ভাইরাসজনিত বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা এখন কিছুদিন পরপর মিডিয়ায় শোনা যায়। অতি সম্প্রতি চীনের উহান শহরে শনাক্ত হওয়া ভাইরাসটি হচ্ছে করোনাভাইরাস। চীনের উহানে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের ছোবল এখন চীনের বাইরে বিভিন্ন দেশেও সংক্রমিত হওয়ায় বিশ্ববাসী আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে। বহু ধরনের করোনাভাইরাস রয়েছে, সব করোনাভাইরাস মানুষকে আক্রান্ত করে না। বহু করোনাভাইরাসের মধ্যে অদ্যাবধি মাত্র সাতটি প্রজাতির করোনাভাইরাস মানুষকে আক্রান্ত করেছে। ভাইরাসজনিত রোগের কোনো ওষুধ আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত না হওয়ায় মানবজাতি এমন রোগের প্রাদুর্ভাবে স্বাভাবিক কারণেই মৃত্যুর আশঙ্কা করে থাকে। শূকর, বিড়াল, সাপ, বাদুড়ের শরীরের গঠনের সঙ্গে মানুষের শরীরের গঠন ভিন্নতর হওয়ায় এইসব প্রাণী থেকে মানুষের দেহে ভাইরাস আসা মাত্রই ভিন্নতর পরিবেশে বেঁচে থাকার তাগিদে ভাইরাসও তার জিনগত গঠনে দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে আসে; এই পরিবর্তনে ভাইরাসের আক্রমণশক্তি আগের চেয়ে বেড়ে যেতে পারে। নতুন এই ভাইরাসকে আমাদের শরীরের ভেতরে থাকা রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা চিনতে পারে না বলে প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগ শরীরে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে। তবে একবার চিনতে পারলে এবং রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে উঠলে ওষুধ না খেলেও সর্দি, কাশির মতো আপনা-আপনি এইসব ভাইরাসজনিত রোগ সেরে যাবে।

করোনাভাইরাসে শ্বাসকষ্টসহ ঠাণ্ডাজনিত নানাবিধ শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। বাদুড়ের স্যুপ থেকে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণায় প্রতীয়মান হয়েছে। সাপ ও বাদুড়ের স্যুপ চীনের উহানে খুবই জনপ্রিয়। এ ভাইরাসের উৎস সাপ বলেও অনেকে ধারণা করছেন। উহানের একটি মাছ-বাজারে মুরগি, বাদুড়, খরগোশ, সাপ ইত্যাদি পশু-পাখি-সরীসৃপ বিক্রি হয়। এই মাছ-বাজারে বাদুড় থেকে সাপে আসার পর এই ভাইরাস সাপ থেকে মানবদেহে স্থানান্তর হয়েছে। এই ভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে ইসরাইল নতুন একটি তথ্যও প্রচার করছে; তাদের কথা অনুযায়ী উহানে চীনের জীবাণু-অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করার যে ল্যাবরেটরি রয়েছে সেই ল্যাবরেটরি থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে চীনের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ধস আনতে আমেরিকা সুপরিকল্পিতভাবে করোনাভাইরাসের কাহিনী প্রচার করছে বলে রাশিয়ার এক রাজনৈতিক নেতা মন্তব্য করেছেন।

