১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এক অজ্ঞাতনামা লেখকের ‘মিয়াজান দারোগার একরারনামা’ নামের ছোট্ট বইটি পেয়েছি আমার সাংবাদিক বন্ধু শফিকুল ইসলাম ইউনুসের কাছ থেকে। বইটি ১৮৬৯ সনে প্রকাশিত হলেও এর ঘটনাকাল আরও তিরিশ বছর আগের। বইয়ের শুরুতেই মিয়াজান দারোগা পাঠকদের জানিয়ে দেন যে, তার বোন কালেক্টারের রক্ষিতা এবং সেই সুবাদে কালেক্টারের জোর সুপারিশে তার চার টাকা বেতনে পুলিশ বিভাগে চাকরি হয়; কিন্তু এই মাসিক বেতন তিনি কখনোই পেতেন না। চুক্তি অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের খাসবেয়ারা গোপাল মিয়াজানের মাসিক বেতন নিজেই স্বাক্ষর জাল করে তুলে নিতো এবং বিনিময়ে দারোগার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠলে গোপাল মামলা ডিসমিস করার ব্যবস্থা করত। মাসমাইনে গোপাল নিয়ে গেলেও সংসার চালাতে মিয়াজান দারোগার কোন সমস্যা হতো না। কারণ সমাজে বিবাদ-বিসম্বাদ লাগিয়ে দিয়ে মামলার বাদী-বিবাদী দুজনের কাছ থেকে দারোগা ঘুষ নিতো, জমিদার বা প্রভাবশালীদের অনুরোধে নিরীহ লোকদের মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়ে জমিদার ও গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করত, কারো ঘরে অবৈধ মালামাল গোপনে রেখে দিয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে প্রচুর উৎকোচ পেত। বিচারক, আমলা, মোক্তার, বেয়ারা সবাই ঘুষখোর ছিলো বলে দারোগার কোন কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াতো না। পুলিশহাজতে অত্যাচারের কাহিনী আরও বীভৎস; স্বীকারোক্তি আদায় করার ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে পিছমোড়া বেঁধে চিত করে শুইয়ে নাভির উপর একটি ঘুরঘুরে পোকা রেখে নারিকেলের মালা দিয়ে চাপা দেওয়ার আধঘণ্টার মধ্যে এই পোকা নাভিতে গর্ত করা শুরু করত। পুলিশ কীভাবে নানা ফন্দিফিকির বের করে নিরীহ লোকদের গ্রেফতার করত, সৎ কর্মচারীরা কীভাবে নির্যাতিত ও অপদস্থ হত, আদালতে কীভাবে নিরপরাধ ব্যক্তির সাজা হত, কেমন করে আইনের মারপ্যাঁচের সুযোগ নিয়ে হাকিমরা নিজেদের শ্রীবৃদ্ধি ঘটাত, কীভাবে কানুনগোর কারসাজিতে নকল নথির ভিত্তিতে আসল হকদারের বিপক্ষে আদালতে রায় দেওয়া হতো ইত্যাদির নিখুঁত বর্ণনা রয়েছে প্রায় দেড়শত বছর আগেকার এই ছোট্ট বইটিতে।

বর্তমানে পুলিশ সম্পর্কে জনগণের ধারণার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। কারণ পুলিশের চেয়ে অন্য সেক্টরে ঘুষ, দুর্নীতির ব্যাপকতা আরও দুর্বিষহ। চোর, ডাকাত, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, বদমাশ, লম্পটদের নিয়ে পুলিশ কাজ করে বিধায় আর্থিক প্রলোভনের মাত্রা সীমাহীন। এমন অসীম প্রলোভন থেকে মুক্ত থাকার জন্য শুধু ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তি যথেষ্ট নয়, প্রক্রিয়া-পদ্ধতিরও নিরপেক্ষ, নিষ্কলুষ প্রয়োগ অপরিহার্য। কারণ পুলিশদের প্রতিনিয়ত অপরাধীর সাথে সখ্যতা করে অপরাধ ও অপরাধীর বিনাশ করতে হয়। কিন্তু অফিসে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে নথি ঠেক দিয়ে যারা ঘুষ খায় তারা পুলিশের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর অপরাধী। চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী সন্দেহে মানুষ যখন নির্মম নিষ্ঠুরভাবে মানুষ পেটায় তখন অপরাধীর একমাত্র রক্ষাকর্তা এই পুলিশ। এক পলাতক সন্ত্রাসী সন্তানকে গণপিটুনি থেকে বাঁচানোর জন্য এক বৃদ্ধা মা’কে পুলিশের কাছে ছুটে যেতে দেখেছি।

