দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আজকের (রোববার, ৩০ জুন ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।

হালাল নাইট ক্লাব

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

সৌদি আরব যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ নিয়ে আবার পেছনে হটে গেল। নারীদের গাড়ি আর বিমান চালানো, মাঠে বসে খেলা দেখা ও সিনেমা হল চালুর অনুমতির পর ‘হালাল নাইট’ ক্লাব চালু করেও সমালোচনার মুখে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। সৌদি যুবরাজের কিছু সংস্কার কর্মসূচি বিশ্ববাসীকে রীতিমতো হতবাক করে দিয়েছে। তবে সাংবাদিক খাশোগীকে তুরস্কের সৌদি দূতাবাসে করাত দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে গুম করার সঙ্গে যুবরাজের সংশ্লিষ্টতার কথা প্রচারিত হওয়ায় তার সংস্কার কর্মসূচি কিছুটা স্থবির হয়ে গেছে। সংস্কারবদ্ধ মানুষগুলোর বিরুদ্ধে এখন আর আগের মতো তিনি উচ্চস্বরে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না। তার পিতা সৌদি বাদশাহও সম্ভবত তাকে আগের মতো যা ইচ্ছে তাই করার অনুমোদন দিচ্ছেন না। অথচ একমাত্র যুবরাজ বুঝতে পেরেছিলেন যে, শুধু তেল বিক্রির টাকায় সৌদি অর্থনীতি আর বেশিদূর এগুবে না; কারণ মাটির নিচের তেল অনন্তকাল বেচার জন্য অফুরন্ত থাকবে না। সৌদিরা বিদেশে গিয়ে নাইট ক্লাবসহ বিভিন্ন আমোদজনক কীর্তিকলাপে শত শত কোটি টাকা খরচ করে; কিন্তু দেশে সেই আনন্দ করা নিষিদ্ধ বিধায় বিদেশি বিনিয়োগ ও বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার একটি ভালো উদ্যোগ শুরুতেই শেষ হয়ে গেল।

নাইট ক্লাবটির নাম ছিল ‘হালাল নাইট ক্লাব’। ইসলামিক আইনে অনুমোদিত বস্তু বা কর্মই হালাল। নাইট ক্লাবে সাধারণত নানা ধরনের পানীয় থাকে; সৌদি আরবের বিবেচ্য নাইট ক্লাবে অ্যালকোহল মিশ্রিত কোন পানীয় রাখার ব্যবস্থা ছিল না বলে ওই ক্লাবটির নাম দেওয়া হয়েছিল হালাল নাইট ক্লাব। দৈনিক ঢাকা পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ইউনুসের বিয়ের সময় শুধু আমি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী দীন মুহাম্মদ বরযাত্রী ছিলাম। আমাদের যাত্রাপথে ‘ইসলামিক খুচরা যন্ত্রাংশের দোকান’ দেখে ড. দীন মুহাম্মদ বলেছিলেন, ‘এক সময় হয়তো ইসলামিক বেশ্যালয় বা ইসলামিক বার ইত্যাদি তৈরি করে ব্যবসায়ীরা ইসলামের অবমাননায় নামবে’। স্যার জীবিত থাকলে দেখে যেতে পারতেন, নেদারল্যান্ডস সম্প্রতি মুসলমান পর্যটকদের জন্য ‘হালাল’ পতিতালয়ও খুলেছে। স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কয়েক দিনের জন্য ভ্রমণে বের হলে ভ্রমণকালীন যৌনকর্ম করার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে সম্পদের বিনিময়ে বিয়ে করাই হচ্ছে মুতা বিবাহ। নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনা হতেই এ বিবাহ ভঙ্গ হয়ে যায়, এর জন্য তালাকের দরকার হয় না। এ বিবাহ প্রথাটি আরবে ইসলামপূর্ব যুগে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগেও এর অনুমতি ছিল। সুরা নিসা অনুযায়ী ‘তোমাদের জন্য সব নারী হালাল করা হয়েছে, শর্ত এই যে, তোমরা তাদের স্বীয় অর্থের বিনিময়ে তলব করবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য—ব্যভিচারের জন্য নয়। অনন্ত তাদের মধ্যে যাকে তোমরা ভোগ করবে, তাকে তার নির্ধারিত হক দান কর। তোমাদের কোন গোনাহ হবে না যদি নির্ধারণের পর তোমরা পরস্পরে সম্মত হও’। কিন্তু পরে কোরআনের অন্য সুরায় ও হাদিসে এ বিবাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে সুন্নী মুসলমানরা ব্যাখ্যা করলেও শিয়ারা কোরআন, হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তাদের ব্যাখ্যা ভুল বলে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। একই শব্দ ও বাক্য তার প্রয়োগ বিবেচনায় ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে বলে ইসলামিক পণ্ডিতেরা এই ক্ষেত্রে এক হতে পারেননি। নেদারল্যান্ডস তাদের পতিতালয়ে মুসলমানদের জন্য এমন অস্থায়ী বিয়ের ব্যবস্থা করেছে বলে ওই পতিতালয়কে ‘হালাল পতিতালয়’ বলা হচ্ছে।

