আমার ফেইসবুক বন্ধুদের অনেকে আমাকে জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে লিখতে অনুরোধ করেছেন, কিন্তু আমি নিয়মিত বাজার করি না, এই দায়িত্ব আমার স্ত্রী পালন করেন। ইদানীং সে অনলাইনে সব পণ্য কিনে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে স্লোগান ছিল তার অনেকটুকুই বাস্তবায়ন হয়েছে। শুধু আমার স্ত্রী নয়, অনেক পরিবারের সদস্যই এখন অনলাইনে সংসারের প্রয়োজনীয় সব কেনাকাটা করে থাকেন। পণ্যের গুণাগুণ ঠিক থাকলে এভাবে কেনাকাটা লাভজনক। বাজারে গেলে অসংখ্য মানুষের সাথে ধাক্কাধাক্কি করতে হয়, সভ্য জগতের রীতিনীতি এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মেয়েদের এভাবে ধাক্কাধাক্কি করে বাজার করা শোভন নয়; দ্বিতীয়ত চাল-ডালসহ ভারী পণ্য বহন করা কঠিন, রিক্সা করে বাসায় আনা হলেও উপরের তলায় পণ্য তোলা কষ্টকর। অনলাইনে বাজার করলে এই সকল সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় না, পণ্য বাসায় পৌঁছানোর খরচও যুক্তিসঙ্গত।
বাজারে চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলের মত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। বিএনপিও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আন্দোলন, মিছিল করছে। কয়েক মাস যাবৎ বিএনপি রাস্তায়—প্রথমে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছিল, কিন্তু কাজ হয়নি। খালেদা জিয়া কিছুটা সুস্থ, তাই এখন আন্দোলনের নতুন ইস্যু হচ্ছে জিনিসপত্রের বর্ধিত মূল্য। বিএনপি’র আন্দোলন শুরুর পূর্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক এবং ইউটিউবে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি নিয়ে প্রচুর পোস্ট দেওয়া হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি নিয়ে নানা ধরনের কৌতুক সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে—দ্রব্যমূল্য নিয়ে বেশীরভাগ পোস্ট দিয়েছে বিরোধী দল বিএনপি’র সমর্থকেরা। আওয়ামী লীগের নেতারা দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি নিয়ে যুৎসই উত্তর দিতে পারছে না, অবশ্য কোন সময়ই পারেনি। উত্থাপিত প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত উত্তর না দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা অশালীন ভাষায় এতদিন বলে গেছেন, ‘বিএনপি’র কোমর ভেঙে গেছে, সোজা হয়ে আর দাঁড়াতে পারবে না’। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের এমন কিছু কথাবার্তা বেমানান মনে হতো। এখন যখন কোমর সোজা করে বিএনপি রাস্তায় নামছে তখন বলছেন, ‘বিএনপি জিনিসপত্রের দাম নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে’। বিএনপি সরকারের বিভিন্ন নীতি-সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রচারে নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করতেই পারে—এটা কোনো অপরাধ নয়; কিন্তু বিএনপি’র কৌশলের মোকাবিলায় সরকার ও আওয়ামী লীগের লোকজন পারঙ্গম নন কেন? ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটি এখন জনসাধারণের মনে আর কোন আবেদন সৃষ্টি করে না—‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ থেকেই এই শব্দটি তার ওজস্বিতা হারিয়েছে।
