১৭ এপ্রিল রাজধানীর উত্তরা হাউস বিল্ডিংয়ে বিজিবি মার্কেট, ১৫ এপ্রিল রাজধানীর নিউ সুপার মার্কেট, ১৩ এপ্রিল রাজধানীর নবাবপুরে একটি টিনশেড গোডাউন এবং ৪ এপ্রিল রাজধানীর বঙ্গবাজার আগুনে ভস্মীভূত হয়। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বঙ্গবাজারে প্রজ্জ্বলিত আগুনের লেলিহান শিখা দেখছিলাম। সকাল ৬টায় আগুনের সূত্রপাত হয়, বাতাস থাকায় তা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নেভাতে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের মোট ২২টি ফায়ার স্টেশন থেকে ৪৮টি ইউনিট বঙ্গবাজারের আগুন নেভাতে যোগ দেয়। তাদের সহায়তায় মাঠে নামে বিমানবাহিনী, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র‍্যাব এবং আনসার। পানি আনতে ব্যবহার করা হয় হেলিকপ্টার। সবার যৌথ প্রচেষ্টায় প্রায় সাড়ে ৬ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বঙ্গবাজার নামের সাথে জড়িত থাকা গুলিস্তান, মহানগরী ও আদর্শ হকার্স মার্কেটও পুড়েছে। ১৯৯৫ সনে আরও একবার এই বঙ্গবাজার আগুনে ভস্মীভূত হয়েছিল।

উল্লেখিত মার্কেটগুলোতে সরু পথে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন সহজে ঢুকতে পারেনি। দেশে লোকসংখ্যা বাড়ছে, ব্যবসা ও ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়ছে; ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় প্রত্যেকটি মার্কেটে পুরাতন অবকাঠামোর উপর কাঠ ও টিনের দোতলা, তিনতলা অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। কোন মার্কেটের আশেপাশে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল এবং শহীদউল্লাহ হলের মাঝখানের পুকুর থেকে হেলিকপ্টারে করে পানি এনে বঙ্গবাজারের আগুনে ঢালতে হয়েছে। একটু পানি দেওয়ার পর হেলিকপ্টারকে ছুটতে হয়েছে আবার পানি আনতে, পানি ঢেলে যতটুকু নেভানো সম্ভব হয়েছিল তা আবার দ্বিগুণ তেজে জ্বলে উঠেছিল বিরতির কারণে। অন্যদিকে ঢাকা কলেজের পুকুরে ১৫টি শক্তিশালী পানির পাম্প বসিয়ে সাতটি পাইপে করে পানি নিয়ে নিউ মার্কেটের আগুনে ঢালা হয়েছে। ইডেন কলেজ ও আজিমপুর কোয়ার্টার থেকেও পানি সংগ্রহ করা হয়েছে।

আগুন লাগলে বাতাসের বেগ তীব্র থাকে, এতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। আগুন লাগা নতুন কোন ঘটনা নয়, লেগেছে এবং লাগবে। স্বাধীনতার পরপর আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য পাটে আগুন লাগত, এখন লাগে পোশাকে। পোশাকও এখন আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য। দুটো পণ্যই দাহ্য পদার্থ, এই দুটো পণ্যে আগুন লাগলে নেভানো কঠিন। বঙ্গবাজারে সব পুড়ে ছাই হওয়ার পর আর নেভানোর প্রয়োজন হয়নি। সরকার ধারণা করছে, এই আগুন লাগিয়ে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য বিরোধী দল অনেক কাজই করে থাকে, সরকারের জনপ্রিয়তা নষ্ট হলেই তাদের বেনিফিট। তারা করোনার সময় করেছে, করোনা-উত্তর মূল্যস্ফীতি নিয়ে করেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে করেছে, ব্যাংকের তারল্য সংকট নিয়ে করেছে। এই সকল ক্ষেত্রে তাদের প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘গুজব’। বাস্তবতার সাথে সম্পর্ক না থাকায় বিরোধী দলের গুজবের সব অস্ত্র ভোঁতা হয়ে গেছে। অবশ্য আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে তারাও হয়তো একই কাজ করত। কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে বিরোধী দলকে আগুন লাগার পেছনে দায়ী করা ঠিক নয়। অপরাধ শনাক্ত করার জন্য সরকারের পুলিশ রয়েছে, গোয়েন্দা বাহিনী আছে, আধুনিক যন্ত্রপাতি আছে। আগুন লাগার সাথে জড়িতদের ধরতে না পারা সরকারের ব্যর্থতা। চিহ্নিত না করে পেছনে লাগা মানুষ পছন্দ করে না। দোষারোপ করার অতিরিক্ত আবেগ ধর্ম এবং রাজনীতি দুটোকেই কলুষিত করছে।

