‘তুই কেন অর্থনীতি নিয়ে পড়তে চাস?’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে আমাকে আমার মেজো ভাই আমাদের গ্রামের বাড়ির উঠানে এই প্রশ্নটি করেছিলেন। আমি উত্তরে দেশ ও জাতি উদ্ধারের মহান ব্রতের কথা বলি। মেজো ভাই হেসে বললেন, ‘এমন গালভরা উদ্ভট কথা যারা মৌখিক পরীক্ষা নেন তারা জ্ঞানী হলে বিশ্বাস করবেন না’। আজ আমিও বিশ্বাস করি না যে, সেবা দেওয়ার মহান ব্রত নিয়ে সবাই ডাক্তার, নার্স হয়েছেন। স্কুলজীবনে রচনায় অবশ্য দেশসেবার মহান ব্রতের কথা উল্লেখ করতে হতো, নতুবা নম্বর পাওয়া যেত না। তাই কোন কোন চিকিৎসক বলছেন, ‘আমি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের ভর্তুকি না নিয়ে বাপের পয়সায় পড়েছি, চিকিৎসা করবো কি না সেই সিদ্ধান্ত আমার’। এভাবে কৃষক যদি তার জমিতে ফসল না ফলায়, জেলে যদি মাছ না ধরে, পরিবহণ মালিক যদি গাড়ি না চালায়, ব্যবসায়ী যদি আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, বেসরকারি শিল্প-কারখানায় যদি উৎপাদন না হয়—তাদের বিরুদ্ধেও তো রাষ্ট্রের কিছু করার থাকে না। এই স্বাধীনতা মেনে নিলে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। বিদেশি আক্রমণে যুদ্ধের ময়দানে শুধু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভয়ে সেনাবাহিনী যদি পিছু হটতে থাকে তাহলে তো দেশ রক্ষাই হবে না। পুলিশ যদি সন্ত্রাসীর ভয়ে পালিয়ে জীবন রক্ষায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে মানবজাতির অস্তিত্ব বিনাশে করোনার প্রয়োজন হবে না, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লুডু খেলার মতো বিরোধেই মানবজাতি বিলীন হয়ে যাবে।
করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কিছু চিকিৎসক ও নার্স কর্মবিরতি দিয়ে বাসায় বসে টেলিভিশনে করোনার হালনাগাদ তথ্য নিচ্ছেন। বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশনের কারণে সৃষ্ট জ্বর বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীকে সরকারি, বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সর্দি-কাশি বা জ্বর থাকলেই রোগী চিকিৎসকের কাছে অচ্ছুত হয়ে যাচ্ছেন। শুধু একটু চিকিৎসার জন্য রোগী অপ্রতুল যানবাহনের সীমাবদ্ধতায় পায়ে হেঁটে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়াচ্ছেন। হাসপাতালে এসে কোন রোগী চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাবে, সেটা যে কারো পক্ষেই মেনে নেওয়া কষ্টকর। চিকিৎসাসেবার সঙ্গে মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়টি জড়িত। করোনার কোন একটি উপসর্গ দেখা দিলে মৃত্যুভয়টি ভয়াবহ হয়ে উঠে যখন চিকিৎসাসেবা দিতে ডাক্তার ও নার্সদের অস্বীকৃতির খবর বিভিন্ন মিডিয়া গুরুত্বসহকারে প্রচার করে। চিকিৎসক তার পেশা ছেড়ে গৃহকোণে লুকিয়ে জীবন বাঁচায়—এমন চিত্র মানুষকে মানবিকতাশূন্য বিশ্বে বসবাসের সঙ্কেত দিচ্ছে।
চিকিৎসকদের এমন হওয়ার কথা ছিলো না। করোনাভাইরাস অত্যধিক ছোঁয়াচে বিধায় ডাক্তার ও নার্সদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি একটু বেশি। কারণ সেনাবাহিনী, পুলিশ, ব্যাংকার, পরিচ্ছন্নতা-কর্মী, পরিবহণ-কর্মী এবং অন্যান্য জরুরি সেবা প্রদানে নিয়োজিত ব্যক্তিগণকে সরাসরি করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসতে হয় না, চিকিৎসক ও নার্সদের করোনা রোগীর পাশে থেকে সেবা দিতে হয়। তাই তাদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ চিকিৎসা পাওয়ার স্বার্থেই অপরিহার্য। কিন্তু তাই বলে তারা করোনার ভয়ে পেশা ত্যাগ করবে এমন প্রত্যাশা কেউ করে না। অনেক চিকিৎসক ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অজুহাতে সাময়িকভাবে ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দিয়ে প্রাণভয়ে নিরাপদ কোয়ারেন্টাইনে আছেন। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সাথে সাথে একজন পরিচিত ডাক্তার হুমকি দিয়ে বললেন, চিকিৎসকদের সুরক্ষা দেওয়া না হলে তারা চিকিৎসাসেবা দেবেন না। উচিত কথা বলেছেন; কিন্তু ডাক্তারদের এতগুলো দলীয় সংগঠন থাকা সত্ত্বেও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আগে বসেননি কেন? অবশ্য এক্ষেত্রে সরকারের অগ্রণী ভূমিকা থাকা বাঞ্ছনীয় ছিলো; স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছুটা পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে একজন ডাক্তার এভাবে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেতেন না। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের পিপিইসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি সরবরাহের দায়িত্ব সরকারের, কিন্তু বেসরকারি হাসপাতাল ও প্রাইভেট প্র্যাকটিশনারদের জন্য সরঞ্জামাদি সরবরাহের দায়িত্ব সরকারের থাকার কথা নয়; কারণ এটা ব্যবসা। সরকারের অনুমোদন নিয়ে হাসপাতাল বা ক্লিনিক খুলে ব্যবসা করলে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সংগ্রহের দায়িত্ব হাসপাতাল ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের, সরকারের নয়। পিপিই বা ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণের সংকট সারা বিশ্বে পরিলক্ষিত হচ্ছে। সত্য বলে বিশ্বাস না হলেও শোনা যায়, বৃটেন ও ইতালিতে ডাক্তারেরা নাকি বাজারের পলিথিন দিয়ে পিপিই তৈরি করে করোনা রোগীর সেবা দিচ্ছেন। পিপিই-এর সংকট থাকায় পাকিস্তানে চিকিৎসকেরা আন্দোলন করছেন এবং সরকার আন্দোলনরত চিকিৎসকদের গ্রেফতারও করছে।
কঠিন রোগে আক্রান্ত রোগী ও তার আত্মীয়-স্বজন চিকিৎসকদের দেবতাতুল্য সম্মান করে, এমন অবস্থায় সৃষ্টিকর্তার পর চিকিৎসকদের উপর সবাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। রোগীর সঙ্কটময় মুহূর্তে চিকিৎসকদের অসদাচরণ জনগণকে মাঝে মাঝে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। করোনাভাইরাসের দুর্যোগে কয়েক দিন আগে গাইবান্ধায় মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়ায় মিষ্টি আক্তার নামে বিশ বছর বয়সী এক মা রাস্তায় সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হয়েছেন। ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সুমন চাকমা ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মুগদা হাসপাতাল ও আইইডিসিআর-এ চিকিৎসার জন্য ছোটাছুটি করে উক্ত তিনটি হাসপাতাল থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে মৃত্যুকোলে ঢলে পড়ার পূর্বমুহূর্তে ফেসবুকে লিখে গেছেন, ‘আমার করোনা হয়নি, অথচ করোনার কারণেই আমাকে মরে যেতে হবে’। চিকিৎসকদের অবহেলায় তার এমন মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। করোনার ভয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সদ্য পাস করা চিকিৎসকগণ তাদের ইন্টার্নশীপ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন; কিন্তু করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগে তাদের সেবাদান অপরিহার্য ছিলো।
ভিন্ন চিত্রও রয়েছে। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের মহামারি শুরু হওয়ার পর এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু হয়েছে সেই লড়াইয়ে অগ্রসৈনিক হচ্ছেন ডাক্তার ও নার্স। সারা বিশ্বে লাখ লাখ চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মী করোনার সঙ্গে লড়াই করছেন। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করে মানবজাতিকে বিধ্বংসী করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার অসম যুদ্ধে নেমেছেন তারা। নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধে নেমে আক্রান্ত হচ্ছেন, জীবন হারাচ্ছেন অনেক ডাক্তার ও নার্স। ইতালিতে ডাক্তারের সঙ্কটে অবসরে যাওয়া চিকিৎসকরাও করোনা-আক্রান্তদের সেবায় এগিয়ে এসেছেন। ইতালিতে প্রতি ১০ জন মৃত্যুর মধ্যে একজন ডাক্তার বা নার্স রয়েছেন। চীনের উহানে যিনি প্রথম এই ভাইরাসের সন্ধান পান সেই চক্ষুবিশেষজ্ঞ লি ওয়েনলিয়াংও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ইরানের চিকিৎসক শিরিন রুহানি চিকিৎসক এবং নার্সের সঙ্কটের কারণে হাতে স্যালাইন লাগানো অবস্থায়ও করোনা রোগীর সেবা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত করোনার কাছে পরাজিত হয়ে মৃত্যুকোলে ঢলে পড়েন। পাকিস্তানের তরুণ চিকিৎসক উসামা রিয়াজ আইসোলেশন ক্যাম্পে করোনা রোগীর সেবা দিতে দিতে প্রাণ দিলেন, করোনা রোগীর সেবা প্রদান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ভারতের রামমূর্তি মীনা মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেননি, নিজের বিয়ে স্থগিত রেখে করোনা রোগীর সেবা দিতে গিয়ে চীনের তরুণ চিকিৎসক পেং ইনহুয়া মৃত্যুবরণ করেন, আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী করোনার এমন মহাদুর্যোগে নিজেই এক বেলা ডাক্তারি করার ইচ্ছা জানিয়ে পুনরায় নিবন্ধন করিয়েছেন। সুদান, নাইজেরিয়া, পাকিস্তানের অভিবাসী চারজন ডাক্তার যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সেবা দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। আমাদের দেশেও অনেক ডাক্তার, নার্স জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাত-দিন করোনা রোগীর সেবা করে যাচ্ছেন, মারাও গেছেন, আক্রান্তও হচ্ছেন। কোথাও কোথাও জনগণ করোনা রোগীর সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্সদের এড়িয়ে চলছে, ফ্ল্যাটের লিফট ব্যবহার করতে ডাক্তার, নার্সদের নিষেধ করা হচ্ছে। অনেক ডাক্তার সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের সংক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্য স্বেচ্ছায় পরিবার থেকে আলাদাভাবে বসবাস করছেন।
গুটিবসন্ত, কলেরা, প্লেগ ইত্যাদি রোগ-জীবাণুর প্রতিষেধক আবিষ্কারের পূর্বে হাজার হাজার লোক অসহায় অবস্থায় মরেছে, আমাদের বাপ-দাদারা ডাক্তার ও ওষুধের অভাবে নিরুপায় হয়ে শুধু জিকির করেছেন, কিন্তু কারও মৃত্যু রোধ করতে পারেননি। করোনার কোন ওষুধ না থাকলেও ডাক্তারের উপস্থিতি মানুষকে আশ্বস্ত করে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে থাকলে যে কোন অসতর্ক মুহূর্তে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাই তাদের এমন সাহসিকতাপূর্ণ কাজে তালি দিয়ে উৎসাহ দিতে পশ্চিমা দেশগুলোর জনগণ ডাক্তার ও নার্সদের বাসায় প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত বারান্দা আর জানালায় অপেক্ষা করে থাকে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্সদের মধ্যে যারা মারা যাচ্ছেন তাদের ইরানে ‘শহীদ’ মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে। করোনা যুদ্ধে সামিল বাংলাদেশের ডাক্তারদেরও প্রণোদনা এবং ঝুঁকি বীমার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যে সকল চিকিৎসক নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই রোগ ও রোগীর চিকিৎসা করে যাচ্ছেন তাদের প্রতি রয়েছে জাতির অভিবাদন। ধর্ম, রাজনীতি, বর্ণবাদ, আভিজাত্য, শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার মানবজাতিকে বিভাজিত করে রেখেছে—করোনাভাইরাসের কারণে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানবজাতি সাময়িকভাবে হলেও পারস্পরিক নৈকট্য বোধ করছে, একটি কমন শত্রুর মোকাবিলায় এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে—দুঃখের মধ্যে ওটাই মানবজাতির বড় প্রাপ্তি।