গত বুধবার, ১৯ জুলাই, ২০১৭ তারিখে 'সংবাদ'-এর প্রথম পৃষ্ঠায় আদালত বার্তা পরিবেশকের একটি প্রতিবেদনে গৃহকর্ত্রী নদীর যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশের খবর পরিবেশন করা হয়েছে। খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, পল্লবীর বাসিন্দা নওরীন জাহান নদী শিশু গৃহকর্মী আদুরীকে ধারালো চাকু দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে, ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়ে মারাত্মক জখম করে। নির্যাতনের এক পর্যায়ে মৃত ভেবে একটি ডাস্টবিনে আদুরীকে রেখে আসে আসামি নদী ও তার মা ইসরাত জাহান। দুই নারীকর্মী অর্ধমৃত আদুরীকে পুলিশের সহায়তায় হাসপাতালে নিয়ে যায়। একজন সেনাকর্মকর্তার বাসায় নিগৃহীত গৃহকর্মীর ছবিসহ খবর কয়েকদিন পূর্বে ছাপা হয়েছে।

গৃহকর্মীদের উপর অমানুষিক ও পাশবিক নির্যাতনের কাহিনী প্রায় প্রতিদিন পত্রিকায় ছাপা হয়। বর্বরোচিত, নির্লজ্জ অত্যাচারী এই লোকগুলোকে অনেকবার পত্রিকায় উন্মোচিত করা হলেও এরা নিজেরা কোন শিক্ষা পাচ্ছে না, অন্যরাও এই উন্মোচন থেকে কোন শিক্ষা নিচ্ছে না। নিঃস্ব, গরিব শিশু গৃহকর্মীদের চোর সাব্যস্ত করে, চুরি করে তরকারি খাওয়ার অভিযোগে, অসুস্থ হয়ে কাজ না করার কারণে, মনিবের সমবয়সী শিশুদের যত্ন না নেয়ার উসিলায়, অতিরিক্ত পরিশ্রমে মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়ায়, সকালে আযান দেয়ার আগে ঘুম না ভাঙার অজুহাতে, একটি পিরিচ বা কাপ ভেঙে মনিবের বিরাট লোকসান আনার জন্য, ভারী বস্তু বহনের অক্ষমতায়, কোন পণ্য তাৎক্ষণিক খুঁজে না পাওয়ায় চুরির সন্দেহে, মনিবদের খাওয়ার সময় তাকিয়ে থাকার অপরাধে আগুনের সেক, খুন্তির খোঁচা, লাঠির আঘাত, পায়ের লাথি, পেন্সিলের গুঁতা, আঙুল মচকিয়ে দেয়া, চুল ধরে আঁচড় দেয়ার ঘটনা নিত্যদিনের। শরীরের উপর এই নির্যাতন গৃহকর্মীদের কাছে খুব বড় শাস্তি নয়—বড় শাস্তি হচ্ছে তাদের কয়েকবেলা অভুক্ত রাখা। আরও বড় শাস্তি হচ্ছে নির্যাতনের সময় কাঁদতে না দেয়া। এর চেয়েও বড় দণ্ড হচ্ছে, অত্যাচারিত হওয়ার কথা বলার কোন আশ্রয় না থাকা।

শিশু গৃহকর্মীদের নির্যাতন করে মনিবেরা সম্ভবত জৈবিক ও পাশবিক আনন্দে বিভোর থাকে; অন্যদিকে নির্যাতিত গৃহকর্মীদের জীবন অত্যাচারে, অত্যাচারে নিরানন্দ ও তিক্ততায় বিষাদ হয়ে উঠে। টেলিভিশন দেখা তাদের জন্য হারাম। ভোরে উঠতে না পারলে মার খাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাত জেগে চলাফেরার সুযোগে আড়চোখে টেলিভিশনের দিকে একটু তাকানোর প্রলোভন তাদের থাকে; তবে আড়চোখে তাকাতেও রাজ্যের ভয় তাদের, যদি মনিবেরা দেখে ফেলে।

