জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকেই সবচেয়ে আলোচিত খবরটি এলো মঞ্চের বাইরে থেকে। নিউইয়র্কের গ্র্যাণ্ড হায়াত হোটেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১১টি বোয়িং কেনার সম্পূরক চুক্তি করল। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখলেন, বাংলাদেশ ও তুরস্ক মিলে ১১১টি বোয়িং কেনার ঘোষণা বোয়িং-এর জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক দিন’। এই বোয়িং-কেনাই বলে দেয়, জাতিসংঘে ভাষণের চেয়ে করিডোরের বাণিজ্যিক দর-কষাকষি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। তবে বাংলায় ভাষণ এটা প্রথম নয়। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়ে ভাষাটিকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ, লুটপাট ও টাকা পাচারে দেশ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে এবং ২০২৪ সালে দেশ মুক্ত হয়েছে। দেশ মেরামতে তার সরকার তিন ‘আর’ কৌশল নিয়েছে—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন। পিতা জিয়াউর রহমান ১৯৮০ ও মাতা খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে একই মঞ্চে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাই এটি তার পরিবারের তৃতীয় ভাষণ। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন, যা প্রাসঙ্গিক। বক্তব্যের আবেগ ও প্রতীকী গুরুত্ব আছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে পনের বছরের শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার নিয়ে ভাষণে উল্লিখিত অভিযোগ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানরা গুরুত্ব সহকারে শুনেছেন কি না জানা যায়নি। ফখরুদ্দিন সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও কথিত আয়নাঘরে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন। তাই আয়নাঘরের সংস্কৃতি যে বহু পুরনো, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি থানাও এক একটি আয়নাঘর। রিমাণ্ডের নামে নির্যাতন করে কথা আদায়ের যে প্রক্রিয়া চলে, তা নিয়ে উচ্চ আদালতও একাধিকবার অভিমত প্রকাশ করেছে এবং সরকারকে কিছু পরামর্শও দিয়েছে, যেমন—স্বচ্ছ কাঁচে ঘেরা রুমে জিজ্ঞাসাবাদ করা, রিমাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চিকিৎসক ও আইনজীবীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা ইত্যাদি। কিন্তু কোনো সরকারই তা বাস্তবায়ন করেনি। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান যদি রাজনৈতিক কারণে গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা চিরতরে বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা নেন এবং হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করেন, তাহলে তা হবে ঐতিহাসিক। জনগণ সেটাই প্রত্যাশা করে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ক্ষতবিক্ষত হওয়ার বক্তব্যটি তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে মেলে না। বিএনপি সরকারের সর্বশেষ ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাজেট ছিল মাত্র ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। ফখরুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮-০৯ সালে তা করে ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিএনপি সরকারই সেই বাজেট করেছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। দেশের অর্থনীতি ক্ষতবিক্ষত হলে ১ লাখ কোটি টাকার বাজেট ১৭ বছর পর ৯ লাখ কোটি টাকায় গেল কীভাবে? এই শক্ত ভিত কি ড. ইউনূসের ১৮ মাস এবং বিএনপির ৭ মাসে হয়েছে? হয়নি। বিএনপির ২০০৬-০৭ সালের জিডিপি ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে আওয়ামী লীগের সাড়ে পনের বছরের শেষ প্রান্তে ২০২৩-২৪ সালে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়, মাথাপিছু আয় ৬১০ ডলার থেকে ২ হাজার ৭৩৮ ডলারে যায়। এই অগ্রগতির বাংলাদেশকে জাতিসংঘ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া উন্নয়নের মডেল হিসেবে স্বীকার করেছে। তাই উন্নয়ন হয়নি, শুধু ক্ষতবিক্ষত হয়েছে—এই বক্তব্য বাস্তবানুগ নয়। এমনকি ড. ইউনূসের শ্বেতপত্রেও স্বীকার করা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সব ক্রাইটেরিয়া পূরণ করেছে।
ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার নিয়েও প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রশ্নে সরকারের দ্বিচারিতা পরিহার জরুরি। বাংলাদেশে দুর্নীতি কমে না একটি কারণে—দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে কোনো সরকার দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেনি। বিএনপির আমলেই দেশ টানা পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, যা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে উঠে এসেছে। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিচারের সঙ্গে সঙ্গে মোহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপি আমলের দুর্নীতিরও বিচার হওয়া জরুরি। এমন নিরপেক্ষ ও নির্মোহ পদক্ষেপ নেওয়া হলে ভবিষ্যতে কেউ দুর্নীতি ও অর্থ পাচার করতে দ্বিতীয়বার চিন্তা করবে। তাছাড়া জনগণ দল এবং দলের মার্কায় ভোট দেয়, আর রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতিবাজকে মনোনয়ন দেয়, তাই দুর্নীতি কমে না, বরং বাড়ে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ কম দেওয়া হয়নি। কিন্তু ওই সকল ভাষণে বাংলাদেশের দৃশ্যমান কোনো উপকার হয়েছে বলে মনে হয় না। অধিবেশনের অধিকাংশ আসন শূন্য থাকে। গৎবাঁধা বক্তব্য শোনার চেয়ে সাইডলাইনে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের গুরুত্ব অনেক বেশি। সাধারণ পরিষদে গৃহীত কোনো সিদ্ধান্ত মানাও কোনো সদস্য দেশের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তাই অনেক সমালোচক এই অধিবেশনকে জাতিসংঘ নামক বিনোদন ক্লাবে সরকারপ্রধানদের বনভোজন বা বিশ্ব নেতাদের বার্ষিক মহামিলন ও কূটনৈতিক মহোৎসব হিসেবে অভিহিত করেন। এবারেও সেই বাস্তবতা দেখা গেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ৫ সেপ্টেম্বর সিলেটে বলেছিলেন, জাতিসংঘের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা আছে। পরে ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে তিনিই জানান, এবার আলাদা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সুযোগ নেই। দুই হাত দূরে থেকেও ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক না হওয়াটা দুর্ভাগ্যের। তবে বৈঠক একেবারেই হয়নি, তা কিন্তু নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কুয়েতের যুবরাজ, ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিরাট বহর সাথে না নেওয়ার জন্য তাকে প্রশংসা করতে হয়, তারপরও এতজন নেওয়ার দরকার ছিল বলে মনে হয় না।
শেষ বিচারে ভাষণটি ছিল রাজনৈতিক ঘোষণা, অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র নয়। ফ্যাসিবাদের আখ্যান এক অংশকে উদ্বুদ্ধ করবে, কিন্তু অর্থনীতির ভিত অস্বীকার করলে বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে। তাই প্রতিহিংসা নয়, ভারসাম্য দরকার। সব আমলের গুম-খুন-দুর্নীতির বিচার হোক, আয়নাঘর-রিমাণ্ড বন্ধ হোক, অর্থ পাচার হ্রাস পাক, দুদক স্বাধীন হোক। না হলে ভাষণ কাগজেই থাকবে, মাটিতে প্রতিধ্বনি হবে না।
