ভারতে গরু জবাই নিয়ে যেভাবে তাদের বিভিন্ন রাজ্যে বিধি-বিধানের প্রবর্তন হচ্ছে, মানুষের মধ্যে বিভেদ ছড়িয়ে দিচ্ছে তাতে তাদের সংবিধানের মূলনীতি 'ধর্মনিরপেক্ষতা' ক্ষুণ্ণ হচ্ছে কি না তা বিচার্য। এক্ষেত্রে তাদের সংবিধান ধর্মের কথা না বলে অহিংস নীতি ও কৃষির অপরিহার্য অঙ্গ বিবেচনায় পরোক্ষভাবে গো হত্যার উপর বিধিনিষেধের কথা বলেছে। কিন্তু হিন্দু মহাসভা বা কট্টর গোষ্ঠী ধর্মের দোহাই দিয়ে গরু জবাইর বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে।
ভারতে জবাই করা গো-মহিষাদির মাত্র ৩০% মাংস হিসেবে খাওয়া হয় বা মাংস হিসেবে রপ্তানি করা হয়; বাকি ৭০% শিল্পজাত পণ্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। মাংস হিসেবে প্রাপ্ত ৩০% আসে ওয়াটার বাফেলো থেকে। ভারতের মোট রপ্তানির ১% বা প্রায় ত্রিশ হাজার রুপি আয় হয় এই গো-মাংস রপ্তানি থেকে।
এই গরুর চর্বির কার্তুজ ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানিয়ে এদেশের সিপাহীরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রামও করেছিলো। স্কুলে আমাদের একটি বই পাঠ্য ছিলো, 'পাকিস্তানের ইতিহাস'। এই বইটিতে শুধু সুলতানি আমল, মুঘল আমল নয় তার পূর্বের এবং পরের শাসনামল নিয়েও বর্ণনা ছিলো। তাহলে এই বইটির নাম 'পাকিস্তানের ইতিহাস' কেন করা হলো বোধগম্য নয়।
এই বইটির একটি অধ্যায়ের নাম 'সিপাহী বিদ্রোহ'। ১৮৫৭ সনের ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের নাম দেয়া হলো 'সিপাহী বিদ্রোহ'। মুঘল সম্রাটসহ হিন্দু, মুসলমান একত্রে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সনে রীতিমত যুদ্ধ করেছে। একক নেতৃত্ব, পারস্পরিক যোগাযোগের অভাব, যুদ্ধের সরঞ্জামের অপ্রতুলতার কারণে বিপ্লব বা সংগ্রামটি সফল হয়নি।
ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিপাহীদের এই সংগ্রামের পরোক্ষ কারণ ইংরেজ শাসনের অবসায়ন, আর প্রত্যক্ষ কারণ ছিলো, বন্দুকে ব্যবহৃত কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বির ব্যবহার। গরু হিন্দুদের নিকট পবিত্র, তাই হিন্দু সিপাহীরা তা ব্যবহার করতে সম্মত হয়নি; অন্যদিকে শূকর মুসলমানদের কাছে হারাম। এই কার্তুজ দাঁতের কামড় দিয়ে বন্দুকে ব্যবহার করতে হতো বলে সিপাহীরা তা ব্যবহার করতে রাজি ছিলো না।
হিন্দুদের নিকট গরু পবিত্র, 'গো-মাতা'। মায়ের বুকের দুধ খেয়ে সন্তান পুষ্ট হয়, তাই মায়ের ভক্তি আমরা ধর্ম-মত নির্বিশেষে সকল মানুষ করে থাকি। আমরা গরুর দুধও খেয়ে থাকি, তাই গরু মায়ের সমতুল্য— হিন্দুদের এই বিশ্বাস থেকেই তারা গরু জবাই করা এবং জবাই করা গরুর মাংস ভক্ষণের বিরোধী। কিন্তু মানবিক এবং অধিকারের দিকটি বিচার করলে, গরুর এই দুধের অধিকার শুধু গরুর বাছুরের; মানুষ কেন সেখানে ভাগ বসায় তা বোধগম্য নয়। মানুষ নিশ্চয় এক্ষেত্রে অমানবিক। পৃথিবীর যারা দুধ দোহন করে, বিক্রি করে বা খায় তারা সবাই গরুর বাছুরদের কতটুকু তাদের মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত করে তার চুলচেরা বিশ্লেষণে কেউ যায় না। এই অমানবিক কাজটি সবাই করে— যারা গরু খায় তারাও করে, যারা খায় না তারাও করে। মানুষ দুধ দোহনের পূর্বে গাভীর সাথে প্রতারণাও করে থাকে; বাছুরকে দুধ খাওয়ানোর শুরুতে যখন গাভী তার সন্তানের জন্য দুধ ছাড়ে ঠিক সেই মুহূর্তে বাছুরটিকে সরিয়ে নেয়া হয়। এই যে মানুষের প্রতারণাপূর্ণ আচরণ তা কোন নীতিবোধে ব্যাখ্যা সম্ভব? মানুষের নীতিবাক্য, 'মায়ের দুধের বিকল্প নেই' গরুর বাছুরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় কেন? মানি, অতিরিক্ত