কলামের শিরোনামটি আমার বক্তব্য নয়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বঙ্গবন্ধুকে একাত্তরের পঁচিশে মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনারা তাঁর বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার বাঙ্গালী জাতিকে উজ্জীবিত রাখতে অনবরত বলে যাচ্ছিল ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের সাথে আছেন’। গ্রামে বাম রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট আমার এক মামার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো বঙ্গবন্ধু ধরা পড়েননি, মাও সে তুং বা হো চি মিনের মতো বঙ্গবন্ধু ‘আণ্ডার গ্রাউণ্ডে’ অবস্থান করে গেরিলা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সময় গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বাঙ্গালী জাতি উপলব্ধি করে যে, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী। পাকিস্তানি কারাগারে বঙ্গবন্ধুর আটক থাকার খবর প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯ জুলাই ফিন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকায়।
বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা থেকে তুলে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের লায়ালপুর ও মিয়ানওয়ালি জেলে এমন প্রকোষ্ঠে রাখা হয় যেখানে রাখা হতো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের। শহর থেকে দূরবর্তী উষ্ণতম স্থানে নিঃসঙ্গ সেলে তাঁকে বন্দী করে রাখার লক্ষ্য ছিলো, বঙ্গবন্ধুর জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা; গ্রীষ্মে অসহনীয় তাপমাত্রার এই শহরের কারাপ্রকোষ্ঠে কোন পাখা ছিল না। তাঁর ‘উন্মাদ’ হয়ে যাওয়ার খবরও মাঝে মাঝে পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুকে ‘পাগল’ করে দেওয়ার একটা পরিকল্পনাও পাকিস্তান সরকারের ছিলো। কিন্তু জেলখানার দুর্বিষহ পরিবেশ, দুঃসহ গরম এবং নিঃসঙ্গ কারাবাসও বঙ্গবন্ধুর মনোবল গুঁড়িয়ে দিতে পারেনি। রাষ্ট্রদ্রোহ এবং যুদ্ধ ঘোষণাসহ বারটি অভিযোগের ভিত্তিতে বেসামরিক ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর বিচার শুরু হয় কোর্ট মার্শালে। বিচারে যে তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড—সেই সংবাদও পত্রিকায় আসতে থাকে। এই প্রহসনের বিচার মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই তাঁর পক্ষে সরকারের নিযুক্ত উকিলের সহায়তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি পুরো বিচারপ্রক্রিয়ায় একবারও আত্মপক্ষ সমর্থন করেননি, বিচারের কোনো কার্যক্রমে অংশ নেননি; প্রতিবাদী মনোভঙ্গি নিয়ে বঙ্গবন্ধু বিচারের সকল কার্যক্রমে নিষ্পৃহ ছিলেন।
বিশ্বকে ধোঁকা দিতে এই প্রহসনের বিচারে আসামী পক্ষের আইনজীবী হিসেবে পাকিস্তানের খ্যাতনামা উকিল এ. কে. ব্রোহিকে নিযুক্ত করা হয়। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সেনা ট্রাইব্যুনাল ৪ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় ঘোষণা করে। মিয়ানওয়ালি জেলে দণ্ডাদেশ কার্যকর করার ব্যবস্থা নেওয়া হতে থাকে। যে সেলে তিনি ছিলেন তাঁর পাশে আট ফুট লম্বা, চার ফুট প্রশস্ত ও চার ফুট গভীর কবর খোঁড়া হয়। আদালতের রায় কার্যকর করার আগেই বঙ্গবন্ধুকে জেলের ভেতর হত্যা করার উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয় যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি যুদ্ধে নিহত হয়েছেন এবং তার মৃত্যুর জন্য যে ব্যক্তি দায়ী সেই ব্যক্তি মিয়ানওয়ালি জেলে রয়েছেন। নিয়াজি ছিলেন মিয়ানওয়ালি জেলার বাসিন্দা, আর জেলের অধিকাংশ কয়েদি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলো মিয়ানওয়ালির অধিবাসী। এই পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খাজা তোফায়েল বঙ্গবন্ধুকে ১৬ ডিসেম্বর রাতে জেলখানা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যান।
