বিভিন্ন গণমাধ্যমে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পদের হিসাবের খবর শুনে জনগণ হতবাক। কয়েকজন প্রার্থীর সম্পদের পরিমাণ মাত্র দশ-পনের বছরে বেড়েছে কয়েক হাজার গুণ। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, দুয়েকজন প্রার্থীর স্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে প্রার্থীর চেয়ে বেশি। নির্বাচনে যারা প্রার্থী হন তাদের আয়-ব্যয় ও সম্পদের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। ২০০৮ সনে আদালত বাধ্য না করলে প্রার্থীরা কখনো স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এই হলফনামা দিতেন না। এই হলফনামায় থাকে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, আয়ের উৎস, মামলার বিবরণী, প্রার্থীর নিজের ও তার নির্ভরশীলদের আয়-ব্যয়, সম্পদ এবং দায়-দেনা। এই হলফনামা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে সবার জন্য, বিশেষ করে ভোটারদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, যাতে তারা প্রার্থীর কর্মকাণ্ড ও চরিত্র বিশ্লেষণপূর্বক ভোট দিতে পারে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১,৮৯৬ জন প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বা টিআইবি একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে, প্রতিবেদন অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে ৫৭১ জন প্রার্থী কোটিপতি এবং ১৮ জন শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক। ১৬৪ জন বছরে এক কোটি টাকা করে আয় করেন। সর্বোচ্চ ১,৩৪৫ কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন একজন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর সম্পদ-মূল্য ৪২১.১৬ কোটি টাকা। সকল প্রার্থী, তাদের স্বামী বা স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের নামে থাকা মোট অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৬৬,৭৫১ কোটি টাকা; তবে তাদের ১৬ হাজার কোটি টাকার ঋণও আছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে ৫৭.৩৪ শতাংশ ব্যবসায়ী, অথচ রাজনীতিবিদ প্রার্থী মাত্র ২.৮৬ শতাংশ।

হলফনামার তথ্যের সাথে প্রার্থীদের প্রকৃত সম্পদের মিল নেই মর্মে বিশ্লেষকদের অভিযোগ সত্য নাও হতে পারে। ৯০ বিঘা জমির দাম ২ হাজার টাকা, ডিওএইচএসে একটি ফ্ল্যাটের দাম ১ লাখ ৩ হাজার টাকা, পাঁচ কাঠা প্লটের দাম ৪০০ টাকা, ১৪৮ ভরি স্বর্ণের দাম ৪০ হাজার টাকা—এই তথ্যগুলো বিভ্রান্তিকর মনে হলেও সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নিশ্চয়ই নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। জমি বা ফ্ল্যাট হেবানামার মাধ্যমে প্রাপ্ত কি না তার উল্লেখ নেই, ১৯৭০ সনেও স্বর্ণের ভরি ছিল ১৫০ টাকা। প্রার্থী ক্রয়মূল্য বা সম্পদের মালিকানা লাভের সময়ের মূল্যকে হিসাবায়ন করলে তা অগ্রহণযোগ্য নয়, কারণ অবমূল্যায়িত সম্পদের হিসাবই আয়কর বিভাগ গ্রহণ করে থাকে। প্রতি বছর সম্পদের বাজার মূল্যে সারচার্জ বা সম্পদ কর দিতে হলে তা করদাতার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

যাদের অস্বাভাবিক হারে সম্পদ বেড়েছে তাদের মধ্যে কোন প্রার্থী হয়তো সম্পদের বর্তমান বাজার মূল্যে হিসাব করেছেন। এছাড়াও মন্ত্রীরা রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো লাভজনক কাজে জড়িত থাকতে না পারলেও সাংসদদের পেশাগত দায়িত্ব পালন বা ব্যবসা করতে আইনগত কোন বাধা নেই। তাই মন্ত্রী থাকা আর সাংসদ থাকার মধ্যে বিরাট ফারাক। অনেকে সাংসদ হওয়ার পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, আইনজীবী, চিকিৎসক বা সিএ ফার্মের সাথে সংশ্লিষ্ট। সাংসদ হওয়ার পর কাউকে তা ছাড়তে হয় না। তাছাড়া সাংসদ হিসাবে তারা ভালো বেতনভাতাদি পান। সম্পদ বাড়ানো কোনো বেআইনি কাজ নয়, কিন্তু তা হতে হবে বৈধ উৎস থেকে। সমালোচকদের বিশ্লেষণে তাই যাই প্রতিফলিত হোক না কেন, ঘোষিত আয় ও সম্পদে মিথ্যা হলফনামা দেওয়ার কথা নয়। কারণ হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে তিন বছর জেল বা প্রার্থিতা বাতিল করার বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী মন্ত্রীরা তাদের বেতন-ভাতাদি ছাড়া আর কোনো উপায়ে আয়-উপার্জন করতে না পারলেও মন্ত্রী হওয়ার পূর্বে বিনিয়োগকৃত শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, স্থায়ী আমানত, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা ইত্যাদি খাত প্রাপ্ত বেনিফিট মন্ত্রীর আয়কর রিটার্নে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। সম্ভবত আইনের এই ফাঁকে মন্ত্রীদের আয় বাড়ার বিষয়টিও বেআইনি নয়।