চীনে এই রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণ উল্লেখ করে আমার ছেলে তানভীর আহমেদ অর্ণব অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেসবুকে একটি ইন্টারেস্টিং স্ট্যাটাস দিয়েছে। তার পোস্টের ভাষ্য অনুযায়ী চীনের জনগণের খাদ্যাভ্যাসই নাকি মানুষের দেহে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ। চীনের মানুষ কী খায়, আর কী খায় না তা বোঝানোর জন্য প্রচলিত কথাটি হচ্ছে, চীনের লোকেরা টেবিল ব্যতীত চার পায়ের সব খায়, উড়োজাহাজ ব্যতীত সব উড়ন্ত বস্তু এবং নৌকা ব্যতীত সাঁতার দিতে সমর্থ সব জিনিস তারা ভক্ষণ করে। মানুষের মল জ্বাল দিলে উপরে ভাসমান তেলজাতীয় যা পাওয়া যায় তা দিয়ে আধমরা কুকুর, বিড়াল, সাপ সব রান্না করে খায়। সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার খাওয়ার প্রত্যাশায় তারা মল জ্বাল দিয়ে তেল তৈরি করে। মরা বা জবাই করা পশু-পাখি নয়, রান্না করার আগে এগুলোকে পিটিয়ে আধমরা করা হয়; কুকুর, বিড়াল, ইঁদুর বা বাদুড় আধমরা বা জ্যান্ত অবস্থায় রান্না করলে নাকি মাংস নরম ও সুস্বাদু হয়। পাখিকে ভরপেট খাইয়ে তা আবার বমি করিয়ে চীনের লোকেরা খায়, তাদের ধারণা পাখির পাকস্থলীতে ঢুকানোর পর কিছুক্ষণের মধ্যে খাবারগুলোর রান্না হয়ে যায়। মানবভ্রূণের স্যুপ তাদের উপাদেয় পানীয়। গরু জবাই করার পূর্বে চামড়া ছাড়িয়ে নেয়াসহ চীনাদের আরও বহু কাহিনী অর্ণব তার স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেছে। অর্ণবের মাস্টার্স-এ সনদ পাওয়ার কনভোকেশনে গিয়ে দেখলাম, মেলবোর্নের মনাশ ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শতকরা নব্বই জনই চাইনিজ।

এ রোগ বা ভাইরাস যাতে আমাদের দেশে আসতে না পারে সেজন্য বাংলাদেশ সরকার নানাবিধ ব্যবস্থা নিয়েছে। যমুনা সেতুর নির্মাণে জড়িত চীনের লোকজনদের দেশে যাওয়া আপাতত বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরে স্থাপিত হেলথ ডেস্কে চীন থেকে আগত সব যাত্রীদের স্ক্যানিং করা হচ্ছে। চীনও ইতোমধ্যে তাদের উহান শহরকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে, এই শহরের সঙ্গে চীনের অন্যত্র যাতায়াতের সব যোগাযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। শুধু এই রোগীদের জন্য উহান শহরের একটি পরিত্যক্ত ভবনে দুই দিনে চীন এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল তৈরি করছে। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, চীনের অন্যান্য এলাকায়ও এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়াও পৃথিবীর অনেকগুলো দেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত লোক শনাক্ত করা হয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে।

ইতঃপূর্বে জিকা, মারবুর্গ, ইবোলা, নিপাহ, সার্স, মার্স, সোয়াইন ফ্লু ইত্যাদি ভাইরাসজনিত রোগে বহু পশু-পাখি ও মানুষ মারা গেছে। রিফট ভ্যালি ফিভার ভাইরাসের বাহক রক্ত খাওয়া পতঙ্গ; এই পতঙ্গ গরুকে কামড় দিলে গরুর দুধ থেকে এই ভাইরাস মানবদেহে স্থানান্তর হয়। ১৯৩১ সনে এ রোগ প্রথম কেনিয়ায় শনাক্ত হয়। ১৯৪৭ সনে জিকা ভাইরাস প্রথম উগান্ডার জিকা ফরেস্ট এলাকায় বানরের মধ্যে আবিষ্কৃত হয়। ১৯৬৭ সনে মারবুর্গ রোগটির প্রথম প্রাদুর্ভাব হয় জার্মানির মারবুর্গ শহরে। বাদুড় এই রোগের উৎস। ইবোলা ভাইরাস ১৯৭৬ সনে প্রথম চিহ্নিত হয় সুদান ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে; পরবর্তীতে তা সাব-সাহারান আফ্রিকান এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক প্রজাতির বানর মানবদেহে ইবোলা ভাইরাসজনিত রোগ সংক্রমণের জন্য দায়ী। ১৯৯৮ সনে মালয়েশিয়ায় শূকরের মধ্যে প্রথম নিপাহ রোগ শনাক্ত করা হয়। সার্স ভাইরাসের উৎপত্তি চীনে এবং ২০০২ ও ২০০৪ সনে দুইবার এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। খাটাশজাতীয় বিড়াল থেকে এই ভাইরাসের সৃষ্টি হলেও অনেকের অভিমত হচ্ছে এ ভাইরাসের সঙ্গে বাদুড়ের সম্পর্ক আছে। মার্স ভাইরাস ২০১২ সনে প্রথম পরিলক্ষিত হয় সৌদি আরবে এবং এ রোগের উৎস উট। সোয়াইন ফ্লু শূকরের শরীর থেকে পাখির শরীরে এবং পাখির শরীর থেকে মানবদেহে সংক্রমিত হয়। তবে ভাইরাসবহনকারী অনেক প্রাণী মানুষের চারপাশে থাকলেও তা মানুষের জন্য ক্ষতিকারক নয়। কারণ প্রাণীদেহ থেকে অনেক ভাইরাস সরাসরি মানুষের দেহে যেতে পারে না, মানুষের দেহে যেতে হলে অনেক ক্ষেত্রে আরেকটি মাধ্যমের প্রয়োজন হয়; যুৎসই মাধ্যমের সংযোগ স্থাপিত হয় না বলে প্রাণীর সব ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হয় না। অন্যদিকে মানবদেহে গিয়ে ভিন্ন পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তনের ক্ষমতা থাকাও আবশ্যক।

