মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করে উল্লেখ করেছেন যে, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে যে বা যারা বাধাগ্রস্ত করবে তাদের আমেরিকার ভিসা দেওয়া হবে না। এই ভিসানীতি নিয়ে বিদগ্ধজনদের আলোচনা, পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ শুনে সাধারণ মানুষ কোন স্পষ্ট ধারণা নিতে পারছে না। বিএনপি’র মতাদর্শের সুশীল সমাজ যখন এই ভিসানীতি ব্যাখ্যা করেন তখন মনে হয় আমেরিকা বিএনপি’র সাথে একাত্ম হয়ে আওয়ামী লীগ ও বর্তমান সরকারকে শায়েস্তা করতে এই নীতি ঘোষণা করেছে। আবার আওয়ামী লীগের মতাদর্শের বুদ্ধিজীবীদের কথা শুনলে মনে হয়, বর্তমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন বানচাল করার বিএনপি’র আন্দোলন ও সংগ্রামের বিরুদ্ধে এই ভিসানীতি।

নির্বাচনের পর পরাজিত রাজনৈতিক দলের আচরণ ও বিবৃতি থেকে প্রতীয়মান হয়, ১৯৭৩ সন থেকে ২০১৮ সন পর্যন্ত একটি নির্বাচনও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোন নির্বাচনও পরাজিত দলের কাছে গৃহীত হয়নি। বিএনপি সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে তিনবার এবং আওয়ামী লীগ বর্জন করেছে দুইবার; দলগুলো শুধু নির্বাচন বর্জন করেনি, নির্বাচনে বাধাও দিয়েছে। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিএনপি এখন সুষ্ঠু নির্বাচনের মাপকাঠি মনে করছে তারাই পরাজিত হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদে যোগদান থেকে বিরত থেকেছে। আওয়ামী লীগও একই কাজ করেছে। বছরব্যাপী সংসদে না গিয়ে বেতন-ভাতাদি গ্রহণে কোন দলের সাংসদকে বিব্রত হতে দেখা যায়নি, সংসদ কর্তৃক প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা নিতে কোন সাংসদ কার্পণ্য করেননি। এই সকল আচরণও ভিসানীতির আওতাভুক্ত হওয়া উচিত। কারণ গণতন্ত্র শুধু সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, সুষ্ঠু নির্বাচনে ক্ষমতাসীন সরকারও অগণতান্ত্রিক আচরণ করতে পারে।

নির্বাচনে অনিয়ম মানে খুন, জালভোট, কেন্দ্র দখল, এজেন্ট বের করে দেওয়া, মাঠ দখল, জোর-জবরদস্তি, বিরোধী পক্ষের ওপর আক্রমণ ইত্যাদি; লুকোচুরি খেলতে হয় না, শক্তি থাকলে পোলিং অফিসারের সম্মুখেই ব্যালট পেপার নিয়ে সিল মারা যায়। কারণ ভোটারের ভোট নয়, জনতার লাশের উপর দাঁড়িয়ে প্রার্থী জিততে চায়। ১৯৭৩ সনের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জাসদের কয়েকজন প্রার্থীকে জোর করে হারিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। তবে সত্যিকার ভোট কারচুপি শুরু হয় ১৯৭৭ সনে জিয়াউর রহমানের ‘হাঁ/না’ বা গণভোট থেকে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পর সামরিক শাসকরা গণভোটের আয়োজন করে ক্ষমতা দখলকে বৈধ করার চেষ্টা করে থাকে, জিয়াউর রহমানও তাই করেছেন। ভোটকেন্দ্রে ভোটার না গেলেও ৮৮.১% ভোট কাস্ট হয়েছিলো এবং ভোট গণনায় দেখা গেল ৯৮.৯% হ্যাঁ এবং ১.১% না-ভোট। এই ভোট দিলো কে? ভোট দিয়েছে পোলিং অফিসার এবং প্রিসাইডিং অফিসার। আমেরিকার ভিসা কি এরা পাবে?

