আজ শনিবার ২৫ ডিসেম্বর, ২০২১-এ দৈনিক সংবাদের অনলাইনে প্রচার এবং ২৬ ডিসেম্বর রবিবারে আমার লেখা উপসম্পাদকীয় ছাপা হবে।
রোহিঙ্গাদের শিবিরে হত্যাকাণ্ড
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
কক্সবাজারের উখিয়ায় কুতুপালং ক্যাম্পের ভেতরে গত ২৯ সেপ্টেম্বর বন্দুকধারীদের গুলিতে রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহ নিহত হয়েছেন। মুহিবুল্লাহর হত্যা দেশে-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হলে পুলিশ পাহারা জোরদার করা হয়; কিন্তু পুলিশের সতর্ক অবস্থানের মধ্যেও মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের ২৩ দিনের মাথায় থাইনখালী রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতরে প্রতিষ্ঠিত একটি মাদ্রাসায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলি ও ধারালো দায়ের আঘাতে প্রাণ হারান আরও ছয়জন রোহিঙ্গা। এই হামলায় শতাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী অংশ নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মুহিবুল্লাহ ছিলেন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সোচ্চার ও অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন মুহিবুল্লাহ। মুহিবুল্লাহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুপরিচিত ছিলেন। ২০১৯ সনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ১৭টি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ২৭ জন প্রতিনিধি সাক্ষাৎ করেন, তাদের মধ্যে মহিবুল্লাহও ছিলেন। তিনি জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনেও যোগ দিয়েছিলেন। মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার করা মামলায় রোহিঙ্গাদের গণহত্যা সম্পর্কিত তথ্য সরবরাহে মহিবুল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে মহিবুল্লাহর উদ্যোগকে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র গ্রুপ ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’ বা আরসা সহ্য করতে পারেনি; আরসা’র ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সশস্ত্র গ্রুপ এআরএসপিএইচ-এর অফিস ঘেরাও করে মুহিবুল্লাহকে গুলি করেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী মুহিবুল্লাহর ভাই হাবিবুল্লাহর দাবি। তবে আরসা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে নিজেদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে। আরসা’র নাম দিয়ে অন্য কোন সশস্ত্র গ্রুপও এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। এমনকি মিয়ানমার সরকারেরও এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে; কারণ তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায় না। অন্যদিকে রোহিঙ্গারা যে সন্ত্রাসী জনগোষ্ঠী, ভাল লোক নয় তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রমাণ করতে মিয়ানমার সরকার এই সকল হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আরসা’র কাঁধে তুলে দিতে চায়। উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের ফুটবল মাঠে মহিবুল্লাহর আহ্বানে ২০১৯ সনে লাখ লাখ রোহিঙ্গা উপস্থিত হয়েছিলো; তার এই জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে অন্য কোন সশস্ত্র গ্রুপও তাকে সরিয়ে দিতে পারে। শিবিরের ভেতরে অবৈধ ব্যবসা এবং নানাবিধ অনৈতিক কর্মকাণ্ড বিরাজ করায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সৃষ্টি হয়েছে, এই অবস্থায় আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের লোকদের হত্যা করতে পারে। শিবিরের ভেতরে প্রায় তিনশত মাদ্রাসা রয়েছে, বিদেশ থেকে ক্যাম্পের মাদ্রাসা-মসজিদের জন্য প্রচুর টাকা আসে; এই টাকার জন্য মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপে দ্বন্দ্ব রয়েছে।
আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)-এর সদস্যরা বহু বছর ধরে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত; মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব এবং সমান মর্যাদা আদায়ের দাবী নিয়ে তারা মিয়ানমারের সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করে যাচ্ছে। সৌদি আরবে বসবাসরত রোহিঙ্গারা আরসা’র এই সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে পূর্ণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরে এই সশস্ত্র গ্রুপেরও অনেক সক্রিয় কর্মী ও সমর্থক রয়েছে; এরাও মিয়ানমারে ফেরত যেতে চায় না এবং অন্যদেরও না যেতে প্ররোচিত করে থাকে। বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ ও অবৈধ ব্যবসায়ী রোহিঙ্গাদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে মুহিবুল্লাহর নেতৃত্বাধীন এআরএসপিএইচ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার পক্ষে অবিরত কথা বলেছে। মহিবুল্লাহর বিশ্বাস ছিলো, মিয়ানমারে সামরিক সরকারের পতনের পর জাতীয় ঐকমত্যের সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের প্রত্যাবর্তন সহজ হবে; এই প্রত্যাশায় তিনি মিয়ানমারে সংগ্রামরত বিরোধী দলগুলোর সাথে সম্পর্কও গড়ে তুলেছিলেন।