হালালের কোন তালিকা ইসলামে না থাকলেও আছে হারাম বস্তু ও কর্মের তালিকা। হারাম কাজ শুধু নিষিদ্ধ নয়, কয়েকটি হারাম কাজের জন্য শরিয়াহ্ আইনে শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে এবং মৃত্যু পরবর্তী শাস্তির কথাও বলা আছে। ধর্মে যত শাস্তির কথাই বলা হোক না কেন, অধিকাংশ মুসলমান শুধু খাবারের বেলায় হারাম-হালাল খোঁজে, হারাম কর্মের ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত। কোরআনে আছে, আহলে কিতাবিদের খাদ্য মুসলমানদের জন্যে হালাল এবং মুসলমানদের খাদ্য তাদের জন্য হালাল। কিন্তু আহলে কিতাবের লোকেরা এখন যা খায় তার সব কোন সহি মুসলমানের পক্ষে খাওয়া সম্ভব নয়। শুধু সহি মুসলমান ব্যতীত পৃথিবীর বেশিরভাগ লোক শূকর খায় ও অ্যালকোহল পান করে। এটা হতে পারে, ওদের ধর্মগ্রন্থ আর অবিকৃত নেই—এই বিষয়টি স্ব স্ব ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস না করলেও আমরা মুসলমানেরা তা মানি। অন্যদিকে আহলে কিতাবের বাইরেও অসংখ্য দেশ ও ভিন্ন ধর্মের অগণিত লোক রয়েছে। মুসলমানেরা কিন্তু সব ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করে যাচ্ছে। আমরা নিজ দেশেও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ধর্মের বাছবিচার করি না, বাস্তবতা বিচারে এমন বাছবিচার করা সম্ভবও নয়।

হালাল ও হারাম ইসলামের অলঙ্ঘনীয় বিষয়। উপার্জন, খাবার, পোশাকসহ সব বিষয়ই হালাল হওয়া বাধ্যতামূলক। হালাল জীবিকা থেকেই খাওয়ার আল্লাহর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বেশিরভাগ লোকের উপার্জন হারাম, এই লোকগুলোই বিদেশে গিয়ে খেতে চায় হালাল। চোর, ডাকাত, ঘুষখোর, সুদখোর, দুর্নীতিবাজ সবাই এক্ষেত্রে একাট্টা। ঘুষ ও সুদের লেনদেন করা কাট্টা হারাম—এটা কমবেশী সব মুসলমান জানেন। কিন্তু বর্তমান জগতে সুদের বাইরে থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকরি করা কোনভাবেই সম্ভব নয়; সম্ভব নয় বলেই হারামকে হালাল করার জন্য ব্যাখ্যা দেওয়ার লোকেরও অভাব নেই। বর্তমানে দেশে প্রচলিত ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সহি ইসলামিক বলে অনেক ইসলামিক পণ্ডিত না মানলেও অন্য পণ্ডিতরা আবার মানেন, সুদের আয় থেকে বেতন-ভাতাদি গ্রহণ ও ঋণের সুবিধায় বাড়ি-গাড়ি করার বৈধতার ফতোয়াও তারা দিয়ে থাকেন। ‘শূকর খাওয়া হারাম’—এই নির্দেশনা মানার জন্য কিছু মুসলমানকে যতটুকু ব্যতিব্যস্ত দেখা যায়, ‘অবৈধ উপার্জনে গঠিত দেহ বেহেস্তে যাবে না’ মর্মে ধর্মের অপর আরেকটি নির্দেশনা পরিপালনে ততটুকু ব্যতিব্যস্ত মনে হয় না। দুর্নীতিপরায়ণ মুসলমানদের দৃঢ় বিশ্বাস, আল্লাহতালা ঘুষ খাওয়াসহ বিভিন্ন অপরাধ মাফ করে দেবেন, তিনি করুণাময়ী। এ লোকগুলো হজের টাকা জোগাড় করে বাপের সম্পত্তি বিক্রি করে; কারণ তার অর্জিত সম্পদে দুর্নীতির মিশ্রণ হয়েছে। ধর্মে ব্যবসাকে হালাল করা সত্ত্বেও অধিকাংশ ব্যবসায়ী ধর্মের নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবসা করেন না, অতিরিক্ত মুনাফার জন্য মিথ্যা ও ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে থাকেন; ভেজাল মেশানোর জন্য প্রায় প্রতিদিন বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের জেল-জরিমানা হচ্ছে। তাই যারা বিদেশে গিয়ে হালাল খাদ্যের অন্বেষণ করেন তারাও দেশে সর্বদা হারাম ব্যবসা করে হারাম খাবার খাচ্ছেন।

