আজ রবিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২১; দৈনিক সংবাদে শনিবারে অনলাইনে এবং রবিবারে প্রিন্টেড পেপারে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:

মর্যাদাপূর্ণ পদে ন্যূনতম মান চাই

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়েকে নিয়ে ফেসবুক লাইভে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং একজন অভিনেত্রীর সাথে কথোপকথনের অশ্লীল ভাষার অডিও ফাঁস হয়ে আলোচনা-সমালোচনায় থাকা তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মুরাদ হাসান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগের পর কানাডা যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। রাষ্ট্রধর্ম বাদ দেওয়া এবং বাহাত্তরের সংবিধানে ফেরত যাওয়ার বক্তব্য দিয়ে তিনি প্রথমে আলোচনায় আসেন, পরবর্তীতে বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন লোকের বিরুদ্ধে একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের নিয়েও তার কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ভাইরাল হয়। মুরাদ হাসান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।

মুরাদ হাসান হঠাৎ করে রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে কথা বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত-সমালোচিত হতে থাকেন। কোন দলের আবেদন-নিবেদন ছাড়াই ১৯৮৮ সনে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ঘোষণা করেন; ইসলামপন্থী কোন গোষ্ঠীও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার দাবী করেনি। ইসলাম ধর্মের কোথাও রাষ্ট্রধর্মের বিধান আছে বলে মনে হয় না। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) দেশ শাসন করেছেন, তাঁর শাসনামলে মদিনা বা মক্কায় ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেছিলেন বলে এখন পর্যন্ত কোথাও পড়িনি। এরশাদ সাহেব সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সমর্থন আদায় করার অভিপ্রায়ে এই কাজটি করেছিলেন। কিন্তু এরশাদ সাহেবের রাষ্ট্রধর্ম যে সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো সেই পঞ্চম সংশোধনী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বাতিল করে দেয়। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সনে পুনরায় ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে পঞ্চদশ সংশোধনী অনুমোদন করায় এই রাষ্ট্রধর্ম তো আওয়ামী লীগের, আর এরশাদ সাহেবের থাকল না। তাই দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে খোলা মাঠে কথা বলে ইসলাম ধর্মের লোকদের উত্তেজিত করা মুরাদ সাহেবের অপরিপক্কতার পরিচায়ক।

মুরাদ সাহেব শালীন ভাষায় রাজনীতির মাঠের লোকদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে পারতেন, তারেক রহমানের কার্যক্রম নিয়ে তুলোধুনো করতে পারতেন; কিন্তু তিনি যদি তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতেন তা হতো সভ্যতা-ভব্যতাবহির্ভূত। এই নৈতিকতায় তারেক রহমানের মেয়েকে নিয়ে শিষ্টাচারবহির্ভূত বাজে মন্তব্য করার শিক্ষা মুরাদ সাহেব পেলেন কই? তারেক রহমানের মেয়ে কোন পাবলিক ফিগার নন, রাজনীতির ধারেকাছেও তিনি নেই, তবুও মুরাদ সাহেব অশ্লীল কথা বলে তারেক রহমানকে হেয় করতে গিয়ে নিজে পচে গেলেন। তার চরম অশ্লীল মন্তব্যের কারণে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি নষ্ট হলো। ডা. মুরাদ এ প্রসঙ্গে বলেন যে, তিনি বক্তব্য দেওয়ার আগে তাকে 'নোংরা ভাষায়' আক্রমণ করে কথা বলেছেন, তাকে নিয়ে ট্রল করেছেন তারেক রহমানের কন্যা। কেনো, কী প্রসঙ্গে ডা. মুরাদকে নোংরা ভাষায় আক্রমণ করেছেন তারেক রহমানের কন্যা, তার বিশদ ব্যাখ্যা তিনি দেননি। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে উপহাস করে বক্তব্য রেখেছেন। খালেদা জিয়াকে নিয়েও তিনি বাজে মন্তব্য করেছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তি হয়ে অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করার যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। তিনি সম্ভবত প্রত্যাশার চেয়ে বেশী পেয়ে গিয়েছিলেন; ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে হুঁশ হারিয়ে বেসামাল হয়ে পড়েছিলেন।