আগুন লাগার হরেক রকমের কারণ থাকতে পারে— সিগারেটের আগুন, মশার কয়েলের আগুন, গ্যাস সিলিন্ডারের আগুন, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে উদ্ভূত আগুন। জ্বলন্ত সিগারেট চোখ বন্ধ করে যেখানে সেখানে ফেলা হয়। তবে সব ক্ষেত্রেই এখন শর্ট সার্কিটের কথাই বলা হয়েছে থাকে। বৈদ্যুতিক তার একবার লাগানো হলে তা আর কখনো পরিবর্তন করা হয় না, বৈদ্যুতিক সুইচগুলোর কার্যক্ষমতা কখনো চেক করা হয় না। জ্বলন্ত মশার কয়েল পাশে রেখে ঘুমানোর অভ্যাস অনেকের রয়েছে। বহুতল ভবন করার নিমিত্তে কর্তৃপক্ষও আগুন লাগাতে পারে। অন্যদিকে গরমে সবাই অতিষ্ঠ। উত্তপ্ত পৃথিবীতে আগুন লাগবেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে— বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক ব্যবস্থা কাজে লাগিয়েও দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। ভবনের অভ্যন্তরে আগুন নেভানোর সর্বাধুনিক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বসুন্ধরা শপিং মলের আগুনে তার প্রয়োগ সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাই বলে আমাদের আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকবে না কেন? পানির আকাল। রাস্তায় রাস্তায় ওয়াটার হাইড্রেন্ট কেন নেই তার কোন ব্যাখ্যা আজও কোন কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে শোনা যায়নি। দুই ফুট রাস্তার পাশে হাজার হাজার বহুতল ভবন, রাজউককে শত শত বার ফাঁসি দিলেও বিল্ডিং কোড না মানানোর যথাযথ শাস্তি হবে না। আগুন নেভানোর ৬-৭ ঘণ্টা অনেক দীর্ঘ সময়, ফায়ার সার্ভিসের ৩০/৪০টি ইউনিট একযোগে চেষ্টা করেও তার আগে পারে না। মানুষ হতাশ হয়।

বঙ্গবাজারে আগুন নেভানোর কাজে ত্বরিত ঝাঁপিয়ে না পড়ায় বিক্ষুব্ধ জনতার একাংশ পাশে ফায়ার সার্ভিস কার্যালয়ে হামলা চালিয়েছে। আগুন লাগার প্রতিটি স্পটে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন অক্লান্ত পরিশ্রম করে থাকে, আগুনে পুড়ে তাদের লোক মারা যায়, আহত হয়— তারপরও তাদের প্রতি ভুক্তভোগীরা ক্ষেপে ওঠে।

সরকারের প্রতিটি সার্ভিস কেন্দ্রে বিক্ষুব্ধ জনতার আক্রমণ হচ্ছে; কেন আক্রমণ হয় তার কারণ উদঘাটন জরুরি। এক সময় বিদ্যুৎ বিভাগে আক্রমণ হতো, এখন বিদ্যুতের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় জনতার ক্ষোভ কমেছে। স্বাস্থ্যকর্মীর উপর বিক্ষুব্ধ জনতার আক্রমণ এখনো কমেনি। সরকারি হাসপাতালে নাম লিখা থাকলে যে কোন চিকিৎসকের হাঁকডাক বেড়ে যায়, রোগীর ভিড় হয়। অধিকাংশ সরকারি চিকিৎসক এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রাইভেট চিকিৎসায় পুরো সময় ব্যয় করেন, দিনে একবার আধা ঘণ্টার জন্য কর্মস্থলে এসে ম্যারাথন দৌড়ে রোগী দেখে আবার কর্মস্থল ত্যাগ করেন। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের লোকজন তেমন নয়, জীবন দিয়ে তারা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন।

