আমাদের এক সময় স্লোগান ছিল, 'মানব আমার জাতি, পৃথিবী আমার দেশ।' সারা পৃথিবীতে এক জাতির এক রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদের এরূপ ধারণা সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ে বিলীন হয়ে যায়; তবে মুক্তবাজার অর্থনীতির বিশ্বায়নের সংজ্ঞায় পুনরায় এক সময় মনে হয়েছিল সাম্যবাদের ওই ধারণাটি পুঁজিবাদের স্বার্থেই বাস্তবায়নযোগ্য।
যোগাযোগের প্রভূত উন্নতিতে মানবজাতি নিকট থেকে নিকটতর হচ্ছিল, পার্শ্ববর্তী দেশগুলো গোষ্ঠীভুক্ত হয়ে একতাবদ্ধ ও নৈকট্য হওয়ার প্রয়াস নিচ্ছিল। ধারণা করা হয়েছিল, এক সময় ছোট ছোট গোষ্ঠীগুলো বৃহত্তর গোষ্ঠীতে পরিণত হবে এবং সাম্যবাদের এক জাতি, এক দেশ হওয়ার ধারণাটি বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতায় মুক্তবাণিজ্যের বিশ্বায়নও বন্ধ হওয়ার পথে। এক জাতি, এক দেশের ধারণা এখন দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। চোর, ডাকাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা যেভাবে সিঁড়ির প্রতিটি দরজায় একটি করে কলাপসিবল গেটের মাধ্যমে রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা তালা দিয়ে সুরক্ষা সৃষ্টির প্রয়াস নিচ্ছি, তদ্রূপ বিশ্বের প্রতিটি দেশও সন্ত্রাসী আর জঙ্গির ভয়ে ভীত হয়ে চলাচলে নিশ্ছিদ্র বেড়ার প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন আঞ্চলিক ফোরাম গড়ে তুলে কিছু কিছু দেশ তাদের অধিবাসীদের সহজে ফোরামভুক্ত দেশগুলোর ভূখণ্ডে প্রবেশাধিকার দিয়ে থাকে। তবে সতর্কতা পরিহার করে নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এরূপ ফোরামের মধ্যে সর্ববৃহৎ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিবাসীরা খুব সহজে নিজ দেশের সীমানা অতিক্রম করে ইউনিয়নভুক্ত অন্য দেশে শুধু প্রবেশাধিকারই পায় না, অবস্থান করে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব করতে পারে। সুইজারল্যান্ড, ব্রিটেন ব্যতীত ইউনিয়নভুক্ত প্রায় সবগুলো দেশের একক মুদ্রার নাম 'ইউরো'। ব্রিটেন ব্যতীত ইউনিয়নভুক্ত যেকোনো একটি দেশের ভিসা নিয়ে সারা ইউনিয়নে অবাধে ঘোরা যায়। ব্রিটেন এরূপ অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করেও কিন্তু গঠিত ইউনিয়নে থাকতে পারল না, ব্রিটেনের জনগণ ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে সম্প্রতি ভোট দিয়েছেন এবং বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ব্রিটেনের স্থায়ী অধিবাসীরা দেখল, ইউনিয়নভুক্ত অন্য দেশের লোকেরা তাদের চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য দখল করে নিচ্ছে। নিজের স্বার্থ বিলিয়ে দিয়ে অন্যের উপকার করার মনোভাব অভিজাত ব্রিটিশরাও বেশিদিন ধরে রাখতে পারল না।
আমাদের সার্কভুক্ত দেশগুলোতেও আমরা অবাধে যাওয়া-আসা করতে পারছি না। ভারতের সঙ্গে আমাদের ১৫শ' মাইল সীমানার কোথাও কোথাও একটি বসতঘরের অর্ধেক অংশ ভারতে আর বাকি অর্ধেক বাংলাদেশে। এ অবস্থায়ও সীমান্ত পাড়ি দেওয়া, না দেওয়া নির্বিশেষে বাংলাদেশিদের ভারতীয় সীমান্তরক্ষী গুলি করছে। চোরাচালান রোধ গুলি করার প্রত্যক্ষ কারণ বলে ঘোষিত হলেও সন্ত্রাসী বা জঙ্গির ভয় এসব প্রতিরোধের অন্যতম ক্রীড়নক।
