ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলোসফির চাকুরিচ্যুত শিক্ষক আসিফ মাহতাব ডিজিটাল দুনিয়ায় হট্টগোল লাগিয়ে দিয়েছেন, তার পক্ষ নিয়ে সংঘবদ্ধ প্রতিবাদী গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে, তারা সবাই ‘ব্র্যাক’ বয়কটের ডাক দিয়েছে। ট্রান্সজেন্ডারের গল্প সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করে ছাত্র-ছাত্রীদের ‘মগজধোলাই’ করা হচ্ছে মর্মে অভিযোগ তুলে প্রতিবাদস্বরূপ পাঠ্যবই থেকে গল্পের পাতা ছিঁড়ে সেমিনারে উপস্থিত সকলকে শুধু তাক লাগিয়ে দেননি, একই কাজ করতে অন্যদেরও প্ররোচিত করেছেন আসিফ মাহতাব। এতে ক্ষেপে গিয়ে ফেসবুকে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীনময় রোয়াজা লিখেছেন, ‘যে পাঠ্যবইয়ে অজান্তে পা লাগলে আমরা সালাম করি সেই পাঠ্যবইয়ের পাতা ছিঁড়া জঘন্য অপরাধ’। কিন্তু পাতা ছিঁড়া অপরাধ বলে মনে হয় না; কারণ আসিফ মাহতাব তার নিজের কেনা বই থেকে পাতা ছিঁড়েছেন। আমেরিকার জাতীয় পতাকা ছিঁড়ে এক নাগরিক বিচারের মুখোমুখি হলেও তার শাস্তি হয়নি; কারণ পতাকাটি তার নিজের ছিল। তাই বলে আসিফ মাহতাবের দ্বিমত পোষণ করার সম্ভাব্য সুশীল আচরণকে অভব্য ও উন্নাসিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া মানানসই হয়নি।
সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইতে ‘সম্প্রদায়’ নামে একটি অধ্যায়ে ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামীদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছিল। আলেমদের পরামর্শে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি বাদ দিয়ে চলতি বছর শুধু ‘হিজড়া’ উল্লেখ করা হয়েছে। সংশোধন হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবাদ থেমে নেই, প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী ট্রান্সজেন্ডার শব্দটি বাদ দেওয়া হলেও তাদের কথাগুলো বাদ দেওয়া হয়নি। ডারউইনের বিবর্তনবাদ নিয়েও কিছুদিন শোরগোল হয়েছে; অথচ ব্রিটিশ কারিকুলামে বাংলাদেশের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী ধর্মবিরোধী বিবর্তনবাদ পড়ছে, কিন্তু আসিফ মাহতাব বা তার সমর্থক গোষ্ঠী ব্রিটিশ কাউন্সিলে গিয়ে বায়োলজির বিবর্তনবাদ নিয়ে লেখা পাতাগুলো ছিঁড়েনি, ব্রিটিশ কাউন্সিলকে বয়কটের ডাকও দেয়নি।
উইকিপিডিয়া অনুযায়ী ট্রান্সজেন্ডারড বা রূপান্তরিত লিঙ্গ হচ্ছে তারা যাদের মানসিক লিঙ্গবোধ তাদের জন্মগত লিঙ্গ চিহ্নের বিপরীত। অর্থাৎ কেউ কেউ ছেলের শরীর নিয়ে জন্মে নিলেও মনে মনে নারীসত্তায় অবস্থান করেন এবং একসময় তাদের শরীরটাকেও নারীর দিকেই নিয়ে যায়। একইভাবে নারীর শরীর নিয়ে জন্ম নেওয়ার পর কেউ কেউ মনে মনে পুরুষের সত্তায় বেঁচে থাকতে নিজেকে পরিবর্তন করে পুরুষ হিসেবে। আবার অন্য মতে পুরুষ লিঙ্গ নিয়ে জন্ম নেওয়া বাচ্চার আচরণ, স্বভাব, দৈহিক গঠন, কণ্ঠস্বর মেয়েদের মত হলে সেও ট্রান্সজেন্ডার; ঠিক একইভাবে মেয়ের লিঙ্গ নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুর বাকি সব পুরুষদের মত হলে সেও ট্রান্সজেন্ডার। তবে যারা স্পষ্টভাবে নারীসুলভ বা পুরুষসুলভ নয় তারাও রূপান্তরিত লিঙ্গের অন্তর্ভুক্ত। উইকিপিডিয়ায় আরও উল্লেখ করেছে যে, রূপান্তরিত লিঙ্গ পরিভাষাটি দ্বারা এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যে জন্মগতভাবে এমন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যা পুরুষ বা নারীর দৈহিক যৌন বৈশিষ্ট্য হতে আলাদা। কারো কারো লিঙ্গনির্ধারক অঙ্গও থাকে না।
প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য হচ্ছে, পবিত্র কুরআন মোতাবেক আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সুন্দরতম গঠনে, তাই আল্লাহ প্রদত্ত সুন্দর অবয়বে কোনো ধরনের পরিবর্তন করা যাবে না। তাহলে প্রশ্ন জাগে, যারা খোঁড়া হয়ে জন্ম নিয়েছে বা যারা জন্মান্ধ তাদেরও কি চিকিৎসা করে কোন পরিবর্তন আনা যাবে না? ধর্মে বারণ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সময়ে আমরা অনেক কিছুই প্রতিবাদ না করেই মেনে নিচ্ছি। এখন অহরহ কৃত্রিম হার্ট, কৃত্রিম কিডনি, কৃত্রিম হাত-পা মানুষের দেহে সংযোজন করা হচ্ছে, অন্ধদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, জোড়বদ্ধ শিশুকে অস্ত্রোপচার করে আলাদা করা হচ্ছে, আঁকাবাঁকা দাঁতের সারি সোজা ও মসৃণ করা হচ্ছে, কৃত্রিম দাঁত বসানো হচ্ছে, প্লাস্টিক সার্জারি করে চেহারাকে লাবণ্যময় করে তোলা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় নাস্তিক আহমদ শরীফের চোখ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এক অন্ধ হাফেজের শরীরে, তিনি এখন শুধু মুখস্থ নয়, দেখে দেখেও পবিত্র কোরআন পড়তে পারছেন। অসংখ্য লোক দেহদান করে যাচ্ছেন, মৃতদেহ থেকে বিভিন্ন অঙ্গ নিয়ে অপূর্ণ মানুষকে পূর্ণাঙ্গ করা হচ্ছে, মৃতদেহ কাটাছেঁড়া করে চিকিৎসাশাস্ত্রের
অধ্যয়ন হচ্ছে, ওই সকল মৃতদেহের কবরও হচ্ছে না। কিন্তু এই সকল ক্ষেত্রে প্রতিবাদ হয় না, বরং আপোষমূলক ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মবিরোধী বিষয়গুলোকে জায়েজ করার চেষ্টা করা হয়।
চিকিৎসাশাস্ত্রের বক্তব্য মোতাবেক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ছেলে থেকে মেয়ে বা মেয়ে থেকে ছেলে হওয়ার প্রক্রিয়া সত্য হলেও তা শখের বশে নয়। শখের বশে কেউ এত জটিল, কষ্টদায়ক, দীর্ঘমেয়াদী ও ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার করার কথা নয়, বরং তারা করতে বাধ্য হয়। শিশু বয়সে এদের মানসিক অবস্থা সুস্থির মনে হলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে বিপরীত লিঙ্গের হরমোনের আধিক্য তাদের মানসিকভাবে অস্থির করে তোলে, তারা নিজেদের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের অস্তিত্ব অনুভব করতে শুরু করে। বিপরীত লিঙ্গের এই উপলব্ধি তাদের সুস্থির হতে দেয় না, এটাকে বলা হয় জেন্ডার ডিসফোরিয়া। আক্রান্ত ব্যক্তি ছাড়া আর কারো পক্ষে তা উপলব্ধি করাও কঠিন। হরমোনের ভারসাম্যহীনতা জেন্ডার ডিসফোরিয়ার বিকাশ ঘটায় এবং
