আমাদের ঈদ-উল-ফিতরের পূর্বমুহূর্ত থেকে অদ্যাবধি বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের যাকাত ফান্ড নিয়ে বিতর্ক চলছে। একজন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর নেতৃত্বে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানকে যাকাত দেওয়া যাবে কি না, যাকাত দেওয়া হলে তা আদায় হবে কি না— ইত্যাদি নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যারা সম্পদশালী, আর্থিক বিচারে সামর্থ্য তাদের জন্য যাকাত ফরজ ইবাদত। যাকাত হিসাব করে দিতে হয়, বেশি দিলে সমস্যা নেই, কিন্তু কম দিলে যাকাত পরিপূর্ণ আদায় হয় না, গুনাহ হয়। বিভিন্ন ধনসম্পদের হিসাব কষে যাকাতের পরিমাণ বের করতে হয়। বিদ্যানন্দ নাকি ইসকনের একটি সংগঠন, আর ইসকন হচ্ছে হিন্দুদের একটি সম্প্রদায়। এই সংগঠনের টাকা দিয়ে ইফতারের আয়োজন হয়, আবার পূজার জন্য ব্যয় হয়। এই প্রতিষ্ঠানকে তাই যাকাতের জন্য অনেকেই নির্ভরযোগ্য মনে করেন না।

যাকাত ইচ্ছে করলে যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া যায় না এবং যায় না বলেই নানাবিধ প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। যাকাত দেওয়া হয় ধর্মীয় নির্দেশে, তাই যাকাত প্রদানে ধর্মের বিধিবিধান মেনে চলা অত্যাবশ্যক। কারা কারা যাকাত পাবে তার তালিকা পবিত্র কোরআনে রয়েছে— ‘যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত উসুলকারী ও যাদের চিত্তাকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাসমুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্যে। এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়’ (সূরা তাওবা—৬০)। এই খাতগুলো নিয়ে আলেমদের ব্যাখ্যা এবং মতভেদ রয়েছে; ধর্ম নিয়ে যত মতভেদ তা ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে। ধর্মে খুব কম বিষয় আছে যা নিয়ে দুনিয়ার সকল আলেম একমত পোষণ করেছেন। যাকাতের এই আটটি খাত নিয়েও আলেমদের ব্যাখ্যার ভিন্নতা রয়েছে।

কোরআনে উল্লেখিত আট খাতের মধ্যে কোন খাত অগ্রগণ্য তা নিয়েও মতভেদ আছে। তবে গরিব-মিসকীনরাই বেশী হকদার বলে মনে হয় এবং সেজন্যই সম্ভবত আল্লাহ্‌ তাআলা তাদেরকে প্রথমে উল্লেখ করেছেন। নবী করিম (স.)-ও মুআ’য বিন জাবাল (রাঃ)-কে ইয়েমেনে পাঠানোর কালে বলেন, ‘তাদেরকে জানাবে যে, আল্লাহ্‌ তাদের সম্পদে যাকাত দেওয়া ফরজ করেছেন; যা তাদের ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং গরীবদের মাঝে বণ্টন করা হবে’। আলেমদের মতে কোন ফকির বা মিসকিন বছরের মাঝখানে ধনী হয়ে গেলেও তাকে তার গৃহীত যাকাত আর ফিরিয়ে দিতে হবে না। কোরআনে সরাসরি কোন প্রতিষ্ঠানকে যাকাত দেওয়ার কথা বলা নেই, কিন্তু যাকাত উসুলকারী বা যাকাত সংগ্রহকারীর কথা বলা আছে। এক্ষেত্রে আলেমদের ব্যাখ্যা হচ্ছে, এখানে রাষ্ট্রের যাকাত ফান্ডের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইসলামি ব্যাংকসহ অনেক প্রতিষ্ঠানই যাকাত সংগ্রহ করে থাকে। এই বিবেচনায় বিদ্যানন্দ বা অমুসলমানদের যাকাত দেওয়া যাবে কি না তা বিচার্য। কোরআনে উল্লেখিত ৮টি খাত বিশ্লেষণ করা হলে এ ব্যাপারে কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যাবে না।

মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল্লাহর কথা মানলে কোন প্রতিষ্ঠানকে যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে না; কারণ যাকে যাকাত দেওয়া হবে তিনি অবশ্যই সেই অর্থের মালিক হবেন এবং স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছেমত সেই অর্থ খরচ করতে পারবেন। ইসলামি ব্যাংক, বিদ্যানন্দ, সলিমুল্লাহ এতিমখানা, আল মারকাযুল ইসলামী, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে যাকাত দেওয়া হলে তা গরিব, মিসকিনদের জন্য ব্যয় করা হলেও এই যাকাতের মালিক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান— কোন গরিব, মিসকিন নয়; এই যাকাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তাদের ইচ্ছেমত খরচ করে, কোন গরিব বা মিসকিন তার ইচ্ছামত খরচ করতে পারে না। এক্ষেত্রে যাকাতের মালিক হলো প্রতিষ্ঠান, কোন গরিব বা মিসকিন নয়, প্রতিষ্ঠানে দেওয়া যাকাত গরিব-মিসকিন ইচ্ছেমত খরচ করতে পারে না। তাই মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল্লাহর ফতোয়া মানলে কোন প্রতিষ্ঠানকে যাকাত দেওয়া যায় না।

মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল্লাহর কথামতো কোন প্রতিষ্ঠানকে যাকাত দেওয়া না গেলে কোরআনের নির্দেশনা মোতাবেক দাস মুক্ত করার জন্য ক্রীতদাসের মালিককে কীভাবে যাকাত দেওয়া যায় তা স্পষ্ট নয়। শুধু তাই নয়, আলেমদের অভিমত হচ্ছে, কাফেরের হাত থেকে একজন মুসলমানের বন্দিত্ব ঘুচাতেও যাকাতের টাকা ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু এই সকল যাকাতের অর্থ পাচ্ছে একজন ক্রীতদাসের মালিক বা একজন কাফের, এক্ষেত্রে ক্রীতদাস যাকাতের অর্থের মালিক হয় না, মালিক হয় না বিধায় যাকাতের অর্থ তার ইচ্ছেমত খরচের প্রশ্নই আসে না। একজন মুসলমানকে কেউ অপহরণ করলে তার মুক্তিপণও যাকাতের অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা যায়; কিন্তু এতে অপহরণকারী কাফের পুনরায় অপহরণ করতে উৎসাহিত হতে পারে। ক্রীতদাস বা ক্রীতদাসীকে মুক্ত করতে যাকাতের অর্থ ব্যবহারের কথা কোরআনে আছে, তাই এই বিষয়ে কোন বিতর্ক থাকতে পারে না। এই প্রেক্ষিতে মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল্লাহর কথা সব ক্ষেত্রে মানা যায় না; তার ফতোয়া সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বিধায় কোন প্রতিষ্ঠানকে যাকাত দিতে বাধা থাকার কথা নয়। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর নেতৃত্বে পরিচালিত কোন প্রতিষ্ঠানে যাকাত দেওয়া যাবে কি না? কোরআনে বর্ণিত আটটি খাত ব্যতীত মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণেও যাকাত দেওয়ার বিধান নেই।

ফতোয়ায়ে-হিন্দিয়াহ গ্রন্থে অমুসলিমদের যাকাত দিতে নিষেধ করা হয়েছে; কিন্তু কোরআনে উল্লেখিত আটটি খাতের কোথাও এই নিষেধাজ্ঞা নেই। গরীবদের খাবার যোগানোর জন্য ২০১৩ সনে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিশোর কুমার দাশ। ‘বিদ্যানন্দ’ এবং ‘কিশোর কুমার দাশ’ দুটোই অনেকের কাছে ছোঁয়াচে রোগ। আনন্দসহকারে বিদ্যা অর্জনের ‘বিদ্যানন্দ’ শব্দটি কেন অচ্ছুত তা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা প্রায় অসম্ভব। কিশোর কুমার দাস মুসলমান নন, তাই তার নেতৃত্বে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের সুখ্যাতিতে অনেকে ঈর্ষান্বিত। কিন্তু এই ঈর্ষা পরিলক্ষিত হয় না জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, ব্রজমোহন কলেজ, নটরডেম কলেজ, হলিক্রস কলেজ, সেন্ট যোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নুন স্কুল ও কলেজ, ভারতেশ্বরী হোমস, সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্ষেত্রে। এই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে শুধু ছাত্র-ছাত্রী নয়, অভিভাবকগণও তুষ্টিতে ভোগেন। বাংলাদেশের অগণিত ক্ষুধার্ত ও সুবিধাবঞ্চিতদের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ‘বিদ্যানন্দ’ মানবতার জয়গান গেয়ে যাচ্ছে, শুধু এক টাকার বিনিময়ে পথশিশুদের খাবার দিচ্ছে। এই সংগঠনটি এখন লাখ লাখ অভুক্ত, সুবিধা-বঞ্চিত, আশাহীন মানুষের বেঁচে থাকার ভরসা। নাম নিয়ে টানাহেঁচড়া হচ্ছে বলে দেহ নিয়ে টানাহেঁচড়া করার সুযোগ কিশোর কুমার দাশ রাখেননি, দেহদান করে দিয়েছেন।

যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে হযরত ওমর (রা.) এবং হযরত ওসমান (রা.) কিছু পরিবর্তন এনেছেন। তারা এই পরিবর্তন কোন ক্ষমতাবলে করেছেন তা আমার জানা নেই। কোরআনে উল্লেখিত ৮টি খাতের একটি হচ্ছে, যারা মুসলমান নয় তাদের যাকাত দিয়ে মুসলমান হতে উদ্বুদ্ধ করা। মক্কা-মদিনার আশেপাশের সব দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান হয়ে গেলে হযরত ওমর (রা.) এই যাকাত দেওয়া বন্ধ করে দেন এবং তখনকার সব আলেম তাতে সম্মতিও দেন। যাকাতের ক্ষেত্রে আরেকটি মতভেদপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ক্রীতদাস ও ঘোড়া; ইসলামী শরিয়া অনুসারে যাকাত দেওয়া জিনিসের মধ্যে ক্রীতদাস ও ঘোড়া এক সময় আওতামুক্ত ছিলো; কিন্তু ওসমান (রা.) খলিফা হওয়ার পর ক্রীতদাস এবং ঘোড়ার উপর যাকাত ধার্য করেন। তাই যাকাত নিয়ে হযরত ওমর (রা.) এবং হযরত ওসমান (রা.) নিজস্ব ধ্যানধারণার অভিব্যক্তি ঘটিয়েছেন। তবে সমাজে বৈষম্য নিরসনে যাকাত ইসলামের একটি সুষ্ঠু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যাকাত প্রদান কোন দয়া বা অনুকম্পা নয়, যাকাতের উপর রয়েছে নিঃস্ব মানুষদের হক। তাই প্রতিষ্ঠানের নাম বিদ্যানন্দ এবং তার প্রতিষ্ঠাতা ভিন্ন ধর্মের বলে তাদের পেছনে লাগাটা মানবতাবিরোধী। দাতাদের থেকে পাওয়া বিদ্যানন্দের মূল তহবিলের মাত্র ৫ শতাংশ যাকাত থেকে আসে। যাকাতের অর্থ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও তা থেকে সরে এসেছে বিদ্যানন্দ; তখন অনেকে বলা শুরু করে দিয়েছিল যে, যাকাত না নিয়ে বিদ্যানন্দকে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। বিদ্যানন্দের বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার হয়েছে এবং হচ্ছে— বিদ্যানন্দ ভারতের ‘র’-এর এজেন্ট, বিদ্যানন্দ ইসকনের অঙ্গসংগঠন, বিদ্যানন্দ নরেন্দ্র মোদির মুখপাত্র, বিদ্যানন্দ গো-চনা মিশিয়ে ইফতার বিতরণ করে ইত্যাদি। যদি তারা আর্থিক কোন অনিয়ম করে থাকে তাহলে অনিয়ম উদ্ঘাটনে অবশ্যই নিরীক্ষণ অপরিহার্য। আমরা মানুষের মঙ্গলে কিছু করি না, তাই বলে অন্যদের মানবিক কাজে বাধা দেওয়ার হীনমন্যতা অসহনীয়। মানবতার জন্য কিশোর কুমার দাশের অনেক ত্যাগ; সম্পদের প্রতি যাতে লোভ না জন্মায় সেজন্য কিশোর কুমার দাশ ও তার লাতিন স্ত্রী নিঃসন্তান থাকার ব্রত নিয়েছেন। এতদসত্ত্বেও ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি করে অভুক্ত মানুষগুলোকে বিদ্যানন্দের আহার থেকে বঞ্চিত করা অমানবিক ও নিষ্ঠুরতা।