বর্তমানে বিতর্কের কেন্দ্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন; সাম্প্রতিককালে যার দুইটি বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সময়ে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বল্প আয়ের জনগণের জীবননির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষগুলোর অবস্থা মূল্যায়নে অসমর্থ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হঠাৎ বলে বসলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে’। অন্যদিকে ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে ‘টিকিয়ে রাখার অনুরোধ’ করার কথা ফাঁস করে দিয়ে কঠিন বিপদে পড়েছেন। আওয়ামী লীগও তার এমন বক্তব্যকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বক্তব্য প্রদানে সাবধানতা অবলম্বন করতে বলেছেন। তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদের কথা অনুযায়ী ড. মোমেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কেউ নন বিধায় তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা একান্তই তার ব্যক্তিগত। আবার আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগেরই কেউ নন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে এবার আইনি চ্যালেঞ্জও এসেছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে তাকে আইনি নোটিশও পাঠিয়েছেন একজন আইনজীবী।
ড. মোমেন একজন দুর্ভাগা পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তার কথার দায়িত্ব আওয়ামী লীগ নিতে চাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ এমন একটি রাজনৈতিক দল, যে দল থেকে কেউ একবার বহিষ্কৃত হলে সঙ্গে সঙ্গে ঐ ব্যক্তি অচ্ছুত ও অপাঙ্ক্তেয় হয়ে যায়। দলের জন্য তার দীর্ঘদিনের অবদান মুহূর্তের মধ্যে অস্বীকার করা শুরু হয়, তার অপকীর্তির ফিরিস্তি দল থেকেই প্রচার হতে থাকে। কিন্তু বহিষ্কৃত লোকটি এত মন্দ স্বভাব নিয়ে দীর্ঘদিন কীভাবে দলে ছিলেন তার জবাব কোন নেতার কাছে পাওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় ড. কামাল হোসেন এবং বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের প্রতি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বীতশ্রদ্ধ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু এই দুইজনের প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণ আওয়ামী লীগের জন্যই মর্যাদাহানিকর। এই দুইজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে মনেপ্রাণে সমীহ করেন। আওয়ামী লীগের এমন অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্যই অবসরপ্রাপ্ত মেজর আকতারুজ্জামান টকশোতে একবার উল্লেখ করেছিলেন যে, বিএনপি তাকে তিনবার বহিষ্কার করে তিনবারই ফেরত নিয়েছে, আওয়ামী লীগ হলে একবারই ফেরত নিতো না, তাই তিনি কখনো আওয়ামী লীগ করবেন না।
আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী একটি দলের নেতারা যেভাবে বক্তব্য দেন তা জনগণের কাছে ওজস্বী মনে হয় না। সাধারণ সম্পাদক যেভাবে কাগজ, মোবাইলের স্ক্রিন বা ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখে বক্তব্য দেন তা জনগণের মনে কোন দাগ কাটে না। ভুল এড়িয়ে চলার স্বার্থে লিখিত বক্তব্য দেওয়ার এই রীতি জনগণকে আকৃষ্ট করে না। বঙ্গবন্ধুও এই দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তিনি কখনো লিখিত বক্তব্য দেননি, এমনকি জাতির সঙ্কটময় মুহূর্তেও অলিখিত যে বক্তৃতা তিনি দিয়েছিলেন তা শুনলে এখনো গায়ের রোমকূপে শিহরণ জাগে, ইউনেস্কো আজ সেই ভাষণকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ড. মোমেনের ব্যক্তিগত আলাপের দায়ভার সরকার নেবে না—তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদের এমন বক্তব্যের মধ্যেও ম্যাচিউরিটি নেই। ড. মোমেন নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগের লোক, তিনি আওয়ামী লীগের একজন এমপি। আওয়ামী লীগের লোক হতে হলে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হতে হয় না, আওয়ামী লীগ বা মন্ত্রিসভার সব লোক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নন। আওয়ামী লীগের লোক না হলেও তিনি সরকারের লোক, সরকার আর দল একাকার করার সুযোগ নেই। পছন্দ না হলে বা উপযুক্ত প্রতিপন্ন না হলে প্রধানমন্ত্রী যে কোন সময় ড. মোমেনকে সরিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু তাকে বা তার বক্তব্যকে অস্বীকার করা ছেলেমি।