বন্দরে বন্দরে জারি করা সতর্কতা বা নজরদারি অথবা অবলম্বিত ব্যবস্থা দ্বারা ভাইরাস ঠেকিয়ে রাখা সহজ হবে বলে মনে হয় না। ভাইরাসজনিত সবগুলো রোগের লক্ষণ প্রায় এক রকম। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর রোগের লক্ষণ হচ্ছে—জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা। ঠান্ডাজনিত রোগে এই লক্ষণগুলো সব রোগীর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। ফলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সাধারণ সর্দি, কাশির রোগীদেরও রক্ত পরীক্ষা করানো অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে, তাদেরও অন্য রোগী থেকে আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি ও কফের মাধ্যমে এই ভাইরাস এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তি যা স্পর্শ করবে তাই জীবাণুযুক্ত হয়ে যাবে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে হ্যান্ডশেক করা যাবে না, তার স্পর্শ করা পোশাক-পরিচ্ছদ, টাওয়েল, দরজার হাতল কিছুই ধরা যাবে না। সব সময় সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। করোনাভাইরাসের বিপজ্জনক দিকটি হচ্ছে, কোনো মানুষের দেহে এই ভাইরাসের সংক্রমণ হলেও এক সপ্তাহ যাবৎ সুপ্ত থাকে এবং কোন পরীক্ষায় তা শনাক্তও হয় না। মাস্ক পরেও খুব বেশি লাভ হয় না, কারণ ঢিলেঢালা মাস্ক ভাইরাস পুরোপুরি ফিল্টার করতে পারে না এবং চোখ অনাবৃত থাকায় বায়ুবাহিত ভাইরাসের আক্রমণ ঠেকানো যায় না।

মানবসমাজে মাঝে মাঝে এমন কতগুলো রোগ ছড়িয়ে পড়ে যেগুলোর কার্যকারণ আবিষ্কার করতে গবেষকদের গলদঘর্ম হতে হয়। আমাদের মতো কুসংস্কারাচ্ছন্ন দেশে এখনো এইসব রোগের জন্য জাদুটোনা, বান, গজব ইত্যাদিকে দায়ী করে এগুলোর নিরাময়ের নিমিত্তে তাবিজ, পানিপড়া, ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করতে হয়। চীনে পবিত্র কোরআনের অবমাননাকেও এই রোগের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বলে ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে, প্রচুর লোক খুশি হয়ে লাইকও দিচ্ছে। এদের অনেকে হয়তো জানেন না যে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে বানর, উট থেকে সংক্রামিত ইবোলা, মার্স ভাইরাসে ইতঃপূর্বে বহু মুসলমান মারা গেছেন। দু-একটি ভাইরাসের প্রতিষেধক ইতোমধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে, চীনের এ করোনাভাইরাসের প্রতিলিপিও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার একদল বিজ্ঞানী, শিগগিরই প্রতিষেধক তৈরি হবে বলে আমরা আশাবাদী। আমেরিকার আবিষ্কৃত প্রতিষেধক সহসা মানুষের ওপর প্রয়োগ করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এশিয়া আর আফ্রিকার মানুষগুলো এভাবে প্রাকৃতিক বা ল্যাবরেটরির কৃত্রিম জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হবে, আর সেইসব রোগের ওষুধ তৈরি করে ইউরোপ, আমেরিকা ও ইসরাইল কোটি কোটি টাকা আয় করবে, তখনও আমরা গজবের প্রত্যাশা করে আত্মতুষ্টিতে গদগদ থাকব।