অল্প বয়সে শুধু ভাই-বোন নয়, খেলার প্রতিবেশী সাথীরাও ধাক্কা-ধাক্কি, মারামারি করে থাকে। ধাক্কাধাক্কিতে ব্যথা পেলে এই শিশুদের নালিশের একটি আশ্রয়স্থল থাকে। নালিশের এই আশ্রয়টিই শিশুর আঘাতকে অনেকটা নিরাময় করে দেয়। রক্ষা করার কেউ আছে—এটা শত আঘাতেও একটা বিরাট প্রবোধ। কিন্তু গৃহকর্মে বা অন্য কাজে নিয়োজিত শিশু যখন দেখে যে, চারিদিকে সবাই মনিব, বয়সে কনিষ্ঠ মনিবের ছোট বাচ্চাটাও তার হুকুমদাতা প্রভু, বছরেও একবার মা-বাবার সাক্ষাৎ পাওয়ার উপায় নেই, তখন গৃহকর্মী বাচ্চাটির মুখ বন্ধ করে, চোখের পানি না ফেলে নির্যাতন সহ্য করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। এই শিশুগুলোর বোবা কান্না তখনই মর্মান্তিক হয় যখন তারা তার আশেপাশের কারো সাথে একটু খুনসুটিও করতে পারে না, নির্বাক হয়ে মনিবের শিশুদের মারামারি দেখে। তারও তখন একটু মার দিতে, মার খেতে ইচ্ছে করে। এই শিশুগুলো অল্প বয়সে তাদের পরিচিত পরিবেশ, মা-বাবা, দাদা-দাদি, আত্মীয়-স্বজন ত্যাগ করে দূরদূরান্তে বিরূপ পরিবেশ ও অপরিচিত জনের সাথে অমানুষিক পরিশ্রম করে দিনাতিপাত করে থাকে। এদের শিশুসুলভ আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে মা-বাবা দারিদ্র্যের কারণে বাধ্য হয়।

একটি শিশুকে দিয়ে গৃহের যাবতীয় কাজ করানোর পরও সামান্য ভুলের জন্য অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে। তাহলে এত শিক্ষা, এত নীতিবোধ, এত ধর্ম-কর্ম শুধু কি বাহ্যিক লেবাস? মনে হয় কিছু

মানুষ প্রবৃত্তির দাস; রিপুর দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভে এরা আগ্রহী নয়। তারা জানে, শত দুঃখ, কষ্টেও মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য বাসনা রয়েছে। এই বাসনাকে দুর্বলতা গণ্য করে মনিব-দুর্বৃত্তরা অসহায় ও নিঃস্বদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাদের উপর জুলুম-নিপীড়ন, অত্যাচার-অবিচার, নির্যাতন করে গোলাম ও দাসানুদাস বানিয়ে থাকে। দুর্বলের উপর আক্রোশ ঝাড়ার এই পাশবিক মনোবৃত্তির অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে ক্ষমতা ও বিত্ত। তবে গরিব, নিঃস্বরাও মাঝে মাঝে শারীরিকভাবে দুর্বলদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে থাকে। এদের ক্ষেত্রে বউ হচ্ছে তাদের দাসী। এই দাসানুদাসদের অদৃষ্টে থাকে শুধু প্রবঞ্চনা, দুর্দশা। এদের ফরিয়াদ জানানোরও জায়গা নেই।

দাস সৃষ্টির ইতিহাস গতকালকের নয়, হাজার বছরের। যুদ্ধে পরাজিত বন্দীদের দাস বানানো সব যুগে সব দেশের সর্বজনগ্রাহ্য নীতি ছিলো। যুদ্ধই ছিলো প্রাচীন ও মধ্যযুগের দাসপ্রথার সবচেয়ে বড় উৎস। প্রাচীনকাল থেকেই যুদ্ধের ময়দানে পরাজিত সবাইকে হত্যা করা হতো অথবা দাস বানিয়ে রাখা হতো। এদের উপর নির্যাতন সমাজের গ্রহণযোগ্য নীতি হিসেবে বিবেচিত হতো।

