সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভিত্তিতে ভারতের অযোধ্যায় ৫০০ বছর পুরনো বাবরি মসজিদের জায়গায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি রামমন্দির নির্মাণের সূচনা করেছেন। মন্দির নির্মাণের সূচনা করার পূর্বে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করে মোদি উল্লেখ করেন যে, এই রামমন্দির ভারতে সংস্কৃতির আধুনিক প্রতীক, শাশ্বত আস্থার প্রতীক এবং কোটি কোটি মানুষের মিলিত শক্তির প্রতীক। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানের এমন একপেশে কথা অযৌক্তিক। ভারতে ১৩৫ কোটি লোকের মধ্যে বিশ্বাসী লোক ব্যতীত রামমন্দির তো অন্যদের সংস্কৃতি, আস্থা বা শক্তির প্রতীক হতে পারে না। ইন্দোনেশিয়া এবং পাকিস্তানের পর ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম-জনবহুল রাষ্ট্র। বাইশ কোটি মুসলমান বাদেও ভারতে দুই হাজারেরও বেশি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস এবং শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, বাহাই, জরথুস্ত্রবাদী ভারতে বাস করেন। এছাড়াও ১০৮ কোটি হিন্দুর মধ্যে সবাই যে রামভক্ত তা কিন্তু নয়; পৃথিবীতে নাস্তিক ও সংশয়বাদীর সংখ্যা দুইশত কোটির বেশি বলে ধারণা করা হয়। এই দুইশ কোটি মানুষের কোন ধর্মের প্রতিই কোন আগ্রহ নেই, আগ্রহ নেই মন্দির, মসজিদ, গির্জা ইত্যাদি উপাসনালয়ের প্রতিও। এই লোকগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে, এদের কোন ফোরাম নেই, একতাবদ্ধ হয়ে নিজের মতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এদের কোন উৎসাহও নেই। তাই রামমন্দির ভারতের আধুনিক সংস্কৃতি ও শক্তির প্রতীক হতে পারে না; পৃথিবীতে কোন একক ধর্মই সকল ধর্মাবলম্বীর ঐক্য, শক্তি ও আস্থার প্রতীক নয়, তাই রামচন্দ্রও ভারতীয় সংস্কৃতির আধার নয়। এ কারণেই মমতা বানার্জি বলেন, ‘আমাদের দেশ তার চিরায়ত বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে, এবং আমাদের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধভাবে এই ঐতিহ্যকে বজায় রাখব’।

রামমন্দির নির্মাণ উপলক্ষে সারা ভারতেই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা উৎসব করেছেন। ৪০ কেজি ওজনের একটি রুপার ইটের মাধ্যমে মন্দির নির্মাণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন নরেন্দ্র মোদি। এছাড়াও মন্দিরের জন্য ভক্তদের কাছ থেকে ‘শ্রী রাম’ খোদাই করা দুই লাখ ইট সংগ্রহ করা হয়েছে, ভারতের লাখ লাখ ভক্ত সোনা-রুপার কয়েন, বার ও ইট পাঠিয়েছেন। উদ্বোধনের পূর্বে ভূমিপূজা হয়েছে এবং তাতে ব্যবহৃত হয়েছে ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানের মাটি, এমনকি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর বাসভবনের মাটিও ব্যবহৃত হয়েছে। হুগলির ত্রিবেণী ঘাট থেকে গঙ্গাজল সংগ্রহ করে তা নেয়া হয়েছে অযোধ্যায়। রামের বিগ্রহ গোটা ভারত ঘোরানো হয়েছে। কুম্ভমেলায় সাধুদের অনুমতিও নেয়া হয়েছে এবং কুম্ভমেলায় সাধু-সন্তরা মন্দিরের মডেলও অনুমোদন করেছে।

খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে রামের জন্ম। রামায়ণ অনুযায়ী রামের জন্ম অযোধ্যায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী বাবরি মসজিদ যে স্থানে অবস্থিত ছিল সেটাই ছিল হিন্দু ধর্মের অবতার রামের জন্মস্থান এবং রামের জন্মস্থানে একটি রামমন্দিরও ছিলো; ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট বাবরের নির্দেশে সেনাপতি মীর বকশি এই রামমন্দির ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ তৈরি করেন। এই বিষয়টি নিয়ে আঠারো শতক থেকেই হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্ক চলে আসছে। আদালতের নির্দেশে ২০০৩ সনে নৃতত্ত্ববিদরা জরিপ করে ঐ স্থানে মসজিদের পূর্বের আরেকটি পুরাতন স্থাপনার অস্তিত্ব খুঁজে পায়। এছাড়াও যে ২৬৩টি পোড়ামাটির জিনিস পাওয়া গিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবী, মানুষ ও নারীর শরীর যা ইসলামে নিষিদ্ধ। উপরন্তু দ্বাদশ শতকে নির্মিত ৮৫টি স্তম্ভ সম্বলিত একটি বিরাট স্থাপনার উপর বাবরি মসজিদটি গড়ে উঠেছে বলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রতিপন্ন হয়েছে। বিজেপি সরকারের এই সকল প্রামাণিক তথ্য মুসলমানদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবুও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত বিভিন্ন স্থাপনার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট উক্ত স্থানে মন্দির নির্মাণের রায় প্রদান করে। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর এই স্থাপনা চারশত বছরের স্থায়িত্ব পেয়েছে বলে প্রমাণিত নয়; তাই ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে মসজিদ তৈরির সময় সম্ভবত এই স্থাপনা মাটির উপরে দৃশ্যমান ছিলো না। এই একটি বিবেচনায় মন্দির ভাঙার দোষারোপ মুসলমান শাসকদের করা যায় না। এছাড়াও বিষ্ণু স্মৃতির ৮৫ অধ্যায়ে তালিকাভুক্ত তীর্থস্থানগুলোর মধ্যে অযোধ্যা নেই। ১৫৭৪ সনে রামচরিতমানস অযোধ্যায় বসে রচনা করেন তুলসীদাস; তিনিও এই স্থানটিকে রামের জন্মস্থান হিসাবে উল্লেখ করেননি। অন্যদিকে ‘জৈন সমতা বাহিনী’র মতে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের নিচে যে মন্দিরটির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে, সেটি ষষ্ঠ শতাব্দীর একটি জৈন মন্দির। নেপালের কমিউনিস্ট প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির মতে রাম ছিলেন নেপালি এবং তাঁর জন্মস্থানও নেপালের অযোধ্যায়, ভারতে নয়। তবে ভারতের বিরুদ্ধে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর এমন অকূটনৈতিক এবং অবন্ধুত্বসুলভ আচরণ প্রকৃতপক্ষে চীনকে খুশী করার অপচেষ্টা বলে নেপালের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক মনে করেন।

বাবরি মসজিদ নিয়ে বার বার সংঘাত ঘটলেও ফৈজাবাদ জেলার ১৯০৫ সনের গ্যাজেটিয়ার অনুযায়ী ১৮৫২ সন পর্যন্ত হিন্দু এবং মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই সংশ্লিষ্ট ভবনটিতে প্রার্থনা ও পূজা করেছে। ১৮৫৩ সনে ইংরেজ আমলে এই মসজিদকে নিয়ে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে প্রথমবারের মত সহিংসতার ঘটনা ঘটলে ১৮৫৯ সনে ব্রিটিশ সরকার দেয়াল দিয়ে হিন্দু আর মুসলমানদের প্রার্থনার স্থান আলাদা করে দেয়। ১৯৪৯ সনে মসজিদের ভেতর হিন্দুরা গোপনে রাম-সীতার মূর্তি স্থাপন করলে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দ বল্লভ পন্থকে চিঠি লিখে হিন্দু দেব-দেবীদের মূর্তি অপসারণ করার নির্দেশ দেন, কিন্তু তাঁর নির্দেশ মানা হয়নি। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা বাঁধার সম্ভাবনা দেখা দিলে সরকার ঐ চত্বরে সকলের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য উভয় সম্প্রদায় আদালতের শরণাপন্ন হয়। ১৯৯০ সনে লালকৃষ্ণ আদভাণী নরেন্দ্র মোদিকে সাথে নিয়ে সোমনাথ থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত রথযাত্রা শুরু করেন এবং তখন থেকেই বিজেপি, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা, বজরং দলের উগ্রপন্থী হিন্দুরা বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণে যে কোন ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে থাকে এবং ১৯৯২ সনের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগে ২০১০ সনে এলাহাবাদ হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত ছিলো:

জমিটির দাবিদার রাম লালা, সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড এবং নির্মোহী আখাড়ার মধ্যে সমান তিন ভাগে ভাগ করে দেওয়া হোক। এই রায়ের বিরোধিতা করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানায় মামলাকারী তিনটি পক্ষই। তারপর সুপ্রিম কোর্ট এই আদেশ বাতিল করে এই জমিতে রামমন্দির নির্মাণের আদেশ দিয়ে অযোধ্যার অন্য কোন উল্লেখযোগ্য স্থানে বিকল্প মসজিদ তৈরির জন্য সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে পাঁচ একর জমি দিতে বলা হয়। তদনুযায়ী বাবরি মসজিদের জায়গা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে ধান্নিপুরে নতুন মসজিদ তৈরির জন্য সরকার জমি বরাদ্দ করছে। এই জমি নেয়া, না নেয়া নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ আছে। একদল বলছেন, তাজমহলের ভেতরে জায়গা দেওয়া হলেও নতুন মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি গ্রহণ করা সমীচীন হবে না। অন্যদল নব্বই শতাংশ মুসলিম-অধ্যুষিত ধান্নিপুরে মসজিদ নির্মাণের পক্ষে।

তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের খ্যাতনামা হাইয়া সোফিয়া জাদুঘরকে সম্প্রতি মসজিদে রূপান্তর করে ছিয়াশি বছর পর সেখানে প্রথমবারের মতো জুমার নামাজ আদায় করা হয়েছে। এক্ষেত্রেও আদালতের রায় মানা হয়েছে। দেড় হাজার বছরের পুরনো এই ভবনটি ছিল খ্রিস্টানদের গির্জা, পরে তা পরিণত হয় মসজিদে, কামাল আতাতুর্কের আমলে একে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়। ৫৩২-৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে তৈরি এই বিশাল গির্জার অস্তিত্ব ছিলো ১৪৫৩ সন পর্যন্ত; ১৪৫৩ সনে ইস্তাম্বুল অটোমান সাম্রাজ্যের দখলে আসার পর গির্জাটিকে মসজিদে পরিণত করা হয়। মসজিদে রূপান্তরের পর এর দেয়ালে মার্বেল পাথরে অঙ্কিত যীশু খ্রিস্টের ছবিগুলো সিমেন্ট দিয়ে মুছে দেওয়া হয়। আয়া সোফিয়া নিয়ে খ্রিস্টান-মুসলমানের দ্বন্দ্বের অবসান টানতে ১৯৩৪ সনে আধুনিক তুরস্কের রূপকার মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এর প্রধান হলরুমটি জাদুঘরে পরিণত করেন এবং যীশু খ্রিস্টের ছবিগুলো পুনরুদ্ধার করে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের আলাদা আলাদা দুই রুমে উপাসনার ব্যবস্থা রাখেন। তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোয়ানও ভারতের মোদির মতো তাদের গত নির্বাচনে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য হাইয়া সোফিয়াকে মসজিদ বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ভারত এবং তুরস্কের সর্বোচ্চ আদালত মসজিদ ভাঙা এবং গির্জাকে মসজিদে রূপান্তর সঠিক নয় বলে নিরর্থক অভিমত দিয়েছে। প্রাচীন স্থাপনা ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় ধ্বংস করে নিজেদের উপাসনালয় স্থাপনের অপকীর্তি নতুন নয়। দেশী ও বিদেশী ধর্মান্ধ শক্তি শুধু অন্যের উপাসনালয় ধ্বংসই করেনি, ধ্বংসাবশেষের উপর নিজেদের ধর্মের উপাসনালয় বানিয়ে নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানে আইএস ও তালেবানদের দ্বারা ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও ভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের উপর নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। ২০১৫ সনে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উন্মত্ততার শিকারে অনেকগুলো মসজিদ ধ্বংস হয়। পূর্ব জেরুজালেম মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদি—এই তিন ধর্মাবলম্বীদের কাছেই পবিত্র স্থান; ইহুদিদের 'টেম্পল মাউন্ট', খ্রিস্টানদের 'ডোম অব দি রক' আর মুসলমানদের ‘আল আকসা’ একই স্থানে রয়েছে। এই স্থান নিয়ে শত শত বছর ধরে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে হানাহানি চলছেই। ধর্মের নামে এমন ধ্বংসযজ্ঞ থামবে বলে মনে হয় না। আল্লাহর দুনিয়ায় তো খালি জমির অভাব নেই, তারপরও পূর্বস্থিত স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে বা রূপান্তর করে নিজস্ব উপাসনালয় তৈরির হীন ও উগ্র মানসিকতার অবসায়ন হয় না কেন? মানুষ তো আজকাল মাতা-পিতা ও জন্মভূমি ত্যাগ করে দেশান্তরি হচ্ছে, অন্য দেশে গিয়ে স্থায়ী বসতি স্থাপনের অনুমতি পেয়ে আনন্দে আহ্লাদে আটখানা হয়ে যায়। নিজের জন্মভূমির জন্য যেখানে অনেকের কোন দরদ নেই, জন্মদাতা মা-বাবাকে ছেড়ে বিদেশ-বিভুঁয়ের নাগরিকত্ব পেয়ে যেখানে আনন্দে মাতাল হয়ে যায় সেখানে নিজ সম্প্রদায়ের কারো জন্মভূমি বা উপাসনালয় নিয়ে খুনাখুনি করার আগ্রহীর সংখ্যা কেন কমে না তা বোঝার শক্তি আমার মতো লোকের কখনোই হবে না। ‘পৃথিবী আমার দেশ, মানব আমার জাতি’—এমন মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ না হলে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক সহাবস্থানকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়ে হুমায়ূন আজাদের কথার প্রতিধ্বনি করে বলতে হয়, ধার্মিকেরাই ধর্মালয় ভাঙ্গতে থাকবে, নাস্তিকেরা ধর্মালয়ে যায়ও না, ধর্মালয় ভাঙ্গেও না।