সুস্থ লোকের সঙ্গে জেন্ডার ডিসফোরিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের গঠন ও এর কার্যকারিতায় পার্থক্য রয়েছে। তারা এই অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি চায়, নিষ্কৃতি না পেলে হতাশায় আক্রান্ত হয় এবং আত্মহত্যার কথা ভাবতে থাকে।
জেন্ডার ডিসফোরিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন উপসর্গ ছাড়াও বিপরীত লিঙ্গে রূপান্তর হওয়ার তীব্র ইচ্ছা অনুভব করে থাকে। এমন মানসিক অবস্থায় তারা বেপরোয়া হয়ে যায়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেন্ডার মিসম্যাচড থেকে পরিত্রাণ পেতে তারা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করায়। অস্ত্রোপচারে সফলতার কোন গ্যারান্টি নেই, মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে। বিপরীত লিঙ্গের হরমোনঘটিত পরিবর্তন না ঘটলে শুধু সার্জারির মাধ্যমে ছেলেকে মেয়ে বা মেয়েকে ছেলে করা সম্ভব হতো বলে মনে হয় না। মোছাম্মত খাদিজা খাতুন ২০১৮ সনের মার্চের ৩০ তারিখে ঘুমাতে গেলেন, আর সকালে ঘুম থেকে ওঠে দেখলেন পুরুষ হয়ে গেছেন, এখন মাওলানা সাহুল সিদ্দিকী, এই ট্রান্সজেন্ডারড হুজুরের ওয়াজ সবাই শুনছেন, কোন প্রতিবাদ নেই। বগুড়ার টিএমএসএস-এর হোসনে আরা জন্মগতভাবে ছিলেন আব্দুস সামাদ। ২০০৫ সনে আমি বাংলাদেশ ব্যাংক বগুড়া অফিসে মহাব্যবস্থাপক থাকাকালীন তার সাথে আমার অফিস কক্ষে তার রূপান্তর নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলাপ করেছি। সরকারের উচ্চপদেও এমন ব্যক্তি আছেন, ইরানে বাংলাদেশি দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ওয়ালিদ ইসলামও সার্জারির মাধ্যমে তার ত্রুটি সারাতে চেয়েছিলেন, অস্ত্রোপচার সফল হয়নি।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ মাহতাব রূপান্তরকামীদের সমকামী বলে অভিহিত করেছেন, ট্রান্সজেন্ডার আর সমকামিতাকে এক করে দেখেছেন।
রূপান্তরকামীরা সমকামী এই তথ্য তিনি কোথা থেকে আবিষ্কার করলেন তার কোন ব্যাখ্যা দেননি। সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকের গল্পে সমকামিতার গন্ধও নেই। রূপান্তরকামীরা অস্ত্রোপচারের সাহায্য নিজেদের সেক্সুয়াল আইডেন্টিটি সুনির্দিষ্ট করে নেন; অর্থাৎ যারা ট্রান্সজেন্ডারড তারা হয় পুরুষ, নতুবা নারী। তাহলে এদের মধ্যে মাহতাব সাহেব সমকামিতা আবিষ্কার করলেন কীভাবে? তাকে চাকরিচ্যুত করার পর সমকামিতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে ব্র্যাকের সবকিছু বয়কট করার ঘোষণা এসেছে প্রতিবাদী কণ্ঠ থেকে, তারা জোর করে রূপান্তরকামীদের মধ্যে সমকামিতা খোঁজার চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা কি তাদের আশেপাশে সুস্থ সাধারণ মানুষের মধ্যে সমকামিতা খুঁজে পায় না? আমাদের দেশের মাদ্রাসাগুলোতে অহর্নিশ যৌন নিপীড়ন হচ্ছে, মাদ্রাসার কিছু শিক্ষকের বলাৎকারের নৃশংসতায় অনেক ভিকটিম শিশু মারা