দাস তৈরির আরেকটি উৎস দারিদ্র্য। দরিদ্র ঘরে জন্মগ্রহণ একটা অভিশাপ; এই দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়া কোন কালেই সহজতর ছিলো না, এখনো নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় জনসংখ্যার বৃদ্ধি বেশি হলে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে দারিদ্র্য বাড়তে থাকে। আর চরম দারিদ্র্য বাড়তে থাকলে দাসপ্রথার বিস্তৃতিও ঘটে দ্রুতগতিতে। বিস্তৃতিতর দারিদ্র্যের কারণেই সস্তায় শিশু শ্রমিক সহজলভ্য হয় এবং নিষ্ঠুর অত্যাচার সহ্য করেও দাস-দাসীরা শুধু খেতে পাওয়ার প্রত্যাশায় শ্রম দিতে থাকে।

যুদ্ধ-বন্দীদের বর্তমানে মান, মর্যাদা বেড়েছে, যুদ্ধ বন্দীদের এখন আর দাস বানানোর রেওয়াজ নেই; এখন বন্দীদের সাথে আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে আচরণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে সৃষ্ট দাস-দাসীদের অত্যাচার, নির্যাতনের মাত্রা এখনো মনিবদের মর্জির উপর নির্ভরশীল। ১৮০৭ সনে বৃটেন মানুষ বেচা-কেনা আইন করে বন্ধ করে। আব্রাহাম লিঙ্কন করেছেন ১৮৬২ সনে। এখন পৃথিবীর কোন দেশ মানুষ বেচা-কেনা সমর্থন করে না। সভ্য জগতে মানুষ বেচাকেনা বন্ধ করা হলেও গৃহদাসীদের অব্যক্ত কান্না আন্তর্জাতিক দরবারে এখনো পৌঁছানোর সহজ কোন পন্থা আবিষ্কৃত হয়নি।

এক সময় জমির সাথে সংশ্লিষ্ট চাষী বা শ্রমিকদের অদৃষ্ট বাঁধা ছিলো; জমির মালিকানা হস্তান্তরের সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট চাষী এবং শ্রমিকেরা বাধ্যতামূলকভাবে হস্তান্তরিত হয়ে যেত এবং তারা নতুন প্রভুর স্বত্ব বলে বিবেচিত হতো। এই সামন্তবাদী ব্যবস্থাপনায় জমিদারেরা তাদের অধীনস্থ কৃষক বা শ্রমিকদের নিকট থেকে বাধ্যতামূলক শ্রম আদায় করে নিত, বিনে পয়সায় খাটিয়ে নিত; জমিদারদের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার উপায় ছিলো না। জুলুম, নির্যাতন, পাশবিক অত্যাচার থেকে কৃষক, শ্রমিকদের বাঁচা-মরা নির্ভর করত জমিদারদের কৃপা ও মর্জির উপর।

ঔপনিবেশিক আমলও এক ধরণের দাসপ্রথারই নামান্তর। শিল্পবিপ্লবের পর আধুনিক মেশিনে উৎপাদিত বিপুল পণ্য ক্রয়ের ক্ষমতা দেশীয় শ্রমিকদের ছিলো না; কারণ শ্রমিকদের এত অল্প পারিশ্রমিক দেয়া হতো যে তা দিয়ে ন্যূনতম মানের জীবনধারণও তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। ফলে বিনা বেতনের দাসদের মতো শ্রমিকদের জীবনমানের কোন উন্নতি পুঁজিবাদে হয়নি। জনগণের ব্যাপক ক্রয়ক্ষমতা না থাকায় অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদার অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রির জন্য নতুন নতুন বাজারের অন্বেষণ জরুরি হয়ে পড়ে। এই বাজার সৃষ্টির তাগিদে ঔপনিবেশিকবাদের উদ্ভব; অন্যদিকে কাঁচামাল সংগ্রহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার অভিপ্রায়েও পুঁজিপতি বেনিয়াদের ভূখণ্ড দখল করা ও দখলে রাখা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এই দখল করা ভূখণ্ডের সস্তা শ্রমিকদের দাসের মতো ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ভিন্ন দেশের লোকেরা যখন জোর জবরদস্তি করে অন্যের ভূখণ্ড দখল করে রাজত্ব করত তখন অধীনতা বিচারেও স্বীয় জন্মভূমির আদিবাসীরা দাসে পরিণত হতো। জবরদখলকারীদের দাসত্ব থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতা লাভে আদিবাসীদের প্রচুর রক্ত দেয়া ব্যতীত ঔপনিবেশিকবাদ কোথাও শেষ হয়নি।

