কয়েকদিন পূর্বে সন্ধ্যায় হাঁটার জন্য হাতিরঝিল যাচ্ছিলাম—হাতিরঝিলে উঠার মধুবাগ-মিরেরটেকের রাস্তাটি মূলত একটি কালভার্ট-রাস্তা, প্রচুর ভিড়। ভিড় ঠেলে রাস্তা অতিক্রম করা কঠিন—ফুটপাত না থাকায় যেকোনো মুহূর্তে রিক্সা বা মোটরসাইকেল পথচারীর গায়ের উপর উঠে যেতে পারে। হাতিরঝিলে হাঁটার জন্য যেতে মন চায় না; আগে প্রায় প্রতিদিন যেতাম রাস্তার কুকুরদের খাওয়ানোর জন্য। একদিন এক লোক ক্ষেপে গিয়ে বললেন, ‘কুকুরদের খাওয়াতে হলে রাস্তার সব কুকুর বাসায় নিয়ে যান, আমার বাসায় সম্মুখে এসব চলবে না’। এখন আর কুকুরদের খাবার নিয়ে রাস্তায় বের হই না। হাতিরঝিলে না যাওয়ার আরও বহুবিধ কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে, হাতিরঝিলে উল্টা পথে গাড়ি চলে—রাস্তা পার হতে গিয়ে কয়েকবার গাড়ির সাথে ধাক্কা খেতে খেতে বেঁচে গেছি; দ্বিতীয় কারণ— কিশোর ও যুবকদের বিকট শব্দ করে দ্রুত গতিতে মোটরসাইকেল চালানো; তৃতীয় কারণ হলো— হিজড়াদের চাঁদা তোলার অত্যাচার; চতুর্থ কারণ— মসজিদ-মাদ্রাসার জন্য চাঁদা চাওয়া; পঞ্চম কারণটি হচ্ছে, ধীরগতির লোকেরা পুরো রাস্তা জুড়ে হাঁটার কারণে আমাদের থেমে থেমে হাঁটতে হয়; ষষ্ঠ কারণটি মারাত্মক, মলের দুর্গন্ধ।

আমার আজকের লেখাটি হাতিরঝিল নিয়ে নয়। আমি দুর্বলচিত্তের লোক হলেও কিছুটা সংবেদনশীল; কোথাও জটলা দেখলে সেখানে গিয়ে দেখি আমার ঘনিষ্ঠতম কেউ বিপদে পড়লো কিনা। চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারীকে মারার দৃশ্যও আমার সহ্য হয় না—শক্তি থাকলে আমি এদের জনতার অমানুষিক নির্যাতন থেকে বাঁচিয়ে দিতাম। নিজের এই অক্ষমতার জন্য মাঝে মাঝে অসহায় বোধ করি। কিছু লোক আছে রাস্তা-ঘাটে চোর, বাটপারদের মারার জন্য দৌড়ে জটলায় উপস্থিত হয়। মানুষ পিটিয়ে এরা আনন্দ উপভোগ করে। আমার পাশের বাড়িতে একটি বাচ্চা মেয়েকে মারছে দেখে আমি চিৎকার করে থামিয়েছিলাম—বউ বললো, ‘ও তার নিজের মেয়েকে মারছে, তুমি মাথা ঘামাচ্ছ কেন?’ আরেকদিন এক দারোয়ান একটি কুকুরকে মারছিলো বলে আমার বাসা থেকে প্রতিবাদ করেছিলাম—আশেপাশের সবাই দেখলাম দারোয়ানের পক্ষে।

