দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আজকের (রোববার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।
আসাম: কামরূপ কামাখ্যা
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
প্রথম পর্ব
আসাম এবং এর আশপাশের এলাকাগুলোতে প্রস্তর যুগ থেকেই মানুষের বসবাসের প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৩শ’ শতাব্দীর প্রথম ভাগে যে অহম জাতি আসাম অধিকার করে তারা উত্তর ব্রহ্ম এবং চীন সীমান্তবাসী সান বংশোদ্ভূত। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা আসাম আক্রমণ করে বিজয়ী হতে পারেননি। ১৯৬১ সালে বিধানসভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক আসামে অসমীয়াকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে দক্ষিণ আসামের কাছাড় জেলার বাঙালিরা বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন শুরু করেন; এই আন্দোলনে আধা-সামরিক বাহিনীর গুলিতে এগারোজন আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়, তবে ভাষা বিলটি প্রত্যাহৃত হয়। ভারতের এই রাজ্যে প্রায় ৪৫টি কথ্য ভাষা থাকলেও সরকারি ভাষা হলো অসমীয়া। রাজ্যটি পেট্রোলিয়াম, কয়লা, চুনাপাথর, প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি সম্পদে সমৃদ্ধ। ১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী তখন সিলেট ছিল আসামের সঙ্গে। ৩৪ শতাংশ ছিল মুসলমান, ২৪ শতাংশ বর্ণহিন্দু, ২৯ শতাংশ অহম এবং ১৩ শতাংশ উপজাতীয় ও অন্যান্য সম্প্রদায়। ১৯৪৭ সনে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়ে গেলে বাঙালির সংখ্যা কমে যায়, অসমীয়ার শতকরা হার বেড়ে যায়।
১৮২৬ সনে ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগে অসমীয়াদের দ্বারা আসাম শাসিত হয়েছিল প্রায় ৬০০ বছর। এক সময় আসাম রাজ্যের নাম ছিল কামরূপ; আজও আসামের একটি জেলার নাম কামরূপ। এক সময় কামরূপ কামাখ্যা সম্বন্ধে আমাদের ফেনীর বিলোনিয়া অঞ্চলে নানা কাহিনী প্রচলিত ছিল। সেখানকার পাহাড়িদের মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে স্বাভাবিকভাবেই মেয়েদের আধিপত্য ছিল। মেয়ে জাদুকরীরা সেখানকার অকর্ম পুরুষদের নাকি ভেড়া বানিয়ে ঘরের মধ্যে রেখে আসতো এবং বাঙ্গাল দেশ ভ্রমণ শেষে বাসায় গিয়ে তাদের আবার পুরুষের রূপ দিতো। প্রেমে বশ করার জন্য, শত্রুকে নিধন করার নিমিত্তে, স্বামীর মন পাওয়ার উদ্দেশ্যে আসাম থেকে আগত এই মেয়েদের কাছ থেকে জাদুটোনা ও বাণ মারার নিশ্চয়তা পাওয়া যেত। আগের দিনে হৃদরোগ, বহুমূত্র রোগ সম্পর্কে মানুষের কোন ধারণা ছিল না বিধায় হার্ট অ্যাটাকে ঘুমের মধ্যে কেউ মারা গেলে বা বহুমূত্র রোগে কেউ কঙ্কালসার হয়ে গেলেই এর সঙ্গে জাদুটোনার সম্পর্কের কথা সবাই বিশ্বাস করত।
আসামের ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস বা এনআরসির অথবা নাগরিকপঞ্জির প্রথম তালিকাটি প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে। ১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অঙ্গীভূত হলে বিপুলসংখ্যক হিন্দু আসামে চলে যায়। অসমীয়া জাতীয়তাবাদী দলগুলো আসামে হিন্দু বাঙালিদের আগমন সহ্য করতে পারেনি, বাঙালির আধিক্য আসামের জনসংখ্যার ভারসাম্যকে বদলে দিতে পারে এ আশঙ্কায় তারা আন্দোলন শুরু করে এবং ১৯৫১ সনে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করতে সরকারকে বাধ্য করে। এ আশঙ্কা আবার দেখা যায় একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় আসামে বিপুলসংখ্যক বাঙালি শরণার্থীর আগমন ও তাদের বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের পর। অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (আসু) ‘বহিরাগত হটাও’ আন্দোলন আবার শুরু হলে তাদের সহিংসতায় ২০০০ লোকের মৃত্যু হয়। এ অবস্থায় আসু’র সঙ্গে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের ১৯৮৫ সনে ‘আসাম একর্ড’ নামে একটি চুক্তি হয় এবং চুক্তি অনুযায়ী যারা বা যাদের পূর্বপুরুষের নাম ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের আগে আসামের ভোটার তালিকায় ছিল তারাই শুধু আসামের প্রকৃত বাসিন্দা, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সাল