আজ রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:

খেলা বনাম রাজনীতি

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

ঢাকার শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-পাকিস্তান তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে পাকিস্তানি জার্সি গায়ে পরে এবং পাকিস্তানের পতাকা হাতে নিয়ে একদল তরুণ ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়েছে। খেলায় কোন টিমকে সমর্থন দেওয়া অপরাধ নয়, কিন্তু বাংলাদেশী হয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলায় বিপক্ষ দলকে সমর্থন করা দৃষ্টিকটু। বাংলাদেশি ক্রিকেটারেরা আউট হলে বা পাকিস্তানের কোন ক্রিকেটার ছক্কা মারলে কিছু বাঙ্গালী তরুণ দর্শকদের উল্লাস দেখে মনে হয়েছে, এই তরুণেরা খেলা উপভোগ করছে না, তারা তাদের মনে জমে থাকা ক্ষোভের বহির্প্রকাশ ঘটাচ্ছে। এমন ঘটনা পাকিস্তানে হলে কী হতো? ২০১৬ সনের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত অস্ট্রেলিয়াকে পরাস্ত করায় উমার দ্রাজ নামের এক পাকিস্তানি যুবক তাদের বাড়ির ছাদে ভারতের পতাকা ওড়ালে পুলিশ তাকে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের বিরোধী গণ্য করে আটক করেছিলো। ভারতেও একই অবস্থা; সম্প্রতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ক্রিকেট দলের কাছে ভারতীয় ক্রিকেট দলের হেরে যাওয়ায় ভারতে কিছু লোক আনন্দ প্রকাশ করে এবং এতে হিন্দুত্ববাদী দলগুলো ক্ষেপে দেশদ্রোহ ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে ১৪ ভারতীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

খেলার সাথে রাজনীতির সম্পর্ক দিন দিন ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হচ্ছে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে শুধু খেলাকে পছন্দ করার লোক প্রতিদিন কমছে। রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী লোকগুলো শুধু ভালো খেলার কারণে কোন খেলার দলকে সমর্থন করছেন না। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের আদর্শে যারা বিশ্বাসী তারা সাধারণত আবাহনীকে সমর্থন করে থাকেন, আর যারা আওয়ামী রাজনীতির বিরোধী তারা মোহামেডানের সমর্থক। খেলা নিয়ে মাতামাতি শুরু হয় পাকিস্তান আর ভারতকে নিয়ে। পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে ক্রিকেট খেলায় সমর্থনের বিভাজন এত মারাত্মক আকার ধারণ করে যে, সমর্থিত দেশ হেরে গেলে সমুদয় দায় চাপানো হয় আম্পায়ার বা ক্রিকেট আয়োজকদের উপর। বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে বেশ কিছু সমর্থকের পাকিস্তান ও ভারত প্রীতি এবং উন্মাদনা দেখে মনে হয় না এরা খেলার প্রতি খুব বেশী অনুরক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শুরু হয় কাদা-ছোঁড়াছুঁড়ি। ভারতকে কত পচানো যায়, পাকিস্তানকে কতভাবে ধিক্কার দেওয়া যায় তার ফন্দিফিকির দুপক্ষের সমর্থকেরা উদ্ভাবন করতে থাকে।

যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক তাদের মনে খেলার সময় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটা প্রতিশোধস্পৃহা জেগে উঠে, একাত্তরে বাঙ্গালীদের উপর পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নির্যাতন তারা কোনভাবেই ভুলতে পারে না, তারা মনেপ্রাণে চায় পাকিস্তান খারাপ খেলুক, হেরে যাক। পাকিস্তানকে সহ্য করতে পারে না বলেই তারা প্রতিপক্ষ ভারতকে অন্ধভাবে সমর্থন করে থাকে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা পাকিস্তানকে সমর্থন করতে গিয়ে নিজেদের কপোলে পাকিস্তানি পতাকা আঁকে, গ্যালারির মেয়েরা আফ্রিদিকে বিয়ে করার বাসনা ব্যক্ত করে, আফ্রিদির দিকে বাতাসে চুমু ভাসিয়ে দেয়। পাকিস্তানের পক্ষের এই দর্শকেরা মূলত আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতির সমর্থক।

এই পর্যায়ে তখন খেলা আর খেলা থাকে না, খেলা হয়ে উঠে রাজনীতির রক্তাক্ত মাঠ, ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠে রণক্ষেত্র।

খেলা শুধু খেলা নয়, খেলার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদেরও উন্মেষ ঘটে। জাতীয়তাবোধ ভুলতে পারে না বলেই বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া খেলায় অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশী অভিবাসীরা বাংলাদেশকে সমর্থন করে থাকে। খেলায় জাতীয়তাবোধ উজ্জীবিত হয় বলেই ১৯৯৪ সনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের আসরে আত্মঘাতী গোল করার ‘অপরাধে’ কলম্বিয়ার ফুটবলার আন্দ্রে এস্কোবারকে গুলি খেয়ে মরতে হয়েছিলো। ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে ১৯৬৯ সনে হন্ডুরাস এবং এল সালভাদরের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিলো একশ ঘণ্টা। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর মতো রাজনীতিও খেলার সাথে জড়িত; তাই বাংলাদেশও ইসরাইলের সাথে কোন খেলায় অংশ নিতে চাইবে না। সর্বশেষ অলিম্পিকে ইসরায়েলের সাথে জুডো খেলা ছিলো বলে এক মুসলিম দেশের অ্যাথলেট খেলায় অংশ নেয়নি। সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ শাসকদের অনুসৃত বর্ণবৈষম্যমূলক আচরণে অতিষ্ঠ সংখ্যাগুরু কালো মানুষগুলোকে বাঁচানোর জন্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংগঠনগুলোর আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় ১৯৭০ সন থেকে ১৯৯১ সন পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট খেলতে পারেনি। শুধু ক্রিকেট নয়, তারা ১৯৯২ সনের পূর্ব পর্যন্ত অলিম্পিকে নিষিদ্ধ ছিলো।

