আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লা খানকে ১৬ হাজার ১৯৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে গাজীপুরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন জায়েদা খাতুন। জায়েদা খাতুন প্রাক্তন মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা। ৬১ বছরের প্রবীণ জায়েদা খাতুন ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। দেশের সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশন গাজীপুর। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে জাহাঙ্গীর নিজে এবং তার মা প্রার্থী। কিন্তু কারো ঋণের জামিনদার হয়ে ঋণখেলাপি হওয়ায় জাহাঙ্গীরের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়, আদালতে শরণাপন্ন হয়েও প্রার্থিতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এই অবস্থায় জাহাঙ্গীর আলম তার মায়ের প্রার্থিতা নিয়ে মাঠে নামেন। তার মা গাজীপুরের কোন পরিচিত ব্যক্তিত্ব নন, জাহাঙ্গীর আলম মেয়র থাকাকালীনও তিনি কোন সভা-সমাবেশে যোগ দেননি। তারপরও তাকে গাজীপুরের ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৪ জন ভোটার ভোট দিয়েছেন। ভোটের লড়াইয়ে দৃশ্যত আজমত উল্লার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জায়েদা খাতুন, কিন্তু পর্দার অন্তরালে আসল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাহাঙ্গীর। ভোটের নীরব প্রচার-প্রচারণায় জায়েদা খাতুনের নাম উচ্চারিত হয়নি, হয়েছে জাহাঙ্গীরের নাম। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লাও নির্বাচনী প্রচারে জাহাঙ্গীরকে প্রতিপক্ষ করেছেন, জায়েদা খাতুনকে নয়।
ভোট প্রচারণা ও ভোটকেন্দ্রে যুবকদের সমর্থন অপরিহার্য। গাজীপুরে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর চেয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী গাজী আতাউর রহমান বেশি ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। মনে হয় জাতীয় পার্টির ইমেজ আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আজমত উল্লা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, সজ্জন ব্যক্তি, ভদ্র, বিনয়ী এবং হালনাগাদ তথ্যে সমৃদ্ধ একজন জ্ঞানী লোক। তারপরও গাজীপুরে জাহাঙ্গীর বেশি জনপ্রিয়। তার জনপ্রিয়তার কিছু কারণ সর্বজনবিদিত।
জাহাঙ্গীর আলম মেয়র হওয়ার পর আমি দৈনিক সংবাদে তার সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে একটি কলাম লিখেছিলাম। চাকরির সুবাদে আমি প্রায় ১০ বছর গাজীপুর ছিলাম এবং সেই সময় বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদের কর্মকাণ্ড দেখেছি, নেতা ও নেতৃত্ব সম্পর্কে জনগণের অভিমত উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি। জাহাঙ্গীর এখনো যুবক, গাজীপুরের যুবকদের উপর তার প্রভাব অনেক বেশি। বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে যুবকদের সম্পৃক্ত করে সব অর্থের যোগান দিয়েছেন জাহাঙ্গীর, তাদের চাঁদাবাজি করতে দেননি। তার নিজস্ব বিশ্বস্ত কর্মীবাহিনীর বিপদে-আপদে তিনি সর্বদা পাশে থাকেন। মেয়র থাকাকালীন রাস্তা প্রশস্ত করতে গিয়ে ভবন ও ভূমি মালিকদের বিরাগভাজন হলেও তার এই কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের সমর্থন ছিল অবারিত। গাজীপুরের অধিকাংশ পায়ে হাঁটার সরু রাস্তাকেও জাহাঙ্গীর ৩০ ফুট প্রশস্ত করেছেন, পুরো সিটি জুড়েই এখন পাকা রাস্তা।
করোনার ভাইরাস পরীক্ষার আধুনিক সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা করে জাহাঙ্গীর গাজীপুরবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছেন। গরিব ও নিঃস্বদের আর্থিক সহায়তা প্রদানে অকৃপণ জাহাঙ্গীর ভাওয়াল কলেজে ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন, ছয় বছর গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। প্রতি বছর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকীতে গাজীপুরের প্রতিটি ওয়ার্ডে জাহাঙ্গীরের উদ্যোগে গরিব-দুঃখীদের খাওয়ানো হতো, সব খরচ বহন করতেন তিনি নিজে, কোন কর্মীকে চাঁদা তুলতে দিতেন না। তার এই জনপ্রিয়তা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল, দলীয় নেতাদের সমর্থন হারিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হলেন। বহিষ্কার হলেও তার নিজের কর্মীবাহিনী তাকে ছেড়ে যায়নি। নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোন কথা বলেননি, শুধু তুলে ধরেন নিজের অবস্থান। জাহাঙ্গীরের কৌশলী প্রচারণা এবং সাংগঠনিক দক্ষতায় আওয়ামী লীগের ভোট দুই ভাগ হয়ে যায়।