থেকে ২৪ মার্চ ১৯৭১-এর মধ্যে যারা আসামে এসেছে তাদের নাগরিকত্ব পেতে ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে এবং যারা ২৪ মার্চ ১৯৭১-এর মধ্যরাতের পর আসামে প্রবেশ করেছে বা করবে তাদের ‘বিদেশি’ হিসেবে গণ্য করা হবে। কিন্তু চুক্তিটি বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৯ সালে অভিজিৎ শর্মা নামে এক ব্যক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের সুপ্রিমকোর্ট ১৯৫১ সালের নাগরিকপঞ্জি হালনাগাদ করার নির্দেশ প্রদান করে এবং নাগরিকত্ব প্রমাণে ‘আসাম একর্ড’ চুক্তিতে উল্লেখিত শর্ত অনুসরণ করতে বলা হয়। কিন্তু হাজার হাজার মুসলিম ও হিন্দু বাঙালি আসামের আদি বাসিন্দা হওয়ার পরও নাগরিকত্ব তালিকায় নাম তুলতে পারেনি; কারণ তাদের কাছে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগের কোন রেকর্ড ছিল না। সুপ্রিমকোর্টের তত্ত্বাবধানে ২০১৭ সালে প্রথম খসড়া তালিকা এবং ২০১৮ সালে দ্বিতীয় খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই খসড়া তালিকায় ৪১ লাখ লোককে অন্তর্ভুক্ত না করায় অনেক হৈ চৈ হয়; তখন বলা হয়েছিল চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পূর্বে আরও যাচাই-বাছাই করা হবে। কিছুদিন আগে যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে ৪১ লাখের স্থলে ১৯ লাখ লোককে বাদ দেওয়া হয়েছে।
অহম রাজার কাছ থেকে ব্রিটিশরা দখল করে নেয়ার পর আসামে বাঙালিদের বসতি স্থাপন শুরু হয়। ইংরেজ আমলে পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, বার্মা প্রভৃতি দেশের লোকদের পরস্পরের ভূখণ্ডে যাতায়াতে কোন বাধা ছিল না, কারণ সব দেশ ইংরেজ শাসনাধীনে ভারতবর্ষ নামে অভিহিত হতো। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে প্রদেশ গঠিত হওয়ায় এই দুই অঞ্চলের লোকদের অবাধ যাতায়াত ও বসতি স্থাপন আরও বেড়ে যায়। এখন যেমন মালয়েশিয়া করছে ঠিক তদ্রূপ ১৯৩০ সালে আসামের সাইয়েদ মোহাম্মদ সাদুল্লাহ সরকারও বাঙালিদের দিয়ে পাহাড় কেটে, জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদের জন্য জমি উপযোগী করে নিয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল আসামকে বসতিযোগ্য করতে গিয়ে পোকামাকড় আর হিংস্র পশুদের আক্রমণ ছাড়াও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার বাঙালি আত্মাহুতি দিয়েছিল তখন; এখন শিক্ষিত, বকধার্মিক রাজনীতিবিদেরা বলছেন, বাঙালিরা আসামের লোক নয়। আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় পতিত জমিতে ‘আসাম টি কোম্পানি’ স্থাপনের পর ইংরেজ আমলে এই টি কোম্পানিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকা থেকে বিশেষ করে বরাক উপত্যকা থেকে অনেক হিন্দু-মুসলমান বাঙালির আগমন ঘটে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় গণভোটে আসাম প্রদেশের অন্তর্গত সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিলেও বাঙালি অধ্যুষিত করিমগঞ্জ, বদরপুর, হাইলাকান্দি ও পাথারকান্দিকে আসামের সঙ্গে রেখে দেওয়া হয়। সিলেটের বৃহৎ অংশ পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বহু হিন্দু বাঙালি তখন আসামে চলে যায়। অন্যদিকে ব্রিটিশরাও আসামের বিপুল অনাবাদি জমিতে কৃষিকাজের জন্য ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে লোকজন নিয়ে যায়। আসামের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বর্তমান চার জেলা—ধুবড়ী, গোয়ালপাড়া, কোকরাঝাড়, বঙ্গাইগাঁও একসময় রংপুরের অন্তর্গত ছিল। এছাড়া ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর দেশ ত্যাগের যে হিড়িক পড়েছিল সেই হিড়িকে আশ্রয়চ্যুত হিন্দু বাঙালিরা আশ্রয় নিল তৎকালীন আসামের কাছাড়, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায়। আসাম এবং ত্রিপুরার লোকদের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের লোকদের মেলামেশা ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পরও পাসপোর্ট, ভিসা ছাড়াই বহুদিন অক্ষুণ্ণ ছিল। এমনকি ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের আগ পর্যন্ত আসামের গৌহাটি ও চাঁদপুরের মধ্যে নিয়মিত জাহাজ চলাচল করেছে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পরও প্রচুর হিন্দু আসামে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। তবে ১৯৭১ সালে যারা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল তারা স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে বাংলাদেশে ফেরত এসেছে; কারণ একাত্তরে সব হিন্দুর মধ্যে এমন একটি বিশ্বাস জন্মেছিল যে, ভারতের চেয়ে তারা বাংলাদেশে অনেক বেশি ভালো থাকবে।
