শিল্পকলা একাডেমির সামনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দশজন বাঙালি মনীষীর মুখ এঁকেছে—নজরুল, লালন, জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, জহির রায়হান, শাহ আবদুল করিম, হুমায়ূন ফরীদি, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর ও সত্যজিৎ রায়। সেই দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপনের অভিযোগে পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে। তাদের মধ্যে একজন রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের সভাপতি আ ন ম আয়াস। ৫ আগস্টের পর থেকে তার নেতৃত্বে প্রকাশ্যে মারধর, পুলিশের সামনে অন্যদের হেনস্তা করার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশ্রয় পেতে পেতে তিনি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠেছেন, এখন সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সিদ্ধান্তকেও চ্যালেঞ্জ করছেন। ছবি পছন্দ না হলে প্রতিবাদ সভা করা যেত, নিজের পছন্দের ছবি পাশে আঁকা যেত, কিন্তু অন্যের আঁকা ছবির মুখে কালি দেওয়ার অধিকার তাদের ছিল না।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি এই আক্রোশ কেন? প্রচলিত অভিযোগগুলো পুরনো—তিনি হিন্দু, তিনি ভারতের লোক, তিনি প্রজা নিপীড়ক জমিদার, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছেন, তাঁর গান কেন জাতীয় সংগীত হবে, তাঁর লেখায় মুসলমান প্রসঙ্গ কম কেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। খ্যাতি বাড়লে অভিযোগও বাড়ে। কিন্তু অভিযোগের মীমাংসা হয় যুক্তির লড়াইয়ে, কালির আক্রোশে নয়। বিদ্বান বলে খ্যাত কিছু ব্যক্তিও তাঁর বিরুদ্ধে আবোলতাবোল বকে যাচ্ছেন। কারণ আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সার্টিফিকেট আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। জ্ঞানতাপস আরজ আলী মাতুব্বর বলেছিলেন, জ্ঞানের সার্টিফিকেট থাকে না। তাই একজন রিকশাচালক যখন নিজ উদ্যোগে সেই কালি মুছে দেন, তখন বোঝা যায়—প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়, জ্ঞান এবং বোধই আসল। সার্টিফিকেটধারী পণ্ডিতদেরও রিকশাচালকের কাছে শেখার আছে। কিন্তু শিখবে না, শিখলে তাদের শেখা ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যাবে।
অনেকে জানেন না, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু অর্থে হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম। ব্রাহ্ম মানে ব্রাহ্মণ নয়, একেশ্বরবাদী। আর হিন্দু হলেই বা অপরাধ কী? হিন্দুধর্ম পৃথিবীর প্রাচীন ধর্মগুলোর একটি। প্রকৃতপক্ষে আসল বিরোধ ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক। ১৯৪৭ সাল থেকে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক কখনো স্বাভাবিক হয়নি। একাত্তরে ভারতের সহযোগিতা যাদের পরাজয় নিশ্চিত করেছে, তারা সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এখনো ভারতবিদ্বেষ উসকে দেয়। রবীন্দ্রনাথকে সামনে পেয়ে সেই বিদ্বেষ মেটানো হয়। শুধু ভারত নয়, পৃথিবীর সব প্রভাবশালী প্রতিবেশীই প্রভাব বিস্তার করে—আমেরিকা যেমন কিউবাকে ৬৬ বছর ধরে অবরোধ করে রেখেছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক ধরে নিয়ে গেছে, রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করেছে, চীন কাশ্মীরের কিয়দংশ ও তিব্বত দখল করে রেখেছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান ভারতেরও আঞ্চলিক প্রভাব থাকা স্বাভাবিক। যদি থাকে তার প্রতিবাদ রাজনৈতিকভাবে করতে হবে, কবির ছবিতে কালি দিয়ে নয়।
