দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত (সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।

জুয়ার আসর ক্যাসিনো

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

[দ্বিতীয় পর্ব]

ক্যাসিনোর উছিলায় দুর্বৃত্তায়ন রোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই পদক্ষেপে তার ইমেজ বাড়বে বলে মনে হয়। তবে তার একার ইমেজ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো খুব সহজ হবে না। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, শুধু শেখ হাসিনার ইমেজে আওয়ামী লীগের শাসন দীর্ঘায়িত করা যাবে না, তার মন্ত্রিপরিষদ, আমলা, আওয়ামী লীগ নেতাদের ইমেজও জনগণের কাছে উজ্জ্বল হতে হবে। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি সাম্প্রতিক সময়ে নষ্ট হয়ে গেছে। বালিশ-তোশক, পর্দা ইত্যাদি কেনায় যে দুর্নীতির কথা সর্বত্র চাউর হয়েছে তা খণ্ডনের কোন চেষ্টা আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় না, তারা বলেন, বিএনপির আমলে এর চেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে। কত অপরিপক্ক; অন্যের অপরাধের আকার দিয়ে নিজের অপরাধ ঢাকার এ অপচেষ্টা দেখলে মনে হয়, এরা যাত্রাভিনয় দেখেছেন সারা জীবন, কোন সৃজনশীল নাটক দেখেননি। প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল বলেই আওয়ামী লীগের নেতারা ক্ষমতার বদৌলতে এখনও আমাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে অখাদ্য-কুখাদ্য খাওয়াতে পারছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ক্যাসিনো ঘটনায় ইদানীং কিছু যুক্তিসঙ্গত কথা বলছেন; তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, যাদের ধরা হচ্ছে তারা আওয়ামী লীগের লোক, অতীতে কোন দল করত তা এখন আর বিবেচ্য বিষয় নয়। অতীতে এদের ভাবমূর্তি খারাপ থাকা সত্ত্বেও যখন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পেরেছে তখন বিএনপিকে এ পর্যায়ে অভিযুক্ত করা যথার্থ নয়।