করোনা-উত্তর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়াকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার অপপ্রয়াসে পৃথিবীতে নেমে আসা অর্থনৈতিক দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে ড. মোমেন বলেছেন, ‘আমরা বেহেশতে আছি’। জনগণের আর্থিক কষ্টের এই মুহূর্তে কথাটি না বলে অন্য সময়ে বললে এত অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হতো না। সুখ এবং শান্তিময় পরিবেশকে আমরাও প্রায়ই বেহেশতের সাথে তুলনা করে থাকি। আমেরিকা এবং ইউরোপের ধনী দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি আমাদের চেয়ে বেশী, প্রচুর নগদ অর্থ থাকায় তাদের পক্ষে জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, কিন্তু অফুরন্ত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তারা মিতব্যয়ী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ব্যতীত অন্য যে কোন দেশের তুলনায় আমাদের দেশের অবস্থা ভাল। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কা ইতোমধ্যে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে, ভুটানের রিজার্ভ এক বিলিয়নে নেমে এসেছে, বিদেশি এনজিওগুলোর রিলিফ সহায়তা না থাকলে এতদিনে আফগানিস্তানের অধিকাংশ লোক না খেয়ে মারা যেত, নেপাল এবং পাকিস্তানের আর্থিক অবস্থা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। আফ্রিকার বহু দেশে দুর্বিষহ দুর্ভিক্ষ বিরাজ করছে। বিশ্বের এমন একটি ভয়াবহ পরিবেশে অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশের অবস্থা কিছুটা ভাল বোঝাতে ড. মোমেন বেহেশতের কথা বলেছেন। কিন্তু কষ্ট এবং দুর্ভোগের মধ্যে এই তুলনাটি উপহাসের বার্তা বহন করে। স্থান, কাল, পাত্র বিবেচনা করে কথা বলেননি বলে ২০০২ সনে বিএনপি’র তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী উপহাসের পাত্র হয়েছিলেন। গুলিতে নিহত শিশুর স্বজনদের সান্ত্বনা জানাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন’। কথাটি কিন্তু মিথ্যা নয়, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কারো জানকবজ হয় না। রামপুরায় বাবার কোলে থাকা ২০ মাসের শিশু নওশিন ছিনতাইকারীদের গুলিতে নিহত হবার পর শোকার্ত পরিবারের প্রতি এমন কথা দেশের জনগণের কাছেও উপহাসের মতো মনে হয়েছে। এমন রসিকতা আরও অনেকে করেছেন। ভবনের স্তম্ভ ধরে হরতালকারীদের টানাটানি করার কারণেই সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়েছে বলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর উল্লেখ করেছিলেন। ২১শে আগস্টে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা নিয়ে খালেদা জিয়া উপহাস করে বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে আবার কে মারতে যাবে! উনি তো নিজেই ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গেছেন, নিজেই গ্রেনেড হামলা করেছেন’। তাই রাজনীতির মাঠে রসিকতা তৈরির কুশীলব ড. মোমেন একা নন।
শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে ড. মোমেনের কথাটি জাতীয় স্বার্থ আদায়ের কৌশলও হতে পারে। শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করার দরকার তাই তাই করতে তিনি ভারতকে অনুরোধ করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কথাটি বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে। শেখ হাসিনা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত যাবেন এবং আগামী বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সম্ভবত এটিই হবে শেখ হাসিনার শেষ ভারত সফর। ভারত যদি তিস্তার পানি বণ্টনের চুক্তিসহ ভারতের সাথে অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধান করে তাহলে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বাড়বে, তিনি জনসমর্থন নিয়ে টিকে যাবেন। তাই ‘শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে’ রাখার জন্য ভারতকে অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধানে এগিয়ে আসা জরুরি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সারবত্তা এটা হওয়াই স্বাভাবিক। শক্তি দিয়ে ভারত হাসিনাকে রক্ষা করতে পারবে না, এটা কোন দেশের জনগণ মেনে নেয় না। ভারত শেখ হাসিনাকে রক্ষা করবে কী করে, তারা তো বঙ্গবন্ধুকেও রক্ষা করতে পারেনি। বাস্তবতা হচ্ছে, পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলো তাদের গোয়েন্দাদের ষড়যন্ত্রে অপছন্দনীয় শাসকের পতন ঘটাতে পারে, খুন করতে পারে, কিন্তু রক্ষা করতে পারে না। ক্ষমতাধর দেশগুলোর ইশারায় ইরাকের সাদ্দাম হোসেন মরেছেন, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি খুন হয়েছেন, চিলির সালভাদর আলেন্দে নিহত হয়েছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার শিকার হয়েছেন এবং পাকিস্তানের ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। কিন্তু আমেরিকা তাদের অনুগত শাসক ফিলিপিন্সের একনায়ক ফার্দিনান্দ মার্কোস, ইরানের শাহানশাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী বা আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানিকে রক্ষা করতে পারেনি। মহাশক্তিধর যেখানে তাদের অনুগত শাসকদের রক্ষা করতে পারে না, সেখানে ভারত কী করে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করবে!