পোশাক রফতানির পর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তর উৎস হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশির পাঠানো রেমিট্যান্স। আমাদের দেশের প্রবৃদ্ধি অর্জনে এই রেমিট্যান্সের অবদান অনস্বীকার্য। বিদেশে লোক পাঠানোর জন্য আমাদের কত দেনদরবার; প্রেরিত লোকদের রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্যও প্রচুর প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। লোকজনও জমি-জমা সব বিক্রি করে বিদেশে যাওয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া। ছাত্রছাত্রীরাও ভবিষ্যতে উপার্জনের নিশ্চয়তা বিধানে তৎপর, বিদেশ-বিভূঁইয়ে একটি অখ্যাত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন মতে ভর্তি হতে পারলেই বর্তে যায়। কিন্তু পৃথিবীর প্রায় সবগুলো দেশের অভ্যন্তরে ঢুকতে বাংলাদেশিদের ভিসা লাগে। ইতঃপূর্বে কয়েকটি দেশে 'অন অ্যারাইভাল' ভিসা নিয়ে যাওয়া যেত, দিন দিন ওই দেশগুলোও আমাদের প্রবেশাধিকারে সঙ্গত কারণে নানাবিধ শর্ত আরোপ করছে।
আমেরিকায় এখনও একটি নিয়ম আছে; একবার আমেরিকায় ঢুকতে পারলে অপরাধী না হলে খুঁজে খুঁজে আমেরিকা থেকে বের করে দেয় না। বৈশ্বিক বিভিন্ন কারণে আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক আমেরিকাকে পছন্দ করে না। সব সময় যে আমেরিকা অপরাধ করে তা কিন্তু নয়; তবুও আমরা 'সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা' বলে প্রতিনিয়ত গালি দিচ্ছি, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে তা জিইয়ে রাখা আর অস্ত্র বিক্রির ধান্ধা করার জন্য মুণ্ডুপাত করছি। সম্প্রতি কাতার আর সৌদি আরবের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির অন্যতম কাণ্ডারী হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা হয়। কারণ তারা শত্রু সৃষ্টি করে অস্ত্র বিক্রি করতে বড় ওস্তাদ। ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাতার এবং সৌদিতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করছে বলে জানা যায়।
লক্ষণীয়, মধ্যপ্রাচ্যের ভুক্তভোগী আরব দেশগুলো আমাদের মতো উচ্চস্বরে সব কিছুর জন্য কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে না, উম্মাহর ভক্ত বলে শুধু আমরা করে থাকি। অন্যদিকে যাদের জন্য আমরা আমেরিকাকে গালাগাল করি সেই উম্মাহর দেশগুলো কিন্তু আমাদের মিসকিন বলে। মায়ের চেয়ে আমাদের মাসির দরদ বেশি। যেমন 'খিলাফত' রক্ষার জন্য মহাত্মা গান্ধীসহ ভারতবাসী যেভাবে সংগ্রাম করেছে তুরস্কবাসী কিন্তু তত করেনি। আমাদের যদি পৃথিবীর যেকোনো দেশের ভিসা সংগ্রহের একবার অবাধ সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে সম্ভবত সৌদি আরব নয়, আমেরিকা দূতাবাসের সম্মুখে সবচেয়ে লম্বা লাইনটি হবে। তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এ ঘৃণা পোষণ করে লাভটা কী? স্বার্থ বিচারে ঘৃণাও অনুরাগে পর্যবসিত হয়।
ভিসা থাকলেও ইদানীং আমাদের প্রবেশাধিকার অবাধ নয়; ভিসা ইস্যু করার পরও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস থেকে পরামর্শ দিয়ে থাকে। এটা বাঙালি বলে নয়, মুসলিম নাম থাকায়। দেখা যাচ্ছে, প্রদত্ত ভিসা বা অনুমতিপত্রও আমাদের জন্য শর্তসাপেক্ষ। তাই বিমানে উঠেও বুক কাঁপে, 'ঢুকতে দেবে তো?'