মুরাদ সাহেব সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, আইনজীবীদের বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন। তার কথায় মোল্লা-মৌলভীরা ক্ষেপেছেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের বিক্ষুব্ধ করেছেন, তারেক রহমানের নির্দোষ মেয়েকে নিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলে সমগ্র নারীজাতিকে প্রতিপক্ষ বানিয়েছেন। রাজনীতির মাঠে তিনি আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞ নেতাদের পাত্তা না দিয়ে সব বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে শ্রীহীন কদর্য ব্যক্তিত্বে পরিগণিত হয়েছেন। রাজনীতিতে অনন্য হওয়ার বাসনা থাকলে হয় না, যোগ্যতাও লাগে। তার মনে রাখা উচিত ছিলো, পতনের অংশীদার কেউ হয় না। আওয়ামী লীগ দলীয় স্বার্থে আরও বড় বড় নেতাদেরও নিমেষে ঝেড়ে ফেলেছে। এখন আর প্রতিপক্ষ দলের প্রয়োজন নেই, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই মুরাদ সাহেবের অতীতের অপকর্মের উদঘাটন করবে। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের লোকেরা বলা শুরু করে দিয়েছে যে, বিএনপি থেকে মুরাদ হাসানের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, আওয়ামী লীগের পেছনে ছুরি বসানোর জন্য তিনি এতদিন অপেক্ষায় ছিলেন।

মুরাদ হাসান ১৯৯৬ সন পর্যন্ত বিএনপি’র ছাত্রদলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, ১৯৯৭ সনে ছাত্রলীগে যোগ দেন। ডাক্তারি পড়ার সময় মুরাদ হাসান রংপুর মেডিকেল কলেজে ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক থাকার খবরটি প্রথম প্রকাশ করেন বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পচে গেলে কোন কদর থাকে না বলেই সম্ভবত বিএনপি’র মহাসচিবের কথা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা বিশ্বাস করেননি, তারা সমস্বরে মহাসচিবের কথার প্রতিবাদ করেছেন। মুরাদ হাসানকে ছাত্রদলের না চেনার আরেকটি কারণও থাকতে পারে; মুরাদ হাসানের ছড়িয়ে পড়া কালিমার কিছুটা এখন বিএনপি’র গায়েও লাগলো, দলের নেতাকর্মীরা বেশ অস্বস্তিতে পড়েছেন। মুরাদ হাসানের বাবা মতিয়ার রহমান তালুকদার জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।

মুরাদ হাসান যাদের সম্পর্কে অশ্লীল কথা বলেছেন তারা সবাই কোন না কোন শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন, ফলে বিপুল জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাজে মন্তব্য করায় তার প্রতিপক্ষদের সংখ্যা ভারী হয়েছে; ভারী হওয়ার কারণে দুই বছর আগের ফোনালাপও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। একজন চলচ্চিত্র নায়িকার সাথে আপত্তিকর কথাগুলো তিনি বলেছেন দুই বছর আগে। তাহলে কথাগুলোর রেকর্ডও হয়েছে দুই বছর আগে; দুই বছর আগে প্রকাশ হলো না, এখন হলো কেন? প্রকাশ করলো কে? কুৎসিত, কদর্য, যৌনবিকৃত, অশালীন ও শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ ও বক্তব্য থামানোর জন্য তাকে উলঙ্গ করল কে?

