সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল সম্প্রতি মানবপাচার এবং মুদ্রাপাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেফতার হন। এমপি সাহেব তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে উল্লেখ করেছেন যে, জনশক্তি রপ্তানিতেও তিনি জড়িত নন, মানবপাচার তো দূরের কথা। কুয়েত সরকার অবশ্য অবৈধ পথে লোক পাঠানোকেই মানবপাচার বলে অভিহিত করছে। বিএনপির আবুল খায়ের ভূঁইয়াকে পরাজিত করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন এই কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল। স্ত্রী সেলিনা ইসলামকে স্বতন্ত্র কোটায় এমপি করার ক্ষেত্রেও তাকে কোন বেগ পেতে হয়নি; বিভিন্ন দলের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের জাদুমন্ত্রে বশীভূত করে তিনি যেভাবে হঠাৎ কুয়েত থেকে এসেই এমপি হতে সমর্থ হয়েছেন সেই একই প্রক্রিয়ায় চারজন স্বতন্ত্র এমপিকে পোষ মানিয়ে স্ত্রীকেও স্বতন্ত্র কোটায় এমপি বানিয়ে দেন। এমপি মহোদয় নাকি আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন, অন্যদিকে তার স্ত্রী ছিলেন কুমিল্লায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেত্রী; এছাড়াও তিনি বিএনপি’র সমর্থনও পেয়েছেন—তাকে কুয়েতে প্রতিষ্ঠিত করেন তার বড় ভাই কুয়েত বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী মঞ্জুরুল আলম। তিনি দ্য মারাফি কুয়েতিয়া গ্রুপের প্রধান নির্বাহী এবং এই প্রতিষ্ঠানটির কাজ হচ্ছে, কুয়েত, ওমান ও জর্ডানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি সরবরাহ করা। এমপি শহীদের প্রতি বছর আয় হয় প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা।

সম্প্রতি এই এমপি কুয়েতে গ্রেফতার হওয়ার পর আমার ছেলে অর্ণব বারবার বলছিলো যে, কাজী শহীদ স্বতন্ত্র এমপি; কিন্তু আমার তা বিশ্বাস হচ্ছিলো না। বিশ্বাস না হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, যে নির্বাচনে বিরোধী দলের জাঁদরেল প্রার্থীরা জিততে পারেননি সেখানে আবার স্বতন্ত্র প্রার্থী জিতে কী করে। আসলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কারো কোন আগ্রহ ছিলো না বলে কে কোথায় জিতলো বা হারলো এই নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। এই আসনটি সমঝোতা মোতাবেক দেওয়া হয়েছিলো মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টিকে এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন লক্ষ্মীপুর জেলার জাতীয় পার্টির সভাপতি মোহাম্মদ নোমান। এই নোমান সাহেব ভোটের নয় দিন আগে হঠাৎ লাপাত্তা হয়ে যান, নির্বাচন পর্যন্ত তাকে আর কেউ খুঁজে পাননি। এই পাপুলকে মনোনয়ন দেওয়ার সুবিধার্থে জাতীয় পার্টিকে নাকি মহাসচিবের পদে পরিবর্তন আনতেও হয়েছিলো। জাতীয় পার্টির প্রার্থী লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি থেকেও স্বতন্ত্র প্রার্থী শহিদ ইসলামের পক্ষে কাজ করার জন্য আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী পাপুলকে জয়ী করার জন্য দৃশ্য-অদৃশ্য সব শক্তি কাজ করেছে। কুয়েতপ্রবাসী কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিজয়ী হন।

কুয়েতের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী লোকদের ঘুষ দিয়ে আমাদের এই এমপি সাহেব লোকপাচার ও মুদ্রাপাচারের অবৈধ সুযোগটি করে নিয়েছিলেন। কুয়েতের সিআইডি অফিস বাংলাদেশের কয়েকজন শ্রমিককে আটক করে এমপি শহীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার জন্য লোভ দেখিয়ে বলে যে, ‘দেশ থেকে আনার জন্য শহীদ তোমাদের কাছ থেকে যত টাকা নিয়েছে তত টাকা তোমাদের ফেরত দেওয়া হবে’। আর যায় কোথায়—সবাই শহীদের বিরুদ্ধে বলেছে; কিন্তু এই লোকগুলোর সাক্ষী দেওয়া শেষ হওয়ার পর প্রত্যেককে মাত্র ১৫০ কুয়েতি দিনার দিয়ে বিমানে তুলে দেওয়া হয়। শুধু আমাদের মতো গরিব বাংলাদেশকে ঘুষের কথা বলে বিশ্বব্যাংকও অপরাধী করে; অথচ ধনী দেশ কুয়েতেও ধাপ্পাবাজি আছে, আছে ঘুষ আর দুর্নীতি। সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসে থাকাকালীন আমার মেজো ভাই আমাকে লিখা একটি চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন, সৌদি আরবের কোন অফিসে গেলেই সৌদিরা বলে, ‘ইনশাল্লাহ আপনার কাজ হয়ে যাবে’। তারপর যতবারই যাবেন ততবারই ‘ইনশাল্লাহ’ বলবে। তাদের যুক্তি হচ্ছে, আল্লাহর ইচ্ছা নেই বিধায় তারা কাজটি এখনো দেখার সুযোগ পায়নি।

