ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের শিল্পমন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে গ্রেপ্তার করেছে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠজন মডেল ও অভিনেত্রী অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে প্রথমে ২১ কোটি ৯০ লাখ রুপি উদ্ধার করার পর তার আরেকটি ফ্ল্যাট থেকে পরদিন উদ্ধার করা হয় ২৮ কোটি ৯০ লাখ রুপি এবং ৫ কেজি স্বর্ণ। ইডির ধারণা, শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন শিক্ষক নিয়োগের সময় নেওয়া ঘুষের অংশ এসব রুপি। পার্থ শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে নিয়োগ পরীক্ষায় শুধু মেধাক্রম লঙ্ঘন করেননি, পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ব্যক্তিরও চাকরি দিয়েছেন। কলকাতা হাইকোর্ট শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারির তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল। তবে শুধু শিক্ষক নিয়োগ থেকে এত টাকা কামাই হওয়ার কথা নয়। জমির প্রকৃতি বদল করে আবাসিক ভবন তৈরির সুযোগ করে দেওয়ার কারণে রিয়েল এস্টেট সংস্থাগুলোও তাকে কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে থাকতে পারে। পার্থ তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিবও ছিলেন। তার এই গ্রেপ্তার তাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে বিপদে ফেলে দিয়েছে।
দুর্নীতি কমবেশী সব দেশেই আছে। যারা দুর্নীতি করে অঢেল টাকার মালিক হন তারা সচরাচর সেই টাকা দেশে রাখেন না, বিদেশে পাচার করে দেন। আমদানি-রপ্তানি এবং হুন্ডিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে টাকা পাচার হওয়ার কাহিনী যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়ে আসছে। একবার বিদেশে পাচার হয়ে গেলে সেই টাকার হদিশ পাওয়া সহজ নয়। কারণ কয়েকটি দেশের ব্যাংকে অন্য দেশের লোকদের অবৈধ টাকা রাখার সুযোগ রয়েছে। এই ব্যাংকগুলো সাধারণত গ্রাহক ছাড়া আর কাউকে তথ্য সরবরাহ করে না। এক সময় সব দেশের দুর্নীতিবাজদের টাকা রাখা হতো সুইজারল্যাণ্ডের ব্যাংকে। কিন্তু পরবর্তীতে ব্যাংক একাউন্টের এই গোপনীয়তা দেশে দেশে জঙ্গি তৎপরতায় অর্থ যোগানের ক্ষেত্রে সহায়ক বিবেচিত হওয়ায় তা প্রকাশের জন্য চাপ বাড়তে থাকে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে। এই চাপের কারণে ব্যাংকগুলো বর্তমানে কিছু তথ্য প্রকাশ করে এবং তাতেই আমরা অবৈধ অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে সামান্য ধারণা নিতে পারি। কিন্তু অবৈধ অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে প্রকাশিত এই সকল তথ্য কোন কাজেই লাগে না। অধিকতর তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে রয়েছে দেশে দেশে গড়ে উঠা ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। তবে এই ইউনিট গড়ে উঠেছে অবৈধ অর্থ ফেরত আনার জন্য নয়, অবৈধ অর্থ যাতে কোনভাবেই জঙ্গি তৎপরতায় ব্যবহৃত না হয় তা নিশ্চিত করতে। আমাদের দেশেও এমন একটি ইউনিট রয়েছে। আমাদের এই ইউনিট বিভিন্ন দেশে পাচার করা অর্থের তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সফল হয়নি। তাদের সংগৃহীত তথ্য আবার সাক্ষী বা প্রমাণক হিসেবে আদালতে ব্যবহার করা যায় না, শুধু আমাদের দেশের অভ্যন্তরে অধিকতর তদন্তের কাজে ব্যবহার করা হয়। অধিকতর তদন্তের ভিত্তিতে দেশে দায়ের করা মামলায় অনুকূল রায় পাওয়া গেলেও বিদেশি ব্যাংক সচরাচর অবৈধ টাকা ফেরত দেয় না, ঐ দেশের আদালতে মামলা করে পুনরায় জিততে হয়। শুধু তাই নয়, আরও প্রক্রিয়া রয়েছে—অর্থ ফেরত আনতে শুধু আদালতের অনুকূল রায়ই যথেষ্ট নয়, সংশ্লিষ্ট দুই দেশের মধ্যে অবৈধ অর্থ প্রত্যাবর্তনের সমঝোতা চুক্তি থাকাও অপরিহার্য।