রোম সাম্রাজ্যে দাসেরা মানুষ পদবাচ্য ছিলো না। এই দাসদের কাজে নিয়ে পশুদের মতো মাজায় লোহার বেড়ি পরিয়ে রাখা হতো যাতে পালিয়ে যেতে না পারে। এই দাসদের কারণে-অকারণে চাবুক মারা ছাড়াও পেটপুরে খেতে দেয়া হতো না। প্রভুরা এদের উপর অত্যাচার করে আনন্দ পেত; দাসদের হাতে তলোয়ার, বল্লম দিয়ে পরস্পরের সাথে মারামারি করার হুকুম দিতো আর রক্তাক্ত হওয়ার সময় উল্লাসে দর্শকেরা তালি দিত। দাসদের রক্তাক্ত শরীর দেখে আনন্দ উপভোগের এই নিকৃষ্টতম বর্বরতা থেকেই মানুষের সহজাত নিষ্ঠুর প্রবৃত্তির পরিচয় পাওয়া যায়।

রোম সাম্রাজ্যে দাসদের নির্যাতনের কাহিনীর সাক্ষী ভ্যাটিকান সিটির পাশের কলোসিয়াম; যা দেখার জন্য অগণিত পরিব্রাজক কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে রোম বেড়াতে যায়। এই কলোসিয়াম ছিলো প্রভুদের মনোরঞ্জন ও চিত্তবিনোদনের কেন্দ্র।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের দাসে পরিণত হওয়ার পশ্চাতে যুদ্ধ এবং দারিদ্র্য দুটো কারণই প্রযোজ্য। কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের উপর শ্বেতাঙ্গদের নৃশংস নির্যাতনের করুণ কাহিনী 'রুটস' সিনেমায় সুন্দরভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। মানুষ বেচাকেনার একটি পর্যায়ে দাসদের প্রতি নমনীয় মনোভাব পোষণ করা হয়, মুক্তিপণের বিনিময়ে প্রভুদের নিকট থেকে স্বাধীনতা অর্জনের অধিকার তাদের দেয়া হয়। মক্কার খলিফা রাশেদীনের আমলে দাসদের মুক্ত করার জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল ব্যবহার করা হতো।

হাজার হাজার বছর পূর্বের অসভ্য মানুষ আর বর্তমানের সভ্য মানুষের ক্ষেত্রে দাস-দাসীর নিপীড়নে কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। অত্যাচারের ধরনে সামান্য হেরফের হলেও এখনো দাস-দাসীদের অবস্থান মনিবদের নিকট কেনা গোলাম ছাড়া অন্য কিছু নয়। আগে উৎপীড়ন চলতো জঘন্যতম প্রদর্শনীর মাধ্যমে, এখন হয় বদ্ধ ঘরের কুঠুরিতে বাইরের লোকের অজান্তে।