অ্যারোমেটিক সাবান দিয়ে বাংলাদেশে প্রথম পণ্য বিপণনে হারাম, হালালের ধারণার প্রবর্তন করা হয়। আমরা সাবান ব্যবহার করি শরীরের ময়লা পরিষ্কার করার জন্য—কিন্তু শরীরটা হালাল রুজি দ্বারা গঠিত না হলে হালাল সাবানে ঘষলেও তো বেহেস্তে যাওয়া যাবে না। এই সাবানের মালিকের দেহ কেমন রুজি দ্বারা তৈরি ছিল আমার জানা নেই। মালিক যদি অসৎ হয় তাহলে আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় না যে, সাধারণ মানুষকে ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে ব্যবসা করাই ছিল তার মুখ্য উদ্দেশ্য। ব্যবসায়ীর কোন জাত, ধর্ম নেই—চাহিদাভিত্তিক পণ্য বাজারজাতকরণে তারা সিদ্ধহস্ত। তাই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মালিকানায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও হালাল মোড়কে মুসলিম দেশগুলোতে তাদের পণ্যের বিপণন শুরু করেছে, এজন্য তারা আবার ‘হালাল ফুড অথরিটি’র মাধ্যমে সার্টিফিকেট প্রদানের ব্যবস্থাও করেছে। চীন, থাইল্যান্ড, ভারতের ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা মুসলমানদের জন্য তৈরি করছে বোরকা, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, টুপি, তসবি, জায়নামাজ, স্কার্ফ, হিজাব। হিজাব ও স্কার্ফের রমরমা ব্যবসা দেখে বিদেশি কোম্পানিগুলো আবার ইসলামকে থিম হিসেবে নিয়ে নানা ধরনের পোশাকের ডিজাইন করছে, ফ্যাশন শো’র আয়োজন করে যাচ্ছে। নারী-পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা নামাজের স্থান, হালাল ডাইনিং টেবিল, হালাল খাবার সরবরাহকরণসহ হালাল পণ্যসামগ্রী পাওয়া যায় মর্মে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে থাইল্যান্ডে ‘হালাল হোটেল’ স্থাপন করা হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের রোগী ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে থাইল্যান্ড, ভারত, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশের হাসপাতাল ও হোটেল-

রেস্টুরেন্টগুলোকে হালালবান্ধবে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে কোন কোন ব্যবসায়ী মরিয়া হয়ে উঠেছে; হোটেল ও হাসপাতালে নামাজের স্থান বরাদ্দ করে নামাজের সময়সূচি উল্লেখ করা হয়েছে, রুমে রুমে জায়নামাজ ও পবিত্র কোরআন রাখা আছে। এই ব্যবসায়ীরা মুসলমান বোর্ডারদের জন্য একদিকে রুমে নামাজের জায়নামাজ রাখে, অন্যদিকে হোটেল লবিতে রাখে ম্যাসাজের জন্য সুন্দরী রমণী। অধিকাংশ মুসলিম পর্যটক দুটো সুবিধাই ভোগ করেন।

কেবল নাপাক বা নিষিদ্ধ কোন প্রাণীর চর্বিমুক্ত থাকাটাই একটি পণ্য হালাল হওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট নয়, বরং পণ্যটি উৎপাদনের সব প্রক্রিয়ায় কাঁচামাল থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণের শেষ ধাপ পর্যন্ত হালাল হওয়ার সব নিয়ম রক্ষা করা হয়েছে কিনা তাই মুখ্য। কিন্তু পৃথিবীর সব পণ্যের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সহি মুসলমানের মাধ্যমে নজরদারি করা সহজ নয়, যে প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার পশু মেশিনে জবাই হয় সেই প্রতিষ্ঠানে জবাইকালে আল্লাহর নাম নেয়া হয় কিনা—তা নিশ্চিত করাও তত সহজ নয়। ব্রিটেনের মুসলমান হাজতিদের জন্য পরিবেশিত হালাল ব্র্যান্ডিংয়ের খাবারে ডিএনএ পরীক্ষায় শূকরের মাংস পাওয়া গেছে। তাই পৃথিবীর সর্বত্র খাবার, জিনিসপত্র হালাল হতে হলে সব সহি মুসলমান দিয়ে তৈরি করা আবশ্যক বা খাওয়ার আগে সব খাবারের ডিএনএ করা আবশ্যক; নতুবা ‘ইসলাম’ সব ব্যবসায়ীদের কাছে শুধু পণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। ব্যবসায়ে জুলুম, ধোঁকাবাজি, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ঠকবাজি, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, কালোবাজারি, খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণে উপার্জন বজায় রেখে হালাল নাইট ক্লাব, ইসলামিক ব্যাংক, ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ইসলামিক টিভি, হালাল সাবান, হালাল ফ্রিজ, ইসলামিক জুতা, ইসলামিক বার ইত্যাদি নামের বদৌলতে ব্যবসা করা হলে নিরীহ মুসলমানেরা শোষণ ও প্রতারণার শিকার হবে মাত্র। কারণ শুধু নাইট ক্লাব হারাম নয়, দুধে পানি মেশানোও হারাম, নাচ হারাম, গান হারাম, দাবা খেলা হারাম, মেয়েদের দিকে একবারের বেশি তাকানো হারাম, বেগানা পুরুষের সঙ্গে মেয়েদের চলাফেরা ও হ্যান্ডশেক করা হারাম, মেয়েদের টাইটফিট পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম। সৌদিরা যেভাবে গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন করে তাও হারাম।