ইত্যবসরে ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ২৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে জেলখানা থেকে বের করে বাহাত্তরের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত রাওয়ালপিন্ডির বাইরে এক বাংলোয় অন্তরীণ রাখেন। বাংলোয় ভুট্টোকে দেখে বঙ্গবন্ধু জানতে চাইলেন, ভুট্টো তাঁর মতো বন্দী কি না। ভুট্টো জানালেন, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু ঠাট্টা করে বললেন, ‘আমি আপনার চেয়ে দ্বিগুণ আসন পেলাম, অথচ আপনি প্রধানমন্ত্রী!’ ভুট্টো বললেন, ‘ইচ্ছে করলে আপনিও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন’। ভুট্টো ইরানকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে একটি সমঝোতার প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তায় তা ব্যর্থ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে জেলখানা থেকে ড. কামাল হোসেনকে এনে বঙ্গবন্ধুর সাথে বাংলোয় থাকতে দেওয়া হয় এবং করাচি থেকে ড. কামালের স্ত্রী ও তাদের দুই মেয়েকে এনে বঙ্গবন্ধুর জন্য নির্ধারিত বিমানে তুলে দেওয়া হয়।
ভুট্টো এবং বঙ্গবন্ধুর মধ্যে যখন বাংলোয় কথা হচ্ছিল তখনও সারা বিশ্ব এবং স্বাধীন বাংলাদেশ নিশ্চিত হতে পারেনি যে, বঙ্গবন্ধু জীবিত, না মৃত। ভুট্টো ৮ জানুয়ারি খুব ভোরে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ার লাইন্সের একটি বিশেষ বিমানে তুলে দেন। তখনও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বার্তা বাংলাদেশ বা বৃটেনের কেউ জানে না, বিমান অবতরণের এক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়ান সাদারল্যাণ্ডকে প্রথম অবহিত করা হয়। তিনি লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনের সিনিয়র কর্মকর্তা রেজাউল করীমকে জানান। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে লন্ডনে পাকিস্তান দূতাবাসের অপেক্ষাকৃত সিনিয়র কূটনৈতিক রেজাউল করীম পাকিস্তান দূতাবাস ত্যাগ করে বাংলাদেশ মিশনে যোগ দেন, পরবর্তীতে তিনি খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হয়েছিলেন। রেজাউল করীম মহিউদ্দিন আহমেদকে বঙ্গবন্ধুর আগমনবার্তা অবহিত করে হিথ্রো বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে রিসিভ করতে অনুরোধ করেন। আবু সাইদ চৌধুরী তখন বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন।
ইংরেজ তরুণ-তরুণীদের নিয়ে গঠিত ‘একশন বাংলাদেশ’-এর নেত্রী পল কনেটের উদ্যোগে ১ আগস্ট লণ্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে অনুষ্ঠিত হাজার হাজার বাঙ্গালী ও ইংরেজদের সমাবেশে মহিউদ্দিন আহমেদ পাকিস্তান দূতাবাসের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে বাংলাদেশ সরকারের আনুগত্য স্বীকার করেন। আবু সাইদ চৌধুরী তাঁর ‘প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি’ বইটিতে উল্লেখ করেছেন, ‘পাকিস্তান সরকারে কর্মরত কূটনীতিবিদদের মধ্যে সমগ্র ইউরোপে