পাশ্চাত্যের দেশগুলো এখন আর দাস-দাসীর সেবা পাওয়ার সুখ বা অত্যাচার করার আনন্দ উপভোগ করে না; কারণ আগের মতো অতি সহজে বৈধ বা অবৈধভাবে আফ্রিকা থেকে মানুষ কিনে আনা সম্ভব নয়। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোতে শ্রমিকদের পারিশ্রমিক আইনে নির্ধারিত থাকায় এখন সস্তায় শ্রম কেনাও সম্ভব হয় না। ফলে গৃহাভ্যন্তরালে নিজেদের সব কাজ নিজেদেরই করতে হয়। কিন্তু প্রাচ্যের কিছু ধনী লোক এখনো নিজেদের কাজ নিজেরা করতে লজ্জা পায়। এছাড়াও গৃহকর্মী সহজলভ্য হওয়ায় দেশ থেকে গৃহকর্মী নিয়ে অনেকে উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি দেয় এবং অভ্যাসবশত বিদেশের উন্নত পরিবেশেও গৃহকর্মীদের উপর নির্যাতন করে। উন্নত বা ইউরোপীয় দেশগুলোতে কিন্তু শিশুর উপর অত্যাচার সহ্য করা হয় না; এমনকি রাষ্ট্রদূতদেরও এক্ষেত্রে কোন ছাড় দেয়া হয় না। যদিও রাষ্ট্রদূতেরা অনেক অপরাধে নিয়োজিত দেশের আইন-কানুনে বিচারের আওতাভুক্ত নন। গৃহকর্মীদের নালিশে ভারতীয় এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের নাজেহাল হওয়ার কাহিনী পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। পশ্চিমের দেশগুলোতে এখন নিজের বাচ্চাদেরও শারীরিক বা মানসিকভাবে শাসন করা যায় না; বাচ্চা স্বয়ং নালিশ করলে বা কোন প্রতিবেশী স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে শিশুদের অযত্ন নিয়ে অবহিত করলে মা-বাবাকে জবাবদিহি করতে হয়। আমাদের দেশে একটা সাধারণ প্রতীতি হচ্ছে, 'আমার সন্তানকে আমি শাসন করবো, তাতে প্রতিবেশীর কী?' কিন্তু মা-বাবারা জানেন না যে, মার খেতে খেতে এক সময় এই শিশুগুলো একরোখা হয়, নিষ্ঠুর আচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। এরা এক সময় রাস্তায় বিড়াল মারে, কুকুর মারে, মানুষ পিটায়।

