কয়েকদিনের টানা বর্ষণে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলায় পাহাড় ধসে দেড় শতাধিক লোক প্রাণ হারিয়েছে, অর্ধশতাধিক লোক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আবার অন্যদিকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কাপ্তাই লেকের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় রাঙামাটি শহরের নিম্নাঞ্চলের বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে।

স্কুলে পড়াকালীন ১৯৭০ সনে ম্যালথাসবাদের জনসংখ্যা তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ করেছি; জনসংখ্যা যে গতিতে বাড়ছে তা রোধে প্রাকৃতিক দুর্যোগের অপরিহার্যতার কথা এই তত্ত্বে বলা হয়েছিলো। এই তত্ত্বের সমালোচনায় বলা হয়েছিলো যে, বিজ্ঞানের বিপুল উন্নতিতে এই তত্ত্ব অসার। সমাজতন্ত্রের তত্ত্বেও বলা হয়েছিলো, মানুষ শুধু মুখ নিয়ে জন্মায় না, একটি মুখের বিপরীতে দুইটি হাত থাকে। তাই এক সময় মানবশিশুর জন্মে সমাজতন্ত্র মাথা ঘামাতো না। চীন জনসংখ্যার বৃদ্ধির ভয়াবহতা উপলব্ধি করার পর এক শিশুর স্লোগান চীনে রাষ্ট্রীয় ঘোষণায় প্রচারিত হয়েছিলো। ইউরোপের অত্যধিক শীতপ্রধান দেশে নেতিবাচক জন্মহার দীর্ঘদিন যাবৎ বিরাজমান। ঐসব দেশে অপরাধ খুবই কম। একটি নিবন্ধে পড়েছিলাম, সুইডেনে কারাদণ্ডে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি তার ইচ্ছে অনুযায়ী সময়ে কারাগারে যাওয়ার অধিকার ভোগ করে থাকে। কারো এক মাসের সাজা হলে সে ফেব্রুয়ারি মাসটা বেছে নেয়, লিপ ইয়ার হলে তার সাজার মেয়াদ আরও একদিন হ্রাস পায়। কয়েকদিন আগে পত্রিকায় পড়লাম, নেদারল্যান্ডে সাজাপ্রাপ্ত লোকের অভাবে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে কয়েদি এনে তাদের জেলে রেখে জামাই আদরে লালন-পালন করেছে। ঐসব দেশ জনসংখ্যা তুলনামূলক কম বলেই মানুষের বসবাস ও জীবনধারণের সব ব্যবস্থা সহজে করা সম্ভব হচ্ছে। কোন কোন দেশে লোকসংখ্যা বেশি হলেও পর্যাপ্ত সম্পদ থাকায় ব্যবস্থাপনায় আপাতত সমস্যা হচ্ছে না, কিন্তু ভবিষ্যতে হবে। জনসংখ্যাবহুল দেশ চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে অগণিত লোক অন্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। আগে প্রায় প্রতিটি দেশে ইন্ডিয়ান মার্কেট দেখা যেত, এখন তার সাথে যোগ হয়েছে চায়না মার্কেট ও ভিয়েতনামের বাজার। বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি লোক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শুধু অবস্থান করছে না, এদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের সমৃদ্ধি অর্জনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। কোন কারণে এই বিপুলসংখ্যক লোক দেশে প্রত্যাবর্তনে বাধ্য হলে দেশের বিরাজমান অর্থনীতি তা সামাল দিতে হিমশিম খাবে।

বর্তমান প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের লীলাখেলা দেখলে মনে হয় ম্যালথাসবাদই সত্য এবং আগামী দিনগুলোর জন্যও সত্য হবে। বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতিও প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবিলা করতে পারছে না। পারবে বলেও মনে হয় না।

সুদূর অতীতেও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অনেক শোরগোল দেখেছি; ইদানীং আর তেমন প্রচার-প্রচারণা দেখি না। এটা সত্য, এখনো পৃথিবীর পতিত জমিগুলোতে মানুষের সুষম বিন্যাস করা গেলে মানুষের বাসস্থান ও খাওয়ার অভাব হবে না। কিন্তু তা হবার নয়। মুক্তবাজার অর্থব্যবস্থা শুধু পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, মানুষের ক্ষেত্রে নয়। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মানবকুলের অবাধ বিচরণের অধিকার চেয়ে একটি আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো বক্তব্য রেখেছিলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তাদের নিকট তা মনঃপূত হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় তা আরও অগ্রহণযোগ্য হবে। জঙ্গীদের অবাধ চলাচল পাসপোর্ট-ভিসার জটিলতা সৃষ্টি করেও রোধ করা যাচ্ছে না।

রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব না থাকলেও প্রতিটি দেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতা রয়েছে; কোন দেশের লোকের অন্য দেশে প্রবেশাধিকার নানাবিধ শর্তাধীনে সীমিত। কোন দেশের লোককে অন্য আরেকটি দেশে ঢুকতে দেবে কি, দেবে না তা সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব নিয়মনীতির নিয়ন্ত্রণাধীন।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে প্রতিনিয়ত এবং এর জন্য অংশত দায়ী করা হচ্ছে মানুষকে। রাঙামাটিতে পাহাড় ধসের সাম্প্রতিক দুর্যোগও মানুষসৃষ্ট। পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলে কত লোক হলে আদর্শ বসবাস হতো তা আমরা জানি; অতিরিক্ত লোক ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য বোঝা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টির কারণ।

১৯৮৯ সনে মালয়েশিয়ায় একটি সেমিনারে বাংলাদেশের আয়তন এবং জনসংখ্যার চিত্র তুলে ধরার পর সেমিনারে অংশগ্রহণকারী একজন মালয়েশীয়ান প্রতিবাদ করে বললেন যে, আমার প্রদত্ত তথ্য সঠিক নয়। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন যে, এত ছোট একটি ভূখণ্ডে এত লোকের বসবাস অসম্ভব।

বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের উপার্জিত রেমিট্যান্স পেয়ে আমরা যারপরনাই খুশি। এজন্য বোধ হয় পরিবার পরিকল্পনার প্রতি আমাদের মনোযোগ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এখন আর বিভিন্ন মিডিয়ায় আগের মতো প্রচার-প্রচারণা হয় না। নিঃস্ব পরিবারগুলো একদিকে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে দ্রুত পরিবারের মোট উপার্জন বাড়াতে ব্যস্ত, অন্যদিকে আমরা সমাজ, রাষ্ট্র অধিক রেমিট্যান্স প্রাপ্তি ও প্রাপ্তির প্রত্যাশায় বিভোর হয়ে অধিক জনসংখ্যাকে আশীর্বাদ হিসেবে হয়তো বিবেচনা করছি। এই অধিক জনসংখ্যা প্রকৃতির উপর যে অত্যাচার করছে তাতে প্রকৃতির প্রতিশোধ নেমে আসাটাও অপ্রত্যাশিত নয়।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের বিনিয়োগের প্রায় সবটাই প্রকৃতি বিনষ্টে; গ্রামে এখন উঁচু ভিটে-জমি খুব বেশি দৃষ্টিগোচর হয় না। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দিয়ে কৃষিজমি ভরাট করে শুধু অট্টালিকা বানানো হচ্ছে; না বানিয়েও উপায় নেই। বিদেশে চাকরি করার সুবাদে তাদের মান-ইজ্জত বেড়েছে, বসবাস উপযোগী একটি ঘর না হলে চলে না। বিদেশে যাওয়ার পূর্বে একটি ছোট্ট ঘরে পরিবারের অনেক সদস্য নিয়ে অমানবিক রাত্রিযাপন সামান্য আর্থিক সচ্ছলতায় গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। তাই খাওয়ার সংস্থান করার পূর্বে সকলে জমি ভরাট করে বাসস্থানের ব্যবস্থা করছে।

অধিক লোকের জিনিসপত্রের অধিক ব্যবহার খুবই স্বাভাবিক। প্রথমত লোক অনুপাতে জমির সীমাবদ্ধতা; খালি জমি ভরাট হবেই। গ্রামে শুধু জলাশয়ই ভরাট হচ্ছে না, পুকুরগুলোও ভরাট হচ্ছে। বাঙ্গালী বসতির সৃষ্টি না হলেও এক সময় পাহাড়ীরাও পাহাড় ভাঙতো। পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল আর কত লোককে আশ্রয় দেবে। উঁচু জমির মাটি দিয়ে নিচু জমির ভরাট কাজ বহু পূর্ব থেকে অব্যাহত আছে। উঁচু জমির বাসিন্দারাও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি রেখে পাহাড়ের মাথা ভেঙে চাষাবাদের উপযোগী সমতল ভূমি তৈরি করছে; ফলে পাহাড়ের উপরিভাগের শক্ত স্তরটি আর থাকছে না। আমাদের পাহাড়গুলোও কঠিন শিলা দ্বারা আবৃত নয়; তাই অল্প বৃষ্টিতেই মাটির বন্ধন আলগা হয়ে যাচ্ছে।