যানবাহন ও মানুষের ভিড় ঠেলে ঐদিন মধুবাগ-মিরেরটেকের রাস্তায় যেতে যেতে ট্রাফিক জ্যামে একটি সিএনজি’র ভেতর হঠাৎ কয়েকটি শিশু ও একজন ভদ্রমহিলার কান্নার আওয়াজ পেলাম। পথিকেরা সবাই ব্যস্ত—দ্রুতগতিতে সবাই নিজ নিজ গন্তব্যে দৌড়াচ্ছে। আমি সিএনজি’র ভেতর তাকিয়ে দেখলাম, পাশে বসা সুঠামদেহী এক লোক পাশে বসা ভদ্রমহিলাকে কিলঘুষি মারছেন। ভদ্রমহিলাকে যত মারছে সাথে থাকা বাচ্চারা তত বেশি জোরে কেঁদে উঠছে। আমি সিএনজি’র ভেতর উঁকি দিয়ে বললাম, ‘ভাই, ভদ্রমহিলাকে মারছেন কেন?’ সিএনজি’তে বসা ভদ্রলোক চিৎকার করে বললেন, ‘আপনি কে? আমার বউকে আমি মারছি’। ‘তাই বলে এভাবে রাস্তায় মারবেন নাকি?’— আমার এমন কথায় খুব ক্ষেপে গিয়ে বললেন, ‘বাসায় যখন মারি তখন কি আপনি পাহারা দেন?’ আমাদের কথা কাটাকাটির মধ্যে কিছু লোক জড় হয়ে গেল, কেউ কিছু বলছে না। একজন বললো, ‘ও ভাই, ওনি ওনার বউকে মারছেন, তাতে আপনার কী?’। এ কথা শুনে সিএনজি’র লোক বউকে আরেকটি ঘুষি মারল এবং বাসায় নিয়ে শোধ তোলার হুমকি দিলো। আমি শারীরিকভাবে দুর্বল, মানসিকভাবে একা—তাই আর প্রতিবাদ না করে হাঁটতে থাকলাম।

শিশু ও কিশোর বয়সে গ্রামে নির্দয়ভাবে বউ পেটাতে দেখতাম—মাঠ থেকে এসেই বড় বড় বাঁশের লাঠি দিয়ে বউয়ের পিঠের উপর সর্বশক্তি দিয়ে পেটাচ্ছে। বউ পেটানোর আনন্দও অনেকে উপভোগ করে—নতুবা আড়াই-তিন হাতের বাঁশের লাঠি দিয়ে কোন স্বামী বউ পেটাতে পারে না। গ্রামে-গঞ্জে লেখাপড়া না জানা পরিবারে শুধু নয়, শহরে শিক্ষিত পরিবারেও স্বামীর হাতে স্ত্রীরা নিয়মিত মার খাচ্ছেন। কিছু লোক স্ত্রীকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে থাকে। তাছাড়া মা-বাবা বা অভিভাবকেরা কখনো চায় না তার মেয়ে শত কারণ থাকা সত্ত্বেও স্বামীর ঘর ত্যাগ করুক। মেয়েরাও চায় না মা-বাবার গলগ্রহ হয়ে থাকতে। সমাজও বিধবাদের সহজভাবে গ্রহণ করে না, চারিদিকে শুধু ভ্রূকুটি। অন্যদিকে সব মেয়ে তো শিক্ষিত নয়, শিক্ষিত হলেও হয়তো অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নয়—তাই বিয়ের দিন সংসার টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে অভিভাবকদের সকল সবক তার মাথায় ঘুরতে থাকে, নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি নিতে আর সাহসী হয় না।

প্রাচীনকালেও সকল সমাজে বউ পেটানোর প্রচলন ছিলো। স্বামী পরিবারের কর্তা বলে তার বউ, সন্তান ও দাসদাসীর মালিক ছিলেন তিনি। ইউরোপেও এক সময় ব্যভিচারের জন্য স্ত্রীকে খুন করলে স্বামীর বিচার হতো না; তবে স্ত্রী কখনো স্বামীর একই অপরাধে শাস্তি দেওয়ার অধিকারী ছিলো না। স্ত্রী ক্রোধবশত স্বামীর প্রতি কোন সহিংস আচরণ করলে সেই আচরণতে মারাত্মক বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ইরানে ২০০৪ সনে সংঘটিত একটি ঘটনা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো; মরিয়ম নামের এক নারী ইরানের শরিয়া আদালতে আবেদন করে এই মর্মে একটি আদেশ প্রত্যাশা করেন যে, তার স্বামী তাকে যেন প্রতিদিন না মেরে সপ্তাহে একদিন মারে। সৌদি আরবের টিভি চ্যানেলে একবার এক থেরাপিস্ট বউ পেটানোর নিয়ম বাতলিয়ে সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কাতারের এক সমাজতাত্ত্বিক বউ পেটানোর নিয়ম-কানুন জানিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন বহু আগে।

