করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত কর্মচারী-কর্মকর্তার বেতন কমে যাচ্ছে। ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস’ কিছুদিন আগে ব্যাংক ব্যবসার দুর্যোগ বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে তাদের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন কমানোর পরামর্শমূলক প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে কর্মীদের পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট, ইনসেন্টিভ বোনাস বন্ধ করাসহ ব্যাংক বাঁচাতে ১৩ দফা সুপারিশ করেছিল সংগঠনটি। ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাংক তাদের কর্মীদের বেতন কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। বেতন হ্রাসের পক্ষে ব্যাংক মালিকদের যুক্তি হচ্ছে, বেতন কমানো না হলে বিকল্প পরিকল্পনায় কর্মচারী-কর্মকর্তা ছাঁটাই করতে হবে। তাদের আরও যুক্তি হচ্ছে, করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে ব্যাংকিং ব্যবসা প্রায় স্থবির হয়ে গেছে, আমদানি-রফতানি হ্রাস পেয়েছে, নতুন বিনিয়োগ নেই, পুরাতন বিনিয়োগ থেকে ঋণগ্রহীতাদের আয় না থাকায় ঋণের সুদাসল আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না।

স্বাধীনতা লাভের পরপর বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে অন্য দেশের ব্যাংকগুলো সন্দিহান ছিলো; বিদেশি ব্যাংকগুলোর ধারণা ছিলো, বাংলাদেশের কোন ব্যাংক তার দায় পরিশোধ করতে সমর্থ নয়। অবশ্য এই সন্দেহ এখনো যায়নি, এখনো বড় বড় এলসি’র ক্ষেত্রে আমাদের দেশে কর্মরত বিদেশি কোন একটি ব্যাংকের পুনর্নিশ্চয়তার প্রয়োজন হয়। এক সময় বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এত বিপুল পরিমাণে ছিলো যে, ব্যাংকগুলোর সাথে বিদেশি ব্যাংকগুলো ব্যবসা করতে ইতস্তত করত। তখন বোধ হয় মন্দ ঋণ অবসায়ন করে ব্যালেন্সশীট ক্লিন করার নিয়ম চালু করা হয়। শুধু আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নয়, অদক্ষতা ও অনিয়মের প্রশ্রয় মিডিয়ায় প্রচারিত হওয়ার পর ইদানীং ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থাও কমেছে। বড় বড় কিছু লগ্নির ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাজুক অবস্থার চিত্র মিডিয়ায় প্রচারিত হওয়ার পর সাম্প্রতিককালে ব্যাংকের ইমেজ প্রায় তলানিতে নেমেছে। বেসিক ব্যাংকের আর্থিক সূচকসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা এক সময় ঈর্ষণীয় মাত্রায় সর্বোৎকৃষ্ট ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে শুধু অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকটির অস্তিত্ব রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়ে। গত ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে করোনার প্রাদুর্ভাবের পূর্বেই এই বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি কমানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়। অব্যবস্থাপনার কারণে ফার্মার্স ব্যাংক এবং পিপলস লিজিং কোম্পানিরও অবসায়ন হয়েছে। সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ব্যাংককেও বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে সরকারকে অর্থায়ন করে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে।