আমরা তো সাধারণ মানুষ, জঙ্গি তৎপরতায় অসাধারণ মানুষকেও ইমিগ্রেশন বা নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হতে এখন নানা সওয়াল-জবাবের সম্মুখীন হতে হয়। তবে মুসলমানদের প্রতি সন্দেহটা একটু বেশি। লাইনে দাঁড়িয়ে যখন দেখি অন্য দেশের পাসপোর্টধারীরা অনেকটা সহজেই ইমিগ্রেশনের লাইন পার হয়ে যাচ্ছে অথচ আমাদের সবুজ পাসপোর্টটা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাড়াচাড়া করছেন, উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষা করছে, ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সিল দিচ্ছে না, তখনকার অবস্থা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ইমিগ্রেশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর স্বস্তির দীর্ঘ নিঃশ্বাসটি নিতে পারলেই বুকে আটকে থাকা পাথরসম বোঝাটি নেমে যায়।
আগেই উল্লেখ করেছি, অসাধারণ ব্যক্তিরাও এখন ইমিগ্রেশনে বিপদে পড়ে যান। আমরা ধরে নিয়েছি, সাধারণ লোকেরা দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করার জন্যই জন্ম নিয়েছে; কিন্তু অসাধারণেরা দেশ ভ্রমণে বিপদে পড়বেন কেন? অসাধারণদের সাহায্য-সহায়তা করার জন্য বিমানবন্দরে অনেক লোক থাকে। কিন্তু তারাও যখন ইমিগ্রেশনে বিপদে পড়েন, অসহায় বোধ করেন তখন মনে হয় মানুষের চলাচল বোধ হয় এক সময় বন্ধ হয়ে যাবে, বিশ্বের দেশগুলোর দূরত্ব দিন দিন না কমে বরং বেড়ে যাচ্ছে।
ভারতের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট এপিজে আবদুল কালামকে ২০১১ সালে তার ৮০ বছর বয়সে একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ দু'বার চেক করে; প্রথমবার চেক করার পর তিনি যথারীতি বিমানে উঠেন, নিরাপত্তাকর্মীরা আবার বিমানে এসে তার জ্যাকেট ও জুতা খুলে নিয়ে পরীক্ষা করে। অবশ্য তিনি তখন ভারতের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। তাকে হয়তো ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ চিনতে পারেনি, তিনিও হয়তো পরিচয় দেননি। এমনিতেই তিনি সাধারণ লোকদের মতো চলাফেরা করতেন, তার অনেক বাণী এখনও আমরা প্রবচনরূপে মেনে চলি। এছাড়াও সম্ভবত তিনি তখন ভারতীয় দূতাবাসের কোন সহায়তা নেননি। কিন্তু ভারতের পারমাণবিক বোমার উদ্ভাবক, প্রেসিডেন্টের পাসপোর্টে কোন না কোন উল্লেখযোগ্য তথ্য থাকার কথা। তবে এটাও সত্য যে, আমরা যেমন ওবামাকে চিনি, ট্রাম্পকে জানি— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লোকেরা বাইরের দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর চেহারা তত মনে রাখার প্রয়োজন মনে করে না। হয়তো চিনেও তারা সন্দেহ করে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। ওইসব দেশগুলোতে আবার একজনের দায়িত্বে অন্যরা হস্তক্ষেপ করে না। যেমন বিভিন্ন দূতাবাসে ভিসা প্রদানে ভিসা অফিসারের একক কর্তৃত্বে অ্যাম্বাসেডর বা হাইকমিশনারেরও সচরাচর কিছু করার থাকে না। তাদের নিকট 'রুলস আর রুলস' এবং তা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য।
তাদের সাবেক প্রেসিডেন্টকে এভাবে হেনস্তা করার জন্য ভারত প্রতিবাদ করায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের নিকট দুঃখ প্রকাশ করেছিল এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট কালামকেও দুঃখ প্রকাশ করে চিঠি লিখেছিল।
জঙ্গিরা বোমা মেরেই লাপাত্তা, কিন্তু এর ফল হয় সুদূরপ্রসারী। আমার সহকর্মী বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকের নামের পেছনে 'ইসলাম' থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে সরকারি সফরেও একবার ভিসা দেয়নি। ঠিক তদ্রূপ নামের সঙ্গে 'খান' লেখা থাকার জন্য ভারতের সিনেমা জগতের বিখ্যাত নায়ক শাহরুখ খানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশনে কয়েকবার কয়েক ঘণ্টা ধরে আটক করে রাখা হয়েছিল।
