচ্ছে।
ফিলিস্তিনীদের যাযাবর জীবন অমানুষিক কষ্টের, এক দেশ থেকে আরেক দেশে পালিয়ে অসম শক্তির সাথে যুদ্ধ করেছে। আব্বাসের নেতৃত্বে ফিলিস্তিন সরকার গঠিত হলেও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে এখনো ব্যাপক স্বীকৃতি পায়নি।
সাদ্দাম হোসেনের সময় ইরাক ছিলো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র; ফিলিস্তিনীরা আগাগোড়াই ধর্মনিরপেক্ষ। ফিলিস্তিনীদের মধ্যে বহু খ্রিস্টান আছে যারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করে জীবন দিয়েছে।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, মানবজাতির প্রতি সৃষ্টিকর্তার বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য একদিকে যেমন বিপুলসংখ্যক পবিত্র ব্যক্তিত্বকে এই জেরুজালেম নগরী ধারণ করেছে, অন্যদিকে তেমনি এই নগরীর মাটিতে যত হত্যা, গণহত্যা ও রক্তপাত হয়েছে পৃথিবীর অন্য কোন নগরীতে তেমন হয়নি। অধিকাংশ নাগরিক ইহুদি হলেও এখন খ্রিস্টান ও মুসলমানেরা এখানে নিজ নিজ ধর্মকর্ম, পোশাক-পরিচ্ছদ, কৃষ্টি, আচার-আচরণ সংরক্ষণ করেই বসবাস করছে। ইহুদিদের সিনাগগ, খ্রিস্টানদের চার্চ, মুসলমানদের মসজিদের সংখ্যা এখানে প্রচুর—ধর্মীয় কারণে বিবাদের উৎপত্তি রোধ করা না গেলেও একেশ্বরবাদী সব ধর্মের পরিপালনের সুযোগে এখন জেরুজালেম একটি ধর্মনিরপেক্ষ নগরীতে পরিণত হয়েছে।