মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর পড়াতে গিয়ে উদাহরণ হিসেবে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর একটি কার্টুন প্রদর্শন করেন ফরাসি শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটি। ইসলাম ধর্মবিরোধী এই কার্টুন প্রদর্শনের কারণে চেচনিয়া বংশোদ্ভূত এক মুসলিম বালক ৬০ মাইল দূর থেকে প্যারিসে এসে ঐ শিক্ষককে আল্লাহু আকবর বলে জবাই করে। আত্মসমর্পণের আহ্বান উপেক্ষা করায় হামলার পরপরই বালকটিকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে আরও নয়জনকে পুলিশ ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়াও ফরাসি পুলিশ চরমপন্থী মুসলিমদের বিরুদ্ধে অপারেশন শুরু করেছে এবং ইতোমধ্যে চরমপন্থী হিসেবে চিহ্নিত ২৩১ জন বিদেশিকে ফ্রান্স থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইসলাম ধর্মের কট্টর ভাবধারার প্রচার করায় কয়েকটি সংগঠন ও সমিতি বাতিল করা হয়েছে। ইমাম কর্তৃক শিক্ষক হত্যাকারীর পক্ষে প্রচারণা চালানোর দায়ে রাজধানী প্যারিসের একটি মসজিদ ৬ মাসের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ইউরোপীয় দেশসমূহের মধ্যে ফ্রান্সে সবচেয়ে বেশি মুসলমান বাস করে। প্রায় ৭ কোটি অধিবাসীর মধ্যে ৫১% খ্রিস্টান, ৪০% নাস্তিক, ৬% মুসলমান এবং বাকিরা অন্যান্য ধর্মে বিশ্বাসী। ফ্রান্সে প্রায় ৪২ লক্ষ (কারও কারও মতে ৬০ লক্ষ) মুসলমানের বসবাস। ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি ও বাক্‌স্বাধীনতার পক্ষে ফ্রান্সের মুসলিম নেতারাও এখন অবস্থান নিয়েছেন। শিক্ষক হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বোর্দো মসজিদের ইমাম তারেক ওব্রু শিক্ষক হত্যার ঘটনাকে বর্বরদের কাজ বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন এবং এই হত্যার ঘটনা ফ্রান্সের মুসলিম সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তিকে ধ্বংস করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। হতে পারে, ফরাসিদের হিংসার তীব্র দহন থেকে বাঁচার জন্য ফ্রান্সের মুসলমানদের এই অবস্থানে যেতে হয়েছে। অপরদিকে এই ঘটনায় ফরাসিদের স্বর মুসলমানদের বিরুদ্ধে অতি উচ্চকিত। সারা ফ্রান্সে লাখ লাখ মানুষ নিহত শিক্ষককে ‘নায়ক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে নিজেদের ‘স্যামুয়েল প্যাটি’ বলে ঘোষণা দিয়েছে। চরমপন্থীদের হাতে নিহত শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটিকে মরণোত্তর ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান ‘লিজিয়ন অফ অনার’ দেওয়া হয়েছে।

আঠার মাস পর ফ্রান্সে যে ভোট হবে সেই ভোটের চিন্তা করে ফ্রান্সের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ শিক্ষককে গলা কেটে হত্যা করার ঘটনাকে 'ইসলামি সন্ত্রাসী হামলা' বলে বর্ণনা করেছেন। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে না বললে কট্টর ইসলামবিরোধী ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এই কারণে প্রায় প্রতিটি দেশে এখন কট্টর নেতার সৃষ্টি হচ্ছে, এই কট্টর রাজনৈতিক নেতাদের উপর মানুষের আস্থা এবং সমর্থনও দিন দিন বাড়ছে। ২০১৫ সনে শার্লে হেবদোতে চরমপন্থী মুসলমান কর্তৃক আক্রমণ এবং পরবর্তীতে তাদের ছুরি হামলা, ট্রাক হামলার সময়ও প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ মুসলিমদের বিরুদ্ধে এত কড়া ভাষায় কথা বলেননি। তিনি হয়তো ভেবেছেন, এখন ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে না বললে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মারি ল পেনের পক্ষে জনসমর্থন চলে যেতে পারে। মারি ল পেন ইসলামকে ফ্রান্সের জাতীয় সত্তার জন্য হুমকি হিসাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। চরমপন্থার ইস্যুতে ফ্রান্সের মানুষ আস্তে আস্তে ইসলাম ও অভিবাসী-বিদ্বেষী রাজনীতিক মারি ল পেনের ভক্ত হয়ে উঠছেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানসহ অধিকাংশ মুসলমান ভোক্তারা ফ্রান্সের পণ্য বয়কট করার ডাক দিয়েছেন। তবে ফ্রান্সের মোট রপ্তানির মাত্র তিন শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে এবং মাত্র এক শতাংশ তুরস্কে রপ্তানি হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ফ্রান্স থেকে অস্ত্র ক্রয় করে থাকে; কিন্তু সাধারণ জনগণের সাথে অস্ত্রের সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। ফ্রান্সের আকর্ষণীয় মদ ও কসমেটিকসের কদর সারা বিশ্বের মানুষের কাছে থাকলেও ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে সেগুলোর ব্যবহার মুসলিম সমাজে খুব বেশি নেই। বিশ্বের কৃষিপণ্যের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক ফ্রান্স। ফ্রান্সের পণ্যের বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা এবং চীন। অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান ছাড়া মুসলিম বিশ্বের আর কোন সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান ফ্রান্সের পণ্য বয়কটের ডাক দেননি। মুসলিম বিশ্ব ফ্রান্সের পণ্য বয়কট করে ফ্রান্সকে কাবু করতে পারবে বলেও মনে হয় না, কারণ মুসলমান তাদের পণ্যের মুখ্য ভোক্তা নয়। কিন্তু বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় ফ্রান্স মুসলিম দেশগুলোর পণ্য বর্জন করলে বাংলাদেশ মারাত্মক বেকায়দায় পড়বে; কারণ দেশটি বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানিতে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। ফ্রান্স বাংলাদেশ থেকে বছরে ৩০০ কোটি ডলারের গার্মেন্টস, হিমায়িত খাদ্য, চামড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য আমদানি করে থাকে, আর বাংলাদেশে রপ্তানি করে মাত্র ৩০ কোটি ডলারের পণ্য। পণ্য বর্জন করতে হলে চীনের পণ্য বর্জন করার প্রয়োজন বেশি। উইঘুরের মুসলমানদের উপর সেখানকার প্রশাসনের নির্যাতনের কথা প্রতিদিন মিডিয়ায় আসছে। সম্প্রতি সেখানকার প্রশাসনের ভয়ে সব মুসলমান কোরআন নদীতে ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন; কারণ প্রশাসনের লোকেরা ঘরে ঘরে কোরআন তল্লাশি করছে, যাদের কাছে কোরআন পাওয়া যাচ্ছে তাদের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। কোরআনের এমন অবমাননায় আমরা সরব নই; কারণ সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত আমরা যা ব্যবহার করি তার বেশিরভাগই চীনের তৈরি, যে মোবাইলে পণ্য বর্জনের ডাক দেব তাও চীন থেকে আগত। ফ্রান্সে বৈধ ১৩ হাজার, অবৈধ ৩৭ হাজার বাংলাদেশি আছে, অন্যান্য দেশের মুসলমানদের মতো উগ্র না হওয়ায় ফ্রান্সে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি ‘মডারেট’ মুসলমানদের বেগ পেতে হয় না।