মহিউদ্দিন আহমেদই প্রথম পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। সেই কারণেই অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আমার মারফত তাঁকে শুভেচ্ছা জানান’। মহিউদ্দিন আহমেদের আনুগত্য স্বীকারের সাথে সাথে সমাবেশে উপস্থিত প্রবাসী বাঙ্গালী ও ইংরেজ তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আনন্দের যে উচ্ছ্বাসধ্বনি উত্থিত হয়েছিল তা ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসে উল্লেখ করেছেন। এমন ঘোষণায় ইউরোপসহ সারা বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন হলো। আবু সাইদ চৌধুরী তাঁর বইতে লিখেছেন, মহিউদ্দিন আহমেদ এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে পাকিস্তান দূতাবাস ত্যাগ করার মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু আবু সাইদ চৌধুরী তাতে সম্মতি দেননি; কারণ তখনো প্রবাসী সরকারের কার্যক্রম শুরু হয়নি। ১৯৭১ সনের ১০ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয় এবং ১৭ এপ্রিল সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। উপরন্তু পাকিস্তানের গোপন তথ্য পাওয়ার নিমিত্তে তাঁর আরও কিছুদিন পাকিস্তান দূতাবাসে থাকার দরকার ছিল। মহিউদ্দিন আহমেদ মুজিবনগর সরকারের আনুগত্য স্বীকার করার পরপর ১৭ আগস্ট লন্ডনে বাংলাদেশ মিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সরকার হওয়ার আগেই মহিউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের আনুগত্য স্বীকার করতে চেয়েছিলেন—এমন সাহস সকলের থাকে না।
মহিউদ্দিন আহমেদ ১৯৬৭ সনে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়ার পূর্বে তিনি করাচির পাকিস্তান রেডিওতে অনুবাদক হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন, পরে তিনি ফেনী কলেজে শিক্ষকতা করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ শেষে লন্ডন দূতাবাসে তাকে তৃতীয় সচিব হিসেবে বদলি করা হয় এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। পাকিস্তান দূতাবাসের লোভনীয় চাকুরী ত্যাগ করে মহিউদ্দিন আহমেদ তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে পথে নামলেন, থাকার জায়গা ছিলো না, খাবার কেনার পয়সা ছিলো না। পাকিস্তান দূতাবাস ত্যাগ করার পর কপর্দকশূন্য মহিউদ্দিন আহমেদকে লন্ডনে এক বাঙ্গালী তার বাসায় আশ্রয় দেন এবং আবু সাইদ চৌধুরী তাঁকে প্রতি মাসে যৎসামান্য পাউণ্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেট নেননি, তিনি সরকারঘোষিত দুই বছরের এন্টিডেটেড সিনিয়রিটির সুযোগ গ্রহণ করেননি। মাত্র দুই বছর পূর্বে বন্ধুদের প্রেসারে সার্টিফিকেট নিতে গিয়ে তিনি আমলাতন্ত্রের উন্নাসিকতায় বিরক্ত হয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটি ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মন্ত্রীর এক জনসভায় কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মহিউদ্দিন আহমেদ সর্বদা গর্ব করতেন।
