জানুয়ারি ১৯, অকস্মাৎ পদত্যাগের ঘোষণা দেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন। প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন এ বছরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগেই পদত্যাগ করছেন। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত এবং নেতৃত্ব দেবার মতো যথেষ্ট শক্তি নেই—এই সকল কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন; কিন্তু কোন দেশের প্রধানমন্ত্রী এমন সব কারণ দেখিয়ে ইতঃপূর্বে পদত্যাগ করেছেন বলে মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কেউ ক্লান্তি বোধ করেছেন এমন নজিরও শোনা যায়নি। তিনি বয়সের ভারে ন্যুব্জও নন, মাত্র ৪২ বছর বয়স। তার বিরুদ্ধে নিউজিল্যাণ্ডে কোন আন্দোলন নেই, কোন অভিযোগ নেই, আছে সুনাম আর প্রশংসা। পদত্যাগের আগে তিনি অনেক চিন্তা-ভাবনা করেছেন, কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের মতো প্রাণশক্তি ফেরত আনতে পারেননি। তিনি বলেছেন, তার এমন মানসিক অবস্থায় দায়িত্ব পালন করলে দেশের ক্ষতি হতো। ৩৭ বছর বয়সে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন এবং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি মা হন; শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে তিনি জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেন।
প্রেমের কারণে সিংহাসন ত্যাগ করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড। ক্ষমতার মোহ না থাকার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে এবার নজির স্থাপন করলেন জেসিন্ডা আরডার্ন। ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন আধুনিক মালয়েশীয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ; ১৯৮১ সন থেকে ২০০৩ সন পর্যন্ত টানা ২২ বছর মালয়েশীয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, এই সময় তার উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন আনোয়ার ইব্রাহীম। ১৯৯৮ সনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের ডাক দিয়ে আনোয়ার ইব্রাহীম প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের বিরাগভাজন হন, ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে দুর্নীতি এবং সমকামিতার অভিযোগ দিয়ে মাহাথির মোহাম্মদ উপ-প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে বরখাস্ত করে কারাগারে পাঠান। ক্ষমতার মোহে ৯২ বছর বয়েসে আবারও তিনি রাজনীতিতে ফিরে আসেন। যাকে সমকামিতার অভিযোগে জেলে পুরেছিলেন তার দলের সাথে জোট বেঁধে ২০১৮ সনে সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি আবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। জোটভুক্ত দলের সাথে শর্ত মোতাবেক তিনি দুই বছর পর পদত্যাগ করলে নির্বাচনী জোটের আনোয়ার ইব্রাহিম বাকি দুই বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা; কিন্তু ক্ষমতার মোহ তাকে এত বেশি অন্ধ করে ফেলেছিল যে, নির্বাচনী জোটকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে তিনি টালবাহানা শুরু করেন, যার ফলশ্রুতিতে জোট সরকারের পতন ঘটে। তিনি তার ৯৭ বছর বয়সে আবারও নির্বাচনে প্রার্থী হন, কিন্তু তিনি এত কম ভোট পেয়েছিলেন যে, তিনি জামানত হারান।
জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অবস্থান করেও জেসিন্ডা আরডার্ন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা উপভোগ করেননি, তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সঠিকভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করা কঠিন, এর কোন ধরাবাঁধা সীমা থাকে না। যারা নির্দিষ্ট পদের দায়িত্ব পালন করেন তাদের চিন্তা-চেতনায় সার্বক্ষণিক দায়িত্ববোধ জাগরুক থাকে। তাই বোধ হয় জেসিন্ডা দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েই পরদিন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পেরেছিলেন এবং স্বস্তির ঘুমের কথা তিনি মিডিয়াকে হাসিমাখা মুখে বলতে পেরেছিলেন। একমাত্র নির্লোভ ব্যক্তিরাই এমন স্বস্তি ও আনন্দ উপভোগ করতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে কিছু কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছিল। তার আমলেই করোনা অতিমারির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, সারা পৃথিবী পরস্পর পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে করোনায় হাজার হাজার লোকের মৃত্যু হলেও জেসিন্ডা আরডার্নের নিউজিল্যাণ্ড করোনা নিয়ন্ত্রণে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল, নিউজিল্যাণ্ডে মৃত্যু হয়েছে খুবই কম। জেসিন্ডার নেতৃত্বে প্রায় এক বছর একটি দেশ তার নাগরিকদের ঘরের ভেতর আবদ্ধ করে রেখেছিল, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ ছিল, দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদনে স্থবিরতা নেমে আসে, সরকারকে কর্মহীন লোকদের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে হয়েছিল। তারপরও তিনি হতোদ্যম হননি। পরবর্তীকালে সংঘটিত ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে উদ্ভূত অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতেও তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন।
সাঁইত্রিশ বছর বয়সে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে জেসিন্ডা আরডার্ন পৃথিবীব্যাপী আলোড়ন তুলেছিলেন। আরডার্নের পদত্যাগের ঘোষণাকে তার ‘চারিত্রিক বিনয়ের প্রমাণক’ হিসেবেও উল্লেখ করা হচ্ছে। ২০১৯ সনে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের দুটো মসজিদে এক শ্বেতাঙ্গ হামলাকারীর গুলিতে ৫১ জনেরও বেশি মুসল্লির মৃত্যু হয়। প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন মাথায় স্কার্ফ পরে হামলায় নিহত পরিবারের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। তিনি মুসলিম মহিলাদের ধর্মীয় পোশাক স্কার্ফ পরে উগ্র শ্বেতাঙ্গদের মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। ভিন্ন ধর্মের প্রতি তার এই সমমর্মিতা বিশ্বের সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছিল।
ক্ষমতার মোহ খুব কম মানুষই উপেক্ষা করতে পারেন। আধুনিক শাসকদের মধ্যে ফিলিপিন্সের সাবেক স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোস ২১ বছরেরও বেশি দিন ক্ষমতায় দিলেন, মিশরের সামরিক শাসক মুহাম্মদ হোসনি মুবারাক ছিলেন ৩০ বছর, ইরাকের সাবেক রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেন ছিলেন ২৪ বছর, লিবিয়ার মুয়াম্মর আল-গাদ্দাফি ছিলেন ৪২ বছর। অন্যদিকে রাজা-বাদশাহরা ক্ষমতায় থাকেন আমৃত্যু। তবে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত শাসক জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ক্ষমতায় থেকেও তিনি পরিচিতি লাভ করেছিলেন একজন মানবিক, সহনশীল, জনপ্রিয় রাজনীতিক হিসেবে। তাই সব পদত্যাগ সব সমস্যার সমাধান নয়।
আমাদের বাঙালি জাতি সব সময় মন্ত্রীদের পদত্যাগ কামনা করে থাকে। কোথাও কোন সমস্যা হলে, দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী দায়ভার নিয়ে পদত্যাগ না করলে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। একটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিদিন অসংখ্য কাজ হয়, সব কাজের দায়ভার নিয়ে মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হলে দেশে মন্ত্রীর আকাল পড়ে যাবে। এক রেল দুর্ঘটনায় বহু প্রাণহানির ঘটনার দায় স্বীকার করে নিয়ে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী রেলমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন। তার এই নজিরবিহীন ব্যক্তিত্ব ও মানসিকতা দেশবাসীর ভূয়সী প্রশংসা এনে দিয়েছিল। কিন্তু রেল দুর্ঘটনার জন্য রেলমন্ত্রী দায়ী হবেন কেন? প্রযুক্তির সব কিছু নিয়ন্ত্রণ বা মনিটর করা কোন মন্ত্রীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। দুর্ঘটনার জন্য কারো অবহেলা থাকলে তাকে দায়ী করে শাস্তি দেওয়াই শ্রেয়। তবে কোন অন্যায় কাজে মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা থাকলে তাকে শুধু পদত্যাগ নয়, আইনের মুখোমুখি করা জরুরি।
পদত্যাগের পর জেসিন্ডা আরডার্নকেও তুলোধুনো করা হচ্ছে—কেউ বলছে সামনের নির্বাচনে তার লেবার পার্টির পরাজয় ঠেকানোর মতো কৌশলী নন বলেই দায়িত্ব থেকে জেসিন্ডা আগেভাগে সরে পড়েছেন। তবে জেসিন্ডা আরডার্নের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোন অভিযোগ নেই, দেশ শাসনে তার আন্তরিকতার অভাবের কথা কেউ বলছেন না। তাকে অনেক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হলেও তিনি ছিলেন কালিমামুক্ত; তাই জেসিন্ডা আরডার্নের পদত্যাগ হচ্ছে একজন নির্লোভ, নিরহংকারী, দেশপ্রেমিকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের ইতিহাস সৃষ্টি।