গেছে, ধর্ষক শিক্ষক শয়তানের প্ররোচনাকে দায়ী করে তার চরিত্রের বিশুদ্ধতার সাফাই গাইছে, বলাৎকারের অপকর্ম গোপন রাখার জন্য ভিকটিম শিশুকে ধর্মগ্রন্থে হাত রেখে শপথ করাচ্ছে। যারা ব্র্যাকের বিরুদ্ধে এত সোচ্চার তাদের কখনো মাদ্রাসার বলাৎকারের বিরুদ্ধে উচ্চকিত হতে শোনা যায়নি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় 'লিঙ্গসমতা' এবং 'নারীর ক্ষমতা ও সমতা' প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে বিধায় প্রতিষ্ঠানটির মূল এজেন্ডাবিরোধী আসিফ মাহতাবকে চাকরিচ্যুত করাই স্বাভাবিক।
পাকিস্তান হিজড়াদের স্বীকৃতি দিয়েছে ২০০৯ সনে, আর বাংলাদেশ দিয়েছে ২০১৩ সনে। প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, ট্রান্সজেন্ডারড ব্যতীত শুধু হিজড়াদের নিয়ে লিখলে তাদের কোন আপত্তি থাকত না। কিন্তু হিজড়ারা কি ইসলাম ধর্মে স্বীকৃত? না, ইসলামে তৃতীয় লিঙ্গের কোন স্বীকৃতি নেই। হাদিসে হিজড়াদের লিঙ্গের প্রাধান্যের ভিত্তিতে নারী বা পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে—পুরুষ হলে পুরুষের, নারী হলে নারীর ইসলামিক বিধান হিজড়াদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। হাদিসে হিজড়াদের নির্বাসনে পাঠাতে বলা হয়েছে। হাতে-পায়ে রং মাখানো নামাজী এক হিজড়াকে নবী করিম (স:) নির্বাসনে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। নামাজী ছিল বলে তাকে হত্যা করা হয়নি। তাই তৃতীয় লিঙ্গের পরিচয়ে হিজড়ারা ইসলাম ধর্ম মোতাবেক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না।
বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে ছাত্র-ছাত্রীদের পরিচয় করে দেওয়ার লক্ষ্যে শরীফ-শরীফার গল্পটি পাঠ্যবইতে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সংশোধন করতে গিয়ে গল্পটিতে হিজড়া এবং ট্রান্সজেন্ডারকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। এই গল্পের যেটুকু অসঙ্গতি তা পুনরায় সংশোধন করা হবে। প্রতিবাদকারীরা ট্রান্সজেন্ডার সম্পর্কে জানাকে ধর্মবিরোধী আখ্যায়িত করেছে। প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসার অভাবনীয় অগ্রগতি সস্তা রাজনীতির কবলে পড়ে হেনস্তা হচ্ছে। এছাড়াও যে দেশের লোকজন ওভারব্রিজ আর জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হতে শেখে না, থুথু ফেলে যত্রতত্র, ঘুষ-দুর্নীতির অর্থ মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করে, কুকুর পিটিয়ে বা গায়ে গরম পানি ঢেলে আনন্দ পায়, গুজবে কান দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারে, মেয়ে শিশু মসজিদে ইমামের পেছনে দাঁড়ানোর কারণে সৃষ্ট বাকবিতণ্ডা থেকে মানুষ হত্যা হয়—সেই দেশে ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনঘনিষ্ঠ তৃতীয় লিঙ্গ, হিজড়া, ট্রান্সজেন্ডার ইত্যাদি জটিল বিষয় পড়ানো অর্থহীন। এই সকল মানবিক ও সংবেদনশীল ধারণা পোষণ ও লালন করার মত মস্তিষ্ক আমাদের এখনও তৈরিই হয়নি।