এরশাদ সাহেবের আমলে সকালবেলায় সব ভোট সংগ্রহ হয়ে যেত। জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পোলিং এজেন্ট এবং প্রিসাইডিং অফিসারের সহযোগিতায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে ভোট দেওয়া সম্পন্ন করত। এরশাদ সাহেবের পতন হলে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের অধীনে ১৯৯১ সনে যে ভোট হয় তাতে বিএনপি জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য বিএনপি এখন সোচ্চার সেই বিএনপি-ই ১৯৯৬ সনের নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দিতে অস্বীকার করে। খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে মাগুরা উপনির্বাচনে এত বড় কারচুপি হয় যে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ওখান থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অসাংবিধানিক উল্লেখ করে বিএনপি বিরোধী দলগুলোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি প্রত্যাখ্যান করে ১৯৯৬ সনের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন করে তাতে বিএনপি’র ৪৮ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যান, বিএনপি’র আনুকূল্যে বিজয়ী হয় বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত হত্যাকারী খন্দকার আবদুর রশিদ। এই নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণও কি ভিসা পাবেন না?

২০০১ সনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপর আওয়ামী লীগের কর্মী এবং সংখ্যালঘুদের উপর যারা বিএনপি সরকারের প্রশ্রয়ে নির্মম নির্যাতন চালালো তাদেরও ভিসানীতির আওতায় আনা সমীচীন হবে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় ২০১৪ সনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত হন এবং ২০১৮ সনের নির্বাচনে রাতে ভোট হয়েছে বলে বিএনপি’র অভিযোগ। এই দুটি নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদেরও আমেরিকার ভিসা থেকে বঞ্চিত করা সমীচীন হবে।

তবে ভোটের মাঠে যারা এতদিন অপরাধ করেছে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করেছে তারা তো সাধারণ নেতা-কর্মী, তাদের আমেরিকায় যাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। আর ভোটকেন্দ্রে যে সকল পোলিং এবং প্রিসাইডিং অফিসার ভোট কারচুপিতে সহায়তা করেছেন তারাও খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন; কারণ তাদের অধিকাংশই স্কুলশিক্ষক। কোন স্কুলশিক্ষক আমেরিকায় যাওয়ার স্বপ্নও দেখেন না। মাঠপর্যায়ে পুলিশের এসপি এবং ডিসিরা আমেরিকায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন যাদের তীব্র তারা নির্বাচনকালীন ডিসি বা এসপি হতে এখন আর আগ্রহান্বিত হবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু এদের ভূমিকার নেতিবাচক দিকটির উন্মোচন খুব সহজ নয়, কে অপরাধী, কে অপরাধী নয় তা নিরূপণ করা কঠিন। যে আগুন লাগায় সে তো টোকাই, কিন্তু যিনি টোকাইকে আগুন লাগানোর জন্য বলেছেন তিনি তো অদৃশ্য জগতে। অন্যদিকে ভোট হয়ে যাওয়ার পর সাব্যস্ত হবে কারা কারা জালভোট দিয়েছে বা ভোটারদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়েছে। ক্ষমতায় বসার পর দুয়েকজন পুলিশ, আমলা, দলীয় নেতা ভিসা না পেলে ক্ষমতাসীন সরকারের কী ক্ষতি হবে?

আমরা যারা নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকব তারা চাইলেই কি ভিসা পেয়ে যাব? না, পাব না। আমার সহকর্মীর এবতাদুল ইসলাম কখনো নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল না, কিন্তু নামের সাথে ‘ইসলাম’ থাকায় দলভুক্ত অন্যরা ভিসা পেলেও তাকে দেওয়া হয়নি। শুধু মুসলমান নামের কারণে বোম্বের সিনেমার নায়ক শাহরুখ খানকে বহুবার এবং ভারতের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট এপিজে আবুল কালামকে একবার দীর্ঘক্ষণ মার্কিন বিমানবন্দরে আটক রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। স্বার্থের সাথে সংঘাত হলে আমেরিকা ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্টকেও চিনে না। তাই সুষ্ঠু নির্বাচন নয়, বরং হলি আর্টিজানের মতো আরও কয়েকটি নৃশংস ঘটনা ঘটলে ভিসা সবার জন্য ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ হয়ে যেত। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও আমেরিকার ভিসা পাননি, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোদির বিরুদ্ধে আরোপিত সকল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে লাল গালিচা হাতে নিয়ে মোদিকে সংবর্ধনা দিতে আমেরিকা তাদের বিমানবন্দরে অপেক্ষা করেছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো এক গোপন তারবার্তায় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দুর্নীতিবাজ এবং ভয়ঙ্কর ও দুর্ধর্ষ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তাকে আমেরিকান ভিসা না দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। উইকিলিকস এই নথি ফাঁস করে দেয়। মরিয়ার্টির এমন মন্তব্য থাকা সত্ত্বেও আমেরিকার সুহৃদ ইংল্যান্ড কি তারেক রহমানকে থাকতে দিচ্ছে না? বিএনপি ক্ষমতায় এলে আমেরিকাও তারেক রহমানকে ভিসা দেবে।