পাপুল দেশে এসে স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনসহ মসজিদ, মন্দির, মাদ্রাসার জন্য দুহাতে টাকা বিলিয়ে এলাকায় ‘দানবীর’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। টাকা বিলানোর জন্য মসজিদ, মন্দিরে তার কদর ইমাম, পুরোহিতের চেয়েও বেশি ছিলো। সমাজের সর্বত্র একই পরিবেশ বিরাজ করছে। টাকা থাকলে সব হয়। আমাদের দেশে ঘুষের ব্যাপ্তি ব্যাপক, ঘুষ খেয়ে ধনী হওয়ার মধ্যে সম্মান আছে, কৃতিত্ব আছে। ঘুষ খেয়ে সম্পদশালী হওয়ার জন্য সমাজে কেউ ঘৃণিত হয়েছেন এমন নজির বাংলাদেশে নেই। টাকা থাকলে সমাজে মাতব্বর হওয়া যায়, রাস্তা-ঘাটে নিরবচ্ছিন্ন সালাম পাওয়া যায়। পরকালের এত লোভ-লালসা থাকা সত্ত্বেও মানুষ ইহকালেই সব সুখ-শান্তি পেতে উদ্গ্রীব। দোজখ আর নরকের লেলিহান শিখায় দগ্ধ হওয়ার ভয়ে কেউ কাবু হন না। দেশে এত মসজিদ-মাদ্রাসা—এখানে তো লোক কম হয় না। শুক্রবারে একটু দেরীতে গেলে রাস্তায় বিছানা পেতে নামাজ পড়তে হয়। আমি ঢাকার একটি ছোট্ট এলাকায় থাকি; শুধু আমার মহল্লায় সাত-আটটি মসজিদ, এদের অনেকগুলো বহুতলাবিশিষ্ট। রমজানের সময় জায়গা পাওয়া যায় না। পরহেজগার এই লোকগুলো সৎ হবে তা সবাই প্রত্যাশা করেন। প্রতি বছর হজে যাচ্ছেন লক্ষাধিক লোক, বিরাট বিরাট গরু কোরবানি দিচ্ছেন কোটি কোটি লোক। ঘুষ আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মের অবস্থান কঠোর। আমি যে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধান ছিলাম সেই প্রতিষ্ঠানের মসজিদে ধর্মের যে বাণী খোদাই করার ব্যবস্থা নিয়েছিলাম তা হচ্ছে, ‘অবৈধ অর্থে গড়া শরীর বেহেস্তে যাবে না’। ধর্মের বাণী কেউ পড়ে না, ধর্মের কথা কেউ শোনে না—শুনলে বাংলাদেশে এত দুর্নীতি, এত অপরাধ হতে পারে না। এক হুজুর তো তার ওয়াজে স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলাদেশে যত ওয়াজ-মাহফিল হয় পৃথিবীর অন্য কোন মুসলিম দেশে তা কল্পনাও করা যায় না। ওয়াজগুলো মুসলমানদের সৎ পথে, সৎ রোজগারে আনতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে তার কোন পর্যালোচনা কোন ওয়াজে শুনেছি বলে মনে পড়ে না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও তো সততার সবক দেওয়া হয়—সেই সবক বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয় না কেন তার বিশ্লেষণ করেও হয়তো অনেকে ডক্টরেট পেয়েছেন, কিন্তু ঘুষ আর দুর্নীতি কমছে না।

আওয়ামী লীগের জামানায় কতগুলো চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির ঘটনা মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে। শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি না হলেও জনগণের কাছে সেগুলো ছিলো আমোদজনক। বালিশ, পর্দার কাপড়, চেয়ার-টেবিল, কলাগাছ ইত্যাদি ক্রয় নিয়ে যেভাবে প্রচার হয়েছে তাতে সরকারের ইমেজ নষ্ট হয়েছে। এখন শুরু হয়েছে ডাক্তারদের হোটেল খরচ নিয়ে। সম্প্রতি পিপিই বা মাস্ক সরবরাহ নিয়ে যে কেলেঙ্কারি হলো তাও সরকারের ইমেজ নষ্ট করেছে। ঘুষ খাওয়ার কাজটি মুসলমানেরা সহজেই রপ্ত করতে পারে। বাংলাদেশ তো দুর্নীতিতে কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো। এখন অবশ্য অবস্থা তত খারাপ নয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হয়, কিন্তু ব্যবস্থা নেয়ার দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপে অভিযুক্তদের ফাঁসি হলেও তার কোন তাৎপর্য জনমনে প্রতিফলিত হয় না। আওয়ামী লীগের নেতারা অনেক কথা বলেন, কিন্তু কাজের কথা বলেন কম। দল বা সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ খণ্ডনের ভাষা আওয়ামী লীগ নেতারা রপ্ত করতে পারেননি। অন্যদিকে কর্মীরা নেতাদের সাথে ছবি তোলে তা অহরহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে সহকর্মীদের মাঝে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে মহাব্যস্ত।