দিন দিন জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে, বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য বেড়েছে, তাই আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য বেশী। মন্ত্রী মহোদয়ের কথা মিথ্যে নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু পণ্যের দাম বাড়েনি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পণ্য পরিবহন খরচও বেড়েছে অনেক। জার্মানিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যে হারে বেড়েছে তা বিগত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পাকিস্তান, শ্রীলংকা প্রভৃতি দেশে জিনিসপত্রের দাম আমাদের দেশের চেয়ে অনেক বেশী। করোনায় পর্যটকের আগমন না ঘটায় শ্রীলংকার অর্থনৈতিক দুর্গতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিএনপি’র সমর্থকেরা যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন তার যুৎসই জবাব দিতে কোন আওয়ামী লীগ সমর্থককে দেখা যায় না, তারা বড় বড় নেতাদের সাথে মোলাকাতের ছবি পোস্ট করতেই ব্যস্ত। দলে পদ-পদবী পাওয়ার জন্য নেতাদের তোয়াজ করে পোস্ট দেওয়ার রীতি সব দলের মধ্যে থাকলেও তা আওয়ামী লীগ কর্মীদের মধ্যে একটু বেশী লক্ষ্য করা যায়, দল বা সরকারের ইমেজ রক্ষায় এদের কোন দায়-দায়িত্ব নেই।
ইদানীং চাকুরিজীবীরাও পণ্যমূল্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুখর হয়ে উঠেছেন; অনেকেই তাদের বেতনের টাকা খরচের হিসাব দিয়ে নতুন পে-স্কেলের আবশ্যকতার আগাম বার্তা প্রচার করছেন। সরকার হয়তো তাই-ই করবে, কিন্তু এতে সাধারণ মানুষের আয় বাড়বে না, বাড়বে জিনিসপত্রের দাম। নির্বাচন যত নিকটবর্তী হবে সরকারের কাছে বিভিন্ন পেশাজীবীর চাওয়া-পাওয়ার দাবী তত বাড়তে থাকবে। বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান উত্থাপিত অভাব-অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে একবার বলেছিলেন, এত অল্প সম্পদ নিয়ে এত লোকের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। খাদ্যে স্বয়ম্ভর হলেও তা টেকসই হয় না, প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে এলে খাদ্যঘাটতি মোকাবিলায় বিদেশ থেকে চাল-গম আমদানি করতে হয়। বাল্যকালে আমরা সয়াবিন তেলের নামও শুনিনি, সবার ঘরে দেশে উৎপাদিত সরিষার তেল ছিল। ডালেরও কখনো অভাব দেখিনি, খেসারি ডাল এত বেশী উৎপাদন হতো যে, গরুর উৎকৃষ্ট খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রায় প্রতিটি পরিবারে গাভী ছিল, মাঠে প্রচুর কাঁচা ঘাস পাওয়া যেত, এখন বিদেশ থেকে গুঁড়া দুধ না এলে আমাদের চা খাওয়া হয় না।
অভাব বর্তমানের তুলনায় পঞ্চাশ বছর পূর্বে অনেক বেশী ছিল, কিন্তু অভাবী লোকগুলো সয়াবিন তেলের উপর নির্ভরশীল ছিল না। টিসিবি’র ট্রাক থেকে পণ্য কেনার এমন হুড়াহুড়ি লক্ষ্য করে দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছে বলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় টিসিবি’র ট্রাক থেকে সয়াবিন তেল কেনার জন্য কথিত দুর্ভিক্ষকবলিত লোকজনের ভিড় দেখলে মনে হয় মানুষের জীবনমান অনেক বেড়েছে, বিত্তহীন লোকেরাও দুই লিটারের সয়াবিন তেল কেনার সামর্থ্য রাখে। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ এবং রাশিয়ার উপর আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধে আন্তর্জাতিক বাজারে জিনিসপত্রের দাম হয়ত আরও বাড়বে, জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে অনেক বেড়েছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে অন্য জিনিসের দামও বাড়বে।
বর্তমানে বাংলাদেশ মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, ধান উৎপাদনে চতুর্থ, আলুতে ষষ্ঠ, পেঁয়াজে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে; তারপরও চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের ইসলাম ধর্ম পেঁয়াজ খেতে নিষেধ করলেও ভারত থেকে পেঁয়াজ না আনলে হাহাকার পড়ে যায়। মসুর ডাল, আদা, রসুন, মশলা, চিনি, ভোজ্যতেল সবই তো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সবজি, মুরগি এবং ডিমের দামও বাড়ছে, কারণ চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম। ডিম এবং