ওমানে আওয়ামী লীগের কর্মীদের নিয়ে বৈঠক করায় চট্টগ্রামের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনি দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটকের প্রায় ১২ ঘণ্টা পর মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। সাংসদ খাদিজাতুল আনোয়ার সনির তুলনায় বাংলাদেশে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত পিটার হাস একজন রাজাধিরাজ। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ছোটাছুটি করতে করতে গলদঘর্ম, মনে হচ্ছে তিনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিক। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের চেয়েও বেশি ব্যস্ত। প্রায় প্রতিদিন তিনি বিবৃতি দিচ্ছেন, টুইট করছেন, দেখা করছেন, সরকারি দল, বিরোধী দল ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন। তিনি নিখোঁজ ব্যক্তির বাড়ি যাচ্ছেন, নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সবক দিচ্ছেন। তার এই অতিরিক্ত ছোটাছুটি প্রায় সবার চোখে দৃষ্টিকটু প্রতিভাত হচ্ছে। তিনি জাতীয় পার্টির সাথে বৈঠকে জানতে চেয়েছেন, জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে, না আলাদাভাবে নির্বাচন করবে। এই জাতীয় কথায় তাকে তো বর্তমান রাজনীতির অংশীজন মনে হয়। পিটার ডি হাসের পক্ষপাতমূলক আচরণের বিরুদ্ধে ১৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে অভিযোগ দাখিল করেছে; এজন্যই বোধ হয় হাস সাহেব এখন বলছেন, তিনি কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নেননি, তিনি চান অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। প্রকৃতপক্ষে এই দৌড়ঝাঁপ পিটার হাসের নয়, এই দৌড়ঝাঁপ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের। হঠাৎ করে তাদের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়ে গেছে।
১৯৬১ সনের ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কূটনীতিকরা আলাদা কতগুলো সুবিধা ভোগ করে থাকেন। তাদের কূটনৈতিক রক্ষাকবচের আওতায় তারা যে দেশে অবস্থান করেন সে দেশে কোন অপরাধ করার জন্য তাদের সেই দেশে গ্রেফতার বা বিচারের সম্মুখীন হতে হয় না। এই রক্ষাকবচের আওতায় শুধু ব্যক্তি কূটনৈতিক নয়, কূটনীতিবিদের অফিস-বাড়িঘরেও তল্লাশি চালানো যায় না। আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুসারে অন্য একটি দেশে কনস্যুলেট বা দূতাবাসের যে চত্বর থাকে সেখানে কূটনৈতিক মিশনে নিজের দেশের আইন চলে। ছোট-বড় সব দেশের কূটনৈতিকরা এই সুবিধা ভোগ করলেও আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের চলাফেরা ও কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হয় তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৭(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ন্যায়পাল বা ওমবাডসম্যান।
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা প্রভৃতি সংস্থা ও দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব থাকায় মিস্টার হাস বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করার সাহস ও সুযোগ পাচ্ছেন। মিস্টার হাস জানেন, আমেরিকা বিরূপ হলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হ্রাস পাবে, উন্নয়নের গতি স্লথ হবে, জাতিসংঘের শান্তিমিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কমতে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের মতো তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামালে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে এক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতো। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী এবং সামরিক শক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভীতি সৃষ্টিতে সক্ষম হলে মিস্টার হাসের অস্তিত্ব সাধারণ জনগণ টের পেতো না। গরিব দেশগুলোর জন্য আরেকটি পথ খোলা আছে এবং তা হচ্ছে আমেরিকার সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে গভীর সম্পর্ক থাকার কারণে সৌদি আরব কানাডাকে ক্ষমা চাইতে বলেছিল; কানাডার অপরাধ, সৌদি নারী অধিকার কর্মীদের মুক্তি চেয়েছিল কানাডা।
সৌদি আরব, মরক্কো, জর্ডান, ব্রুনাই প্রভৃতি দেশেও পিটার হাসের মতো মার্কিন রাষ্ট্রদূত রয়েছেন, তারা কিন্তু ঐ সকল দেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য একটি কথাও উচ্চারণ করেন না। কেন করেন না? কারণ ঐ দেশগুলো আমাদের মতো গরিব নয়। এছাড়াও কোন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে আমেরিকা কতটুকু হস্তক্ষেপ করবে তা নির্ভর করে দুটি দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর। সৌদি রাজবংশের কড়া সমালোচক সাংবাদিক খাসোগীকে তুরস্কে সৌদি দূতাবাসের ভেতর করাত দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করার পরও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মানবাধিকারের অভিযোগে সৌদি যুবরাজকে অভিযুক্ত করেননি, বরং তিনি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ৪ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র সৌদি আরবে বিক্রি করেছেন। জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে সৌদি যুবরাজের সাথে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন, সৌদি যুবরাজের সাথে তিনি ফোনে কথা বলেননি। যুবরাজ তা বুঝতে পেরে চীনের সাথে সম্পর্ক গাঢ় করতে থাকেন। রাশিয়া বেশি দরে তেল বিক্রি করে যাতে লাভবান না হয় সেজন্য আমেরিকা সৌদি আরবকে তেলের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে অনুরোধ করে, কিন্তু সৌদি যুবরাজ তাতে কান দেননি। এই অবস্থায় জো বাইডেন তার সমস্ত রাগ-অভিমান ভুলে যুবরাজের সাথে দেখা করতে সৌদি আরবে ছুটে যান। কিন্তু জো বাইডেন বুঝতে পারেননি, সৌদি আরব আর বাংলাদেশ এক নয়। মিস্টার হাস রাষ্ট্রদূত হয়ে সৌদি আরব গেলে জো বাইডেনের মতো অবস্থা হবে।