ব্রিটিশ আমলেও ঘুষ, দুর্নীতি ছিলো, পাকিস্তান আমলে তো ছিলোই। ঢাকা শহরে পঞ্চাশটি খাল ছিলো, এখন নেই, ভরাট হয়ে গেছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে ভরাট করে ইমারত ও বিভিন্ন স্থাপনা করলেন তারা তো রাতের অন্ধকারে করেননি, করেছেন দিনদুপুরে সকলের সম্মুখে। এই খালগুলোর তদারকি করার লোক নিশ্চয়ই ছিলো, কোন আমলে তাদের কারো শাস্তি হয়েছে এমন কাহিনী আমি শুনিনি। দুই, তিন বা চার ফুট রাস্তার পাশে অজস্র ভবন; এই ভবনগুলো নির্মাণের অনুমোদন কে দিলো, কোন আইনে দিলো কেউ তা বের করার চেষ্টা করেছে বলেও শুনিনি। আমি ব্যাংক লোন দিয়ে পৌনে দুই কাঠার উপর একটি বাড়ি করেছি, আমার আশেপাশে চার কাঠা বা পাঁচ কাঠার উপরও বাড়ি আছে; কিন্তু এমন একটি বড় ভবনের সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্স আমার বাড়ির চেয়ে কম কেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে কর্পোরেশনের এক কর্মচারী রেগে গিয়ে প্রায় পনের/বিশ বছর আগে বলেছিলেন, ‘আপনি কে এই প্রশ্ন করার? কোন বাড়ির কত কর হবে তা আমরা নির্ধারণ করবো, আপনি নন, কুদরত থাকলে আপনারটার করও কমিয়ে নেন’। সম্প্রতি করোনার জন্য মিটার না দেখে পূর্ববর্তী মাসের সাথে মিল রেখে দুই মাসের বিদ্যুৎ বিল করা হয়েছে; এটা হতেই পারে। কিন্তু বিল তৈরির সময় কম্পিউটারে বসে যারা কাজ করেছেন তারা বিগত মাসগুলোর বিল দেখারও প্রয়োজন বোধ করেননি; মিটার না দেখে প্রদত্ত বিলের সাথে তার আগের কয়েক মাসের বিলের কোন মিল নেই, আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তাই বলে কোন বিল কম করা হয়নি, কয়েক গুণ বেশি করা হয়েছে। মিডিয়ায় এসে মন্ত্রী মহোদয়কে এইজন্য বিবৃতি দিতেও হলো, এই প্রথম বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর ২৯০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সুপারিশ করা হয়েছে।

দলের প্রকৃত ত্যাগী নেতা, কর্মীদের বঞ্চিত করে টাকাওয়ালাদের মনোনয়ন দেওয়ার কাহিনী প্রতিটি নির্বাচনেই শোনা যায়। গত নির্বাচনে বিএনপি তো প্রায় প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্য করেছে বলে তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে শোরগোল উঠেছিলো। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন পাওয়ার জন্য প্রার্থীদের হন্যে হয়ে ছুটে বেড়ানোর দৃশ্য বেশ আমোদজনক। পার্টির প্রভাবশালী নেতাসহ মনোনয়ন প্রদান কমিটির সদস্যদের তখন রমরমা অবস্থা; এই সকল নেতার পিএ/পিএস-দের ‘স্যার’, ‘ভাই’ ইত্যাদি সম্বোধনে আপ্লুত করতে প্রার্থীর আকুতি মেলোড্রামার আবহ তৈরি করে থাকে। বিগত নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা জাতীয় পার্টির মহাসচিবকে বনানী কার্যালয়েই প্রায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন। অন্যদিকে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায় এবং পল্টন কার্যালয় বন্ধ করে দিয়েছিলো। বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্টারদের তখন পোয়াবারো; খ্যাত-অখ্যাত প্রার্থীদের ছবি তোলে ভিডিও করে অনেক রিপোর্টার তখন দুহাতে টাকা কামিয়েছেন।

তাই সব দোষ শুধু কাজী শহীদ ইসলামের কাঁধে তুলে দিয়ে অন্যদের সাধু সাজার অভিনয় অর্থহীন। কোন দল থেকে কাউকে কোন কারণে বহিষ্কার করা হলে সাংবাদিকসহ সবাই একযোগে তার যত দোষত্রুটি আছে তার সবগুলো রং লাগিয়ে ফুটিয়ে তোলেন, কিন্তু দলে থাকাকালীন দীর্ঘদিন পূতপবিত্র থাকার রহস্য কেউ খুঁজে দেখেন না। এখন আমরা সবাই এমপি কাজী শহীদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করছি, কিন্তু শহীদকে কে মনোনয়ন দিলো, তার জয়লাভের নেপথ্যের নায়ক কারা, কে কত টাকা নিয়েছেন—তার হিসাব কি কেউ নেবেন?