পুলিশের নাম উচ্চারণ করার সাথে সাথে সবার মনে বেধড়ক লাঠিপেটার কথাটাও মনে পড়ে। সব রাজনৈতিক দলের কর্মী ও নেতারা পুলিশের মার খেয়েছেন, অনেক নেতার মাথা ফেটে রক্তে পোশাক রঞ্জিত হয়েছে। মার খাওয়া নেতাদের মধ্যে অনেকে আবার পুলিশমন্ত্রীও হয়েছেন। পাকিস্তান আমলে মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে গিয়ে রাজনৈতিক নেতা অলি আহাদকে যখন পুলিশ পেটায় তখন অলি আহাদ রাগে-ক্ষোভে পুলিশকে শাসিয়ে বলেন, ‘আমি ক্ষমতায় গেলে তোকে দেখিয়ে দেব’। প্রত্যুত্তরে পুলিশের উত্তর ছিলো, ‘স্যার, আপনার হুকুমে তখন আপনার বিরোধী দলকে এমনি করে পেটাবো’। সকল নেতিবাচক কাজের জন্য ব্রিটিশ আমল থেকেই পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পাকিস্তানের পর আমরা বাংলাদেশের পুলিশ পেয়েছি, এখনো তারা নির্দেশ পালন করতে গিয়ে সব সরকারের আমলে একই আচরণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। পুলিশও নিয়মিত মার খাচ্ছে, ইটের টুকরার আঘাতে তাদের মাথার রক্তও পড়েছে।

করোনার এই সঙ্কটে পুলিশ ভূমিকা একেবারেই বদলে গেছে, নিজের জীবনের কথা চিন্তা না করে, পরিবারের সদস্যদের কথা না ভেবে জনগণের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। পুলিশ, RAB ও সেনাবাহিনী ইতঃপূর্বেও জাতীয় দুর্যোগে দুর্গতদের সহায়তা করেছেন, কিন্তু প্রাণ দিয়ে লোককে এমনভাবে সাহায্য করার দৃশ্য আগে কখনও দেখা যায়নি। অগ্নিকাণ্ড, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জঙ্গি মোকাবিলায় পুলিশ, RAB ও সশস্ত্রবাহিনী সর্বদা দুর্গত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রথম গুলিটি ছুঁড়েছিলো পুলিশ; একাত্তরে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ ও সশস্ত্রবাহিনীর প্রশিক্ষণ থাকলেও করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার কোন শিক্ষা বা অস্ত্র তাদের নেই। খালি হাতে করোনা যুদ্ধে নেমেও পুলিশ, RAB ও সেনাবাহিনী নিজেদের সুরক্ষার অজুহাত তুলে কখনো পশ্চাদপসরণ করেননি।