আমাদের ধর্মে (সুরা নিসা, আয়াত-৩৪) বউকে প্রহারের অনুমতি আছে—‘... আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায় তবে তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না’। বঙ্গানুবাদে ‘প্রহার’ শব্দটি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। ‘দারাবা’ আরবি শব্দের বঙ্গানুবাদ করা হয়েছে ‘প্রহার’; অনেক আধুনিক আলেমের মতে ‘দারাবা’ শব্দের অর্থ ‘রাগ প্রদর্শন’। তবে বেশিরভাগ আলেম ‘দারাবা’ শব্দের অর্থ ‘প্রহার’ বলে উল্লেখ করেছেন। ডা. জাকির নায়েকও দারাবা শব্দের অর্থ প্রহার বলে উল্লেখ করেছেন। স্ত্রীকে প্রহার করার বিষয়টি ইসলামের জন্য স্পর্শকাতর হওয়ায় অনেক আলেম এই আয়াতের বঙ্গানুবাদ করতে গিয়ে প্রহার শব্দের পর ব্র্যাকেটে ‘মৃদু’ শব্দটির সংযোজন করে দিয়েছেন যা আয়াতে নেই। তবে একটি হাদিসে মেসওয়াক দিয়ে মারার উল্লেখ রয়েছে, সম্ভবত এই হাদিসের অনুসরণে অনুবাদকগণ ‘মৃদু’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তবে যারা মৌলবাদী তারা কোরআনের কোন নির্দেশনার সামান্যতম ব্যতিক্রমী ব্যাখ্যাও গ্রহণ করতে প্রস্তুত নন। তারা মনে করেন, দারাবা শব্দের অর্থ প্রহার। স্ত্রীকে যে প্রহারের অনুমতি আছে তার স্বপক্ষে কোরআনের সুরা ছোয়াদের ৪৪ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে বলেন যে, ‘গাছের কাঁচা ডাল দিয়ে স্ত্রীকে প্রহার’ করার নির্দেশনা শুধু নবী হযরত আইয়ুব (আ:)-এর জন্য প্রযোজ্য হলেও তাতে একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন হাদিসেও স্ত্রী প্রহার করা যাবে মর্মে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে—‘যেমনভাবে দাস-দাসীদের প্রহার কর তেমনভাবে কখনো স্ত্রীদের মারবে না, তারপর রাতে তাদের সাথে শোবে’ (সহি বুখারি হাদিস নম্বর-২৪৬৮); হযরত আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত, ‘তিনি (মুহাম্মদ) আমাকে বুকের উপর আঘাত করলেন যা আমাকে ব্যথা দিল’ (সহি মুসলিম, বই-৪, হাদিস-২১২৭)। হাদিসগুলো ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

স্ত্রীদের প্রহার করার জন্য স্বামীদের ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছে আরেকটি হাদিসে—‘রোজ হাশরে কোন স্বামীকে জিজ্ঞাসা করা হবে না সে কেন স্ত্রীকে মেরেছিলো’ (আবু দাউদ, সহি হাদিস নম্বর- ২১৪২)। হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদ, কিন্তু ‘মনুসংহিতা’ হচ্ছে হিন্দুদের জীবনবিধান। এই জীবনবিধানে স্ত্রী অপরাধ করলে সূক্ষ্ম দড়ি দিয়ে বা বেত দ্বারা প্রহার করে শাসন করতে বলা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, স্বামী অবাধ্য হলেও স্ত্রীদের এমনভাবে শাসন করার কোন বিধান ধর্মে নেই। ধর্ম এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার জন্য অধিকাংশ স্ত্রীরা স্বামীদের শাসন বিনা প্রতিবাদে মেনে নিচ্ছে, অথর্ব ও অকেজো স্বামীর কর্তৃত্ব স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে নিচ্ছে। স্ত্রীরাও আজকাল আয় করে, তাই শুধু আয় করার জন্য পুরুষের অযাচিত কর্তৃত্ব বহাল থাকার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে গায়ের জোর পুরুষদের বেশি; এই এই গায়ের জোর বাঘ, ভাল্লুক আর সিংহের আরও বেশি—তারা কিন্তু কম শক্তিশালী মানুষের বশ্যতা স্বীকার করে। তাই গায়ের জোর দিয়ে স্বামীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অপপ্রয়াস রোধে স্ত্রীদের সচেতন হতে হবে। তাই বলে স্ত্রীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হোক তাও কিন্তু কাম্য নয়—পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা অপরিহার্য।