সম্প্রতি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা। জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর কর্মকাণ্ড এত ধীর যে জাইকার পক্ষে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয় করতে সমস্যা হচ্ছে। জাইকা আরও উল্লেখ করেছে যে, একই কাজ তাদের দেশে অনেক দ্রুত সম্পন্ন হয়ে যায়। ইতঃপূর্বে বিশ্বব্যাংকও একই অভিযোগ উত্থাপন করেছে। বিশ্বব্যাংকের অভিমত হচ্ছে, প্রকল্পের প্রস্তুতি ও অনুমোদনে সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া জটিল ও ধীর; প্রকল্প বাস্তবায়নের গড় সময় ৭ বছর। মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো অনেক সময় প্রকল্প পরিচালক ও পরামর্শক নিয়োগে বিলম্ব করে, এমনকি প্রশাসনিক অনুমোদন দিতেও অস্বাভাবিক বিলম্ব করে থাকে। কোন প্রকল্প সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ একনেকে পাস হওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন কেন অপরিহার্য তা বোঝা আমাদের মতো সাধারণ লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ধীরগতি নিয়ে বছর দুয়েক আগে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের সব ক্ষেত্রে দায়ী করা যায় না; কারণ দরপত্র ও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা ছাড়াও বৈদেশিক অর্থায়নেও মাঝে মাঝে জটিলতার সৃষ্টি হয়। বিদেশি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন কোন কোন প্রকল্পে বিদেশি পরামর্শক নিয়োগের শর্ত থাকে। শুধু তাই নয়, কোন কোন প্রকল্পে কোন্ কোন্ দেশ থেকে কোন্ কোন্ কোম্পানির পণ্য বা সেবা ক্রয় করতে হবে তারও শর্ত থাকে। এই সকল ক্ষেত্রে অর্থদাতা দেশ বা সংস্থার অনাপত্তি নিতে হয়। এই সকল প্রক্রিয়ায় কিছু সময় ব্যয়িত হয়। ভূমি অধিগ্রহণের সময় সংক্ষুব্ধ কেউ মামলা ঠুকে দিলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হবেই। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন না হওয়া বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিক ঘটনা; কারণ জুন মাসে বাজেট পাস হওয়ার পর সংগ্রহ নীতিমালা অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র আহ্বান করলেই যে উপযোগী ও উপযুক্ত দরদাতা পাওয়া যাবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময় একই চাহিদার জন্য একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করতে হয়। অর্থবছরে সমাপ্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করতে হলে তার জন্য সংকুচিত হয়ে ওঠে। দরপত্র মূল্যায়নেও অনেক সময় দেরি করা হয়; এর পেছনে দুটো কারণ, এক—দুর্নীতি, দুই—মূল্যায়নের অযোগ্যতা। আবার দ্রুত কাজ করলেও নিরীক্ষক বা দুদকের লোকজন তাতে সন্দেহ পোষণ করে থাকে। তাই অর্থবছরের শেষ মাস জুনে সবাই তড়িঘড়ি করে বরাদ্দ শেষ করার কাজে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। অর্থবছরের শেষ দুই-তিন মাসে দ্রুত প্রকল্প শেষ করার কারণে কাজের মান ঠিক থাকে না, দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।
প্রকল্পের বিলম্বিত বাস্তবায়ন নিয়ে জাইকার অভিযোগের জবাবে পরিকল্পনা মন্ত্রী যা বললেন তা খুব হতাশাজনক; ধীরগতির জন্য মন্ত্রী দায়ী করলেন বিদ্যমান নিয়মকানুন এবং সংসদে জবাবদিহিতাকে। মন্ত্রীর উত্তরের সঙ্গে আমলাদের কৌশলী উত্তরের মিল আছে। যে সকল নিয়মকানুন দ্রুত কাজ করার প্রতিবন্ধক সেই সকল নিয়মকানুন বাতিল করার দায়িত্ব মন্ত্রী ও সংসদের। দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে কাজ করার উপযোগী নিয়মকানুন প্রণয়নের দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের। সংসদে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হওয়ার আগে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি হওয়া দরকার। মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনিটরিং থাকলে কাজের গতি অবশ্যই বাড়ানো সম্ভব। সরকারের পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পের মূল্যায়ন করে এবং একনেকের অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়ার আগে প্রকল্পগুলোর বিষয়ে পরামর্শও দিয়ে থাকে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি নিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দুদকের বক্তব্যের মিল নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নে মন্থরগতির জন্য দুদক সরকারের প্রকৌশলসংশ্লিষ্ট দফতর বা সংস্থাগুলোর দুর্নীতি ও অনিয়মকে দায়ী করছে। উন্নয়ন নির্মাণকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারের বিভিন্ন দফতরের প্রকৌশলীদের সঙ্গে বৈঠকও করেছে। প্রকল্প পরিচালকরা কেউই প্রকল্প এলাকায় থাকেন না। পরিকল্পনা মন্ত্রী যখন বলেন, প্রকল্প পরিচালকরা কেউই প্রকল্প এলাকায় থাকেন না, একই সঙ্গে একাধিক প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়ে তারা ঢাকায় থাকেন, তখন আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা মন্ত্রীরও নেই।
উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা সহজ শর্ত এবং কম সুদহারে ঋণ দিয়ে থাকে। জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বড় অংশীদার। আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নে জাইকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে ঢাকার এমআরটি বা মেট্রোরেল প্রকল্প, আড়াইহাজারে এসইজেড প্রকল্প, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে জাইকা অর্থ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ এবং জাপানের জাইকার মধ্যকার সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করা হয়েছে গত বছর জুন মাসে। দুই দেশের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে জাইকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। জাপান বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং বৃহত্তম উন্নয়ন সহযোগী। স্বাধীনতার পরপর যে কয়টি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় তাদের মধ্যে জাপান অন্যতম। স্বাধীনতার পরপর ১০.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য অনুদান দিয়ে যে সহায়তা শুরু করেছিল তা বাড়তে বাড়তে বাংলাদেশে এখন জাইকার আর্থিক সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। জাপানই বাংলাদেশের অন্যতম পরীক্ষিত বন্ধু। চীনকেও পরীক্ষিত বন্ধু বলা হয়, কিন্তু চীন মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিরোধিতা করেছে, বাঙালিদের হত্যা করার জন্য অস্ত্র দিয়েছে, জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে বারবার বাধা দিয়েছে। জাপান বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামায় না, কিন্তু চীন ভারতের কারণে নানা বিষয়ে প্রেসার সৃষ্টি করে থাকে।
বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল বলা হচ্ছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে; অথচ স্মার্ট সক্ষমতা নিয়ে বিদেশিরা প্রশ্ন তুললে আমাদের বিব্রত হতে হয়। তাই দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার স্বার্থে অনিয়ম রোধ করে যথাসময়ে যথাযথভাবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন অপরিহার্য। প্রকল্প গ্রহণ করে বিদেশ ভ্রমণ নিশ্চিত করার মধ্যে ব্যক্তিগত লাভ থাকে, কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে দেশের স্বার্থের লোকসান হয়। প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হলে উন্নয়নের গতি মন্থর হয়ে যায়। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ কর্তৃপক্ষের জানা থাকলেও করণীয় নির্ধারণ করা কেন সম্ভব হচ্ছে না তা বোধগম্য নয়। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক বৈঠকে বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি প্রসঙ্গে বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। দুর্নীতি, অদক্ষতা, দায়িত্বহীনতার বৃত্ত থেকে বের হওয়ার প্রয়াস আন্তরিক হলে এই সকল সমস্যার সমাধান অবশ্যই সম্ভব। তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃপক্ষের প্রকল্পসংশ্লিষ্ট জ্ঞান না থাকায় অধস্তন কর্মকর্তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না। তাই প্রকল্পের প্রস্তাবনা প্রণয়ন এবং কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কেবল টেকনিক্যাল জ্ঞানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করলে হবে না, তাদের নির্ভরযোগ্য, দক্ষ, করিতকর্মা, বিশ্বস্ত ও সৎ হতে হবে। কারণ দক্ষ ও নৈতিকভাবে সবল জনশক্তিই কেবল শতভাগ প্রকল্প টার্গেট অর্জন করতে সক্ষম।
বিরোধী দল স্বীকার না করলেও আওয়ামী লীগের সর্বশেষ ধারাবাহিক শাসনামলে অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে। ছোট-বড় নানা রকম উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়ে সরকার একদিকে যেমন প্রশংসিত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে মন্থরগতি ও বারবার ব্যয় বাড়ানোর জন্য সমালোচিতও হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি নিয়ে সকল শাসনামলে সমালোচনা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত ছিলেন এবং এখনো আছেন, কিন্তু সমাধান হয়নি, হচ্ছে না, এখনো সমাধানের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখে সরকার পরবর্তী বছরে কাজের গতি ত্বরান্বিত করার ঘোষণা দেয়; কিন্তু পরবর্তী বছরে সরকার তাদের আগের প্রদত্ত ঘোষণার কথা ভুলে যায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়ে লাখ লাখ বস্তা লেখা হয়েছে, কোন উত্তরণ নেই। অর্থছাড়ে বিলম্ব বা গড়িমসির অবসান হবে— এই প্রত্যাশা সবার। অবশ্য বরাদ্দ পেয়েও শতভাগ অর্থ ব্যবহারে ব্যর্থ অনেক প্রকল্প। তাই ব্যয়ের অক্ষমতা দূর করার সাথে সাথে অদক্ষতা দূর করাও জরুরি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায় থেকে ধারাবাহিক তদারকি থাকা বাঞ্ছনীয়। দক্ষতা বাড়ানোর জন্য অবিরত কর্মশালা, সেমিনার বা প্রশিক্ষণ অপরিহার্য নয়, সময় এবং অর্থের অপচয়। দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবেই।