অজানাকে জানার স্পৃহা মানুষের স্বভাবজাত। শিশুরা অহরহ প্রশ্ন করতে থাকে; কিন্তু খুব কম অভিভাবকই আমাদের সমাজে শিশুদের প্রশ্নের উত্তর দানে স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু আমাদের জানা থাকা দরকার যে, কী, কেন, কখন, কোথায় ইত্যাদি প্রশ্ন ও প্রশ্নের উত্তর দ্বারাই শুধু চিন্তা, চেতনার বিকাশ ঘটানো সম্ভব। পৃথিবীর এই যে অগ্রগতি, মনুষ্য পদবাচ্য এই প্রাণী যে সভ্য অভিধায় পরিচিতি লাভ করেছে, বিজ্ঞানের যে নানাবিধ আবিষ্কার, শিল্প ও সংস্কৃতির যে অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি তার পেছনে বহু মনীষীর অগুনতি প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা ছিলো। শুধু প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা নয়, জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার নিরলস প্রচেষ্টার কারণে আজ মানবসভ্যতার এই উত্তরণ। প্রশ্ন ও উত্তর খোঁজার পথ কোন কালে মসৃণ ছিলো না। প্রশ্নমুখী এই সব মনীষী জিজ্ঞাসাবিমুখ মানুষের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছেন যুগে যুগে।
গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস; তিনি বিনা প্রশ্নে কোন কিছুই মেনে নিতেন না। এজন্য তৎকালীন ধর্মগুরুরা চটে গেল, রাজাকে ক্ষেপিয়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলো। দার্শনিক সক্রেটিসের অনেক যুবক মুরিদ বা শিষ্য ছিলো; সক্রেটিস শিষ্যদের প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁর শিক্ষাদানের কোন নির্দিষ্ট শিক্ষায়তন ছিলো না; রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজারই ছিলো তাঁর শিক্ষায়তন। তিনি বলতেন 'বিস্ময় হলো জ্ঞানের গুরু'। এই বিস্ময় হচ্ছে, জানার আগ্রহ। তিনি প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে বিপক্ষকে পরাভূত করতেন। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করার সময় এমন ভাব দেখাতেন যেন নিজে কিছুই জানেন না, বোঝেন না, লোকের কাছ থেকে জানার জন্য প্রশ্ন করছেন। সক্রেটিসের উক্তি: "আমি সর্বক্ষণ তোমাদের দেহে হুল ফুটিয়ে তোমাদের মধ্যে সুস্থ ভাবনা জাগিয়ে তুলি, যুক্তির দ্বারা উদ্বুদ্ধ করি এবং প্রত্যেককে তিরস্কারের দ্বারা তৎপর করে রাখি।"
প্রশ্ন করে সক্রেটিসের সত্য জানার আগ্রহ তৎকালীন শাসক ও ধর্মযাজকদের ভীত করে তোলে। ধর্মযাজকদের মিথ্যা বিক্রির অভিসন্ধি প্রশ্নবাণে ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় প্রশ্নের উদ্গাতা সক্রেটিসকে শাসকদের নির্দেশে 'হেমলক' নামক বিষ খেয়ে মরতে হলো। তখন থেকেই প্রশ্ন করা মহাপাপ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
পারিপার্শ্বিক এইরূপ অসহযোগিতার জন্যই আমাদের সমাজে অধিকাংশ মানুষ প্রশ্নহীন, জিজ্ঞাসাবিমুখ। ফলে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, মূর্খতা, মূঢ়তা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজকে গ্রাস করে রেখেছে।
বিবিধ কারণে আমাদের জ্ঞান আহরণের দ্বারে অর্গল আঁটা। জানার ক্ষেত্রে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা থাকায় চিন্তা, চেতনায় জাতি হিসেবে আমরা প্রায় স্থবির। এই অচলায়তন কাটিয়ে এগুতে হলে মনে বিস্ময় ভাব থাকতে হবে। জ্ঞানসাধনায় রুদ্ধ পরিবেশ থাকায় আমাদের বিজ্ঞানের জগতে কোন অবদান নেই। সর্বত্র জিজ্ঞাসার জাল বিস্তার করে জ্ঞান লাভের সুযোগ থাকলে বুদ্ধিহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
আমাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রচেষ্টা নিলে তর্ককে যুক্তিনির্ভর বিতর্কে পরিণত করতে পারে। যুক্তি-তর্কের কষ্টিপাথরে ঘষে ছাত্র-ছাত্রীদের সৃজনশীল করে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকের। ক্লাসে পড়াতে গিয়ে অনেক শিক্ষক শুধু বইয়ের পাঠ্য অংশটুকু ছাত্র-ছাত্রীদের শুনিয়ে দায়িত্ব শেষ করে ক্লাস ত্যাগ করেন। কোন কোন শিক্ষক প্রাণহীন মূর্তির মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে বিরতিহীন বলতে থাকেন, ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীরা তার বক্তব্য শুনছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখেন না। কয়েকজন আবার ক্লাসে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের একটি কাজ দিয়ে ব্যক্তিগত কাজে মনোনিবেশ করেন, ঘণ্টা পড়লে হুঁশ হয়। কিছু শিক্ষক রোল কল করে, অপ্রয়োজনীয় কথা বলে অর্ধেক সময় অতিবাহিত করেন। কিছু শিক্ষক ক্লাসে পরীক্ষার খাতা দেখেন। কিছু শিক্ষক ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের কিছু একটা করতে বলে একটু ঘুমিয়ে নেন।
শিক্ষার্থীর মনে জ্ঞানবিদ্যার আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলাই একজন শিক্ষকের আদর্শ হওয়া উচিত। আগ্রহ সৃষ্টির মূলে কাজ করে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রাণের উচ্ছ্বাস তৈরি করা। ক্লাসে প্রাণ সৃষ্টি করতে পারেন খুব কম শিক্ষক। প্রাণ সৃষ্টির যোগ্যতা প্রমাণে পড়ালেখায় মেধাবী হতে হয় না। পড়াশুনাকে কিছু শিক্ষক এত সিরিয়াস পর্যায়ে নিয়ে যান যে, ছাত্র-ছাত্রীরা আনন্দসহকারে আত্মস্থ না করে শুধু গলাধঃকরণ করে।
কম জানা শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশ্ন করাকে অপছন্দ করেন বলে প্রশ্ন এড়াতে গিয়ে ক্লাসে ঢুকেই রাগারাগি আরম্ভ করে দেন। প্রশ্ন করার আগ্রহ থেকে নিরুৎসাহিত ও নিবৃত্ত করার এই কৌশল ছাত্র-ছাত্রীদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরিয়ে দেয়। কিছু শিক্ষক সহজ অঙ্ক, সহজ পড়াটা ক্লাসে শেষ করে অপেক্ষাকৃত কঠিন বিষয়গুলো বাড়ির কাজ হিসেবে নির্বাচিত করেন যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা প্রাইভেট পড়তে বাধ্য হয়।
ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে অজানাকে জানার, অনায়ত্তকে আয়ত্ত করার ব্যাকুলতা সৃষ্টি করার সক্ষমতাতেই শিক্ষকের কৃতিত্ব। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে যদি এমন প্রত্যয় জন্মানো হয় যে, শিক্ষক যা বলবেন তাতেই বিশ্বাস করতে হবে, আস্থা রাখতে হবে, প্রশ্ন করা যাবে না তাহলে সে শিক্ষা হবে ভক্তদের সম্মুখে রেখে পুরোহিতের গীতা পাঠ। বিশ্বাসে সব প্রশ্নের, সব অন্বেষার অবসান হয় সত্য, কিন্তু যতক্ষণ মানুষ বিচার, বুদ্ধি বা জ্ঞানের আলোতে থাকে ততক্ষণ সন্দেহও আছে, প্রশ্নও আছে। শুধু প্রশ্ন করে ক্ষান্ত হয় না, প্রশ্নের উত্তর খোঁজার অহর্নিশ ভাবনায় মানুষ সুস্থির থাকতে পারে না। যুক্তিতর্ক ও বিচার বিশ্লেষণহীন বিশ্বাস অন্ধতারই নামান্তর। মহামতি গৌতম বুদ্ধ তাঁর অনুসারীদের বলতেন যে, 'আমি বলেছি বলেই তোমরা বিশ্বাস করো না। তোমরা ভেবে দেখো আমার কথায় সত্যতা আছে কি নেই'। শিশুরা রূপকথার পরীতে বিশ্বাস করে, কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে এ বিশ্বাস আর থাকে না। কারণ না দেখেও বিশ্বাস করা যায়, কিন্তু না বুঝে আস্থা রাখা অসম্ভব। তাই তো ভূতের গল্পের স্থলে এসেছে বিজ্ঞানের মজার মজার কাহিনী। ম্যাজিকও মানুষ বিশ্বাস করে, তবে তা ক্ষণিকের। উত্তর সন্তোষজনক হলে বিশ্বাস, আস্থা দুটিই দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়। এই যে জানার পথে বাধা, জিজ্ঞাসায় আঘাত, ভাবনায় অর্গল— এরই প্রতিফলন হচ্ছে, ছাত্র-ছাত্রীদের প্রকৃত জ্ঞান আহরণে মারাত্মক শৈথিল্য। জানার ক্ষুধা অতৃপ্ত থাকলে জ্ঞান পরিপূর্ণ হতে পারে না।
দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাবোর্ড থেকে পাঠ্যবই নির্ধারিত; পাঠ্যবইয়ের বাইরের কোন বিষয় নিয়ে প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয় না। সৃজনশীল প্রশ্নোত্তরের নিয়ম-নীতি প্রতিটি স্কুলে কম-বেশি শেখানো হয়। যেভাবেই হোক, প্রতিটি স্কুলেই সিলেবাস শেষ করা হয়ে থাকে। কোন কোন বছর সিলেবাসের প্রতিটি বিষয় স্কুল থেকে রিভাইসও দেয়া হয়, কোচিং করানো হয়। এতগুলো কাজ স্কুলে করার পরও প্রায় প্রতিজন ছাত্র-ছাত্রী স্কুলের শেষ ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে প্রাইভেট পড়তে দৌড়ায়। প্রাইভেটে কোন নতুন বিষয় পড়ানো হয় না। তাহলে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাইভেট পড়ার এত আগ্রহ কেন? তাহলে কি প্রশ্ন ও প্রশ্নোত্তর কোনটাই ক্লাসে পূর্ণতা পায় না বলে একই পড়া ভিন্ন শিক্ষকের নিকট থেকে প্রাইভেটের নামে ঝালাই করে নেয়া হয়?