তরল-সোনার বদৌলতে মধ্যপ্রাচ্যের বেদুইনেরা খোলা মাঠের তাঁবু ছেড়ে এখন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় বসবাস ও চলাফেরা করে। দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে আমাদের মতো গরিব 'মিসকিন'দের অল্প বেতনে গৃহের দাস-দাসী বানিয়ে সেবা পেতে এদের বর্তমানকালেও কোন অসুবিধা হচ্ছে না। এই মুসলিম উম্মার ভাইরা 'মিসকিন' গৃহদাসীদের যেভাবে নির্যাতন করে তা শত শত বছর আগের রোমকদের অত্যাচারের চেয়েও বেশি মর্মন্তুদ বলে প্রতিভাত হয়। অর্থের জন্য আইএস কর্তৃক যুদ্ধ-বন্দীদের পশুর হাটের মতো বেচা-বিক্রির সচিত্র খবর প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়। অথচ ইসলাম ধর্মে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, 'তোমাদের অধীনস্থ দাসদের প্রতি এহ্সান ও বদান্যতা প্রদর্শন কর'। হযরত মুহাম্মদ (সা.) দাস-দাসীদের 'গোলাম' বা 'বাঁদী' বলে সম্বোধন করতে নিষেধ করেছেন; তাঁর নির্দেশনা হচ্ছে, তাদের এমনভাবে সম্বোধন করতে হবে যাতে তারা প্রভুর পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে নিজেদের ভাবতে পারে। 'প্রকৃতপক্ষে শিশুদের দুষ্টুমি বন্ধ করার জন্যে বড়রা যে ধরনের শাস্তি দিয়ে থাকে তার চেয়ে কঠিন শাস্তি দাসদের জন্যে কখনো (ইসলাম ধর্মে) বৈধ করা হয়নি'। একটি ইসলামি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে দাসদের অধিষ্ঠানেও ইসলামে কোন বাধা নেই, দাসদের সাথে প্রভুর মেয়েদের বিয়েও ইসলামে জায়েজ। দিল্লির সুলতানী রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় মোহাম্মদ ঘোরির দাস কুতুবুদ্দীন আইবেকের মাধ্যমে, কুতুবমিনার তাঁর আমলের বিখ্যাত স্থাপনা। কুতুবুদ্দীনের মৃত্যুর পর তাঁর দাস ইলতুৎমিশ সুলতান হন এবং ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর তাঁর কন্যা সুলতানা রাজিয়া সুলতান হন। ইসলাম দাসদের ব্যাপারে এত উদার হওয়া সত্ত্বেও দাসপ্রথা নিষিদ্ধ না হওয়ায় মরহুম আবু জাফর শামসুদ্দীন দৈনিক সংবাদে তাঁর বিখ্যাত 'বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা' কলামে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন, "মাননীয় রাষ্ট্রপতি, মানুষ যদি এখন মানুষদের বিক্রির উদ্দেশ্যে বিদেশে পাচার করে পাচারকারীর বিচার করা যথার্থ হবে না, কারণ ইসলামে মানুষ বেচা-কেনা নিষিদ্ধ নয়" (হুবহু নয়, কারণ বহু বছর পূর্বের পড়া)। তৎকালীন যুগে 'যুদ্ধে যে সকল অমুসলিম নারী বন্দী হতো তাদের জন্য ইসলামী সমাধান ছিলো— তাদেরকে মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া; প্রয়োজন হলে এক একজনকে একাধিক নারীর দায়িত্বও অর্পণ করা হতো। এরা হতো দাসী এবং দায়িত্ব গ্রহণকারী মুসলমানরা হতো তাদের প্রভু'। এই দাসীদের প্রভুরা অনেক সময় বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দিত।

গৃহকর্মীরা জানে যে তারা দাস বা দাসী বই আর কিছু নয়। কিন্তু বর্তমান যুগে অফিস-আদালতেও যে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মধ্যে দাসানুদাস মনোবৃত্তি দৃষ্টিগোচর হয়! সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতের বাইরে অধস্তনেরা নথিতে কোন স্বাধীন মতামত দিতে পারে বলে মনে হয় না। উপরস্থদের নির্দেশ ও পরামর্শ ব্যতিরেকে নিম্নস্থরা কোন বিষয়ে ইদানীং স্বাধীন মতামত দেয়ার দায়িত্ব পায় না। উপরস্থদের মর্জির উপর এরূপ নির্ভরশীলতা দাসানুদাস মনোবৃত্তিরই পরিচায়ক। অবশ্য স্বাধীন মতামত দেয়ার যোগ্যতাও অনেকের নেই; যোগ্যতা থাকে না বলে অনেকে স্বেচ্ছায় দাস বনতে ভালোবাসে।

সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় গুণ, ঘটনা বিন্যাসের ঔচিত্যবোধ এবং সংলাপ নির্মাণের সার্থকতা। তাঁর কয়েকটি নাটকে গৃহকর্মীকে মনিবদের সাথে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে খাইয়েছেন; টেলিভিশনের প্রায় সব দর্শক তখন মানবতার জয়গান গেয়ে নাটক দেখার তৃপ্তি পেয়েছে। কতগুলো নাটকে গৃহকর্মীদের উপর অত্যাচার, নির্যাতনের চিত্র দেখে অনেক দর্শকদের কাঁদতে দেখেছি, অত্যাচারী গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর প্রতি অভিশম্পাত দিতে দিতে রেগে ফুঁসতেও অবলোকন করেছি। কিন্তু চোখের পানি না শুকানোর পূর্বেই ঐ গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীকে তার গৃহকর্মীর উপর খড়্গহস্ত হতেও দেখেছি।