প্রকাশ্যে এবং পর্দার আড়ালে চলছে নানা তৎপরতা। বিরোধী দল জানে, শত শত দিন রাস্তায় বিক্ষোভ করার চেয়ে তাদের পক্ষে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের একটি বক্তব্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে অধিকতর কার্যকর। সরকার মিস্টার হাসের অস্বাভাবিক আচরণকে প্রকাশ্যে পাত্তা না দিলেও ভেতরে ভেতরে তার বক্তব্যকে অবমূল্যায়ন করার সাহস পাচ্ছে না। তবে মিস্টার হাস বাংলাদেশের জটিল রাজনীতির সমাধান দিতে পারবে না। কারণ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি হিংসাত্মক মনোভাবাপন্ন প্রতিপক্ষ। বিরোধী দল বিএনপি চাচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর সংসদে সংশোধনী এনে এই ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাদ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে অতীতে দুই দলের মতভেদের সমন্বয় হয়েছে তৃতীয় শক্তির আবির্ভাবে; এখন তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব হলে তা রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হবে, ডকট্রিন অব নেসেসিটি দিয়েও মুক্তি পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। পিটার ডি হাস তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, তিনি চাচ্ছেন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শর্ত না থাকায় আওয়ামী লীগও পিটার হাসের কথার সাথে সুর মেলাচ্ছে, তাকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।
জাতীয় সংসদের নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা নিয়ে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ তত বাড়তে থাকবে। কিন্তু কূটনীতির চিকন বা বাঁকা বুদ্ধি হারিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমদিকে কিছুটা বেসামাল হয়ে উঠেছিল; রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের নেতা ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কড়া ভাষায় আমেরিকার সমালোচনা করছিলেন। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়নে কূটনীতির ভাষা আয়ত্ত করা জরুরি। মিসাইলটি ছোঁড়ার পূর্বমুহূর্তেও একজন জাত কূটনৈতিক শত্রুর সাথে হাসিমুখে করমর্দন করে থাকেন। রাজনৈতিক নেতাদের কিছু কড়া বক্তব্য মিস্টার হাসকে থামানোর জন্য অপরিহার্য হলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিকণ মুচকি হাসি বজায় রাখা সমীচীন হবে। প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে জন্ম নেওয়া প্রথম মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের প্রধানমন্ত্রী, তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক, কূটনীতিবিশারদ চাণক্য বা কৌটিল্যের কাছে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে।
শুধু পিটার হাসকে অভিযুক্ত করা সঠিক বলে মনে হয় না। নির্বাচন এলে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সক্রিয় করে তুলতে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা যেভাবে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন তা পৃথিবীর অন্য কোন দেশের রাজনীতির মাঠে দেখা যায় না। গরিব দেশ বলে বিদেশি কূটনৈতিকদের প্রকাশ্য কর্মতৎপরতা অতীতেও দেখা গেছে, এখনো চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে। আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল তখন তারাও বিদেশি কূটনৈতিকদের কাছে ধর্ণা দিয়েছে।
বিশ্বায়নের যুগে কোন দেশের সরকার তাদের সব কাজকে অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে জায়েজ করতে পারে না, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সরকারের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করবেই। এই প্রতিবাদের প্রয়োজনও আছে; নতুবা কোন কোন দেশের সরকার অন্যায় আচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। আমাদের দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কোনো জাতীয় ইস্যুতে একমত হতে না পারলেও শক্তিধর রাষ্ট্রের কাছে পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে উভয় দল পছন্দ করে। তাই পিটার হাসরা বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মুরব্বী হয়ে দৌড়ঝাঁপ দিতেই থাকবে। তবে আমেরিকার চেহারা এক সেকেন্ডে বদলে যেতে পারে। ভারতের সামান্য বিবৃতি ইতোমধ্যে বিএনপি’র চেহারাও পরিবর্তন এনেছে।