ঘড়ির কাঁটা ডানদিকে ঘোরে কেন, বিভিন্ন কালার-সাবানের ফেনার রং শুধু সাদা কেন, আমাদের সব মোবাইলের নম্বর শূন্য দিয়ে শুরু কেন—একটি গণিত উৎসবে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের এই তিনটি প্রশ্ন উত্থাপনের বিষয়টি পত্রিকায় পড়েছিলাম। এছাড়াও গরু, মহিষ ইত্যাদি জবাইয়ের পর তাদের খণ্ডিত মাংসে স্পন্দন হয় কেন অথবা কেটে ফেলার পরও সাপ বা টিকটিকির লেজ নড়ে কেন, পূর্বদিক থেকে কত মাইল বেগে বিমান চালালে বিমানযাত্রীর নিকট সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা না হয়ে সর্বদা যাত্রারম্ভের সময়ই থেকে যাবে— সাধারণ এই প্রশ্নগুলোর মতো ছাত্র-ছাত্রীদের মনেও পাঠ্যক্রম নিয়ে অফুরন্ত প্রশ্নের উদয় হওয়ার কথা। শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের জানার এই কৌতূহল একটু প্রচেষ্টা নিলেই মেটাতে পারে।
জানার প্রবল আগ্রহ ও উৎসাহ নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠ্যক্রমবহির্ভূত বই পড়া অপরিহার্য; পাঠ্যপুস্তকের একই পড়া বারবার মুখস্থ করার অভ্যেস পরিত্যাগ করে আনন্দ ও জ্ঞানের উৎস সমৃদ্ধ বইকে সাথী করা স্বীয় স্বার্থে আবশ্যক। বুঝতে হবে, অনুসন্ধানী মানুষই প্রজ্ঞাবান হয়। জিজ্ঞাসাবিযুক্ত মানুষ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে প্রচলিত বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরে শক্ত হাতে। তবে শুধু পুস্তক পাঠই জ্ঞানের আধার নয়; কারণ পুস্তক শুধু জ্ঞান বিতরণ করে না, কতগুলো পুস্তক জ্ঞান লাভের প্রতিবন্ধকও। তাই পড়ার জন্য যথাযথ বইয়ের নির্বাচন অপরিহার্য। পুস্তক থেকে অর্জিত বিদ্যার সত্যাসত্য ঝালাইয়েও যুক্তি, তর্কের প্রয়োগ অনস্বীকার্য। যে কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে নির্বাচিত ও উপযোগী পড়ার কোন বিকল্প নেই।
পড়া-লিখা নকল করা যায়, জ্ঞান নকল করা যায় না। জ্ঞানীরা একদিকে যেমন অন্যের বক্তব্য যুক্তিসহকারে খণ্ডন করেন, ঠিক তেমনি যুক্তিপূর্ণ হলে অন্যের যুক্তি সহজভাবে গ্রহণও করেন। মানুষের জীবনের বড় ধর্ম হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে সত্যের অনুসন্ধান করা। তাই বলে জানার অহমিকায় দাম্ভিকতা প্রকাশেরও সুযোগ নেই। নিজের ভুলকে অবনতমস্তকে স্বীকার করে নেয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্য করা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।
আমাদের সকলের ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ কঠিন হলেও প্রতিটি বিষয়ে যুক্তিসহকারে বুঝার ও অনুধাবনের সুযোগ থাকা বাঞ্ছনীয়। জিজ্ঞাসা এবং অনুসন্ধিৎসার তাড়না না থাকলে নতুন সৃষ্টির উন্মাদনাও থাকে না। কোন বিষয়ে পারদর্শিতা লাভে হাত-কলমে শিক্ষার আবশ্যকতাও অনস্বীকার্য। তাই অজানাকে জানার নিমিত্তে ভ্রমণের কোন বিকল্প নেই। অন্যদিকে জ্ঞানী ও অভিজ্ঞদের কথা শুনার ব্যবস্থা করা দরকার। এঁদের শুধু উপস্থিতিই ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে জ্ঞান লাভের অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে। 'জননী' উপন্যাসের লেখক শওকত ওসমান ঢাকা কলেজের শিক্ষক থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্রদের অভিযোগ ছিলো যে, তিনি পড়াতে গিয়ে পাঠ্যক্রমে কখনো আবদ্ধ থাকেন না। এই অভিযোগ অধ্যক্ষের কানে গেলে তিনি ছাত্রদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট উচ্চারণে উল্লেখ করেন যে, শওকত ওসমান সাহেবেরা আছেন বলেই ঢাকা কলেজ প্রসিদ্ধ। আসলে তাঁর পড়ানোর উপযোগী মানস-গঠনে ছাত্রদের মনোযোগী হওয়ার দরকার ছিলো।