পার্থ চট্টোপাধ্যায় সম্ভবত কিছু অর্থ প্রেরণ করেছেন বাংলাদেশে। তার পাঠানো অবৈধ টাকা দিয়ে বাংলাদেশে নাকি জমি কেনা হয়েছে। পার্থের বাংলাদেশী কয়েকজন সুহৃদের খোঁজ গোয়েন্দা সংস্থা থেকে নেয়া হচ্ছে বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। পার্থ তার অবৈধ টাকা বাংলাদেশে পাচার করেছে, অন্যদিকে পি কে হালদার বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার করেছেন ভারতে। পি কে হালদার ভারতে নিয়ে বিপদে পড়েছেন, এখন তিনি হাজতে, ভারত সরকার তার সম্পদের হিসাব-নিকাশ নিচ্ছে। বাংলাদেশ কিন্তু বড় অর্থনীতির দেশ নয়, আমাদের ব্যাংকগুলোর গ্রহণযোগ্যতা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একেবারেই নেই। তাই বাংলাদেশের ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে বড় অঙ্কের অবৈধ টাকা বৈধ করার সুযোগ কম।
বাংলাদেশের দুর্নীতিবাজেরা অবৈধ টাকা হাতে এলেই ইংল্যাণ্ড, কানাডা, মালয়েশীয়া, থাইল্যাণ্ড, সিঙ্গাপুর, আবুধাবি প্রভৃতি দেশে পাচার করে দেয়। পাচার করা টাকা দিয়ে দুর্নীতিবাজ বাঙ্গালী প্রথমে কিনবে একটি বাড়ি; অবশ্য বাড়ি কেনার আগে সন্তান বা স্ত্রীর বিদেশি নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হয়। ঐ সকল দেশে বাড়ি কেনার জন্য সহজ শর্তে প্রচুর ঋণ পাওয়া যায়; তখন বৈধ ঋণে অবৈধ টাকা বিলীন হয়ে যায়। আমাদের দেশের ধনী লোকদের সবার নাকি বিদেশে রাজপ্রাসাদতুল্য বাড়ি আছে, ঐ সকল বাড়িতে তাদের সন্তান বা স্ত্রী বসবাস করে। সীমিত সম্পদ আর অগুনতি লোকসংখ্যার কারণে বাংলাদেশ এক সময় বসবাসের অযোগ্য হয়ে যেতে পারে। দুর্নীতিবাজেরা তাই অধিকতর সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত দেশে পাড়ি দিচ্ছে, দেশগুলো তাদের সাদরে বরণ করেও নিচ্ছে। পাকিস্তান এবং ভারত থেকে পাচার করা অর্থের পরিমাণ বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশী। বিশ্বের ১১টি দেশের ৬০০ সাংবাদিক যে ১ কোটি ২০ লক্ষ গোপন নথি ফাঁস করেছে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের ক্ষমতাধর কিছু লোক অবৈধভাবে অর্জিত ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা বিদেশে পাচার করে তা লুকিয়ে রেখেছেন। এদের মধ্যে ৯০টি দেশের ৩০০ জনেরও বেশি রাজনীতিক রয়েছেন। আগে উল্লেখিত দেশগুলো অবৈধ অর্থ পেয়ে খুশী, দেখেও না দেখার ভান করে। মালয়েশীয়া অবৈধ অর্থ দিয়ে বিদেশিদের ‘সেকেণ্ড হোম’ করে নিশ্চিত বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছে।
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেফতারে মমতা ব্যানার্জি এবার বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সরকারকে দোষারোপ করেননি, বলেননি যে, মোদি সরকার পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলকে ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্র করে পার্থকে অর্থ কেলেঙ্কারিতে জড়িত করেছে। গত বছর সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন বা সিবিআই কলকাতার মেয়র ও মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমসহ দলের বেশ কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক নেতাকে আরেক অর্থ কেলেঙ্কারির মামলায় গ্রেপ্তার করলে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কয়েক হাজার লোক নিয়ে সিবিআই দপ্তর ঘেরাও করেন। আমাদের মতো দেশে ক্ষমতাসীন দলের লোকদের ঘুষ-দুর্নীতির জন্য সচরাচর ধরা হয় না, তারা ধরা খায় অন্য দল ক্ষমতায় এলে। এক্ষেত্রে অবশ্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও কাজ করে।
আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায়, কোন মন্ত্রী বা আমলা ঘুষ-দুর্নীতির জন্য বিচারের সম্মুখীন হয়ে শাস্তি ভোগ করেছেন বলে জানা নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারালে মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করার হুমকি দিচ্ছে বিএনপি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগে নেতাদের দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলেও আওয়ামী লীগ থেকে বলা হবে, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের হেনস্তা করা হচ্ছে’; নেতাদের এমন বক্তব্য আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা বিশ্বাসও করবেন। এখন একই আচরণ করছে বিএনপি। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে বিএনপি’র নেতাদের অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিএনপি বলছে, ‘এইসব আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’। যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতি নিয়ে বর্তমানে সোচ্চার তাদের অধিকাংশ বিশ্বাস করেন না যে, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান বা কোকো রহমান দুর্নীতি করেছেন, তাদের বিশ্বাস সব আওয়ামী সরকারের ষড়যন্ত্র। অথচ যে সকল মামলায় বিএনপি’র নেতাদের শাস্তি হয়েছে সে সকল মামলা হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। দেশে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি’র বাইরে লোক খুব বেশী নেই; এই দুই দলের সমর্থক যখন বিশ্বাস করে তাদের দলের নেতারা দুর্নীতি করে না তখন দুর্নীতি নির্মূলের প্রতিশ্রুতি অর্থহীন।
উপমহাদেশের প্রতিটি দেশে দুর্নীতি নিয়ে দলীয় নেতারা সোচ্চার। দুর্নীতি দূর করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৪ সনের লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টিকে বিশাল জয় এনে দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। নরেন্দ্র মোদী বিরোধী দলের নেতাদের দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করে তার প্রতিশ্রুতি পালন করছেন, কিন্তু নিজের দলের কাউকে দুর্নীতির দায়ে বিচারের মুখোমুখি করছেন না। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও নির্বাচনী প্রচারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন; কিন্তু তার ক্ষমতায় থাকাকালীন পাকিস্তানে দুর্নীতি বেড়ে গিয়েছিল, এখন তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার অঙ্গীকার করেছিলেন। ইমরান খান এবং নরেন্দ্র মোদি একটি টাকাও বিদেশ থেকে ফেরত আনতে সমর্থ হননি। ইন্দোনেশিয়ার অনুসরণে বিদেশ থেকে টাকা ফেরত এনে দেশে বিনিয়োগের একটা প্রশ্নাতীত সুযোগ এবার বাজেটে বাংলাদেশ সরকার দিলেও কেউ টাকা ফেরত আনবে বলে মনে হয় না।
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের দুর্নীতি ফাঁস হওয়ার পর বিপাকে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার দল তৃণমূল কংগ্রেস। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি সম্পর্কে অবগত না হওয়াটাও মমতার নেতৃত্বের দুর্বলতা, আর যদি দুর্নীতি তার অনুমোদনে হয়ে থাকে তাহলে তা মমতার প্রধানমন্ত্রীত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ম্লান করার জন্য যথেষ্ট। ২০২৪ সনের লোকসভার নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদিকে চ্যালেঞ্জ করে বিরোধী জোট থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে মমতার। কিন্তু তার সব পরিকল্পনা পার্থকাণ্ডে ভেস্তে গেল বলে মনে হয়। ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে বিজেপি ১৮টি আসন দখল করে নিয়েছে। এ অবস্থায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এভাবে অপকর্মে জড়িয়ে পড়লে আগামী নির্বাচনে বিজেপি’র বিজয় নিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।