করোনাভাইরাসে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে একটি কলাম লেখার জন্য মিরাজ আকন নামে আমার এক পুলিশ ফেসবুক বন্ধু অনুরোধ করেছেন। আমার এই বন্ধুর বয়স খুবই কম, দেখতে ভীষণ স্মার্ট। করোনার শুরুতে তিনি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন, ‘আপনারা ঘরে থাকুন, আমরা আপনাদের নিরাপত্তায় বাইরে আছি’। করোনার এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে আমার আরেক বন্ধু শরিয়তপুরের পুলিশ সুপার, এস. এম. আশরাফুজ্জামান দোলার নির্ভয় আন্তরিক তৎপরতা মিডিয়ার গুরুত্বসহকারে প্রচারিত হতে দেখলাম। দেশজুড়ে প্রতিটি জেলায় পুলিশদের সেবায় অকৃত্রিম ভালোবাসার ছোঁয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে। একজন প্রতিবন্ধী কিশোর সাইকেল চালিয়ে কোথাও যাওয়ার পথে আরেক পুলিশ অফিসার তাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করছেন, ‘করোনার মধ্যে কোথায় যাচ্ছ?’ কিশোর বললো, ‘কোথাও ত্রাণ দেয় কি না দেখতে’। ‘তুমি সারাদিন কিছু খেয়েছ?’ ‘না’। ‘তুমি এখানে চেয়ারে বস, আমি আসছি’। মনে হলো পুলিশ অফিসার ত্রাণ আনতে গেলেন অথবা কিশোর ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবার কিনতে গেলেন। এমন হাজার হাজার পুলিশ, RAB ও সেনাবাহিনী রোদ, বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছেন, জনগণকে বাসায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, রাস্তায়-ঘাটে, হাটে-বাজারে, মাঠে-ময়দানে, মসজিদ-মন্দিরে প্ল্যাকার্ড ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে জনগণকে সতর্ক ও সচেতন করে যাচ্ছেন, রাস্তায় জীবাণুনাশক স্প্রে করছেন, যানবাহনের স্বল্পতায় রোগীদের গাড়ী করে হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছেন, কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন থেকে পালানো ব্যক্তিদের খুঁজে বের করছেন। সরকারের ত্রাণ নয়, পুলিশ ও সেনাবাহিনী নিজের রেশনের চাল, ডাল, তেল, লবণ ইত্যাদি অভুক্তদের মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছেন, ভাসমান লোকদের সস্নেহে কাছে ডেকে নিয়ে খাবার খেয়েছে কি না জিজ্ঞেস করছেন। শুধু খাবার নয়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ, RAB ও সেনাবাহিনীর লোকেরা রাস্তায় গরিব লোকদের মুখে মাস্ক পরিয়ে দিচ্ছেন। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের ভয়ে ঘনিষ্ঠতম প্রিয়জনেরাও যখন দূরে সরে যাচ্ছে, করোনায় মৃত মা’কে যখন সন্তান বনজঙ্গলে ফেলে রেখে পালায় তখন তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী—দাফনের দায়িত্ব পালন করছেন তারা অকুতোভয়ে। চাষীদের লোকসান কমানোর অভিপ্রায়ে সেনাবাহিনী মাঠে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে সবজি কিনছে। নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীও দুস্থদের মধ্যে খাবার বিতরণ করছে। এমনকি রাস্তার অভুক্ত কুকুরদের খাবার দিতেও পশুপ্রেমী পুলিশদের দেখা যাচ্ছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর এমন উদ্যোগ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।

করোনাপূর্ব দিনে বাড়ির দরজায় পুলিশ এলে মান-ইজ্জত থাকতো না, এখন না এলে জীবন থাকছে না। জনকল্যাণমুখী দায়িত্ব পালন ও মানবিক কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে পুলিশের উপর জনগণের আস্থার অভাব দূরীভূত হয়েছে। নানা দুর্যোগেও মানুষ বেঁচে থাকে, কিন্তু যে বেঁচে থাকায় পরোপকার হয় না সেই বেঁচে থাকার অর্থ গৌণ ও তাৎপর্যহীন। জনতা আর পুলিশের যে একটি হার্দিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, করোনার সঙ্কটে তাদের যে প্রশংসনীয় ইমেজ তৈরি হয়েছে তা অটুট থাকুক এটাই আমাদের সকলের কামনা।