বিদ্যার প্রাচুর্যে ঐশ্বর্যবান হিন্দু কলেজের শিক্ষক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর নেতৃত্বে ঊনিশ শতকে বাংলার তরুণ সমাজের মধ্যে আত্মজিজ্ঞাসার তাড়নায় নবযুগের সৃষ্টি হয়েছিলো। তাঁর অনুপ্রেরণায় বাঙালি ছাত্ররা পড়ালিখায় যুক্তি, বিচার-বিশ্লেষণ, অনুসন্ধিৎসু ও জিজ্ঞাসু হয়ে উঠেছিলো। তাঁকে বাংলার 'সক্রেটিস' বলা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে ডিরোজিও শিক্ষক হলেও শিক্ষকের ছাঁচ ও নোটের বোঝার বাহন ছিলেন না। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন, রাধানাথ সিকদার, প্যারিচাঁদ মিত্র, কালী প্রসাদ ঘোষ, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রসিককৃষ্ণ মল্লিক। এই ছাত্ররা প্রত্যেক বিষয়ে প্রশ্ন ও তর্ক করে নবদিগন্তের উন্মোচন করেছিলো।
কিছু ছাত্র-ছাত্রী ও কিছু শিক্ষক জানেন, পাস করার জন্য সব প্রশ্নের উত্তর জানার প্রয়োজন নেই। স্কুলের মান নিরূপিত হয় পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে; ছাত্র-ছাত্রীদের জানার ব্যাপকতা বা জ্ঞানের মাপকাঠিতে নয়। চাকরির জন্য ডিগ্রি দরকার, আর কাজের জন্য জ্ঞান। কিন্তু সব চাকরির কাজে জ্ঞানের চর্চার প্রয়োজন হয় না। জ্ঞানের কোন ডিগ্রি না থাকায় জ্ঞানী লোকেরা প্রায়ই অবমূল্যায়িত থাকেন।
প্রতিজন ছাত্র-ছাত্রীর ভিত তৈরি হয় স্কুলে। যুক্তিতর্ক ও বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া কোন কিছুর গ্রহণ সৃজনশীল প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে না। যুক্তির দ্বারা অনুমোদিত হলেই তা গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত। শিক্ষকদের প্রধান কাজ হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের মনে তীব্র জ্ঞানানুসন্ধিৎসা জাগিয়ে তোলা। আগের দিনে পণ্ডিত ব্যক্তিরা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেব গ্রহণ করে গর্ব করতেন। এখন স্কুল শিক্ষকদের গর্ব করার সাহস এবং মানসিকতা কোনটাই নেই। কারণ একজন স্কুল শিক্ষকদের বেতন কাঠামো একজন করণিকের চেয়ে বেশি বলে মনে হয় না। তাই বাঁচার জন্য তাঁরা অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো ভিন্ন একটি কাজে জড়িত হন; প্রাইভেট পড়ানোর অনৈতিক কাজে অধিক মনোনিবেশ করতে বাধ্য হন। শুধু বেতনে জীবনধারণ মানবেতর বিধায় জ্ঞানীরা সাধারণত এই পেশাকে সাদরে আজকাল গ্রহণ করতে দ্বিধান্বিত। তাই অনেক শিক্ষকের বিদ্যাশিক্ষার ডিগ্রি থাকলেও জ্ঞানের স্বীকৃতি নেই। পাঠশালাপ্রীতি বা ছাত্রপ্রীতির মহান ব্রতের সাধনায়ও ভরপেট খাদ্য দরকার।
জ্ঞানসাধনা ও জ্ঞান বিতরণে শিক্ষকদের অর্থ সংশ্লেষের আলোচনা উহ্য রেখে বলা সমীচীন হবে যে, প্রশ্ন, প্রশ্নোত্তরে শানিত যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সত্যের লালনের মধ্য দিয়েই ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয় জাগিয়ে তোলা সম্ভব। ছাত্র-ছাত্রীদের চেয়ে শিক্ষককে পড়তে হবে অনেক বেশি; একজন শিক্ষক হবেন, জ্ঞানের পূজারী, জ্ঞান-সাধক ও জ্ঞান বিতরণকারী। একজন শিক্ষক পড়াবেন, জানবেন, বুঝবেন এবং বুঝাবেন।