জঙ্গিদের ভয়ে এখন সবাই তটস্থ, ভিসা অফিসারের নিকট মানুষ হিসেবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সবাই জঙ্গি। বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে ভিসা সংগ্রহ তাই কঠিন হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধান ছিলাম। প্রতিষ্ঠানের একটি মেশিন বিকল হলে মেশিন সরবরাহকারী তাদের আঞ্চলিক অফিস দুবাই থেকে টেকনিশিয়ান পাঠাতে সম্মত হয়; কিন্তু জঙ্গিদের সংরক্ষিত নামের তালিকার একটি নামের সঙ্গে টেকনিশিয়ানের নাম মিলে গেলে বাংলাদেশ দূতাবাস তাকে ভিসা দেয়নি। ফলে ইউরোপ থেকে আরেকজন টেকনিশিয়ান আসা পর্যন্ত মেশিনটি দীর্ঘদিন আর সচল করা যায়নি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন, এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা মহাদেশের প্রতিটি দেশে, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও তাদের ইমিগ্রেশনে হেনস্তা করা হয়। ইদানীং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশে লোক চলাচলে আরও বেশি কড়াকড়ি আরোপ করছে; আমেরিকার উদ্দেশে বিমানে উঠার আগে তারা অন্য দেশে তাদের লোক দিয়ে গমনেচ্ছু লোক ও তাদের ভিসার সত্যতা যাচাই করে নিচ্ছে যাতে তাদের ভূখণ্ডে যাওয়ার পূর্বেই জঙ্গি ছাঁটাই করা সম্ভব হয়।
এখন বিমানে উঠার সময় সঙ্গে করে এক বোতল পানিও নেয়া যায় না। আমি বহু বছর পূর্বে একবার সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরে হ্যান্ড লাগেজের কয়েকটি সেন্ট রেখে আসতে বাধ্য হয়েছি, বারবার সেন্টগুলো ছেড়ে দিতে অনুরোধ করায় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আমাকে থেকে যেতে বলেন।
বাঙালিদের পাসপোর্টে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের ভিসা থাকলে এক সময় সমূহ বিপদ হিসেবে গণ্য করা হতো। এ কারণে আমার এক সহকর্মী প্রশিক্ষণে পাকিস্তান যেতে আগ্রহী ছিলেন না।
স্ক্যানিংয়ে ত্রুটি থাকায় আমাদের বিমানবন্দরের ওপর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ অনবরত শর্ত আরোপ করে যাচ্ছে; শর্তগুলোর পূরণেও বিদেশিরা সন্তুষ্ট নয়, তাদের লোক নিয়োগ দিয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো পরীক্ষার করার শর্তও দিচ্ছে। তারা তাদের বিমান, বিমানবন্দর এবং দেশকে সুরক্ষিত রাখার অভিপ্রায়ে আমাদের এসব শর্ত দিচ্ছে। কারণ আমাদের বিমানবন্দরের বিমান ও বিমানের লোকগুলো তাদের দেশে যাচ্ছে। নিজের সুরক্ষায় তারা কোন আপস মেনে নিচ্ছে না।
অবাধ চলাচল বিশ্বায়নের পথে প্রধান বাধা। মুসলমানদের নাম নিলেই বাকি বিশ্ব এখন আঁতকে উঠে। এর যুক্তিসঙ্গত কারণও আছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ বিগ্রহ লেগেই আছে। সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, সৌদি আরব, মিসর, তুরস্ক, তিউনেশিয়া, ইয়েমেন, পাকিস্তান প্রভৃতি মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে প্রায় প্রতিদিন বোমা ফুটছে, অসংখ্য আবালবৃদ্ধবনিতা বোমার আঘাতে মারা যাচ্ছে। নাইজেরিয়ার ইসলামিক গ্রুপ বোকো হারামের ভয়ে মেয়েরা স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে। অন্যদিকে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, আমেরিকা তো জঙ্গিদের আক্রমণের প্রধান টার্গেট।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং পারিবারিক উদাসীনতা জঙ্গি তৈরির ক্ষেত্রে কখনো কখনো মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। দুঃসাহসিক কাজ করে হিরো হওয়ার তাগিদ থেকেও কেউ কেউ জঙ্গি হচ্ছে। কিশোর, যুবকদের অনিশ্চিত জীবনের হতাশা জঙ্গি সৃষ্টিতে সহায়তা করছে। শহীদ হয়ে পরকালে বেহেশত পাওয়ার প্রত্যাশা, অনুসরণীয় আদর্শ ব্যক্তির অভাব, এইরূপ বিভিন্ন কারণেও লোকেরা জঙ্গি হচ্ছে। এর মধ্যে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাটাই অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়; পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে সহজে অন্যের দ্বারা প্ররোচিত ও প্রভাবিত হওয়া সম্ভব।