পেঁয়াজ ভারতে সস্তা, ভারত থেকে আমদানি করলে দেশের ডিম এবং পেঁয়াজ উৎপাদনকারীগণ লোকসানে পড়েন। ভারতের উৎপাদন খরচ কম হলে আমাদের উৎপাদন খরচ বেশী কেন—এর কোন যুৎসই ব্যাখ্যা নেই। শিম, করলা, বেগুন, টমেটো, পটল, বরবটি, শুকনামরিচ তো দেশে হয়, কেন বাড়ছে এগুলোর দাম? কারণ দেশের উৎপাদন মানুষের চাহিদা পূরণে সমর্থ নয়। চাষাবাদের জমি নেই—খাদ্যশস্য ও সবজীর উৎপাদন বাড়ানোর অভিপ্রায়ে সরকার উগাণ্ডাসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশে জমি বর্গা নিতে চেয়েছিলো, অর্থ পাচারের আরেকটি রুট খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় সেই পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশের বাজারেও আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়বে।
সরকারের মনিটরিং নেই বলে অভিযোগ করা হচ্ছে—অভিযোগ অসত্য নয়। কিন্তু মনিটরিং বাড়িয়ে বা ব্যবসায়ীদের উপর চাপ সৃষ্টি করে অতীতে ভালো ফল পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুযায়ী বাজারে মূল্য নির্ধারিত হবে পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে, সরকার বা অন্য কারো মাতব্বরিতে নয়। বিএনপি’র অভিযোগ হচ্ছে, সরকারের লোকদের দুর্নীতির কারণে পণ্যমূল্য বাড়ছে। কথাটা মিথ্যা নয়; দুর্নীতি তো রোধ করা যাচ্ছে না—কারণ এরা বর্ণচোরা, এরা সব সরকারের সমর্থক। ঘুষখোর এবং দুর্নীতিবাজ বিএনপি’র আমলেও ছিল। ব্যবসায়ীরা দেশ বা জনগণের স্বার্থ বোঝে না, শুধু বোঝে নিজেদের মুনাফা। শুধু ব্যবসায়ীদের দোষ দিয়েও লাভ নেই, তাদের অতিরিক্ত মুনাফায় রাজনৈতিক দলগুলো ভাগ বসায় বলে অনেক অভিযোগ রয়েছে। সব দলের লোক ব্যবসাজগতে আছে, তাদের রাজনৈতিক দল ছাড়াও মাস্তান পালতে হয়। রাজনৈতিক দল ও নেতাদের চাঁদা না দিলে জিনিসপত্রের দাম আরও কম হতো। আমেরিকার মতো চাঁদার ঘোষণা প্রকাশ্যে নেয়ার ব্যবস্থা করা দরকার, তাহলে জনগণ বুঝবে জিনিসপত্রের দর বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোন্ রাজনৈতিক দলের ভূমিকা কতটুকু।
বাজারে কোন ঘাটতি নেই এমন পণ্যের দাম বাড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত লোভ এবং সততার অভাব। বাজেট, ঈদ, পূজাপার্বণ, বন্যা, খরা, হরতাল, ধর্মঘট, বেতন-স্কেল ইত্যাদি এলেই পণ্যের দর বেড়ে যায়। খ্রিস্টমাস উপলক্ষে পশ্চিমা দেশগুলোর খ্রিস্টান ও ইহুদি ব্যবসায়ীরা বেশী বিক্রির প্রত্যাশায় জিনিসপত্রের দামে প্রচুর ছাড় দিয়ে থাকে, অন্যদিকে রোজা এলে মুসলমান বাঙ্গালী ব্যবসায়ীরা জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে থাকে। ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে ভ্যাট-ট্যাক্স তুলে নেয়া সত্ত্বেও দাম তেমন কমছে না। ন্যায্য দরে নিত্যব্যবহার্য পণ্য পাওয়া নিশ্চিত করতে সরকার এক কোটি পরিবারকে কার্ড ইস্যু করেছে, কিন্তু কার্ড বিতরণে স্বজনপ্রীতি থাকার সম্ভাবনা বেশী। স্বজনপ্রীতি কেয়ামতের আগের দিন পর্যন্ত চলবে, রোধ করার সাধ্য কারো নেই, চুরি না হলেই মঙ্গল।
দুঃখের বিষয় হচ্ছে, বর্ধিত দরেই রোজাদারগণ প্রতিযোগিতা করে জিনিসপত্র কিনে বাসায় মজুত করছেন, অন্য মাসের তুলনায় রোজার মাসে দ্বিগুণ পরিমাণ ভোজ্যতেল ব্যবহার হবে, আর জিনিসপত্রের দাম বেশী কেন এ নিয়ে ক্ষোভও থাকবে। সত্য হচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে জনসংখ্যা বাড়বে, চাষযোগ্য জমি ও উৎপাদন কমবে, আমদানির পয়সা না থাকলে বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের যোগান দেওয়া সম্ভব হবে না, অভাবের তাড়নায় কিছু লোক না খেয়ে মরবে, পণ্যের দাম কম হলেও তাদের পক্ষে কিনে খাওয়া সম্ভব হবে না, এর মধ্যেও কিছু লোক কানাডায় গিয়ে বেগমপাড়া বানাবে, সিঙ্গাপুর গিয়ে সাপ্তাহিক বাজার করবে।