ধর্ম অবমাননার অভিযোগে করা মামলায় মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ে ২২ বছর ধরে শিক্ষকতা করা শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের জামিন শেষ পর্যন্ত হয়েছে। দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ধর্ম হচ্ছে ‘বিশ্বাস’, আর বিজ্ঞান হচ্ছে যুক্তি এবং প্রমাণনির্ভর। ছাত্রদের সাথে চলা প্রশ্ন এবং কথোপকথন পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয়, হৃদয় মণ্ডল পূর্বপরিকল্পিত পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। অনবচ্ছিন্নভাবে ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করে যাওয়ার জন্য কয়েকজন ছাত্র তাদের সতীর্থদের পেছন থেকে প্ররোচিত করেছে, বারবার নিচু স্বরে মেসেজ দেওয়া হয়েছে যে, ‘ভিডিও হচ্ছে, চালিয়ে যা’। বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সব সূত্র যে পবিত্র কোরআনে রয়েছে তা স্বীকার করতে ছাত্ররা হৃদয় মণ্ডলকে চাপ দিয়ে যাচ্ছিল, ছাত্রদের জেদ থাকা সত্ত্বেও তিনি ইসলাম ধর্ম নিয়ে কোন কথা বলেননি, বরং হিন্দুধর্মের যুক্তিহীন একটি বিশ্বাসের উদাহরণ দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, হনুমানের কানের ভেতর পৃথিবীর চেয়ে ১৩ লক্ষ গুণ বড় সূর্যের অবস্থান অবাস্তব বিধায় যুক্তি দিয়ে তা প্রমাণ করা যাবে না। তিনি বলেছেন, ধর্ম যখন ছিল না তখনও বিজ্ঞান ছিল, ধর্মে বহু কিছু আছে যা যুক্তি দিয়ে, বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণ করা যাবে না, বিশ্বাস করতে হবে। হৃদয় মণ্ডল আরও বলেছেন, ধর্ম মানুষকে সুশৃঙ্খল রাখে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) হচ্ছেন একজন ‘মহামানব’।
সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা এড়াতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উত্থাপিত হলেই ইদানীং অভিযুক্তর জন্য পাকিস্তানের মতো বিপদ নেমে আসছে। আইনজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, হৃদয় মণ্ডলের জামিন দেওয়ার বিষয়টি অবলিগেটরি বা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু জেলের বাইরে থাকলে হৃদয় মণ্ডলের জীবনের ঝুঁকি বাড়তে পারে মর্মে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী উল্লেখ করার পর হৃদয় মণ্ডলের আইনজীবীও আর জামিনের আবেদন করেননি। একই কারণে সম্ভবত সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাশেরও ৬ মাস জামিন হয়নি, জেলখানা থেকে বের হলেই জীবনহানির আশঙ্কা করা হয়েছে। আইনজ্ঞ জেড আই খান পান্না তার পক্ষে লড়ে ৬ মাস পর জামিনের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু জেলখানা কি নিরাপদ? জাতীয় চার নেতাকে জেলের ভেতরেই খুন করা হয়েছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের পর জেলের ভেতর খুনের আশঙ্কা থাকায় বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের জেলখানা থেকে সরিয়ে একটি ডাকবাংলোয় রাখা হয়েছিল। পৃথিবীর সকল দেশের মতো পাকিস্তানে হরহামেশাই জেলখানায় খুন হয়ে থাকে। অতীতে ব্লাসফেমি আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পাকিস্তানের জেলখানার ভেতর কুড়াল দিয়ে হত্যা করেছে কারাগারের প্রহরী পুলিশ। ব্লাসফেমি আইনের বিরোধিতা করায় পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর সালমান তাসিরকে তার নিজ দেহরক্ষী গুলি করে হত্যা করেছিল; এই দেহরক্ষী পরে জেলখানার ভেতর বীরোচিত সংবর্ধনা পায়। তারপরও যদি মনে করা হয় যে, উগ্র ধর্মান্ধদের কাজ থেকে বাঁচানোর জন্য জামিন না দিয়ে জেলখানায় রাখাই নিরাপদ, তাহলে সম্পূর্ণ দেশকে জেলখানা বানানোই শ্রেয়।