মহিউদ্দিন আহমেদের দুই মেয়ে—অরু মহিউদ্দিন এবং লোরা মহিউদ্দিন। চাকরিজীবন শেষেও মহিউদ্দিন আহমেদের কোন সঞ্চয় ছিলো না, তিনি ছিলেন গ্রামের মাইনর স্কুলের এক প্রধান শিক্ষকের সন্তান। তাঁর বাবা এন্ট্রান্স পাস করে কোন চাকরির প্রত্যাশা না করে ১৯২৬ সনে ফেনীর জিএমহাট এলাকায় একটি মাইনর স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। অবসর নেয়ার পর তাঁর ব্যক্তিগত কোন গাড়ি ছিলো না, চলাফেরার বাহন ছিল রিক্সা আর বাস। তিনি আক্ষেপ করতেন ছাই বিক্রেতা এক নারীর জন্য, যাকে তিনি বিগত বিশ বছর ধরে তাঁর বাসার সম্মুখের রাস্তা দিয়ে ‘ছাই নেবেন, ছাই’ বলে চিৎকার করতে শুনেছেন। তিনি কষ্ট পেতেন প্রবীণ রিক্সাচালকদের জন্য যাদের রিক্সায় যাত্রী উঠে না; তিনি প্রবীণ রিক্সাচালক দেখলেই তাদের রিক্সা ভাড়া নিতেন এবং গন্তব্যস্থলে পৌঁছে পকেটের সব টাকা ভাড়া হিসেবে দিয়ে দিতেন। বিগত বিশ বছর যাবৎ তিনি তাঁর পেনশন এবং মুক্তিযোদ্ধার ভাতা তাঁর জিএমহাট এলাকার তালিকাভুক্ত ৩০টি গরিব পরিবারের মধ্যে বিলি করে দিতেন। তিনি ধর্ষিতা মেয়ে ও শিশুদের দেখতে হাসপাতালে গিয়ে তাদের হাতে উপহার তুলে দিতেন। গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন তাকে বিচলিত করত, তিনি ‘প্রথম আলো’র সম্পাদককে চিঠি লিখে এই সকল নিপীড়িত গৃহকর্মীদের পক্ষে কলম ধরতে অনুরোধ করেছিলেন।
বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি প্রায় পনেরশত কলাম লিখেছেন; তিনি তাঁর লেখার সম্পাদনা পছন্দ করতেন না বলে কলাম লেখা বন্ধ করে দেন। তিনি প্রতিদিন কমপক্ষে ১০টি দৈনিক পত্রিকা পড়তেন। তাঁর প্রিয় পত্রিকা ছিল ‘দ্য ইকোনোমিস্ট’। তাঁর বাসায় কমপক্ষে ১০টি বুকশেলফ রয়েছে। তাঁর শখ ছিল ‘পড়া’। রাস্তায় বের হলে তাঁর কাছে দুটি জিনিস থাকত—একটি কলম আর একটি ছোট নোটবুক। একাত্তরের স্মৃতিবিজড়িত লন্ডন পুনরায় দেখার খুব আগ্রহ ছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় তাঁর লন্ডন দেখা আর হয়নি। দশ/বার বছর পূর্বে তাঁর চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বিশ হাজার ডলার বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি জাদুঘরে ফেরত দেওয়ার নিমিত্তে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করেছিলেন, কিন্তু একটি অনুক্ত কারণে তাঁর আগ্রহ পূরণ হয়নি।
মহিউদ্দিন আহমেদ এবং আরও দুই বাঙ্গালী মিলে হিথ্রো বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে রিসিভ করতে চলে যান। বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার কথা ভেবে বঙ্গবন্ধুর আগমনবার্তা তখনো গোপন রাখা হয়, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কোন সদস্যও তাঁর মুক্তির বিষয়ে অবহিত ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু না থাকায় স্বাধীন হয়েও বাঙ্গালী জাতি স্বস্তি পাচ্ছিলো না; গোটা জাতি তাকিয়ে ছিল একজন মানুষের দিকে, যিনি সদ্য স্বাধীন বাঙ্গালী জাতির সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বলবেন, ‘ফাঁসির পর যে মরদেহ আমি বাংলাদেশে পাঠাতে ভুট্টুদের বলেছিলাম সেই ফাঁসির রজ্জু ছিঁড়ে আমি বেঁচে আছি’। আনন্দভরা অস্থিরচিত্তে মহিউদ্দিন আহমেদ বঙ্গবন্ধুর আগমন ও দর্শনের অপেক্ষা করতে থাকেন। বঙ্গবন্ধুকে দেখা মাত্রই তাদের সকলের হৃদয় আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তখনো বঙ্গবন্ধুর জীবনহানির শঙ্কায় সকলে কাঁদছে, বিজয়ের আনন্দে পড়েছে কালোমেঘের ছায়া। সেই মুহূর্তে লণ্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুর বুকে মাথা রেখে মহিউদ্দিন আহমেদ আনন্দে কাঁদছেন; বঙ্গবন্ধু তাঁকে বুকে টেনে নিয়ে বলে উঠলেন ‘ভয় নেই, আমি এসে গেছি’। এই মহিউদ্দিন আহমেদ, আমার মেজো ভাই, ২০ জুন, ২০২২-এর সন্ধ্যা ৬.৩০টায় মৃত্যুবরণ করেছেন, সাথে সাথে একজন সাহসী, নির্ভীক, নির্লোভ, আপোষহীন এবং অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযোদ্ধার জীবনাবসান হলো।