থাকলে তা অপচয় না করে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারে কোন দোষ নেই, মানুষের ক্ষেত্রেও ধাত্রী মা আছেন। এই বিষয়টি বিদেশি গরুর ক্ষেত্রে যতটুকু প্রযোজ্য ততটুকু আমাদের দেশীয় গরুর ক্ষেত্রে নয়। বিদেশি গরুগুলোতে পর্যাপ্ত দুধের মজুত থাকে, দেশী গরুতে যে দুধের সঞ্চয় থাকে তা একটি বাছুরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পুষ্টির জন্য পর্যাপ্ত হলেও মানুষের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ থাকে না।
পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল বেশী। শুধু তাই নয়, একই ধর্মের মধ্যেও মতের ভিন্নতায়, ব্যাখ্যার নিজস্বতায় ভিন্ন ভিন্ন মারমুখী দল আছে। পৃথিবীর সকল বড় ধর্মের ধর্মনেতারা বহুধাবিভক্ত; একই ধর্মের অনুসারী হওয়ার পরও এরা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী, মারমুখী গোষ্ঠী।
শুরুতে কোন ধর্মের সম্ভবত মতাদর্শগত বিভেদ ছিলো না। ধর্মের সার্বজনীন রূপ খণ্ডিতভাবে উপস্থাপনে বিভিন্ন গোষ্ঠীর আচার-আচরণ, খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো পরিপালনে পার্থক্যের পরিসর বাড়তেই থাকলো। তাই নিজেদের ক্ষেত্রে এত পার্থক্য রেখে অন্য ধর্মের গ্রহণ-বর্জন নিয়ে মেতে থাকার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার্য নয়। এক সময় রোমান ক্যাথলিক গির্জার পোপ গ্রিসের খ্রিস্টানদের ধর্মীয় স্বীকৃতি না দিয়ে তাদের 'নাস্তিক' বলে ফতোয়া দিয়েছিলো। ধর্মের নামে মানুষের কোমল অনুভূতিকে প্রতারিত করার কৌশল যুগ যুগ ব্যাপী অনুসৃত হতে দেখা যায়। সব ধর্মে ধর্ম-ব্যবসায়ীদের মৌলিক চরিত্রে কোন পার্থক্য নেই। এরা ব্যক্তিস্বার্থে ধর্মনিষ্ঠ সাধারণ মানুষকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে বিকৃত করে বিভ্রান্ত করতে সর্বদা কর্মতৎপর থাকে।
এক সময় সমুদ্রযাত্রা অমোচনীয় পাপ হিসেবে গণ্য করা হতো; কারণ ধর্মবেত্তাদের অলক্ষণীয় ভয় বিদেশি সংস্কৃতি। উন্নততর ভিন্ন সংস্কৃতির সংস্পর্শে যাতে কেউ আসতে না পারে সেজন্য এইরূপ অলঙ্ঘনীয় নিষেধাজ্ঞা। ভিন্নতর সংস্কৃতি অন্ধভক্তির কুয়াশাচ্ছন্ন মনে মুক্ত চিন্তার উন্মেষ ঘটাতে পারে— এই ভয় সদা জাগরুক ছিলো বলে সমুদ্রযাত্রায় মহাপাপ ঘোষিত হয়েছিলো। এখন কিন্তু কেউ সাগর পাড়ি দিতে অধর্মের কথা বলে না।
রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজ সংস্কারক ছিলেন; কিন্তু তাঁদের সংস্কারের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের সমালোচনা ছিলো ব্যাপক। ভিন্ন ধর্মের ইংরেজ শাসক আইন করে সতীদাহ প্রথা রোধ না করলে হয়তো সতীদাহ প্রথা আজও থাকতো। তবে থাকলেও এখন কেউ স্বামীর সাথে সহমরণে সম্মত হতো কি না সন্দেহ। তখনো আবেগে, সতী-সাধ্বী রূপে দর্শকদের কাছে উদ্ভাসিত হওয়ার বাসনায় অগ্নিতে গেলেও হাত-পা বাঁধা না থাকলে শবদাহ থেকে পালাত; বাঁচার আকুতি, কষ্টের চিৎকার যত, ঢোলের আওয়াজ ছিলো তার দ্বিগুণ।
এগুলো না করার জন্য তো এখন আর অধর্ম হচ্ছে বলে কেউ বলে না। যে সুফিদের মরমী ধর্মদর্শনে মোহিত হয়ে দলে দলে সমাজের অচ্ছুতরা ধর্মান্তরিত হয়েছে সেই সুফিদের মাজারে 'বিদআত' ফতোয়ায় এখন বোমা ফুটানো হয়। ধ্রুপদী ইসলাম নয়, সুফিদের লালিত ধর্মীয় দর্শনই এদেশের মানুষকে ধর্মান্তরিত হতে আগ্রহী ও উৎসাহী করেছিলো। কট্টর ধর্মীয় দর্শনের স্থলে সুফিদের প্রেমময় দর্শন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সৃষ্টিরও সহায়ক ছিলো। সুফিদের অনেকে রাজা-বাদশাহদের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ বা গাজী হয়েছেন সত্য, কিন্তু শহরবহির্ভূত গ্রামাঞ্চলে তাঁদের পরিচিতি ছিলো সাধারণ মানুষ ও পরোপকারী হিসেবে। এঁরা ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য লঙ্গরখানা, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কট্টর রক্ষণশীল মনোভাব ও আচরণ না থাকায় সুফিদের প্রেমবাণী হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়কে যুগ যুগ ধরে ভারতবর্ষে যুগলবন্ধী করে রেখেছিলো।
ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পায় ১৮৫৭ সনের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ রদের মধ্য দিয়ে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন যাতে দানা বাঁধতে না পারে সেজন্য ব্রিটিশ শাসকেরা হিন্দু, মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার প্রয়াস নিয়েছে বারবার। ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে, মধ্যযুগের শত শত বছরের ন্যায় সম্প্রদায় সম্প্রীতি বজায় থাকলে এখন গরুকে উপজীব্য করে তারা মারমুখী হচ্ছে কেন?
গরু দুধ দেয় বলে গাভী মায়ের তুল্য, ষাঁড় বা বলদ কেন তাহলে 'মা' বিবেচনার বাইরে থাকছে না। বলা হচ্ছে, গরু-মহিষ কৃষির অপরিহার্য অঙ্গ, এগুলো পরিবহণের কাজেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তাই এগুলোর নিধন কট্টর হিন্দু সমাজ মানছে না। সুপ্রিম কোর্ট গরু নিধন ও গো মাংস ভক্ষণে কোন নিষেধাজ্ঞা না দিলেও ভারতের বেশীরভাগ রাজ্য তাদের অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডে আইনগত বাধা আরোপ করেছে।
গো-হত্যা রোধে মহাত্মা গান্ধীর অভিমত ছিলো, “How can I force anyone not to slaughter cows unless he is himself so disposed? It is not as if there were only Hindus in the Indian Union. There are Muslims, Parsis, Christians and other religious groups here.” (আমি কী করে একজনকে গরু নিধন করা থেকে বিরত রাখি যদি না সে নিজ থেকে বিরত হয়। ভারতবর্ষে শুধু হিন্দুরা বাস করে না; মুসলমান, পার্সি, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী গোষ্ঠীও বাস করে)।
গো-হত্যা নিষেধের কথা হিন্দু ধর্মে নেই মর্মে অনেক আলোচক অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এক্ষেত্রে হিন্দু পণ্ডিতদের অভিমত হচ্ছে, ধর্মের যথাযথ ভাষান্তর বা অনুবাদের অক্ষমতা থেকে এ সকল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। হিন্দুরা যে জুতা পায়ে দেয় তা যে মহিষ বা অন্য প্রাণীর চামড়ায় তৈরি তা নিশ্চিত হওয়া কি সহজ? অসুখ-বিসুখ বা বয়সের কারণে কয়টি গরুই বা মারা যায়? দুধের জন্য বা কৃষির জন্য লালিত গরু বিদ্যমান বিধি মোতাবেক জবাইয়ের উদ্দেশ্যে বিক্রি করা নিষেধ। এক্ষেত্রে গরু-মহিষাদির স্বাভাবিক মৃত্যুতে একজন গরিব কৃষক তার পুঁজি হারাবে। দুধ বা কৃষির জন্য অনুপযুক্ত গরু জবাইয়ের জন্য বিক্রি করার নিষেধাজ্ঞা না থাকলে কৃষক তাদের বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে আরেকটি উপযুক্ত গরু কিনে পুঁজির সংরক্ষণ করতে সমর্থ হতো।
এক সময় সনাতন অনুষ্ঠানগুলোতে হিন্দুদের মধ্যে গরুর মাংস খাওয়ার রেওয়াজ ছিলো বলে স্বামী বিবেকানন্দ উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, “There was a time in this very India when, without eating beef, no Brahmin could remain a Brahmin;” (এই ভারতেই এক সময় ছিলো, গরুর মাংস না খেলে ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণই থাকতে পারতো না)।