ব্যক্তিগত ফোনালাপ ফাঁস করা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। পারস্পরিক সমঝোতার ফোনালাপ প্রকাশের এখতিয়ার কারো থাকা উচিত নয়। তবে এটা মানতে হবে যে, ফোনালাপে হত্যা বা ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হলে, জোর করে বিকৃত রুচির অশ্রাব্য কথাগুলো শুনতে বাধ্য করা হলে তা নিশ্চয়ই প্রকাশযোগ্য, কারণ এমন কর্মকাণ্ড ফৌজদারি অপরাধ। ফেসবুকে অহরহ নারীবিদ্বেষী বা নারীদের উপহাস করে বিভিন্ন কৌতুক পরিবেশন করা হয়। বাংলাদেশের সমাজটাই নারীবিদ্বেষী। ওয়াজে অহর্নিশ নারীদের নিয়ে উপহাস করা হয়। রাজনৈতিক দলের নেতারা নারী প্রসঙ্গে ওয়াজিদের চেয়ে খুব বেশী পরিশীলিত নন। এই মুরাদ হাসানকে যথাস্থান থেকে যথাসময়ে সতর্ক করা হলে, তিরস্কার করে থামতে বললে জল এতদূর গড়াত না। ‘অ্যাটিকেট এ্যাণ্ড ম্যানার’ নামে একটি বই বহু বছর আগে পড়েছিলাম, ইংরেজদের প্রণীত; ঐ বইতে শিষ্টাচার নিয়ে বিশদ বর্ণনা রয়েছে। সরকারের কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণের পূর্বে শিষ্টাচার নিয়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে পশুবৃত্তি রয়েছে, সংযত আচরণে অভ্যস্ত না হলে পশুপদবাচ্য হতে সময় লাগে না।

বাংলাদেশের এক কদর্য রাজনৈতিক চরিত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। অশ্লীল-কদর্য-ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে তিনি বারবার রাজনীতির আলোচনায় এসেছেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর দম্ভও ছিল আকাশচুম্বী; তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করতে থাকেন। জাতীয় সংসদে তিনি অহরহ অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যে খিস্তিখেউড় করতেন। এমনকি তিনি তৎকালীন সংসদে বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন সময়ে নানা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। মুরাদের বিপক্ষে আজ যারা সোচ্চার তাদের অনেকে তখন তাকে হাততালি দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছেন। ২০০১ সনে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ওআইসির মহাসচিব পদে বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। মালয়েশীয়া এবং তুরস্কও একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। প্রার্থী না দিয়ে মালয়েশীয়া তাদের সমর্থন দিতে বাংলাদেশকে বারবার অনুরোধ করেছিলো; বিএনপি সরকার মালয়েশীয়ার কথা শোনেনি। তুরস্ক বিপুল ভোটে জিতে গেলে মালয়েশীয়ার শ্রমবাজার হারিয়েছিল বাংলাদেশ। ওআইসি’র নির্বাচনে অসম্মানজনক হারের পর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী কথাবার্তায় আরও বেশী আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে বিএনপি নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের অশ্লীল ও অভব্য বক্তব্যের বিরুদ্ধে বিএনপি’র তরফ থেকে প্রতিবাদ করা হয়নি। বিএনপি শুধু মুরাদের কথা বলে, আলাল সাহেবের কথা বলে না। আলাল সাহেব ভারত আর মোদি সম্পর্কে অশ্লীল কথা বলে ভারতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন, ভারতে বসেই অশ্লীল বক্তব্য দেওয়ার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, ডিজিটাল আইন বাতিলের দাবী করে বিএনপি ডিজিটাল আইনেই মুরাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিভিন্ন সম্প্রচারে শ্রোতারা যে সকল কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে তা সাকা চৌধুরী ও ডাক্তার মুরাদের ভাষার চেয়েও খারাপ। আমোদজনক বিষয় হচ্ছে এই শ্রোতারাও এখন মুরাদের মুণ্ডপাত করছে। কত বিচিত্র মানুষের চরিত্র। জামালপুরের এক পুলিশ সুপার সাংবাদিকদের সাথে অশোভন আচরণ করায় এই ডাক্তার মুরাদ হাসান সেই পুলিশ সুপারকে ভর্ৎসনা করেছিলেন। তিনি এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভাষা ও ব্যবহারে মার্জিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। ‘সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ’—যে দেশে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত অস্ট্রিয়াপ্রবাসী সিফাতুল্লাহ সেফুর কদর্য কথা শোনার লোকের অভাব হয় না সেই মুরাদ হাসানের অশ্লীল কথা শুনে লজ্জাও পায়।

লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী

পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ahmedzeauddin0@gmail.com