আজ বৃহস্পতিবার ২৫ নভেম্বর, ২০২১: সাম্প্রতিক দেশকালে আমার লেখা কলাম:

শাহরুখ খানের পুত্রের মাদকাসক্তি

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

ভারতের বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খান; তার বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা ২৩ বছর বয়সী ছেলে আরিয়ান খানকে নিষিদ্ধ মাদক রাখা ও সেবনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। মুম্বাই থেকে গোয়াগামী একটি বিলাসবহুল প্রমোদতরীতে অভিযান চালিয়ে আরিয়ান খানসহ ১০ জনকে আটক করা হয়; তারা প্রমোদতরীতে মাদক পার্টি করছিলো। প্রমোদতরী পার্টি থেকে এক্সট্যাসি, কোকেইন, মেফিড্রোন, চরসসহ নানা ধরনের নিষিদ্ধ ড্রাগ উদ্ধার করা হয়। জাতীয় মাদক নিয়ন্ত্রক ব্যুরোর আইনজীবী আদালতে দাবী করেন যে, আরিয়ান নিয়মিত মাদক সেবন করত। অন্যদিকে শাহরুখ সবচেয়ে দামি আইনজীবী নিয়োজিত করেছেন; আরিয়ানের আইনজীবী সতীশ মানশিন্ডে একদিনের জন্যই নাকি নেন ১০ লক্ষাধিক রুপি। ছেলের এমন কাণ্ডে সমালোচনার মুখে পড়ে বাবা শাহরুখ খান এখন বিচলিত হলেও এক সময় নাকি ছেলে মাদক সেবন করুক এটাই তার প্রত্যাশা ছিলো। শাহরুখ নাকি কামনা করেছিলেন তার ছেলে মেয়েদের সাথে যৌনতায় মেতে থাকবে, মাদক সেবন করবে এবং তার জীবনে তিনি যা যা করতে পারেননি তার সবগুলোই তার ছেলে করবে; তিনি নাকি একটা বিগড়ে যাওয়া ছেলে চেয়েছিলেন যাতে প্রতিবেশীরা প্রতিদিন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আসবে। কিন্তু চাওয়াটা পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে শাহরুখের মানসিক অবস্থান এখন আর আগের মতো নেই; কারণ সিনেমার মায়াবী জগৎ আর বাস্তবতার মধ্যে ফারাক অনেক বেশী। দামি এবং নামজাদা উকিলও তার ছেলের কারাগারে থাকা রদ করতে পারেনি।

এমন একটি ঘটনা হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা জ্যাকি চ্যানের ছেলের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। জ্যাকি চ্যানের ছেলে জেসি চ্যানকেও ২০১৪ সনে বেইজিং পুলিশ মাদক মামলায় গ্রেপ্তার করে। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, ২০০৯ সন থেকে চীনের অ্যান্টি-ড্রাগ গুডউইল অ্যাম্বাসাডর ছিলেন জ্যাকি, অথচ তার ছেলেই তাদের অ্যাপার্টমেন্টে মাদকসহ ধরা পড়ে। গ্রেফতারের পর জ্যাকি চ্যান ছেলের জন্য অস্থির হলেও ছেলের কারামুক্তির কোন তদবির করেননি; এমনকি ছেলের মামলার শুনানির সময় জ্যাকি কিংবা তার স্ত্রী কেউই আদালতে হাজির হননি। কারণ ছেলের মাদক-কাণ্ডে তারা বিব্রত হয়েছিলেন। ছয় মাস জেল খেটে মুক্ত হওয়ার পর জ্যাকি চ্যান সেই সময়ে গণমাধ্যমে উপস্থিত হয়ে পৃথিবীর সব মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেছিলেন ‘আমি লজ্জিত’। ছেলে জেসি চ্যানও ক্ষমা চেয়ে আর এমন ভুল না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো বিশ্ববাসীকে। জেসি চ্যানও ছিলেন গায়ক এবং অভিনেতা; তাই জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বহুদিন মাস্ক পরে রাস্তা-ঘাটে চলাফেরা করতে হয়েছিল তাকে।