জমিদার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কেমন ছিলেন, তার রেকর্ড আছে। শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসরের প্রজা নিপীড়নের কোনো নজির কেউ দেখাতে পারেনি। বরং তিনি জমিদারির প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, ‘সাহাদের হাত থেকে শেখদের বাঁচাতে হবে’। শিলাইদহে মহর্ষি দাতব্য চিকিৎসালয়, পতিসরে বড় হাসপাতাল, ১৯১০ সালে ট্রাক্টর, পানির পাম্প ও সার নিয়ে আদর্শ কৃষিক্ষেত্র, তাঁতিদের শান্তিনিকেতনে পাঠিয়ে বয়নশিল্প শেখানো—এসব তাঁরই উদ্যোগ। ১৯০৫ সালে নওগাঁর পতিসরে তিনি ভারতবর্ষের প্রথম জামানতবিহীন কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করে ব্যাংকের মূলধন জোগাড় করেছিলেন। নোবেলের এক লাখ ১৬ হাজার টাকার মধ্যে ৭৫ হাজার টাকা সেই ব্যাংককে দিয়েছিলেন, যা আর ফেরত পাননি। কারণ কৃষক ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করেনি। তারপরও ব্যাংকটি কুড়ি বছর চলেছিল।
লালনকে আমরা চিনি অনেকটাই রবীন্দ্রনাথ পরিবারের কারণে। লালনের যে ছবিটি আমরা দেখি, তা কুষ্টিয়ার শিলাইদহে নৌকায় বসে এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লালনের গানের প্রথম সংগ্রাহক ও সংকলকও রবীন্দ্রনাথ। ১৯০৫ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লালনের কুড়িটি গান তিনিই পরিমার্জনা করে প্রকাশ করেন। শুধু লালন নন, লালনের ভাবশিষ্য ডাকপিয়ন গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানটি দিয়েও তিনি ‘প্রবাসী’র হারামণি বিভাগ শুরু করেন। এই সূত্রেই কলকাতার বিদগ্ধ সমাজে লালন ও গগন পরিচিত হন। আজ যারা লালন ও রবীন্দ্রনাথকে মুখোমুখি দাঁড় করান, তাদের আরও বেশি ইতিহাসচর্চা করা দরকার।
দুটি বড় মিথ—জাতীয় সংগীত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ‘আমার সোনার বাংলা’ তিনি লিখেছিলেন ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বেদনা থেকে, এ কথা সত্য। বাংলা যদি ভাগ না হতো তাহলে শেরেবাংলার লাহোর প্রস্তাব মোতাবেক গোটা বাংলা, ত্রিপুরা ও আসাম নিয়ে ১৯৪৭ সনেই আলাদা আরেকটি মুসলিম দেশ হতে পারত। তাই দেশ ভাগ হলে ব্যথা লাগবেই। আমাদের জাতীয় সংগীতের সুর তিনি নিয়েছিলেন গগন হরকরার সুর থেকে, তবে লুকিয়ে নয়, নিজেই লিখে গেছেন—‘ওই বাউলের গানের সুরের মাধুর্যে বিমোহিত হয়ে আমি বাংলাদেশকে মাতৃরূপে গণ্য করে এই গান লিখেছি’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধিতার অভিযোগটি আরও বেশি দুর্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করার লক্ষ্যে কলকাতার গড়ের মাঠে আয়োজিত সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্ব করার কথা বলা হয়, কিন্তু ড. আকবর আলী খানসহ গবেষকরা দেখিয়েছেন ওই সময়ে তিনি কুষ্টিয়ায় ছিলেন। এ ছাড়াও কোনো সংবাদপত্রে রবীন্দ্রনাথের সভায় উপস্থিতির খবর নেই, অথচ তিনি তখন এত বিখ্যাত যে তাঁর সভায় যোগদান পত্রিকার প্রধান খবর হওয়ার কথা। বিরোধিতা করলে প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সংবর্ধনা দিতে ডাকত না, তিনিও আসতেন না, অথবা ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টর অব লিটারেচার উপাধিও প্রদান করত না।
সবচেয়ে হতাশাজনক ছিল কালি লেপনকারী নারীর বক্তব্য। তিনি বলছিলেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছেন, ভারত করেছে ‘অগ্রাসন’। অথচ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু ১৯৪১ সালে, বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে, মৃত মানুষ বিরোধিতা করে কীভাবে? তিনি ‘আগ্রাসন’ শব্দটিও উচ্চারণ করছিলেন ‘অগ্রাসন’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলছিলেন ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি’। পাকিস্তান আমলেও তাঁকে বেতার ও পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু পারেনি। কারণ তাঁর অবস্থান ইট-পাথরে গাঁথা নয়, মানুষের মনোজগতে প্রোথিত। দেয়ালের ছবিতে কালি লাগে, কিন্তু মনের ভেতরের রবিকে কালি দিয়ে ঢাকা যায় না।