বিগত নির্বাচনে আসামে উগ্র জাতীয়তাবাদী বিজেপি, আরএসএস, শিবসেনা ও বজরং পার্টির লোকেরা ওখানকার বাঙালিদের বিতাড়নের স্লোগান দিয়ে স্থানীয় অসমীয়দের নিজেদের পক্ষে একতাবদ্ধ করতে সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে কোন কোন নেতা আবার শুধু মুসলমান বাঙালিদের বিতাড়নের স্লোগান দিয়ে হিন্দু বাঙালিদের সমর্থন আদায়ে সমর্থ হয়েছিল। ধর্ম যখন রাজনৈতিক বিজয় লাভে যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হয় তখন অধিকাংশ ধর্মবিশ্বাসীরা আফিম খাওয়া মাতালের মতো আচরণ করে, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে ল্যাং মারতে কুণ্ঠাবোধ করে না। রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার মুলা ঝুলিয়ে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের তাড়ানোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে সাধারণ হিন্দুদের একচেটিয়া ভোট পড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী বিজেপির ভোটবাক্সে। এখন তাদের ভোটারদের তালিকাবহির্ভূত ‘বিদেশি’ আখ্যায়িত করে একটি জটিল সমস্যার সৃষ্টি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে জটিলতা আরও বাড়বে। অসমীয়া রাজনীতিবিদের রাজনীতি এতদিন ঘুরপাক খেয়েছে ‘বাঙালি খেদাও’ রাজনীতির মধ্যে; এই বিদ্বেষমূলক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রধান মিত্র ছিল বিজেপি। তালিকাবহির্ভূত লোকদের মধ্যে তাদের দলের সমর্থকদের সংখ্যা বেশি হওয়াতে বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা আসামে আপাতত কমেছে, অন্যদিকে তালিকাবহির্ভূত লোকের সংখ্যা তাদের বক্তৃতা, বিবৃতিতে উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম হওয়াতে অসমীয় রাজনীতিবিদদের গ্রহণযোগ্যতা সাধারণ অসমীয়াদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
নিবন্ধিত তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষগুলো যখন রাষ্ট্রবিহীন উদ্বাস্তু হওয়ায় আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন তখন আসাম রাজ্য সরকারের অর্থমন্ত্রী বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ঘোষণা করেছেন, বাদ পড়া ১৯ লাখ মানুষের মধ্যে ১৪-১৫ লাখ ‘অবৈধ অভিবাসীকে’ তারা বাংলাদেশকে ফেরত নিতে বলবেন। তালিকাবহির্ভূত লোকগুলোকে আমাদের দেশে ঠেলে দেওয়ার হুমকিতে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের মতো আরেকটি সংকটে পড়তে পারে। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে খুন, হত্যা, রাহাজানি, মাদকব্যবসা দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় আসাম থেকে বাঙ্গাল খেদানো হলে মানবতার দোহাই দিয়ে আরেকটি আলাদা শরণার্থী ক্যাম্প খোলার সামর্থ্য আমাদের নেই। রোহিঙ্গাদের সাদরে গ্রহণের দাবি করে কিছু বাঙালি প্রথমদিকে প্রায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিল; কিন্তু এ উন্মাদনা আসামের বাঙালিদের গ্রহণের বেলায় হবে বলে মনে হয় না। কারণ তালিকাবহির্ভূত ১৯ লাখের মধ্যে ১১ লাখ বাঙালিই হিন্দু, মাত্র ৬ লাখ মুসলমান। আবার এদের সবাই বাঙালি মুসলমান নন, কিছু রোহিঙ্গাও আছে। বাঙালি মুসলমান বলেই এরা যে বাংলাদেশের নাগরিক সেটা হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে কে বলেছে?
পৃথিবীতে মানবতাবাদে বিশ্বাসী লোকসংখ্যা দিন দিন কমছে—গুহায় ধ্যানী মোদি, উগ্র জাতীয়তাবাদী ট্রাম্প, জিহাদি আইএস, তালেবানের সমর্থক বাড়ছে। ধর্মের আবরণে নতুন ইস্যু সৃষ্টি করে প্রয়োজনমতো কাজে লাগানোর ফন্দি-ফিকির এ জাতীয় নেতাদের রণকৌশল।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com