নির্বাচিত হয়ে জো বাইডেন সৌদি যুবরাজের সাথে কথা বলতে চাননি, অবহেলা করেছেন; কিন্তু তেলের উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনে এই জো বাইডেনই ছুটে গিয়েছিলেন যুবরাজের দরবারে। তাই বলে বাংলাদেশেও জো বাইডেন ছুটে আসবেন তা ভাবার কোন কারণ নেই। আমার বন্ধু অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হাবিবুল হক বললেন, তিনি ১৫ দিনেই আমেরিকার ভিসা পেয়ে গেছেন, করোনার পর থেকে নতুন ভিসার জন্য দীর্ঘ লাইন, নতুন যারা আবেদন করছেন তাদের তারিখ দেওয়া হচ্ছে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪। যারা পড়তে যাচ্ছে তাদের কথা আলাদা, অন্যরা ভিজিট ভিসায় যাবে আফগানিস্তান, তাদের নাসারার দেশ আমেরিকায় যাওয়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না।

সুষ্ঠু নির্বাচন, ভোট কারচুপি, গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র সব বিবেচিত হয় আমেরিকার স্বার্থে। বিধ্বংসী অস্ত্র রাখার মিথ্যা অজুহাত দিয়ে সাদ্দাম হোসেন এবং ইরাককে ধ্বংস করে আমেরিকা কখনো লজ্জাবোধ করেনি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিজয়ী হামাসকে ফিলিস্তিনের ক্ষমতায় বসতে দেয়নি আমেরিকা। নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনে বিজয়ী মিশরের প্রেসিডেন্ট মুরসী আমেরিকার ইন্ধনে শুধু ক্ষমতাচ্যুত হননি, তাকে জেলখানায় পচে মরতে হয়েছে। গোপন দলিলপত্র ফাঁস করার অভিযোগে বাক্‌স্বাধীনতার প্রবক্তা আমেরিকার ভয়ে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে ৭ বছর ধরে ইকুয়েডর দূতাবাসে পালিয়ে থাকতে হয়েছে; তার অপরাধ তিনি ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক প্রভৃতি দেশে আমেরিকার জঘন্য অপরাধ উন্মোচন করে দিয়েছিলেন। মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে সামরিক প্রশাসক মানুয়েল নরিয়েগাকে আমেরিকা পানামা থেকে ধরে নিয়ে যায় এবং বিচার করে জেলে পুরে দেয়। অনেকে বলে থাকেন, নরিয়েগা পানামা খালের উপর আমেরিকার কর্তৃত্ব খর্ব করে পানামার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমেরিকার রোষানলে পড়েছিলেন। আমেরিকার সব নিষেধাজ্ঞা হচ্ছে নাইজেরিয়া, কিউবা, উত্তর কোরিয়া, চীন, সিরিয়া, ইরান আর রাশিয়ার বিরুদ্ধে; নতুন করে শুরু হয়েছে বেলারুশের বিরুদ্ধে। উত্তর কোরিয়ায় যেমন গণতন্ত্র নেই, সৌদি আরবেও নেই। তুরস্কে সৌদি দূতাবাসে সৌদি রাজতন্ত্রের কট্টর সমালোচক সাংবাদিক খাসোগীকে করাত দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলল, এই জন্য আমেরিকা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি, ৪ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি যুবরাজের ভক্ত হয়ে গেলেন। রাশিয়াকে সমর্থন করে আওয়ামী লীগ সরকার আমেরিকার রোষানলে পড়েছে। আমেরিকার ভিসা সীমাবদ্ধ হয়ে গেলে, রাজনৈতিক নেতা, কর্মী আর আমলারা আমেরিকায় না গেলে দেশ উপকৃত হবে।

আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া, উগান্ডা এবং সোমালিয়ার ক্ষেত্রেও আমেরিকা একই ভিসানীতি প্রয়োগ করেছে, কিন্তু কাজ হয়নি। এই সকল দেশে যাদের উপর ভিসানীতি প্রয়োগ করেছে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি বিধায় রাজনীতির মাঠে ভিসানীতির কোন প্রভাব পড়েনি। ভিসানীতি বাংলাদেশেও কোন প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ এটা কোন স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞা না। বাংলাদেশের ইলেকশন ক্রিমিনালদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বন্ধে নতুন একটা ভিসানীতি, এর আওতায় যারা পড়বেন তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। এই ভিসানীতির সাথে ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের স্যাংশন না থাকায় যাদের ভিসা দেওয়া হবে না তারা কিন্তু ভিসা কার্ড, মাস্টার কার্ড ব্যবহার করতে পারবেন, ব্যবসা-বাণিজ্যও করতে পারবেন, শুধু আমেরিকায় যেতে পারবেন না। অনুষ্ঠিত নির্বাচন আমেরিকার পছন্দ না হলে তাদের নিজস্ব বিবেচনায় কয়েকজন বড় কর্মকর্তা এবং শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। তাই সেনাবাহিনীকে কোনভাবেই নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট করা ঠিক হবে না, আমেরিকা নাখোশ হলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে কাজ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। পুলিশের দারোগা, পেয়াদা, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, যুবদল, দলের নেতা বা স্কুলের মাস্টার, আনসার ভিডিপির কিছু লোকের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিলেই কী, না দিলেই বা কী!

আমেরিকার ভিসা নিয়ে একটা অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বিএনপি কেন খুশী তা বোধগম্য নয়। কারণ আমেরিকা এখন আর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলে না, বলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা। মানে খুব স্পষ্ট। সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে না এলেও আমেরিকার আপত্তি নেই, তারা শুধু চায় নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয়। সরকার যদি আমেরিকাকে সন্তুষ্ট করতে পারে যে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে তারা আন্তরিক, তাহলে বিএনপি’র অংশগ্রহণ না থাকলেও আমেরিকা নির্বাচন মেনে নেবে। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করছে। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি আবার চালু করা সম্ভব নয়, যদিও ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলাম তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনরুজ্জীবন সম্ভব বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তার দেওয়া যুক্তি খুবই দুর্বল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে আদালত কয়েকজন অ্যামিকাস কিউরির মতামত নিয়েছিল, ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলাম সম্ভবত তাদের মধ্যে একজন। কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে মত দিয়েছিলেন, তবে সবাই বলেছিলেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখা হলেও কোন বিচারপতিকে এই ব্যবস্থায় রাখা ঠিক হবে না। অধিকাংশ অ্যামিকাস কিউরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পক্ষে বললেও আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করে। অ্যামিকাস কিউরির মতামত নয়, সুপ্রিম কোর্টের রায়ই আইন।

শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পঞ্চম সংশোধনী, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সপ্তম সংশোধনী এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ষোড়শ সংশোধনীও বাতিল হয়েছে। ধারণা করছি, আমেরিকা কখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য চাপ দেবে না, তারা নজরদারি বাড়াবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে। এই অবস্থায় বিএনপি’র মনস্তাত্ত্বিক চাপ বেড়ে গেল, কারণ তারা তত্ত্বাবধায়ক বা দলনিরপেক্ষ সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিএনপি এতদিন ধরে বলে আসছে, তারা দলীয় সরকারের অধীনে যে কোন নির্বাচন প্রতিহত করবে। কিন্তু এই ভিসানীতির কারণে বিএনপি সরকারের একতরফা নির্বাচনে বাধাও দিতে পারবে না। তবে নির্বাচনে না গেলেও বিএনপি’র নেতারা আমেরিকার ভিসা পাবেন, কিন্তু নির্বাচন প্রতিহত করতে গিয়ে ভিসানীতির গেঁড়াকলে পড়বেন না তো!

লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক।