আজ রবিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:
হাফ ভাড়া ও নিরাপদ সড়ক
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
বাসে হাফ ভাড়া নেয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা গত কিছুদিন ধরে যে দাবি জানিয়ে আসছিলো তা শুধু ঢাকা শহরে মেনে নিয়েছে সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি। হাফ ভাড়া দিতে হলে প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীকে নিজ প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড দেখাতে হবে; সাপ্তাহিক ও মৌসুমি ছুটির সময়, সকাল সাতটার আগে এবং রাত আটটার পর এই হাফ ভাড়া কার্যকর থাকবে না। সম্প্রতি ডিজেলের দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে বাস ভাড়া বাড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা তাদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নেয়ার দাবি করতে থাকে। তাদের এই দাবি আদায়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকাসহ কয়েকটি এলাকায় প্রতিবাদ, বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সিটি করপোরেশনের গাড়ির ধাক্কায় নটরডেম কলেজের এক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর সেই আন্দোলন রূপ নেয় নিরাপদ সড়কের ৯ দফা দাবির আন্দোলনে। এই উত্তেজনার মধ্যে রামপুরায় একটি প্রাইভেট বাসের ধাক্কায় আরেকজন ছাত্রের মৃত্যু হলে অনেকগুলো পরিবহণে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই অবস্থায় ছাত্রদের দাবী শুধু হাফ ভাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তারা রাস্তায় নেমে আবার ২০১৮ সনের মতো ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব নিয়ে পরিবহণের ফিটনেস, ড্রাইভারের লাইসেন্স ইত্যাদি যাচাই করা শুরু করে এবং তাদের দাবি বৃদ্ধি পেয়ে এখন ১১ দফায় রূপ নিয়েছে।
লিখিত কোন নীতি না থাকলেও পাকিস্তান আমল এবং একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছু সময় গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়াই নেয়া হতো। ১৯৬৯ সনে পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকদের নিকট উত্থাপিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবির একটি ছিল ‘হাফ ভাড়া’ নির্ধারণ। এই দাবির প্রেক্ষিতে ইয়াহিয়া খানের সামরিক আদেশে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া আদায়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তখন পশ্চিম পাকিস্তানে ছাত্র-ছাত্রীরা বাসে ১০ পয়সা ভাড়ায় শহরের যে কোনো স্থানে যাতায়াত করতে পারত। হাফ ভাড়ার কোন আইন না থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান আমলে আমরা স্বাধীনতা দিবসে বিনা ভাড়ায় ট্রেন ভ্রমণ করতাম, দলবেঁধে জিএমহাট স্কুল থেকে বিলোনিয়া ট্রেনে ফেনী গিয়ে বিনা টিকেটে সিনেমা দেখতাম। ছাত্রদের হাফ ভাড়া নিয়ে তখন বাকবিতণ্ডা হয়েছে বলে মনে পড়ে না। কিন্তু পরবর্তীতে বাসে হাফ ভাড়া নিয়ে বাস কণ্ডাক্টর এবং ছাত্রদের মধ্যে শুধু উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় নয়, মারামারিও হয়েছে।
পাকিস্তান আমল ও দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর ছাত্রদের একটা আলাদা গুরুত্ব ছিলো, বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রদের গৌরবময় ভূমিকার কথা জাতি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করত, ছাত্রদের অবস্থান ছিলো তখন অনেক উঁচুতে। কিন্তু পরবর্তী কোন এক সময় তারা তাদের এই অবস্থান আর ধরে রাখতে পারেনি। রাস্তা-ঘাট সর্বত্র তারা শক্তি প্রদর্শন করতে শুরু করে, প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের মধ্যে মারামারি-কাটাকাটি চলতেই থাকে। হলের সিট বাণিজ্য, ডাইনিং হলে বিনে পয়সায় বন্ধু-বান্ধব নিয়ে খাওয়া, ভিন্নমতাবলম্বীকে টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করা, টেণ্ডারবাজি, মাস্তানি, অপহরণ প্রভৃতি অপরাধমূলক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় জড়িত হওয়ায় তাদের অতীতের গৌরবময় ভাবমূর্তি তলানিতে নেমে আসে। ছাত্ররা কোণঠাসা হয়ে পড়ার কারণে তাদের হাফ ভাড়ার দাবী ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে থাকে। আইন না থাকায় পরিবহণ কর্তৃপক্ষও শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া দাবির প্রতি অবজ্ঞা করে আসছিল। সম্প্রতি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া।
শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নয়, নিরাপদ সড়কের দাবিই যৌক্তিক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরিবহণ ভাড়ার হরেক রকমের রীতি অনুসৃত হয়; অনেক দেশে শিক্ষার্থীরা গণপরিবহণে চলাচলের ক্ষেত্রে ছাড় পায়, কয়েকটি উন্নত দেশে বিনা ভাড়ায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুযোগও রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে একবার টিকেট কাটলে নির্দিষ্ট রুটে যে কোন যাত্রী সারাদিন যতবার ইচ্ছে ততবার চলাচল করতে পারে। পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা এবং ভারতের কোন কোন রাজ্যে শিক্ষার্থীরা গণপরিবহণে ভাড়ার ক্ষেত্রে ছাড় পেয়ে থাকে। ভারতের কেরালা রাজ্যে বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া আট রুপির সঙ্গে বাড়তি এক রুপি দিয়ে শিক্ষার্থীরা ৪০ কিলোমিটার যাতায়াত করতে পারে। তবে প্রাইভেট গাড়িতে ছাত্রদের জন্য হাফ ভাড়া নেয়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই; ছাত্রদের জন্য মুক্তবাজার অর্থনীতিতে তাদের তো কোন দায়ও নেই। শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তারা হাফ ভাড়া নিতে পারে, কিন্তু তা হবে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত, জোর করে নয়। অথবা সরকার ভর্তুকি দিলে প্রাইভেট বাসে হাফ ভাড়া চালু করা যায়। কিন্তু সব ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিলে সরকার দেশ পরিচালনার টাকা পাবে কই? উন্নত দেশগুলো ছাত্রদের যে সকল সুযোগ-সুবিধা দেয় তার অধিকাংশ পরবর্তীকালে আদায় করে নেয়।
সড়ক এবং মহাসড়কে নৈরাজ্য চলছে। এমন নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রীরা যখন ২০১৮ সনে রাস্তায় নামে তখন নিরাপদ সড়ক কিছুটা নিশ্চিত করতে আইন পাস হয়; কিন্তু পরিবহণ মালিক এবং শ্রমিকদের ক্ষমতা ও গুরুত্ব ছাত্র-ছাত্রীদের চেয়ে অনেক বেশী। করোনায় দুই বছর স্কুল বন্ধ ছিলো, তাতে দেশের অর্থনীতিতে কোন চাপ পড়েনি; কিন্তু দুইদিন পরিবহণ বন্ধ থাকলে সারা দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। পরিবহণ না চললে দেশের অর্থনীতি অচল হয়ে যাবে, শিক্ষার্থীরাও ঘরে আবদ্ধ হয়ে পড়বে। তাই শুধু সাধারণ মানুষই নয়, সরকারকেও পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকদের কাছে জিম্মি থাকতে হয়। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকদের প্রয়োজনীয়তা ও একচেটিয়া দাপটের কারণে প্রণীত আইনের বাস্তবায়নও হয় না। তাদের বক্তব্য স্পষ্ট; শুধু চালকের অবহেলায় সড়ক দুর্ঘটনা হয় না, দুর্ঘটনা হয় পথচারীর বেপরোয়া চলাফেরায়, সড়কের যত্রতত্র খানাখন্দের অবস্থানের কারণে। পথচারীও ট্রাফিক আইন মানে না, অবশ্য ট্রাফিক আইন মানার যথাযথ ব্যবস্থাদিও নেই। ফুটপাতে হাঁটার জায়গা নেই, ফুটপাতে গরিব লোকদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা, এই লোকগুলোর ব্যবসা বন্ধ করে দিলে দুর্ঘটনা অন্যত্র ঘটবে, ছিনতাই-চুরি-ডাকাতি বেড়ে যাবে। দুর্ঘটনা কমাতে হলে অগণিত লোকের জন্য ঢাকা শহরকে নতুন করে সাজাতে হবে, যা অসম্ভব।