শুধু হিন্দু ধর্মে নয়, শিখ, জৈন ও জোরাষ্ট্রিয়ান ধর্মেও গো-মহিষাদিকে পবিত্র মনে করা হয়। সম্রাট আকবরের আমলে জৈনদের অনুরোধে তাদের একটি ধর্মীয় উৎসব চলাকালীন গরু-মহিষাদির জবাইয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিলো। শিখ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রণজিৎ সিংহও তাঁর আমলে গো হত্যার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। প্রাচীন মিশরে বিড়ালকে পবিত্র ভাবা হতো। নিরীহ কচ্ছপকে যুগ যুগ ধরে বহু গোষ্ঠী পূজা করে আসছে। জার্মানি, ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়াসহ বহু দেশে কুকুরের মাংস নিষিদ্ধ। পাশ্চাত্যের বহু লোকের পোষা বিড়াল বা কুকুরের প্রতি এত বেশী মমত্ববোধ যে, অতিথি হয়ে কোন বাসায় বেড়াতে গেলে তার পোষা কুকুর, বিড়ালকে 'হ্যালো' বলে দুয়েকটি কথা বলতে হবে, না বললে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে অতিথি দাওয়াত না খেয়ে চলে আসতে পারে।
আবার অনেক দেশ বা অঞ্চল আছে যেখানে এই পোষা বিড়াল, কুকুরকে হত্যা করে উৎসবের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সাপ বিষাক্ত— অনেকে লাঠি দিয়ে মারে, আবার অনেকে অ্যাকোয়ারিয়াম থেকে বেছে নিয়ে রান্না করে মজা নিয়ে ভক্ষণ করে।
বৌদ্ধ ধর্মে জীব হত্যা নিষেধ। কিন্তু মনুষ্যজাতি জীবন্ত বস্তুকে মেরে সঙ্গে সঙ্গে খাওয়ার জন্য উপাদেয় করে তোলে; মরা প্রাণী খেতে উপাদেয় নয়। বণিকেরা মানুষের এই মনোভাবকে পুঁজি করে অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ, কচ্ছপ, সাপ ইত্যাদি লালন করে দ্বিগুণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। যা মানুষের জন্য উপাদেয় তা ঐ জীবঁটির জন্য কষ্টদায়ক মৃত্যু। জীবন্ত একটি মাছকে বঁটি দিয়ে কাটা কি মাছটির জন্য সুখকর? তাহলে খাব কী? আশ্চর্য জগদীশ চন্দ্র বসু আবার আবিষ্কার করে বসে আছেন যে, গাছ, লতা-পাতা, শাক-সবজিরও প্রাণ আছে।
আবহাওয়া, পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রাপ্যতা ইত্যাদির উপর নির্ভর করে খাদ্যবস্তু গৃহীত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন রকম। ব্যক্তির রুচি এবং স্বাস্থ্যগত কারণেও অনেকে অনেক কিছু গ্রহণ করে না। একটি বয়সে রেড-মিট খাওয়া ডাক্তারি শাস্ত্র নিষেধ করে।
সারা পৃথিবীতে যে পরিমাণ মাংস খাওয়া হয় তার ৩৬% শূকরের, ৩৩% হাঁস-মুরগির এবং ২৪% গরুর মাংস। মানুষের প্রোটিন যোগানের ক্ষেত্রে গরুর একটি ভূমিকা লক্ষণীয়।
ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র; বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দাবি হলেও গো-মাংস ভক্ষণ থেকে ভারতের অধিবাসী মুসলিম, খ্রিস্টানদের বিরত রাখাটা যে সমীচীন নয় তা মহাত্মা গান্ধীও বলেছেন। সংখ্যায় কম হলেও সচেতন হিন্দুরা গোঁড়া হিন্দুদের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। মমতা ব্যানার্জি তো জোর গলায় গো-মাংস ভক্ষণের পক্ষে বলে যাচ্ছেন। সচেতন, বাস্তবধর্মী কিছু লোক সর্বযুগে ন্যায়ের পক্ষে বলেছেন, ভবিষ্যতেও বলবেন—এটাই মানবজাতির প্রাপ্তি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পশুবলি দিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়ার বাসনার বিরুদ্ধে 'বিসর্জন' নাট্যকাব্য লিখেছেন। কিন্তু হিন্দুদের এক কোপে ছাগল কাটার ধর্মীয় অনুষ্ঠান আমার দেখেছি। গো-মাতার জবাইকে রুখতে মানুষ হত্যা কখনো অহিংস বাণীর রূপায়ন হতে পারে না। শুভবুদ্ধির লোকের সংখ্যা কম হলেও তাদের প্রজ্ঞার মূল্যায়ন সারা পৃথিবীতে সমাদৃত; এই আশা নিয়েই বিভেদ সৃষ্টিকারীদের বিফল করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।