সন্তান মেধাবী, নটর ডেম বা ঢাকা কলেজ থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ভালো সাবজেক্টে পড়ে, কখনো প্রেম করেনি, মেয়েদের দিকে ফিরেও তাকায় না, মুরব্বিদের সমীহ করে, প্রয়োজনাতিরিক্ত একটি কথাও বলে না, মাথা নিচু করে চলাফেরা করে, ঘরে ঢুকেই রুম বন্ধ করে পড়তে বসে, খুবই সুবোধ; এমন একজন সুবোধ ছেলে পেয়ে পিতামাতার অহংবোধ হতে পারে, সন্তানের জীবন গড়ার ব্যাপারে মনে মনে নিশ্চিত হয়ে বুঁদ হয়ে থাকা সহজ। কিন্তু সন্তানদের সঙ্গে সখ্য না করে দূর থেকে এমন পর্যবেক্ষণ সঠিক নাও হতে পারে। দেখা যাবে হঠাৎ একদিন গভীর রাতে পুলিশ এসে বাড়ি ঘেরাও দিয়ে ছেলেটিকে নিয়ে গেল তখন হয়তো উপলব্ধি হবে, সুবোধ ছেলেটি কেন এত সুবোধ ছিল, কেন ব্যতিক্রমী অসামাজিক ছিল।
বর্ণিত এ ছোট্ট বানানো কাহিনীটিই যেকোনো পরিবারে সংঘটিত হতে পারে। কারণ ইচ্ছে করলেই জীবনের সবকিছু আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না; আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাইরে অনেক ঘটনা ঘটে থাকে এবং তা দ্বারা আমরা প্রভাবিত হই। কোন কোন প্রভাব আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে, আবার কোন কোন প্রভাব জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই নিজের ব্যাপারে, সন্তানদের বিষয়ে সতর্ক ও সজাগ থাকা অপরিহার্য। দেশের মঙ্গলে বিদ্রোহ কবি কাজী নজরুল ইসলামের উচ্চারিত 'ধর্মমাতাল'দের সুনজর থেকে আমাদের সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য দ্বিগুণ সতর্কতাই যথেষ্ট নয়, এই ব্যাধি যাতে সংক্রামক আকারে বেড়ে মহামারী রূপ ধারণ না করে সে ব্যাপারেও সজাগ থাকা অত্যাবশ্যক।
১৯৪৬ সনের 'দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং' নাকি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছিল। মুসলিম লীগ ১৯৪৬ সনের ২৯ জুলাই 'ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে'-এর প্রস্তাব গ্রহণ করে যা পালন করা হয় ১৬ আগস্ট। এই দিবসটি অহিংস হবে, না কি হিংসাত্মক হবে সে ব্যাপারে মহম্মদ আলী জিন্নাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি সাংবাদিকদের উত্তরে বলেন, 'আমি এখানে নৈতিকতা আলোচনা করতে আসিনি।' একটি লিফলেটে এই দিবসে জেহাদে অবতীর্ণ হতে আহ্বান করা হয়; অন্য একটি লিফলেটে দেখানো হয়, জিন্না উন্মুক্ত তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন আর লিফলেটে লিখা ছিল, 'আমরা মুসলমানেরাই এক সময় রাজা ছিলাম, আমরাই রাজত্ব করতাম। তৈরি হোন, হাতে তরবারি তুলে নিন... প্রবল হত্যাকাণ্ড এবং ধ্বংসের আর বেশি দেরি নেই।' এই উন্মত্ততায় একদিনে ৬ হাজার লোক কতল হন।
জঙ্গি আতঙ্ক যে আমাদের সার্বিকভাবে কত ক্ষতি করছে তা বেশি বুঝতে পারে বিদেশে গমনেচ্ছুরা। ছাত্রছাত্রীরা পূর্বে যত সহজে বিদেশে পাড়ি জমাতে পারত এখন আর পারে না। কয়েকটি দেশ ঝুঁকি নিয়ে ভিজিট ভিসা দিলেও পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ তা এখন আর ইস্যু করে না। ভিসার জন্য এখন এমন কাগজপত্র দিতে বলা হয় যা সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব। জার্মান অ্যাম্বাসি বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের দলিল চায়; যারা প্রবীণ তাদের পক্ষে এ দলিলটি নতুন করে সংগ্রহ করা দুরূহ ব্যাপার। চলাচলে বাধা থাকায় ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাকরির জন্য ভিসা নেয়া তো 'সোনার হরিণ'। সবুজ পাসপোর্টটা নিয়ে যখন বিভিন্ন দেশের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা সন্দেহ পোষণ করে তখন খুব অপমানিত বোধ করতে হয়। আমাদের ইমেজ দিন দিন ক্ষয় হচ্ছে, অভাবের তাড়নায় অন্য দেশে যাওয়াটা এক সময় জঙ্গিপনার জন্য বন্ধ না হলেই বাঁচি।