প্রাণ সৃষ্টির ব্যাপারে ডারউইনের বিবর্তনবাদ তো ধর্মের সাথে রীতিমত সাংঘর্ষিক। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ডারউইনের মতবাদে প্রভাবিত হয়ে লিখেছেন, ‘মোরা আর জনমে হংস-মিথুন ছিলাম’। বিজ্ঞান বলে সূর্য স্থির, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে; আর ধর্ম বলে পৃথিবী স্থির এবং সূর্য পৃথিবীকে চক্কর দেয়, সূর্য প্রতি রাতে আল্লাহর আরশের নিচে গিয়ে সেজদা করে এবং তার কাছে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি চায়। ধর্ম মতে, কালোজিরা সর্বরোগের মহৌষধ, কিন্তু কালোজিরার উপর আস্থা রেখে ওষুধ খাওয়া বন্ধ রেখেছেন কতজন মুসলমান? ধর্ম বলে ছোঁয়াচে বলে কোন রোগ নেই, অথচ সাম্প্রতিককালের করোনাকে ছোঁয়াচে রোগ বলে মানবজাতি স্বীকার করে নিয়ে লকডাউন দিয়েছে। ধর্ম বলে চাঁদের নিজস্ব আলো আছে, বিজ্ঞান বলে নেই। ধর্ম বলে বৃষ্টির আগাম সংবাদ কোন মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়, কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্র এখন বৃষ্টির আগাম সংবাদ শুনে মানুষ বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। জ্বর আসে জাহান্নামের উত্তাপ থেকে, ধর্মের এই কথা তো চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক। উটের মূত্র পান করলে রোগ সারে, ধর্মের এই বিশ্বাসও বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত নয়। জন্মের সময় বাচ্চারা শয়তানের খোঁচায় কাঁদে—ধর্মে বর্ণিত শয়তানের এই কাণ্ড নবজাতকের বেঁচে থাকার জন্য জরুরি; জন্মের পর কোন শিশু না কাঁদলে তাকে কাঁদানোর জন্য চিকিৎসক গলদঘর্ম হয়ে যান। বাইবেলে অসংখ্যবার ইউনিকর্ন, ড্রাগন, বেহেমথ, নেফিলিম, লেভিয়াথানসহ অসংখ্য পৌরাণিক প্রাণীর উল্লেখ আছে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে যাদের অস্তিত্ব কোন কালেই প্রমাণ পায়নি। অপরদিকে বাইবেলে উল্লেখ করা হয়নি এমন একটি প্রাণীর নাম ডাইনোসর, একসময়ে পৃথিবীতে যার অস্তিত্ব ছিল বলে প্রমাণিত। ইসলাম ধর্মেও বোরাক নামে একটি প্রাণীর উল্লেখ আছে, যার বর্ণনা থেকে জানা যায় অনেকটা ইউনিকর্নের মত। প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের সংঘর্ষ। এমন অসঙ্গতি অগণিত, এগুলোর মীমাংসা না হলে ধর্মকে বিজ্ঞানের উৎস হিসেবে গণ্য করা কঠিন।
ধর্ম থেকে বিজ্ঞানের উৎপত্তি না হলেও মুসলমান বিজ্ঞানীদের হাত ধরে বর্তমান বিজ্ঞানের অনেক ধারার যে সৃষ্টি হয়েছে তা অনস্বীকার্য। জাবির ইবনে হাইয়ানকে বলা হয় রসায়নশাস্ত্রের জনক, অথচ তার পিতাকে উমাইয়া বংশের খলিফার হুকুমে হত্যা করা হয়। আল খোয়ারিজমিকে বলা হয় বীজগণিতের জনক। মডার্ন মেডিসিনের জনক ইবনে সিনাকে ‘কাফির’ বলা হয়েছিলো সেই আমলেই। আরও অসংখ্য মুসলমান বিজ্ঞানী ছিলেন যাদের হাত ধরেই বিজ্ঞানের অনেক নতুন শাখার সূচনা হয়। কিন্তু মুসলমানরা তাদের মূল্যায়ন করেনি বলেই পরবর্তীতে মুসলমানদের মাঝে আর কোন নামকরা বিজ্ঞানীর আবির্ভাব হয়নি। ৫৬টি মুসলিম দেশের মধ্যে একমাত্র পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তির অধিকারী এবং পাকিস্তানে পারমাণবিক কর্মসূচীর