বঙ্গবাজার অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বলে ২০১৯ সনে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কেউ গুরুত্ব দেয়নি। পুলিশ দিয়ে যেখানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা যায় না সেখানে একটি নিরীহ নোটিশের ক্ষমতা আর কতটুকু। ২০১৮ সনে দ্বিতীয় দফায় আগুন লাগার পর আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবাজার নির্মাণের ব্যবস্থা নিয়েছিল; কিন্তু বঙ্গবাজার মার্কেট সমিতি হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত সিটি কর্পোরেশনের নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের উপর স্থগিতাদেশ আরোপ করে। রিট না করলে হয়ত এখন ব্যবসায়ীদের এমন লোকসানের সম্মুখীন হতে হতো না। গাউছিয়া মার্কেটও ঝুঁকিপূর্ণ বলে ফায়ার সার্ভিস বিভাগ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমন মার্কেট ঢাকা শহরের সর্বত্র।

ক্ষোভ আর দুঃখের মধ্যেও আশা জাগানিয়া ঘটনা মনুষ্যকুলকে বাঁচতে অনুপ্রেরণা যোগায়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হিজড়ারা তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি পায়। কিন্তু টাকা আদায়ে জোরজবরদস্তির কারণে মানুষ তাদের দেখলে ভয় পায়। বহুদিন আগে এক সাহসী হিজড়া জঙ্গিকে পাকড়া করে মিডিয়ায় বেশ প্রচার পেয়েছিলেন। এবার আরও বড় খবর— বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বঙ্গবাজারের আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ২০ লাখ টাকা সাহায্য দেওয়া হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের ৪০ লক্ষ টাকা ছাড়াও কুমিল্লার এমপি আ ক ম বাহার উদ্দিনের ১০ লাখ টাকা এবং সহায়তা প্রদানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্বাসও রয়েছে। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়াতে বহু ব্যক্তি ও সংগঠন নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। ৪০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে পুড়ে যাওয়া টিন ও লোহা। কিন্তু যেভাবে প্রতিদিন ঢাকার বিভিন্ন মার্কেট পুড়ে যাচ্ছে তাতে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সরকার ও জনগণের সহানুভূতির রাখা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে।

হজের জমানো টাকা দিয়ে বঙ্গবাজারের ক্ষতিগ্রস্তদেরকে সাহায্য করলেন উত্তরার হিজড়া আলেয়া। বঙ্গবাজারের সব পোড়া কাপড় কিনে নিচ্ছে বিদ্যানন্দ। কিন্তু ইফতারের জন্য দেওয়া বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের ২০ হাজার টাকা নিয়ে বঙ্গবাজারের কিছু ব্যবসায়ী ঠাট্টা-তামাশা করেছেন, কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়ী ছিলেন বলেই সম্ভবত তাদের মধ্যে কিছুটা অহংবোধ রয়েছে। অনেকের কাছে ২০ হাজার টাকা এত ক্ষুদ্র যে তারা কোটি টাকার অহঙ্কারে বলেছেন, ‘সাকিবের টাকায় আমরা থুতু মারি, থু’। খুবই আপত্তিকর এই বক্তব্য। দাতার দান যত ক্ষুদ্রই হোক তাকে সম্মান করার রীতি নষ্ট করেছে বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা। এত দাবী কেন? এত কোটি টাকার অহংকার থাকলে ব্যবসায়িক পণ্যের ইনসিওরেন্স করেননি কেন? কেন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের পরিকল্পনা মোতাবেক বঙ্গবাজার রিকন্সট্রাকশন প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মামলা করলেন?

বঙ্গবাজারসহ সকল পোড়া মার্কেটের ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি মানুষ সহানুভূতিশীল। সহানুভূতিশীল মানুষগুলোর মধ্যে মানবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে সবার আগে শ্রদ্ধা জানাই সমাজের চোখে অচ্ছুত অপাঙ্তেয় হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষগুলোকে যারা তাদের সর্বস্ব নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। অন্যদিকে আগুন লাগার পেছনে প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। আগুন লাগার পেছনে কোন দুরভিসন্ধি থাকলে তা চিহ্নিত করে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে জনগণের সম্মুখে উন্মোচন করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।