অনেক রাজনৈতিক কর্মী দৃশ্যমান কোন কাজকর্ম করেন না, কিন্তু তাদের চালচলনে মনে হয় সবাই রাজনারায়ণের পুত্র মধুসূদন। সম্প্রতি দু’জন ছাত্রনেতাকে ছাত্রলীগ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ছাত্রদের সামাজিক অবস্থান এক সময় অনেক উঁচুতে ছিল। দেশের সব ইতিবাচক রাজনৈতিক আন্দোলনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। এক সময় অর্ধেক ভাড়ায় বাস, ট্রেন ইত্যাদিতে ছাত্ররা ভ্রমণ করতে পারত, অর্ধেক পয়সায় সিনেমা দেখার সুযোগ পেত; এখন আর পায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলার সময় সমাজের মুরব্বিরাও এক সময় সমীহ ভাব দেখাত। ছাত্রনেতাদের তখন আলাদা কদর। আর এখন বাস, ট্রেনে ছাত্র দেখলেই সবাই এড়িয়ে যায়, ভয়ে থাকে কখন কোন কথা বা আচরণে অপদস্থ হতে হয়। এখন ছাত্রনেতারা ছাত্র থাকাকালীনই টেন্ডারবাজি করে কোটিপতি বনে যায়। এরশাদের পতনের পরপর অনেক ছাত্র কোটি কোটি টাকা খরচ করে এমপির নির্বাচন করেছেন। একটি রাজনৈতিক দলের অনেকগুলো অঙ্গসংগঠন; কর্মী হয়ে বেশিদিন রাজনীতি করতে কেউ পছন্দ করে না, অঙ্গসংগঠনের নেতা হওয়া চাই। তাই সংগঠনের পর সংগঠন গড়ে উঠে। নিজের দল ক্ষমতায় থাকলে এদের অপতৎপরতা বেড়ে যায় শতগুণে। এরা জমি দখল করে, দখল করা জমি মুক্ত করে, চাঁদা তোলে, তোলা চাঁদা বিলি করে, সালিস দরবারে বিচারক হয়ে মানুষ পেটায়। ফুটপাতে পিঠা বিক্রেতা বিধবা, নিঃস্ব নারী, রিকশাওয়ালাদের কাছ থেকেও এই শ্রেণির রাজনৈতিক কর্মীরা ‘হপ্তা’ নেয়। কিশোর বয়সে এই হপ্তা তোলার রাজনৈতিক কর্মীগুলোই বড় হয়ে রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর সভাপতি, সেক্রেটারি, সাংগঠনিক সম্পাদক হয়। এদের সবাই চেনে, চিনতে বাধ্য হয়। তাই এরা চাটাই বিক্রেতা থেকে ব্যাংকের মালিক হয়ে যায়, এদের ১৬৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত থাকে, ছয় হাজার ভাড়া বাড়ি থেকে এদের ৬ কোটি টাকার ডুপ্লেক্স বাড়ি হয়, পিয়ন থেকে ২৫টি ফ্ল্যাট, ১৫০ কোটি টাকা স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ, ১৫০ বিঘা জমি হয়। এদের টর্চার সেল থাকে। জনগণ ওদের আজরাইলের মতো ভয় করে, বাহ্যিকভাবে শ্রদ্ধা করে, সম্মান করে, সালাম দেয় ভয়ে। প্রধানমন্ত্রী না ক্ষেপলে এদের বিরুদ্ধে কোন আইন নেই, আদালত নেই, পুলিশ নেই। এদের অর্জিত টাকা বিনা পরিশ্রমে পেয়ে যায় অনেক অজানা বড় বড় কর্মকর্তা, বিরাট বিরাট নেতা। এরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসভায় বক্তৃতা দেন, এরা অফিসে অন্যদের মূল্যবোধের কথা শোনান, নৈতিকতা রক্ষার অপরিহার্যতার বাণী উচ্চারণ করেন, ধর্মের লেবাসে আবৃত শরীরের নূরানী চেহারা দিয়ে অন্যের সমীহ আদায় করে। তাই এদের অপরাধের কথা পত্রিকায় প্রকাশ হলে জনগণ মোটেই আশ্চর্য হয় না, দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

পত্রিকায় পড়লেই দেখা যায়, সরকারি, বিরোধী প্রতিটি দলের প্রতিটি সংগঠনের পদ বিক্রি হয়। কেনা পদে অধিষ্ঠিত নেতার কাছ থেকে দলীয় আদর্শের বাস্তবায়ন আশা করা হাস্যকর। নির্বাচনে বিভিন্ন দলের মনোনয়ন প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও কত কেন্দ্রীয় নেতা, নেতার পিএ/পিএস কত টাকা কামিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। নির্বাচনের আগে পরে বিভিন্ন দল থেকে এমন অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল। তাহলে নেতাকর্মীদের কাছ থেকে নিঃস্বার্থ, নিষ্কলুষ ত্যাগ, তিতিক্ষা প্রত্যাশা করি কেন? কেনা পদে অধিষ্ঠিত হয়ে জনগণ বা কর্মীর তোয়াক্কা করার প্রয়োজন থাকে না। এসব নেতার জন্য কর্মীদের তোয়াজ দেখলে হতভম্ব হয়ে যেতে হয়। ফেসবুকে চব্বিশ ঘণ্টা নেতার বন্দনা করে পোস্ট দেওয়া হয়। এসব নেতার আকাশচুম্বী অহংকার পরিশেষে পদস্খলনে আবর্জনায় রূপান্তরিত হয়। এরা কেনা পদে অধিষ্ঠিত মাস্তান, এদের কাজই হচ্ছে চাঁদা তোলা আর টর্চার সেলে নিয়ে অবাধ্যদের শাস্তি দেওয়া। কিন্তু দলের প্রবীণ নেতার ইমেজও যে খুব ভালো তা তো মনে হয় না। পরিচিত ও প্রবীণ এক নেতার নাকি পা স্পর্শ না করে তার ঘরে ঢোকা যায় না। একবার নেতা অভিধায় অভিষিক্ত হলে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে সরানোর কোন উপায় নেই। তারা মৃত্যু পর্যন্ত নির্বাচন করে যেতে চান; আজীবন ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চান। বিকল্প নেতা তৈরির কোন সুযোগ নেই; এলাকায় অন্য কাউকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেওয়া হয় না। এজন্য বি এবং সি ক্যাটাগরির অনেকে নেতৃত্ব নেয়ার প্রতিযোগিতায় না গিয়ে অবৈধ টাকা কামানোতে নিজেকে নিয়োজিত করেন। মূল নেতাও খুশি, মূল নেতার আশ্রয়ে থেকে টাকা কামানোর সহজ সুযোগ পেয়ে বি এবং সি ক্যাটাগরির নেতাও খুশি।