সবাই বক্তব্য প্রদানে পটু নন। বাগ্মিতা একটা আর্ট, সবাই তা রপ্ত করতে পারে না। শুধু বাগ্মিতার জোরে বহু রাজনীতিবিদ ক্ষমতায় এসেছেন, জনপ্রিয় হয়েছেন। ১৯৬৩ সনে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র জগদ্বিখ্যাত একটি ভাষণ দিয়েছিলেন; বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ এই বক্তৃতার খণ্ডাংশ পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মুখে মুখে আজও উচ্চারিত হয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের ‘গেটেসবার্গ অ্যাড্রেস’-এর অংশ ‘গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল’—আজও মানুষের কণ্ঠে শোনা যায়। ‘রিভোনিয়া ট্রায়াল’ নামের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নেলসন ম্যান্ডেলার ১৭৬ মিনিটের ভাষণে উচ্চারিত ‘আমি মরতে প্রস্তুত’ আজ বিশ্বইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অনবরত পাগলাটে আচরণ করেছেন এবং উদ্ভট উদ্ভট কথা বলে তিনি হিলারি ক্লিনটনের মতো ঝানু রাজনীতিবিদকে পরাজিত করেছেন। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশরা উগান্ডাবাসীর উপর যে অপমানজনক ব্যবহার করেছিল তার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে তার জন্য জুতা সরবরাহের অনুরোধ করেছিলেন, পালকিতে চড়ে তিনি শ্বেতাঙ্গদের পালকির বাহক বানিয়েছিলেন। সবাই বঙ্গবন্ধু আর নেলসন ম্যাণ্ডেলার মতো সহজাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। ভাল বক্তা না হলে দলের কেউ হবে না এমন বক্তব্যও কৌশলী বক্তার পরিচায়ক নয়। ড. হাসান মাহমুদ এবং আবদুর রহমানকে মনে রাখতে হবে, কেন্দ্রীয় কমিটিবহির্ভূত সমর্থকেরাই কথা বলে আওয়ামী লীগ টিকিয়ে রেখেছে। তাদের আরও মনে রাখা দরকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগের কেউ না হলেও সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাকে কথা বলতেই হবে। তবে এটাও ড. মোমেনকে মনে রাখতে হবে যে, দ্বিপাক্ষিক গোপনীয় কথা তৃতীয় ব্যক্তির কানে তোলা দক্ষ কূটনীতির পরিচায়ক নয়। ক্ষমতাবান দেশগুলো কূটনৈতিক ভাষায় গোপনে ধমক দেয়, হুমকি দেয়, শর্ত আরোপ করে—এইগুলো কখনো আলোর মুখ দেখে না, হজম করতে হয়। তাই নেতাদের সর্বদা প্রশিক্ষণের মধ্যে থাকা উচিত। আওয়ামী লীগের যারা নিজেদের কেন্দ্রীয় নেতা মনে করেন তাদের কথাবার্তাও যুৎসই এবং মনোগ্রাহী হওয়া অপরিহার্য।