দাস হয়ে কেউ জন্মায় না এবং একবার দাস হলে সারাজীবন দাসত্ব বরণ করার অপরাধও কেউ করে না। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার আবহে পরিবর্ধিত মানুষেরা যেভাবে শ্রমিক ও গৃহকর্মীর উপর বর্বরোচিত নির্যাতন করে থাকে তাতে মনে হয়, অত্যাচার করার অধিকার তাদের জন্মগত প্রাপ্তি। গৃহকোণে অত্যাচারের এই রুক্ষ মূর্তি তাদের লেবাসে থাকা সংস্কৃতি, ভদ্রতা, প্রগতিকে রুদ্ধ করতে পারে না। দারিদ্র্যের অক্টোপাস বা দুষ্টচক্র থেকে সমাজের একটি শ্রেণি বেরিয়ে আসতে পারছে না বলে এরা দুর্ভাগ্য ও প্রবঞ্চনার শিকার থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

সমাজে কতক নিষ্ঠুর লোকের অহংকার করার মতো অর্থ-বৈভব বলতে কিছুই নেই; এই লোকগুলো তখন বাপ-দাদার আভিজাত্যের দোহাই দিয়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি জাহির করে। বাপ-দাদা থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত আভিজাত্য নিজের বলে দাবী করা হলেও তা আজকাল আর হালে পানি পায় না। প্রশাসনিক ক্ষমতা ও অর্থের আধিক্যের অভাবে বাপ-দাদার আভিজাত্য সমাজে এখন আর গুরুত্ব পায় না। বাইরের জগতে ক্ষমতা হারিয়ে এরা ঘরে গৃহকর্মী মেরে ক্ষমতা জাহির করে। অন্যদিকে নব্য ক্ষমতাবান ও অর্থের অধিকারী কিছু লোক ঘর-বাইরে নির্বিশেষে সর্বত্র মারমুখী। এরা ঘরের ভেতরে নিরীহ গৃহকর্মীদের উপর যখন তখন অত্যাচার করে; স্বামীর ক্ষমতায় স্ত্রীরাও এই নিঃস্ব শিশুদের উঠতে-বসতে নির্যাতন করে। শিক্ষিত ও সম্পদশালী হলেও সংস্কৃতির অনুশীলন না থাকায় এরা কদাকার, বর্বর। আবার সমাজে অধিকতর ক্ষমতাবান, বিত্তশালী লোকের কাছে এই লোকগুলো ভিজে বিড়াল, যত গর্জন শুধু বাসার ভেতরে প্রতিবাদবিহীন নিরীহ গৃহকর্মীদের উপর।

নিগৃহীত শ্রেণির লোকগুলোর অনেকে দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করে। এদের আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়া বা ক্ষমতা অর্জন অলৌকিকভাবে দুই, তিন প্রজন্মের মধ্যে হয়ে গেলে এরাও অত্যাচারী হয়ে উঠে। বস্তী থেকে সৃষ্ট পাড়ার মাস্তানরা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ক্ষমতাবান বা সম্পদশালী না হওয়া পর্যন্ত এরা তাদের উপর অত্যাচার, নিগ্রহের জন্য শুধু নিজেদের অদৃষ্টকে দায়ী করে; এরা মনিবের স্বেচ্ছাচারী অত্যাচার, নির্যাতনের নিষ্ঠুরতম করুণ শিকারে পরিণত হয়। দুর্বল শিশু ও নারী গৃহকর্মীদের উপর গৃহকর্তা-কর্ত্রীর যথেচ্ছ ও অমানুষিক জুলুম অপ্রতিরোধ্য। আহার, বাসস্থানের বিকল্প ব্যবস্থা জানা না থাকায় এই নিরীহ শ্রেণিটি নীরবে নির্যাতন হজম করে, মা-বাবা, প্রতিবেশীদের কাছে নির্যাতনের কাহিনী প্রকাশ করে না। তবে এই দুর্বল শ্রেণিটির উপর অত্যাচার যখন চরমে উঠে, নির্যাতনের চিহ্ন সম্বলিত গৃহকর্মীর ছবি যখন পত্রিকায় ছাপা হয় তখন কিছু হৃদয়বান ব্যক্তি বিভিন্ন মিডিয়ায় সোচ্চার হয়। কিন্তু দুয়েকদিন পর সচেতনদের নিশ্চুপতায় নির্যাতনকারীরা আবার মারমুখী হয়ে উঠে। সম্প্রতি পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে, গাছের সাথে বেঁধে শিশু নির্যাতনের নতুন কৌশল রপ্ত করা হচ্ছে।