বৈধ, অবৈধ পন্থায় টাকা রোজগার করা এবং সময়ে সময়ে বিরোধী দলকে ঠেঙ্গানো ছাড়া এদের অন্য কোন কাজ থাকে না। এরা নিজেদের কাজেই অতি ব্যস্ত, এরা শুধু ‘হপ্তা’ তোলে না, তোলা হপ্তা বিভিন্ন দাবিদারদের কাছে বিলিও করে; কারণ হপ্তা বিলি না করলে আয়-রোজগার সব বন্ধ হয়ে যাবে।

এতদিন সবাই নিশ্চুপ ছিল, প্রধানমন্ত্রী সরব হওয়াতে বিরোধী দলও সরব হয়েছে। পত্রিকায় দেখলাম, এরা বিরোধী দলকেও তোফা দিয়ে সন্তুষ্ট রাখে। সাংবাদিকেরা এতদিন নিশ্চুপ ছিলেন। সংবাদে দেখলাম, এই জুয়ার টাকার ভাগ অনেক সাংবাদিকের পকেটেও গেছে। প্রশাসনও চুপ ছিল, রাজনৈতিক নেতারাও। এতদিনের অনবচ্ছিন্ন অপরাধ প্রশাসন বা কেন্দ্রীয় নেতাদের গোচরে কেন এলো না এমন প্রশ্নের উত্তরে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের কাছে জানতে চেয়েছেন, ক্যাসিনো সম্পর্কিত কোন অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন তারা এতদিন করেননি কেন? পেছনে দেখলাম কিছু সাংবাদিক হাসছেন, বাকিরা নিশ্চুপ। রাজনৈতিক এক নেতা তো সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে ক্ষেপে পাল্টা প্রশ্ন করেছেন, ‘আপনাদের প্রেস ক্লাবে তাসের জুয়া খেলেন না?’ সমাজে অনেকগুলো প্রেশার গ্রুপ আছে, সাংবাদিক নাকি সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেশার গ্রুপ—তাই অপরাধীরা এদের পুলিশের চেয়েও বেশি ভয় করে। অবশ্য নিরপরাধ লোকেরাও পুলিশ এবং সাংবাদিকদের ভয় করে; কারণ একবার থানায় নেয়া হলে বা মানসম্মান নিয়ে নেতিবাচক রিপোর্ট হলে পরে ইতিবাচক রিপোর্ট দিয়ে তা পুনরুদ্ধার করা যায় না। ‘যায়যায়দিন’ সাপ্তাহিকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর সম্পাদক শফিক রেহমান একাধিক ইতিবাচক নিবন্ধ লিখে তার গুণগান করেও প্রথমে প্রকাশিত নেতিবাচক রিপোর্ট থেকে পাঠকদের মন ফেরাতে পারেননি। তাই ক্যাসিনো থেকে লাভবান হওয়ার অভিযোগ থেকে অন্তত কিছু সাংবাদিককে বাদ দেওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

অবৈধ কাজে ঝুঁকি বেশি বিধায় উপার্জনও বেশি। এইসব ক্লাবের মালিক, পরিচালক ও ব্যবস্থাপকেরা এত দ্রুত সম্পদশালী হয়ে যায় যে, কয়েকজন দেহরক্ষী ছাড়া তখন আর তাদের চলাফেরা করার সাহস থাকে না। কারণ আমাদের দেশের ক্যাসিনোর মালিকেরা রাজনৈতিক আশ্রয়ে যত শক্তিশালীই হোন না কেন, আইনের প্রয়োগ শুরু হলে এদের সিংহের হুঙ্কার বিড়ালের মিও মিও শব্দে পর্যবসিত হয়ে যায়। অন্যদিকে রাজনীতির লেবাস থাকায় এরা পুরো সময়ের জন্য সন্ত্রাসী হতে পারে না; তাই ফুল টাইম শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এরা কিছুটা ভয় করে। ভয় করে বলেই তাদের অর্জিত অর্থের ভাগীদার হয় অন্য সন্ত্রাসীরাও। এমনকি বিদেশে অবস্থানকারী শীর্ষ সন্ত্রাসীদেরও জুয়ার আসর থেকে প্রাপ্ত টাকার ভাগ দিতে হয়।

এদের প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে আমার একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ফরিদাবাদ স্কুলের আশেপাশের স্থানীয় মাস্তানেরা অভিভাবকদের নিকট থেকে টাকা নিয়ে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করানোর জন্য স্কুলশিক্ষক ও ম্যানেজমেন্ট কমিটির উপর চাপ সৃষ্টি করত, আমি তখন ঐ স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান। এক স্বীকৃত খুনির এমন চাপে অতিষ্ঠ হয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক স্থানীয় এক প্রভাবশালীর মাধ্যমে ভারতে অবস্থানরত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর কাছে নালিশ করলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঐ মাস্তান স্কুল মাঠ ত্যাগ করে। শুনতে অদ্ভুত লাগে, বিদেশে অবস্থান করেও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দেশে এত প্রভাব। এদের ভাগ দিতেই বিদেশে প্রচুর টাকা হুন্ডির মাধ্যমে চলে যাচ্ছে। শেখ হাসিনাই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে নিজ দল বা অঙ্গসংগঠনের ভেতরে থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তবে তিনি একটু বেশী ঝুঁকি নিয়ে নিয়েছেন বলে মনে হয়; কারণ অপরাধীদের ধরলেও বিপদ, বিরোধীরা তখন বলতে থাকে, ‘দেখ, শাসক দলের দুর্নীতির ব্যাপকতা’। যদি না ধরত, তাহলে এরাই হয়তো বিরোধী দলসহ যে কোন দল থেকে জনপ্রতিনিধি হয়ে যেতে পারত, তাদের অপরাধ ঢাকা পড়ে যেত, অপরাধের কেউ খোঁজও নিত না। আমরা লক্ষ্য করেছি, একজন নেতা কোন দল থেকে বহিষ্কার বা গ্রেফতার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মী ও পত্রিকার রিপোর্টারেরা তার চরিত্রহননে নেমে যান, অথচ তার আগে যে তিনি অগণিত অপরাধ করেছেন তার খোঁজ বের করার গরজ কেউ অনুভবও করেননি। যে লোকগুলো আজ আওয়ামী লীগের ঘৃণিত নেতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন তাদের উত্থান নাকি বিএনপির নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে হয়েছে। অথচ ক্যাসিনোর ঘটনা না ঘটলে আমরা সাধারণ লোকেরা এ লোকগুলোর নাম না জেনেই ইহকাল ত্যাগ করতাম। এদের দুয়েকজন ব্যতীত অন্যদের পরিচিতি খুব বেশি নেই।