তাই বলে মন্ত্রী, সাংসদদের হাজার হাজার শতাংশ সম্পদ বৃদ্ধি স্বাভাবিক নয়, এই বৃদ্ধি বৈধ উৎস থেকে হয়েছে কি না তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, মিথ্যা তথ্য দেওয়ার কারণে কোন প্রার্থীর আজ পর্যন্ত জেল-জরিমানা বা প্রার্থিতা বাতিল হয়নি। অবশ্য নির্বাচন কমিশন কখনো কোন প্রার্থীর তথ্যবিবরণী যাচাই করার কথা চিন্তাও করেনি; কারণ তারা মনে করে, হলফনামার বিষয়ে তদন্ত বা কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের নয়, তথ্যগুলো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়াই তাদের কাজ। এই সকল তথ্য যাচাই করার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্টও অবশ্য নির্বাচন কমিশনের নেই। তাই তারা এই ব্যাপারে নির্লিপ্ত।

নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সকল তথ্য যাচাই করা সম্ভব না হলেও এই যাচাই দুর্নীতি দমন কমিশন ও রাজস্ব বিভাগের মাধ্যমে করা সম্ভব। প্রার্থী হিসাবে যারা হলফনামায় সম্পদের হিসাব দেন, তারা প্রতি বছর আয়কর রিটার্নও দাখিল করেন, রিটার্নে আয়-ব্যয় এবং সম্পদের বিস্তারিত বিবরণ থাকে। নির্বাচন কমিশনে প্রদত্ত সম্পদ বিবরণীর সাথে কোন অসঙ্গতি থাকলে তা আয়কর বিভাগের পক্ষে চিহ্নিত করা খুব সহজ। একবার নাকি প্রার্থীদের সকল তথ্য নির্বাচন কমিশন থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু তাদের কাছ থেকে নির্বাচন কমিশন কোন প্রত্যুত্তর পায়নি। কোন প্রার্থী দুর্নীতি করে টাকা উপার্জন করেছেন কি না সেটা দেখার দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশনের। কিন্তু স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক যাচাইয়ের কাজটি করতে আগ্রহী নয়, নির্বাচন কমিশন তথ্য পাঠালে তারা হয়তো যাচাই করবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষমতাধরদের সাথে বিরোধে যেতে উৎসাহী হয় না; কারণ তারা জানে, নিজ স্বার্থে সরকার এবং বিরোধী দলের সাংসদগণ এক ও অভিন্ন।

নির্বাচনের পূর্বে সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনী ইশতেহারে দিয়ে দুর্নীতি রোধে জিরো টলারেন্সের কথা বলে থাকে; কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সব ভুলে যায়। রাজনীতিকে এখন আর কেউ শ্রদ্ধা করে না, করে ভয়, কারণ তাদের হাতে ক্ষমতা। বিরোধী দলের নেতাদের মধ্যেও অনেকের বৈধ আয় দৃশ্যমান নয়। সাংসদদের সুযোগ-সুবিধা দেশের অর্থনীতি বিচারে পর্যাপ্ত, প্রত্যেক সংসদ সদস্য শুল্কমুক্ত গাড়ি, এমপি হোস্টেলে একটি বাসা এবং সম্মানজনকভাবে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্মানী পান; আবেদন করলে রাজউকের প্লটও পান। তারপরও অনেকে পাঁচ বছরেই সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন। দেশের জন্য দুর্ভাগ্য হলো, দলের প্রতি অন্ধ ভক্তির কারণে ভোটারগণ চোর আর দুর্নীতিবাজদেরই পছন্দ করেন।

রাজনীতি বর্তমানে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা, প্রার্থীদের হলফনামাগুলো বিশ্লেষণ করলেই প্রমাণিত হয় যে, সম্পদের এত প্রবৃদ্ধি আর কোনো ব্যবসায় সম্ভব নয়। রাজনীতি, ক্ষমতা, সংসদে প্রতিনিধিত্ব যে আস্তে আস্তে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের হাতে চলে যাচ্ছে তার প্রমাণ হচ্ছে, বিশ্ব এবং দেশের অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও প্রার্থীদের সম্পদের স্ফীতি।