আধুনিক জমানায় খেলোয়াড়দের জাতীয়তাবোধ খুব কম, অর্থই তাদের কাছে মুখ্য। টেনিস খেলায় রজার ফেদেরার বা রাফায়েল নাদাল অলিম্পিক বা ডেভিস কাপ-এর মত টুর্নামেন্ট ছাড়া সাধারণত নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন না। আবার রিয়েল মাদ্রিদ বা বার্সেলোনার মতো ফুটবল ক্লাবেও নানা দেশের খেলোয়াড় খেলেন এবং এই জনপ্রিয় ক্লাব দুটি স্পেনের হলেও স্পেনকে প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে কোনো দেশের জাতীয় ক্রীড়া দল ওই দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে বিধায় জাতীয় দলের সমর্থন করা ওই দেশের নাগরিকদের দেশাত্মবোধের পরিচায়ক। তাই ভালো খেলার অজুহাত দিয়ে নিজ দেশের প্রতিপক্ষ অন্য দেশকে সমর্থন করার মধ্যে কোন গৌরব নেই। বাংলাদেশ যখন ক্রিকেট খেলার প্রতিদ্বন্দ্বী তখন সকল বাঙ্গালী এক কাতারে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জয় কামনা করবে—এটাই প্রত্যাশিত। কারণ কোন খেলায় খেলোয়াড়েরা হারলে দেশ হেরে যায়, জিতলে দেশ জিতে যায়; কেউ বলে না মাশরাফিরা জিতেছে, সবাই বলে বাংলাদেশ জিতেছে।

খেলার সাথে রাজনীতির সম্পর্ক অনেক গভীর। খেলাকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখার প্রচেষ্টা কম হয়নি, কিন্তু রাজনীতি খেলাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। একাত্তর সনে পাকিস্তানি সেনাদের হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের মর্মান্তিক দৃশ্য অবলোকন করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সাবেক এমপি মাইকেল বার্ন পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে ব্রিটেনে প্রবেশ বন্ধ করে দেন এবং এতেই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এক আলোড়নের সৃষ্টি হয়।

ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল প্রভৃতি দেশের সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধ না থাকায় বিশ্বকাপ ফুটবলে তাদের দেশের পতাকা নিয়ে মাতামাতিতে কেউ কিছু মনে করেন না। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের ফুটবল দল এখনো বিশ্বের আসরে স্থান করে নিতে না পারায় বাঙ্গালীদের অন্য দেশের প্রতি সমর্থন স্বাভাবিক আনন্দ, উচ্ছ্বাস বলে মনে করা হয়।

কিন্তু ক্রিকেটের আসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব থাকায় বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে এত লাফালাফি ও আনন্দ প্রকাশ কিছুটা অশোভনীয়।

ক্রিকেট খেলায় মুখে আঁকা ভারত ও পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা শুধু খেলার প্রতি দর্শকের সমর্থনকে প্রকাশ করে না, প্রকাশ করে দর্শকের ঐ দেশের প্রতি গভীর আবেগ আর অনুভূতি। একাত্তরে পাকিস্তানিদের নির্যাতনের কথা এই তরুণদের না জানানোর ব্যর্থতা আমাদের সকলের। যারা একাত্তর দেখেনি তারা কেন পাকিস্তানকে সমর্থন করে নিজেদের বিজয়ী মনে করে, কেন তারা ভারতকে গালাগাল দিয়ে পাকিস্তান ভাঙার খেদ মেটায়, কেন এরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে উপহাস করে—তার সূত্র ও উৎস খোঁজা দরকার। এরা সংঘবদ্ধ, উগ্র, সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ। কিছু তরুণ পাকিস্তানি জার্সি আর পাকিস্তানি পতাকা নিয়ে যেভাবে গলা ফাটিয়ে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ শ্লোগান দিচ্ছিলো তাতে অনেকে ক্ষুব্ধ হয়ে কবি আবদুল হাকিমের কথাটি পুনর্ব্যক্ত করেছেন, ‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’। আমি তত কট্টর নই। আমি আশা করবো, একাত্তরে পাকিস্তানিদের হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়া বাঙ্গালী ক্রিকেটার মুশতাক আহমেদ এবং আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েলের স্মরণে মিরপুর স্টেডিয়ামে যে দুটি স্ট্যাণ্ড রয়েছে তাতে যেন পাকিস্তান ভাঙার প্রতিশোধ নিতে কোন উগ্র তরুণের বাংলার মাটিতে জন্ম না হয়।

লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ahmedzeauddin0@gmail.com