বেটিং ও জুয়া ভারতে নিষিদ্ধ হলেও তা শত চেষ্টায়ও বন্ধ করা যাচ্ছে না; তাই বাজি ধরা ও জুয়াকে আইনসিদ্ধ করার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আইন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্ট এ ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছার সুবিধার্থে জনমত যাচাই করছে। অনেকের অভিমত হচ্ছে, আদিকাল থেকে এই খেলা পৃথিবীব্যাপী চলছে; ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র শত চেষ্টা করেও এ জুয়া বন্ধ করতে পারেনি—মানুষের বৈধ, অবৈধ সব টাকা এ জুয়া খেলায় ব্যবহৃত হলেও সরকারের নিকট তা অবৈধ হওয়ায় রাষ্ট্র ট্যাক্স থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে এবং ট্যাক্স হিসেবে বিপুল অর্থ আদায় সম্ভব হওয়ায় অনেক মুসলিম দেশেও জুয়া খেলার অনুমোদন দেওয়া আছে। এতে সরকারের শুধু আয় বাড়ে না, কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়। আরও পরিলক্ষিত হয়েছে যে, দেশে জুয়া খেলার বৈধ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সম্পদশালী বিদেশে গিয়ে জুয়া খেলেন। অধিকন্তু অনলাইনের জুয়া ঠেকানো প্রায় অসম্ভব। লটারিকে আমাদের দেশে কেউ জুয়া বলেছে বলে শুনিনি; সরকারের তরফ থেকে প্রবর্তিত প্রাইজবন্ড আমরা সবাই কিনছি, উপহার হিসেবে দিচ্ছি—কোন ধার্মিককে তা গ্রহণে অনাগ্রহী মনে হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকে আমার ধার্মিক সহকর্মী যে কোন অনুষ্ঠানে দশ বা পনেরো মিনিট সুরা, কেরাত পড়ে মূল বক্তব্য শুরু করেন, তিনি প্রাইজবন্ডে ফার্স্ট প্রাইজ পেয়ে মহা খুশি—এই প্রাইজ ধর্মমতে জায়েজ কিনা সে প্রশ্ন তার মনে একবারও উদয় হয়নি। অনেকে আবার কালোটাকা সাদা করার জন্য প্রাপ্ত প্রাইজ-সংশ্লিষ্ট বন্ডটি কিনে নেন। সরকারের বিভিন্ন দফতরে শত শত হাজার হাজার কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হচ্ছে, এদের এমন অপরাধ সমাজে ঘৃণিত নয়—মসজিদ, মাদ্রাসায় দান করে বরং বাহবা পাওয়া যায়। কিছু আমলা খুবই ধুরন্ধর, মন্ত্রীরা এসব অবৈধ লেনদেনের খোঁজও পান না—অথচ বদনামের পুরো দায় নিতে হয় মন্ত্রীদের। রাজনৈতিক পাণ্ডাদের টাকা রোজগারে মাস্তান পালতে হয়, গোলাগুলির ঝুঁকি নিতে হয়—অথচ আমলারা রুমে বসে দর-কষাকষি করে কোন ঝুঁকি ছাড়াই শত শত কোটি টাকা উপার্জন করে যাচ্ছেন আর বিদেশে পাচার করছেন। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় থাকলেও ধর্ম, গণতান্ত্রিক ভোট, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, কিছু লোকের সর্বস্বান্ত হওয়ার আশঙ্কার কারণে আমাদের দেশে ক্যাসিনো খেলার অনুমোদন প্রদান প্রায় অসম্ভব। পাকিস্তান আমলে দেশে সামরিক শাসন এলে কিছু সেনাকে ছেলেদের লম্বা চুল কাটতে বা মহিলাদের অনাবৃত অংশে আলকাতরা মাখতে দেখেছি; তাই অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি যেন মূল লক্ষ্যকে ব্যাহত না করে সেদিকে প্রধানমন্ত্রী সজাগ থাকলে জনগণের সমর্থন পাবেন বলে মনে হয়।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com

(উল্লেখ্য এটি রোববার প্রকাশিত হওয়ার কথা থাকলেও তা অনিবার্য কারণে সেদিন প্রকাশিত হয়নি। ঐ একই কারণে আজকের ২০/১০/১৯ তারিখের নির্ধারিত কলামটিও প্রকাশিত হয়নি।)