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে বিপদে পড়েছে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া সহজ হবে বলে মনে হয় না। ভয়ের কারণ হচ্ছে, এরা বাংলাদেশ সরকারকেও চ্যালেঞ্জ করছে, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেই ক্যাম্পের ভেতরে ঢুকে মুহিবুল্লাহকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা বিনা বাধায় ক্যাম্প ত্যাগ করতে সমর্থ হয়েছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে কক্সবাজারের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে, হাজার হাজার গাছ ও পাহাড় ধ্বংস করে রোহিঙ্গাদের বসতি গড়ে তোলা হয়েছে, তাদের স্বাচ্ছন্দ্য জীবনের জন্য নোয়াখালীর ভাসানচর দ্বীপে তাদের জন্য বসতঘর ও জীবননির্বাহের কর্মকাণ্ডের সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের বেড়ি দিয়েও শরণার্থী শিবিরে আবদ্ধ রাখা সম্ভব হচ্ছে না, সমুদ্রবেষ্টিত ভাসানচর দ্বীপেও তাদের আবদ্ধ করে রাখা যাচ্ছে না। তারা বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে স্থায়ী বসতি গড়ার চেষ্টা করছে, পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বাঙ্গালী পরিচয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে, বিদেশের মাটিতে অপরাধ করে বাংলাদেশ ও বাঙালির সুনাম নষ্ট করছে।
শরণার্থী শিবিরে আরসা এবং আল ইয়াকিনের সশস্ত্র অবস্থানের কথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্বীকার করা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে যে অনেকগুলো সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে তা এই সকল হত্যাকাণ্ড থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। ‘আল-ইয়াকিন’ নামের গ্রুপটি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ, শরণার্থী শিবিরে আগুন লাগিয়ে ত্রাস সৃষ্টি, মাদক বিক্রি, মানবপাচার, অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়, ডাকাতি ও মাদকের টাকায় আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহসহ নানা অপরাধে জড়িত এই বাহিনী। রোহিঙ্গাদের মুক্তিপণ দেওয়ার মতো অর্থ না থাকায় তারা অপহরণ করছে আশেপাশের বাঙ্গালীদের। শুধু তাই নয়, টেকনাফ উপজেলার যুবলীগের এক নেতাকে হত্যা করেছে আল-ইয়াকিন, তারা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে আরাকানের অংশ হিসেবে দাবী করছে। আল-ইয়াকিন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের ঘোর বিরোধী।
রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে পাচারের কারণে বাংলাদেশে অদূর ভবিষ্যতে অস্ত্র অধিকতর সহজলভ্য হতে থাকবে; পাড়ায় পাড়ায় কিশোর সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকবে। সশস্ত্র গ্রুপগুলো যেভাবে স্থানীয় বাঙ্গালীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে বা মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যা করছে তাতে স্থানীয় বাঙ্গালীদের সাথে রোহিঙ্গাদের বিরোধ চরম আকার ধারণ করতে পারে। শুধু মহিবুল্লাহ নয়, ভবিষ্যতে হয়তো যে রোহিঙ্গা মিয়ানমারে যেতে চাইবে তাকেই হত্যা করা হবে। অন্যদিকে মিয়ানমারে সামরিক শাসন বলবৎ হওয়ার পর থেকেই মিয়ানমার ভূখণ্ডের সর্বত্র আন্দোলন, সংগ্রাম ও চোরাগুপ্তা হামলা চলছে, সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নামার জন্য জনগণ প্রস্তুতি নিচ্ছে। মিয়ানমারে এমন একটি অস্থির পরিবেশে বাংলাদেশে আরাকান রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র মহড়া একটি বড় অশনিসঙ্কেত। সশস্ত্র গ্রুপের লোকেরা বাংলাদেশে অপরাধ করে নিমিষেই সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে চলে যাবে এবং একইভাবে মিয়ানমারে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে বাংলাদেশে ফেরত আসবে। রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র করে যুদ্ধে লিপ্ত করতে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে দুই দেশের সীমান্ত সংঘর্ষ বেড়ে যাবে, সম্পর্ক তিক্ত থেকে তিক্ততর হবে। এমন অস্বস্তিকর পরিবেশে বাংলাদেশ সরকারের সম্পৃক্ততা বেড়ে গেলে উন্নয়নে গতি শ্লথ হয়ে যাবে। তাই রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে এক্ষুণি সশস্ত্র তৎপরতা সমূলে উৎপাটন করা জরুরি ও অপরিহার্য।
লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী
পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ahmedzeauddin0@gmail.com