মাদক সেবন যে অন্যায় তা বাবা জ্যাকি চ্যান এবং ছেলে জেসি চ্যান দুই জনই মেনে নিয়েছিলেন। তাদের এই ক্ষমা প্রার্থনা বিশ্ববাসী সাদরে গ্রহণ করেছিলো এবং জ্যাকি চ্যান ‘আদর্শ বাবা’ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিলেন। অপরাধকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছিলেন বলেই জ্যাকি চ্যানের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। ছেলের মাদক সেবনের অপরাধকে ছোট করে দেখলে তার ছেলে জেসি চ্যান প্রায়শ্চিত্ত না করে আরও বেশী অপরাধে ডুবে যেতে পারতো। পিতৃস্নেহে ভুলকে ঠিক বলার অন‍্যায় পথে তিনি হাঁটেননি। শাহরুখের পুত্র আরিয়ান এবং জ্যাকি চ্যানের পুত্র জেসি চ্যান দুই জনই বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত; উভয়ের পিতা অঢেল সম্পত্তির মালিক। না চাইতে পাওয়ার আনন্দ এক সময় ফুরিয়ে যায়, হতাশা ভর করে। বাস্তব জীবনে তাদের অপ্রাপ্তিজনিত হতাশা নেই, আছে অতিরিক্ত প্রাপ্তির বেদনা। সব প্রত্যাশা যখন পূরণ হয়ে যায় তখন চরম সুখও আনন্দ দেয় না। এমন পরিস্থিতিতে আনন্দ খুঁজতে গিয়ে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকাটাই তখন তাদের কাছে জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সুখ। শুধু সম্পদ দায়ী নয়, বাবার সঙ্গও এদের কেউই পায়নি। দুই জনের বাবাই সিনেমাজগতের শ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম। মা-বাবা বুঝতে পারার আগেই আচমকা ছেলের গ্রেপ্তারের খবর পান তারা উভয়ে।

মাদকও পণ্য, তবে পৃথিবীর প্রায় সব দেশে এই পণ্য নিষিদ্ধ; নিষিদ্ধ বলেই এই মাদকের প্রতি আগ্রহ বেশী। মাদক ব্যবসায়ীরা পৃথিবীব্যাপী এই পণ্যের চাহিদা তৈরি করে যাচ্ছে; প্রতিটি দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে টেক্কা দিয়ে মাদকের ব্যবসা টিকে আছে। পৃথিবীর সব দেশে ড্রাগ কারটেল বা মাদক বেচাকেনার গোপনীয় গোষ্ঠী বা দল থাকলেও সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সংগঠন রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া এবং মেক্সিকোতে। সত্তর দশকের কলম্বিয়া মেডেলিন কারটেলের সর্দার পাবলো এসকোবারের জীবনী নিয়ে অনেক বই আছে, অনেক সিনেমা এবং ডকুমেন্টারি নির্মিত হয়েছে; তার জীবনের উপর নেটফ্লিক্সে ‘নারকোস’ নামের একটি টিভি সিরিজও রয়েছে। পাবলো এসকোবার যে পরিমাণ টাকা উপার্জন করতেন সেই টাকার বাণ্ডিল করতে মাসে ২৫০০ ডলারের রাবার ব্যাণ্ড প্রয়োজন হতো। বৈধভাবে অর্থ রাখার সুযোগ না থাকায় প্রতি বছর তার ২ বিলিয়ন ডলার নোট ইঁদুরে কেটে ফেলত। তার ব্যক্তিগত দ্বীপ এবং চিড়িয়াখানা ছিল। তিনিই প্রথম কলম্বিয়ায় জলহস্তী আমদানি করেন এবং এজন্য কলম্বিয়ার জলহস্তীর নাম ‘এসকোবারের জলহস্তী’। একবার শীতের রাতে পরিবার নিয়ে পালানোর সময় এসকোবারের মেয়ের শীত নিবারণের জন্য ১ ঘণ্টায় ২ মিলিয়ন ডলারের নোট পুড়িয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেন। তিনি তার উপার্জনের একটি বড় অংশ গরিব লোকজনের মাঝে বিলিয়ে দিতেন বলে খুব জনপ্রিয় ছিলেন; এই জনপ্রিয়তার কারণে তিনি কলম্বিয়ার পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, সারা পৃথিবীর প্রায় সকল কোকেন তার মাধ্যমে সরবরাহ হলেও তিনি জীবনে কোন দিন কোকেন খেয়ে দেখেননি। ১৯৯৩ সনে কলম্বিয়া ও আমেরিকার কমান্ডোদের যৌথ অভিযানে গুলিতে এসকোবারের মৃত্যু হয়।