করোনাভাইরাস বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির উপর করোনার নেতিবাচক প্রভাব এখনো সম্পূর্ণ দৃশ্যমান হয়নি, করোনার প্রকোপ দীর্ঘায়িত হলে অচিরেই দৃশ্যমান হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতিতে বৈশ্বিক মহামন্দা দীর্ঘায়িত হলে শুধু ব্যাংকিং সেক্টর নয়, সব সেক্টরেই বিরূপ প্রভাব পড়বে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে যাবে, লোকবল ছাঁটাই হবে, বিদেশ থেকে দলে দলে শ্রমিকেরা দেশে ফেরত আসবে, বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। পৃথিবীতে বাংলাদেশের মতো বহু দেশ আছে যারা শুধু একটি সেক্টরের রপ্তানি আয়ের উপর নির্ভরশীল—জ্বালানি তেল, গার্মেন্টস, পর্যটন, বিনোদন বা সেবা খাত ইত্যাদি। এই আয় এখন নেই। শুধু ব্যবসা বন্ধ হয়নি, এর সাথে সংশ্লিষ্ট লক্ষ লক্ষ লোক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশসহ সব দেশের যৌনকর্মীরাও না খেয়ে মরছে; কারণ সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে যৌনকর্ম করা সম্ভব নয়। সব দেশেই মাসাজ পার্লার বন্ধ—এক্ষেত্রেও শারীরিক স্পর্শ অপরিহার্য। অনেক সংবাদপত্র তাদের সকল কর্মচারীর বেতন দেয় না বা দেওয়ার সামর্থ্যও নেই; সরকারের প্রণোদনার জন্য তাকিয়ে আছে। অন্যদিকে গ্রাহকেরা অনেকে করোনার ভয়ে পত্রিকা রাখা বন্ধ করে দিয়েছেন অথবা গ্রাহকদের কাছে পত্রিকা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। স্কুল পুরো বছর বন্ধ থাকলে ছাত্রবেতন পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না, ছাত্র-ছাত্রী বেতন না দিলে শিক্ষক বাঁচবেন কী করে। ট্রেনে যাত্রী না থাকায় বাংলাদেশে ইতোমধ্যে কয়েকটি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে, দূরপাল্লার বাসগুলো যাত্রী পাচ্ছে না, পৃথিবীর অনেকগুলো বিমান সংস্থা দেউলিয়া হয়ে যাবে, হোটেল ব্যবসা প্রায়ই বন্ধ—ডাক্তারদের রাখার জন্য তালিকাভুক্ত হতে বিভিন্ন তারাবিশিষ্ট হোটেলগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে, পোশাক-পরিচ্ছদের দোকানে কোন ক্রেতা নেই, খেলাধুলা বন্ধ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নেই—এই সকল প্রতিষ্ঠান ও অনুষ্ঠানের সাথে কোটি কোটি লোক জড়িত। অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদেরও কোন কাজ নেই। দীর্ঘদিনের লোকসান তো আর সরকারের প্রণোদনা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয় না থাকলে সরকার রাজস্ব আদায় করবে কোত্থেকে? টাকা ছাপিয়ে বাজারে দিতেই হবে, কিন্তু তা কত?

গার্মেন্ট সেক্টরের আমদানি-রপ্তানি দুটোই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তৈরি পোশাকের বহু অর্ডার ইতোমধ্যে বাতিল হয়েছে। বড় বড় কারখানা হয়তো টিকে যাবে, কিন্তু ছোট পুঁজির কারখানার অর্ডার বাতিল হলে তাদের টিকে থাকা কোনভাবেই সম্ভব হবে না। প্রাইভেট ব্যাংকারদের মতো গার্মেন্টকর্মীদের বেতন হ্রাসের কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রায় পঁচাশি শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে; এ খাত সঙ্কটে পড়লে দেশের পুরো রফতানি খাতই সঙ্কটে পড়বে এবং এই খাতে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোও গভীর সঙ্কটে নিপতিত হবে। অনেক শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সিক হবে, দেউলিয়া হবে, আসল টাকা আদায় হবে না, সুদ মওকুফের দাবী উঠবে। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) আশঙ্কা হচ্ছে, করোনাভাইরাসের কারণে ২৪ কোটি ২০ লাখ লোক চাকরি হারাতে পারে; এর মধ্যে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশী কর্মী কতজন তার হিসাব জানা যাবে কিছুদিন পর। কারণ সবগুলো দেশই করোনার কারণে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তেলের দাম কমার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উন্নয়নমূলক কাজ হ্রাস পেয়েছে, তারাও কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে। বিদেশে বাংলাদেশীদের ফুটপাতে বসে হাহুতাশ করতে দেখা গেছে। মালয়েশিয়া, কোরিয়া এই সুযোগে অবৈধ লোকদের তাড়ানোর সর্বাত্মক ব্যবস্থাদি গ্রহণ করেছে।