হালাল ব্যাংকিং, হালাল খাবারের পর এখন ওষুধ, প্রসাধন সামগ্রী, ইলেকট্রনিক সামগ্রীকে হালাল করার প্রচেষ্টা চলছে। তবে ওষুধ ও প্রসাধনীতে হারাম, হালাল নিরূপণ তত সহজ নয়। শূকর, ঘোড়া, গরু, মুরগি, মাছসহ বিভিন্ন প্রাণীর চামড়া, চর্বি এবং হাড় থেকে তৈরি হয় জেলাটিন। বিশ্ব চাহিদার ৪৪ শতাংশ জেলাটিন শূকরের চামড়া থেকে তৈরি হয় এবং ২৮ শতাংশ তৈরি হয় গরুর চামড়া থেকে, মাত্র ১ শতাংশ মাছ, মুরগি বা অন্যান্য ধর্মনিরপেক্ষ প্রাণিজ উৎস থেকে। জেলাটিনের ৮০-৯০ শতাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে অমুসলিম দেশ। পশ্চিমা বিশ্বসহ অন্যান্য অমুসলিম দেশে পণ্যটি তৈরির জন্য শূকর ছাড়াও অন্যান্য যে সব পশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা হাড় ব্যবহার করা হচ্ছে সেই সব পশু আল্লাহর নামে জবাই করা হয় না। জেলাটিন দিয়ে তৈরি হয় খাবার, ওষুধ এবং প্রসাধনী। আসলে হারাম-হালাল নিরূপণ করে পণ্য তৈরি করাও সহজ নয়; কারণ যে জীব বা বস্তু এক ধর্মাবলম্বীর জন্য হালাল তা অন্য ধর্মাবলম্বীর জন্য হারাম। যেমন, শূকরের মাংস মুসলমানের কাছে, গরুর মাংস হিন্দুদের কাছে, ঘোড়ার বর্জ্য রোমানীয়দের কাছে নিষিদ্ধ। সবাই নিজ নিজ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও কাঁচামাল জেলাটিন ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার করার ক্ষেত্রে হিন্দু, মুসলমানেরা ১৮৫৭ সনের সিপাহী বিপ্লবের মতো বিদ্রোহ করছে না; কোন পশুর বর্জ্য দিয়ে তাদের ব্যবহৃত সামগ্রী তৈরি সে ব্যাপারে খোঁজ নেয়ার তাগিদও অনুভব করছে না। ধর্ম রক্ষা করতে হলে হিন্দু ও মুসলমানের জন্য গরু ও শূকরের আলাদা আলাদা চর্বি বা উপকরণ দিয়ে আলাদা আলাদা মেশিনে আলাদা আলাদা লোক দ্বারা ওষুধ ও প্রসাধন সামগ্রী তৈরি করতে হবে, সহজে শনাক্ত করার জন্য মোড়কে দিতে হবে ভিন্ন রং; সাবান বা ওষুধ বিক্রি করার সময় ক্রেতাকে জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘আপনি হিন্দু, না মুসলমান?’ অ্যালকোহল এক কথায় হারাম, এই অ্যালকোহলও ওষুধে ব্যবহৃত হয়। কোন ধর্মবেত্তাও আজ পর্যন্ত ওষুধের উপকরণ নিয়ে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন বলে আমার জানা নেই। চুল রং করার কালি কী দিয়ে তৈরি তা কোন মুসলমান ভেবেছেন বলে মনে হয় না, কিন্তু তারা জানেন, সাদা চুল ও দাড়ি কালো রং করাটা হারাম। মানছেন কি? এখানে হালাল-হারাম নয়, প্রয়োজনটাই মুখ্য। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকের কাছে খাদ্য এবং ব্যবহার্য উপকরণ নির্ধারণে নিজস্ব স্বকীয়তার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও প্রয়োজনকে অস্বীকার করার বিকল্প ক্ষমতা তাদের নেই।

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com