মেক্সিকোতে ২০০৬ সন থেকে এখন পর্যন্ত একটি যুদ্ধ চলমান, যুদ্ধটির নাম ‘ড্রাগ ওয়ার’; এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মেক্সিকোতে মাদক ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট মূল ৩টি মাদক-সংগঠনের মধ্যে ‘সিনালোয়া কারটেল’; এর মূল লিডার এল চাপো আমেরিকার একটি হাই সিকিউরিটি প্রিজনে বন্দী থাকলেও তিনি সেখান থেকেই সিনালোয়া কারটেল-এর প্রধান হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কয়েক বছর পূর্বে এল চাপোর ছেলে মেক্সিকোর পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সিনালোয়া কারটেল-এর সদস্যরা মেক্সিকো সিটি দখলে নিয়ে শহরে সর্বত্র আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া ছাড়াও নির্বিচারে মানুষ হত্যা শুরু করে। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে, আমেরিকার মেরিন সেনারা যেই ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে ড্রাগ কারটেল-এর কাছেও ঠিক সেই একই ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ; আছে ট্যাঙ্ক, ট্যাঙ্কবিধ্বংসী কামান, হেলিকপ্টার, সাবমেরিন ইত্যাদি।

ড্রাগ কারটেল যদি স্বীকৃত কোন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হতো তাহলে বর্তমান পৃথিবীর সব থেকে বড় প্রতিষ্ঠান হতো ‘ড্রাগ কারটেল’। ড্রাগ কারটেল-এর বেতনভুক্ত সহায়তাকারীদের মধ্যে মেক্সিকোর মন্ত্রী, বিচারক, মেয়র, পুলিশ, আর্মি থেকে শুরু করে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুসহ প্রায় সকলেই। এর বাইরেও দেশে দেশে তাদের বেতনভুক্ত কর্মচারী আছে। প্রকৃতপক্ষে এরা সকলেই কারটেল-এর হুমকি ও টাকার কাছে বন্দী। জনগণের মধ্যে ভীতি সৃষ্টির জন্য তারা তাদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের ভিডিও মাঝে মাঝে প্রকাশ করে; তাদের প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক উলঙ্গ ব্যক্তিকে জ্যান্ত অবস্থায় কামড়ে খেয়ে ফেলছে কিছু কুকুর; আরেকটি ভিডিওতে চিত্রায়ন হয়েছে জীবন্ত মানুষের রোস্ট করার দৃশ্য। তবে জ্যান্ত অবস্থায় প্রতি ৫ মিনিট অন্তর অন্তর প্রথমে হাত, পরে পা, নাক, কান, চোখ ইত্যাদি কেটে সর্বশেষে গলা কেটে মাথা আলাদা করে হত্যা করা কারটেল সদস্যদের সব থেকে প্রিয় পদ্ধতি।

মদ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে বৈধ; আমাদের দেশেও। কিন্তু ইদানীং বিভিন্ন অভিযানে প্রাপ্ত মদ এবং মাদককে একই প্রক্রিয়ায় প্রদর্শন করা হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত না হলে মদ সব সময় স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ নয়; অন্যদিকে মাদক আস্তে আস্তে জীবনীশক্তি নিঃশেষ করে দেয়। বাংলাদেশে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে মায়ানমারে বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশের পদ্মা সেতুর বাজেট হল ৩০ হাজার কোটি টাকা; অথচ মিয়ানমার বর্ডার এলাকায় বনে-জঙ্গলে কিছু ল্যাবে ইয়াবা বানিয়ে তা বাংলাদেশে পাচার করে প্রতি বছর ৫০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ ধনী হচ্ছে; কিছু পরিবারের কাছে প্রচুর অবৈধ পয়সা। ড্রাগ কারটেল দূর থেকে তা পর্যবেক্ষণ করছে, ইতোমধ্যে ইয়াবা বাজারের কিছু অংশ দখল করেছে আইস, কোকেন ইত্যাদি অভিজাত মাদক। ইয়াবা গরীবদের মাদক হিসেবে আরও বহুদিন ব্যবহৃত হবে। বাংলাদেশে মাদক ব্যবসা ড্রাগ কারটেলের কাছে যেদিন লাভজনক বিবেচিত হবে সেদিন থেকে অভিজাত মাদকের বিস্তার রোধ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়া জরুরি এবং এক্ষেত্রে মদের উপর কড়াকড়ি কমিয়ে মাদক সেবনের উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করাই শ্রেয় হবে।

লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী

পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ahmedzeauddin0@gmail.com