কেন কিছু লোকের মানসগঠনে কোন পরিবর্তন আসছে না? কারণ সহৃদয় ও সুবিচারভিত্তিক আচরণ রপ্ত করা কারো কারো সংস্কার ও আভিজাত্যের সাথে বেমানান; দুর্বলদের উপর রাগ ঝাড়াই তাদের আভিজাত্যের লেবাস। আমাদের বিদ্যমান সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার অনিবার্য ফলশ্রুতিতেই ঘটনাগুলোর রোধ সম্ভব হচ্ছে না। অধিকার যতটুকু পাওনা সবটুকু বিত্তশালী, আরাম-আয়াসে থাকা লোকগুলোর; নিজের অধিকার ভোগ করে তারা তৃপ্ত থাকে না, অন্যের অধিকার মাড়াতে না পারলে তাদের স্বস্তি হয় না। ক্ষুধার জ্বালা নিবারণের জন্য আসা গৃহকর্মীদের পিঠে, গালে প্রতিদিন পালা করে দু'তিন ঘা না মারতে পারলে তাদের আরাম, আয়েস, আভিজাত্য মিনমিনে হয়ে যায়। এরা তাদের ছোট ছোট বাচ্চাদেরও এমনভাবে শাসনকর্তা বানিয়ে দেয় যাদের হুকুম ও আনুগত্য মানতে মানতে গৃহকর্মীদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠে। এই শাসনকর্তা শিশুগুলোর মানসিক গঠন এমনভাবে গড়ে উঠে যে, সমাজের সকলে তাদের হুকুম বিনা প্রতিবাদে তামিল করবে এইরূপ প্রত্যাশা নিয়ে তারা বড় হতে থাকে। যেখানে নির্যাতনের কোন প্রতিবাদ নেই সেখানে মারতে পারার ক্ষমতা দেখিয়ে কী ধরনের আনন্দানুভূতি পায় তার বিশ্লেষণের জন্য মনোচিকিৎসক দরকার। এই আনন্দ কোত্থেকে আসে তা শুধু মনস্তত্ত্ববিদরা বুঝবেন; আমরা বুঝি এরা মানসিক রোগী। এদের জন্য একটি এসাইলাম করা দরকার, সমাজের সাথে এদের অবস্থান সমাজকে কলুষিত করে। এই পশুদের মানুষ করতে লেখাপড়া নয়, সংস্কৃতির লালন ও অনুশীলন প্রয়োজন। অবশ্য পশুদের সাথে এদের তুলনা করা হলে পশুদের অপমান করা হয়। হিংস্র এই মানুষগুলোর পশুদের নিকট থেকে অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে।

তাই বলে সমাজে যে অসংখ্য ভালো লোক নেই তা তো নয়। বহু পরিবার আছে যাদের গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীরা গৃহকর্মীদের সাথে সন্তানতুল্য আচরণ করেন, বাচ্চাদের গৃহকর্মীদের সাথে খেলাধুলা ও খুনসুটি করতে প্রশ্রয় দিয়ে থাকে, রোগে-শোকে পাশে থাকে, আদর করে, শাসন করে, পড়া-লিখা শেখায়।

বর্তমান সমাজের প্রচ্ছন্নে থাকা আগের দিনের ক্রীতদাসীদের মুক্তির একটিই পথ—জীবনধারণের জন্য আবশ্যকীয় উপকরণ সংগ্রহের অধিকার প্রয়োগে সম্মানজনক নীতির অলঙ্ঘনীয় বাস্তবায়ন।