বিআরটিএ-এর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমে উঠেছে। পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে নাজেহাল হতে হয়। গাড়ির ফিটনেস, লাইসেন্স, ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গেলে ভোগান্তির শেষ নেই, দালালের দৌরাত্ম্য। যে কাজ এক বছরে হয় না সেই কাজ মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশে একদিনে হয়ে যায়। বারবার ধর্ণা দিয়েও মুদ্রিত কাগজপত্র না থাকায় লাইসেন্স বা রুট পারমিট দিতে পারছে না—এমন অজুহাত দিয়েও বিআরটিএ-এর লোকেরা পার পেয়ে যায়; কেন যথাসময়ে কাগজপত্র ছাপানো হলো না তার জবাবদিহিতা দিতে হয় না। ঢাকা শহরে বাসের রেষারেষি চালকদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। প্রতিটি বাসের গায়ে শত শত ঘষা, মনে হয় কয়েকশ বছরের পুরোনো গাড়ী। বাস স্টপেজেও একটি গাড়ী পুরো রাস্তা জুড়ে এমনভাবে কোণাকোণি রাখা হয় যাতে অন্য আর কোন গাড়ী তার সম্মুখে যেতে না পারে। তবে একটু সুযোগ পেলে হঠাৎ পেছনের বাস দ্রুতগতিতে এসে সামনের বাসটির গা ঘেঁষে এমনভাবে দাঁড়াবে যাতে আগে আসা বাসে কোন যাত্রী উঠতে না পারে; এতে যাত্রীর হতাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাসগুলোর এমন রেষারেষি বন্ধে কোন ট্রাফিক পুলিশ কোন দিন কোন বাস ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেছে বলে আমার নজরে পড়েনি। এছাড়াও পেছনে আরেকটি বাস দেখা গেলে সামনের বাসটি স্টপেজে না থেমে রাস্তার মধ্যখানে যাত্রীকে চলতি অবস্থায় বাস থেকে নামতে বাধ্য করে। মহাসড়কেও বেপরোয়াভাবে গাড়ী চালানোর প্রতিযোগিতা মাঝে মাঝে এত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে যে, যাত্রীদের অনেকে দোয়া-দরূদ পড়তে থাকেন।
ছাত্রদের প্রতি সরকার সহানুভূতিশীল বলেই ছাত্রদের অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা হয়নি। প্রেসার গ্রুপগুলো বুঝতে পেরেছে, মারামারি-কাটাকাটি, ভাঙচুর না করলে, আগুন না লাগালে কারো দাবিই কর্তৃপক্ষের কানে উঠে না, তাই ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু ছাত্রদের মনে রাখতে হবে, হাফ ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করা কোন অধিকার নয়। তবে সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বিবেচনা করে পরিবহণ মালিকেরা সারা দেশব্যাপী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য হাফ ভাড়া নেয়ার ব্যবস্থা নিতে পারে। পরিবহণ মালিকেরা অবগত যে, মোট যাত্রীর তুলনায় ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা খুব বেশী নয়। একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে সীমাবদ্ধ করার উদ্ভট চিন্তাও পরিত্যজ্য। এমন বালখিল্য সিদ্ধান্তে ঝামেলা বাড়বে। আংশিক গিঁট খুলে, বাকি প্যাঁচ লাগিয়ে রাখলে সমস্যার নিরসন হবে না। তবে বিআরটিএ-এর নৈরাজ্য এবং বাসচালকদের বেপরোয়া ড্রাইভিং বন্ধের ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে নেয়া প্রয়োজন।
লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী
পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ahmedzeauddin0@gmail.com