বৃষ্টি হলে পাহাড় ধসে পড়বে জেনেও মানুষ সেখানকার বসতি ছেড়ে যেতে চায় না; কোথায় যাবে? জলোচ্ছ্বাসেও চিৎকার করে দুর্গত-প্রবণ এলাকার সব লোককে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আনা সম্ভব হয় না; আসলে গরু-বাছুরসহ পরিবারের সব নিয়ে দুই ঘণ্টার নোটিশে অন্যত্র যাওয়াও সহজ নয়। বিবেচ্য হচ্ছে, ঐ সকল এলাকায় লোক বাস করতে বাধ্য হচ্ছে কেন? ছন্নছাড়া মানুষগুলোর বসতি গড়ার এর চেয়ে ভালো জায়গা নেই, থাকলে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে এরূপ অনিশ্চয়তায় বসবাস করত না।

ঢাকা জেলার বসতির ঘনত্ব বিবেচনায় নিয়ে পৃথিবীর লোকগুলোকে বিন্যস্ত করা হলে নাকি সারা পৃথিবীর লোকজনকে শুধু আমেরিকায় 'অ্যাকোমোডেট' করা সম্ভব। কিন্তু পৃথিবীর অন্য স্থানের হাল্কা বসতির চিন্তা-ভাবনায় আমরা যদি বাংলাদেশে লোকসংখ্যা বাড়াতে থাকি তা কখনো আমাদের জন্য শুভ হবে মনে হয় না।

পরিবার পরিকল্পনা এখনো হচ্ছে এবং তা হচ্ছে শিক্ষিত ও সচেতন পরিবারে। এতে একটি শ্রেণির লোকজন সীমিত হচ্ছে, অপরদিকে অন্য শ্রেণিতে দ্বিগুণ হারে বেড়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির মতো মনুষ্যসমাজেও ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য। বুদ্ধ্যঙ্ক বংশগত হলে এক সময় বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার অভাব সমাজে প্রকট হয়ে উঠতে পারে।

এগুলো হচ্ছে জ্ঞানগরিমার কথা। এর বাইরেও কথা আছে। কোথাও কোথাও বসুধার ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত লোক অতিরিক্ত জঞ্জাল সৃষ্টি করে প্রকৃতির জগতে যে অনাসৃষ্টি করছে তা আমাদের বিবেচ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। অতিরিক্ত লোকের অতিরিক্ত খাওয়া, অতিরিক্ত বাসস্থান, অতিরিক্ত বস্ত্র, অতিরিক্ত পানি, অতিরিক্ত রাস্তা, অতিরিক্ত জ্বালানি ইত্যাদি দরকার; সাধ্যমত এগুলো আমরা করছিও। কিন্তু অতিরিক্ত লোকের ব্যবহৃত বর্জ্যগুলোর অপসারণ, নিষ্কাশনের ব্যবস্থাদি হচ্ছে না বলেই অনেকগুলো দুর্যোগ মহামারি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে আমাদের ভূমির উচ্চতা খুবই কম। তাই সমুদ্রের পানির উচ্চতা একটু বাড়লেই আমাদের দেশ ডুববে। মালদ্বীপের অবস্থা আরও খারাপ; পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার তাগিদে ২০০৯ সনের ১৭ আগস্ট প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের সভাপতিত্বে ঐদেশের মন্ত্রিসভার একটি বৈঠক সমুদ্রের তলদেশে আয়োজন করা হয়েছিলো। কিন্তু পৃথিবীর যাদের এ বিষয়টি শুনা দরকার তারা তা তাৎক্ষণিক লাভের লোভে শুনছে না।

লোক বাড়ছে, লোকের নিত্যনতুন চাহিদা বাড়ছে; আর এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে কার্বন নির্গমনের পথ তৈরি হচ্ছে। পৃথিবীতে যে পরিমাণ কার্বন নির্গত হয় তার তুলনায় আমাদের দেশের কার্বন নির্গমনের হার ০.০৩ শতাংশ মাত্র; অথচ সাগরের পানির উচ্চতা বাড়লে আমাদের দেশটি ডুববে প্রথম। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহর সাগর হয়ে যায়। এত লোকের আবর্জনা পরিষ্কার করার ব্যবস্থাদি নগর পরিকল্পনায় ছিলো না, এখন নতুন করে করার সামর্থ্যও নেই। নালা-নর্দমা করলেই যে পানি সরে যাবে তাও নিশ্চিত নয়; কারণ সাগরের পানির উচ্চতা আগের তুলনায় বাড়ছে, এখন আর সাগর পানি নিতে চায় না, বরং কিছুদিন পর আমাদের জনপদের দিকে তাদের লবণাক্ত পানি ঠেলে দেবে।

তাই ম্যালথাসবাদ নতুন করে অধিকতর সত্য হওয়ার পূর্বে আমাদের সচেতন হওয়া অপরিহার্য।