নিহত শিক্ষক নবীজীর যে কার্টুন ক্লাসে প্রদর্শন করেছে তা বহু বছর আগে প্রকাশ করেছিলো শার্লি হেবদো নামক একটি রম্য ম্যাগাজিন। শার্লি হেবদো বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যঙ্গচিত্র ছাড়াও চরম ডানপন্থী, ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়ান, ইহুদি ধর্ম এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশ করে থাকে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানের আপত্তিকর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করায় ম্যাগাজিনটির বিরুদ্ধে তিনি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন। মহানবীর কার্টুন অঙ্কন করে তারা মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত দেয়ায় ২০১৫ সনে কয়েকজন উগ্রপন্থী মুসলমানের আক্রমণে শার্লি হেবদোর অফিসের ১২ জন লোকের মৃত্যু হয়। জাতীয় ঐক্য এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলে মুসলমানদের বর্তমান প্রতিবাদের মধ্যেও মহানবীর কার্টুনগুলোর প্রদর্শন তারা অব্যাহত রেখেছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার মূলনীতি থেকে ফ্রান্স সরে আসবে না বলে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে নবীজীকে নিয়ে মুসলিমরা সংবেদনশীল। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ফ্রান্সের অধিবাসীদের আতঙ্কিত ও ইসলামবিদ্বেষী করে তুলেছে। মুসলমানদের সঙ্গে সৃষ্ট এই দূরত্ব বাড়তে থাকলে সম্প্রদায়গত সংকট আরও ঘনীভূত হবে। এতে লাভবান হবে বিভিন্ন ধর্মের চরমপন্থীরা। ইউরোপের সভ্য দেশগুলোর কিশোরদের মধ্যেও ইসলামবিদ্বেষ মারাত্মক রূপ নিচ্ছে— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন ভিডিওতে দাড়ি, টুপিধারী ও হিজাব পরিহিতাদের রাস্তাঘাটে উগ্র খ্রিস্টান, ইহুদি কিশোরদের হাতে অপমানিত হতে দেখা যাচ্ছে। মুসলমানদের উগ্রতা নিয়ে যেভাবে মিডিয়ায় প্রচার হচ্ছে তাতে হয়তো কোন এক সময় মুসলমান বনাম অন্য ধর্মাবলম্বী—এই দুই ভাগে সারা পৃথিবীর মানুষ ভাগ হয়ে যেতে পারে। এই ভাগ দৃশ্যমান না হলেও মানসিক বিভাজন স্পষ্ট হবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভ্রমণে।

ফ্রান্স ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ফ্রান্সে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধর্মচর্চা থাকলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মের কোন গুরুত্ব নেই। তারা বিশ্বাস করে, কোনো জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হবে। মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হলেও ফ্রান্সকে স্বীকার করতে হবে যে, কারো ব্যক্তিগত নিভৃত বলয়ে কারও অযাচিত প্রবেশ অবাধ স্বাধীনতার প্রবক্তাগণও চান না। ঠিক তদ্রূপ রাষ্ট্রের গুপ্ত-তথ্য অন্যের কাছে প্রকাশ করাও বাক্‌স্বাধীনতার অংশ নয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হলে ফ্রান্স, প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর ‘মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা’ করানো প্রয়োজন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের এমন বক্তব্যে ক্ষিপ্ত হতো না, মর্যাদাহানিকর বলে এরদোয়ানের বক্তব্য ফ্রান্স প্রত্যাখ্যান করত না। দেখা যাচ্ছে, মর্যাদাবান ব্যক্তির মর্যাদাহানি করা বাক্‌স্বাধীনতার আওতাভুক্ত নয়। একই বিবেচনায় তারা নবীজীর মর্যাদায় আঘাত দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে পারে। বাক্‌স্বাধীনতার নামে মুসলমানের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অপকর্ম বন্ধ হওয়া দরকার; কারণ আঘাত থেকে প্রতিঘাতের জন্ম হয়, ঘৃণা থেকে ঘৃণার প্রসব হয় এবং এভাবে চলতে থাকলে এক সময় মানবতাবোধ উবে যাবে, মানুষে মানুষে বিরাজমান ভ্রাতৃত্ববোধ ধ্বংস হবে; প্রতিষ্ঠিত হবে ভয়, ভীতি ও চরমপন্থার অরাজকতা। পারস্পরিক সহাবস্থানের স্বার্থেই ঘৃণা, বিদ্বেষ, সহিংসতা ও উগ্রপন্থার সকল কার্যক্রম পরিহার করা অপরিহার্য।