দক্ষ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং নানাবিধ হস্তক্ষেপের কারণে বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা কখনোই আসেনি; করোনার কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকট এখন আরও ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা অবস্থায় অপরাপর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মতো ব্যাংকগুলোও কর্মীর বেতন কমিয়ে বা ছাঁটাই করে টিকে থাকার চেষ্টা করবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির সংজ্ঞা অনুযায়ী জোর করে কোন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখাটা অব্যবস্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাংক-কর্মী বা কারখানার শ্রমিকদের যদি এই প্রতীতি জন্মায় যে, তাদের মালিকেরা তাদের মেধা ও শ্রমে উপার্জিত আয় দিয়ে নিজের আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতায় ডুবে আছেন তখন বেতন কমানো বা কর্মী ছাঁটাই তাদের কাছে যুক্তিগ্রাহ্য মনে হবে না। প্রাইভেট ব্যাংকগুলো প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার মুনাফা করেছে, কোন কোন ব্যাংক ছয়শত/সাতশত কোটি টাকা লাভ করেছে। তাই করোনার সাময়িক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে এক্ষুণি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন হ্রাস করার বিষয়টি বিবেচিত হওয়ার কথা নয়। এক সময় প্রাইভেট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বেতন-ভাতাদি মনে হতো নিলামে উঠেছে; দেশের জাতীয় বেতন স্কেলের সাথে সঙ্গতিহীন মাসিক বেতন দশ-পনের লক্ষ টাকা। প্রাইভেট ব্যাংকগুলো আরও কিছু অকাজ করে থাকে; তাদের শাখার ব্যয়বহুল সাজসজ্জা দেখলে পাঁচতারা হোটেলের মতো মনে হয়, অনেক গ্রাহক ভেতরে ঢুকতেই ভয় পায়। অন্যদিকে প্রাইভেট ব্যাংকগুলোর উচ্চমূল্যের গাড়ির বহর দেখলে মনে হয় না আমরা কোন গরিব দেশের অধিবাসী। কোন কোন ব্যাংকের সভা, বোর্ড মিটিং হয় লন্ডন বা কক্সবাজারে। এমন সব আরামদায়ক খরচ না কমিয়ে সব বোঝা কর্মীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া অগ্রহণযোগ্য।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য; ‘মালিকরা এই পরিস্থিতিতে কী কী ছাড় দেবেন, তারা বছর শেষে লভ্যাংশ নেবেন কি না তা কর্মীদের জানানো উচিত’।

শিক্ষিত যুবকদের কাছে ব্যাংকিং পেশাটি চ্যালেঞ্জিং হলেও বেতনকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় আকর্ষণীয়ও। নীতিনিষ্ঠ, করিতকর্মা এবং মালিকদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হলে দ্রুত পদোন্নতিও পাওয়া যায়, মেধাবীরা তাই আজকাল ব্যাংকিং পেশাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি ব্যাংকগুলো সাধারণত ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়া অন্য কোন সেক্টরে অর্থ লগ্নি করে না, তাদের অর্থায়নে খুব বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। প্রকল্পঋণে ঝুঁকি বেশি বলেই বিদেশি ব্যাংকগুলো শুধু বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য হ্রাস পেলেও প্রকল্পঋণ খুব বেশি না থাকায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি দেশী ব্যাংকগুলোর তুলনায় কম। দেশী-বিদেশি যাই হোক না কেন মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তাদের নিকট মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি বহনের নীতি পরিত্যাজ্য। তাই মন্দা কাটানোর যুৎসই কর্মকৌশল দিয়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকার সংগ্রাম করতে হবে, এই সময়ে বিচক্ষণতা ও মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার অপরিহার্য। এমন অস্বস্তিকর অর্থনৈতিক পরিবেশ থেকে উত্তরণে সরকার ও প্রাইভেট সেক্টরে সম্প্রসারণমূলক কাজকর্মে অর্থ যোগান দেওয়ার জন্য ব্যাংকের কর্মচারী-কর্মকর্তার শুধু আন্তরিকতাই যথেষ্ট নয়, ব্যাংকগুলোর সুস্থ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও জরুরি।