আওয়ামী লীগ বিরোধী খুব বেশি ভোট জাহাঙ্গীরের মা জায়েদা খাতুন পেয়েছেন বলে মনে হয় না। কারণ প্রার্থীরা তাদের অবস্থান বিবেচনায় ভোট কম পাননি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী পেয়েছেন ৪৫ হাজার ৩৫২ ভোট এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী পেয়েছেন ১৬ হাজার ৩৬২ ভোট। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও বিএনপি পরিবারের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী সরকার শাহনূর ইসলামও পেয়েছেন ২৩ হাজার ২৬৫ ভোট। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লাহকে হারানোর লক্ষ্য নিয়ে বিএনপি’র ভোটাররা ঝাঁপিয়ে পড়েনি, ঝাঁপিয়ে পড়লে সরকার শাহনূর ইসলাম বা জায়েদা খাতুন আরো বেশি ভোট পেতেন এবং ভোট প্রদানের হার ৪৮.৭৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকত না, ভোট কাস্টিং হতো ৬৫-৭০ শতাংশ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯১ সনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই কাস্টিং ভোটের ৩০ শতাংশ করে ভোট পায়; ১৯৯৬ সনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় ৩৭.৪৪ শতাংশ, বিএনপি পায় ৩৩.৬০ শতাংশ; ২০০১ সনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় ৪০.১৩ শতাংশ, বিএনপি পায় ৪০.৯৭ শতাংশ এবং ২০০৮ সনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় ৪৯.০ শতাংশ, বিএনপি পায় ৩৩.২০ শতাংশ। গাজীপুরের মেয়র নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী জায়েদা খাতুন এবং আওয়ামী লীগের আজমত উল্লা উভয়ে একত্রে পেয়েছেন ৪ লক্ষ ৬১ হাজার ৬৭১ ভোট, অর্থাৎ মোট ভোটের ৩৯.১৪ শতাংশ। গাজীপুরের মেয়র নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় কাস্টিং ভোট কম, তাই মোট ভোটের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এই তুলনায় প্রতীয়মান হয়, আওয়ামী লীগ বিরোধী খুব বেশি ভোটার আজমত উল্লাহ বা জায়েদা খাতুনকে ভোট দেননি।
আওয়ামী লীগের আরেকটি ভুল নীতি হচ্ছে, কোন নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করেই তার বিরুদ্ধে নানা বিরূপ প্রচারণা শুরু করা হয়, তার অতীতের অপকর্মগুলো ফলাও করে প্রচার করা হয়। দীর্ঘদিন দলে থাকাকালীন কোন ভুল নজরে এলো না, অথচ যেদিন বহিষ্কার করা হলো সেদিনই সেই নেতা বা কর্মী দলের কাছে অখাদ্য ব্যক্তি হিসেবে পর্যবসিত হন। দলের এমন আচরণে মানুষ হাসে, দলের ইমেজ নষ্ট হয়। মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে আওয়ামী লীগ এবং মেয়র পদ থেকে বহিষ্কারের পর গাজীপুর-টঙ্গীতে জাহাঙ্গীর আলমের সমর্থকদের দলের পক্ষ থেকে গণশোকজ করা হয়, বহিষ্কার করা হয়, হাজতে পাঠানো হয়, বাকিদের মৌখিকভাবে দল থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেওয়া হয়। কর্মীরা দলের এমন অপরিণামদর্শী আচরণের প্রতিশোধ নিয়েছে বুকে নৌকা প্রতীক লাগিয়ে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা ও আওয়ামী লীগের নৌকা ছাড়া অন্য কোন প্রার্থীর এজেন্ট ভোটকেন্দ্রে দেখা যায়নি। এজেন্ট ছাড়াই জায়েদা খাতুন জিতে গেলেন; এর অন্যতম কারণ আওয়ামী লীগের অধিকাংশ এজেন্ট নৌকা প্রতীক নিয়ে জায়েদা খাতুনের টেবিলঘড়ির পক্ষে কাজ করেছেন। শুধু এজেন্ট নয়, জায়েদা খাতুনের কর্মীরাও বুকে লাগিয়েছিল নৌকা প্রতীক। জাহাঙ্গীরের প্রতি একনিষ্ঠ না হলে কর্মীরা এভাবে জায়েদা খাতুনের জন্য মাঠে নামতো না, সাধারণ জনগণের ভালোবাসা না থাকলে জায়েদা খাতুন এত ভোট পেতেন না। জাহাঙ্গীর আলম প্রার্থী হলে হয়তো আরও বেশি ভোট পেতেন। ছেলে জাহাঙ্গীর সাবেক মেয়র, তার চেয়ারে এখন বসবেন মা জায়েদা খাতুন। আওয়ামী লীগের ভুল সিদ্ধান্ত এবং জাহাঙ্গীরের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার কারণে গাজীপুরবাসী প্রথম একজন নারী মেয়র পেলো। নারায়ণগঞ্জের সেলিনা হায়াত আইভীর পর তিনিই দ্বিতীয় নারী, যিনি দেশের কোনো একটি সিটি করপোরেশনের নগরমাতা হলেন।
ব্যালটের মাধ্যমে গাজীপুরের আওয়ামী লীগ ভোটারগণ নেতাদের সিদ্ধান্তের নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছেন, ভোটের বিপ্লব ঘটিয়ে আওয়ামী লীগকে সতর্ক করেছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে তারা অহংকারী, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকায় তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা হ্রাস পেয়েছে এবং তারা তোষামোদি রাজনীতির অনুরক্ত হয়ে পড়েছেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মনে রাখতে হবে, বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে প্রার্থী হলেই জিতে যাওয়ার যে আনন্দ এতদিন বিরাজ করেছে তা আগামী নির্বাচনে থাকবে না। প্রার্থী নির্বাচনে সততা না থাকলে প্রতিটি সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগকে গাজীপুরের মেয়র নির্বাচনের মতো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই লড়তে হবে।