শুরু করেছিলেন আবদুস সালাম। দুঃখজনক হচ্ছে, পাকিস্তানে তাঁর সমাধির এপিটাফে লেখা বিজ্ঞানে ‘প্রথম মুসলিম নোবেলবিজয়ী’ থেকে আহমদিয়া বিধায় ‘মুসলিম’ শব্দটি মুছে ফেলা হয়েছে। খ্রিস্টান ধর্মের সাথেও একসময় বিজ্ঞানের তুমুল সংঘর্ষ ছিল এবং এইজন্য অনেক বিজ্ঞানীকে জীবন দিতে হয়েছে। একসময় কোন নারী একটু বিজ্ঞানমনস্ক হলেই গির্জা তাকে ডাইনীর অপবাদ দিয়ে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। যুক্তিনির্ভর জীবন গড়ার তাগিদ দেয়ায় সক্রেটিসকে বিষ খেয়ে মরতে বাধ্য করা হয়েছে। ‘পৃথিবী কেন্দ্রে আর সূর্যসহ অন্যান্য গ্রহগুলো পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে’ বাইবেলের এই বাণীর বিরোধিতা করায় খ্রিস্টান যাজকেরা ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী জিওর্দানো ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের গুজব তুলে, মিথ্যা অভিযোগে কাউকে অভিযুক্ত করে মুহূর্তে কিন্তু উগ্র লোক তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদানার্থে একতাবদ্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তানে যুগ যুগ ধরে যা হয়েছে, ইদানীং ভারত ও বাংলাদেশেও তাই শুরু হয়েছে। এই দলবদ্ধ উগ্রতা দিন দিন বাড়ছে। দলবদ্ধ উগ্রতার বিরুদ্ধে সরকারের নমনীয়তা বাংলাদেশ ও ভারতকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতে পশ্চাতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এই উগ্র জনতা কত ভয়ঙ্কর তার প্রমাণ পাওয়া যায় আমাদের তিন খলিফার হত্যায়। ‘ধর্ম অবমাননার’ দায়ে হযরত ওসমান (রা.)-কে তৌহিদি মুসলিম জনতা কোরআন পাঠরত অবস্থায় কুপিয়ে হত্যা করেছে।
বিজ্ঞানের সব আবিষ্কার আমাদের পবিত্র কোরআনে আছে দাবী করা হলে তার তাৎপর্য এক সময় ধর্মের জন্য নেতিবাচক হয়ে যেতে পারে। কারণ বিজ্ঞান মাঝে মাঝে তার পূর্বে প্রমাণিত সত্য থেকেও সরে যায়—আজ যা সত্য আগামীকাল আরও নতুন গবেষণায় তা ভুল বলে শনাক্ত হতে পারে। বিজ্ঞান নিজের অবস্থান সময়ের সাথে পরিবর্তন করতে পারলেও ধর্মের সেই সুযোগ নেই। বিশ্বাসীদের তাই বিজ্ঞানের আজকের কোন এক তত্ত্ব বা আবিষ্কার ধর্ম থেকে এসেছে দাবী করার এই ঝুঁকি না নেয়াই উত্তম। বিজ্ঞান মানবকল্যাণে নিবেদিত, কোন বিশেষ জাতি বা ধর্মের জন্য বিজ্ঞান গবেষণা করে না। বিজ্ঞানের ভিত্তি হচ্ছে যুক্তি, জ্ঞান, অনুসন্ধান, প্রশ্ন এবং প্রমাণ—বিশ্বাসের কোন স্থান নেই বিজ্ঞানে। অপরদিকে ধর্মের সব কিছু যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা যাবে না, বিশ্বাস করতে হবে। ধর্ম ও বিজ্ঞানকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর নীতি থেকে খ্রিস্টানেরা সরে এসেছে। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে এই উপলব্ধি জাগ্রত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তাই সংঘর্ষও থামবে না। এই ক্ষেত্রে একটিই সমাধান, বিজ্ঞানের সাবজেক্টগুলো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলে নিয়ে ধর্মগ্রন্থ কোরআন পড়ানোই উত্তম, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়কে মাদ্রাসায় রূপান্তর করে ধর্মশিক্ষার সম্প্রসারণ করা শ্রেয় হবে। সংঘর্ষ এড়াতে ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থায় আমাদের সমর্পিত হওয়া বাঞ্ছনীয়—দেশে দুটি শিক্ষাব্যবস্থা পাশাপাশি থাকায় আমরা ইহকাল-পরকাল দুটিই হারাচ্ছি।