দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আজকের (রোববার, ০৫ মে ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।

নাটকের নাম ‘আমি’

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সাহিত্য অঙ্গনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বিকশিত শিল্প হচ্ছে নাটক। টিকিট করে নাটক দেখা শুরু হয় স্বাধীনতা লাভের পরপর। মঞ্চনাটকের সংগঠক ও শক্তিমান অভিনেতা খন্দকার শাহ আলম অভিনীত একাঙ্কিকা ‘আমি’ দেখার সুযোগ হয় গত রোববারে শিল্পকলা একাডেমিতে। আমার অবসরজীবনে শিল্পকলা একাডেমির কফি হাউজের আড্ডার আসরে মাঝে মাঝে গিয়ে বসি। মাঠসংলগ্ন মূল মঞ্চের পাশে অভিনেতা শাহ আলমের একটি কফি হাউজ আছে। এ কফি হাউজে প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটি টেবিল ঘিরে অভিনেতা, অভিনেত্রী, গায়ক, গায়িকা, ভাস্কর, কবি, লেখক, নাট্যকার, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, ব্যাংকার, বেকার, অবসরপ্রাপ্ত লোকজন বসে কফি খান আর নির্ভেজাল গল্পগুজব করেন। তবে যে কফি সার্ভ করা হয় তাতে দুই চুমুক দেওয়ার পর আর অবশিষ্ট থাকে না। এ আড্ডায় খন্দকার শাহ আলম একদিন তার নাটক দেখার আমন্ত্রণ জানায়; কফি হাউজের অনেকে ইতঃপূর্বে ‘আমি’ নাটকটি দেখেছে বলে পুনরায় দেখার ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোন আগ্রহ দেখা গেল না। কিন্তু আমি আগে দেখিনি বলে রোববার সন্ধ্যা ৭টার আগেই হলে গিয়ে বসলাম; নাটক শুরুর পূর্ব মুহূর্তে বাংলাদেশ থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীর সভাপতি আবদুল আজিজসহ কফি হাউজের সবাই হলে ঢুকলেন। থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীর সভাপতি হিসেবে আজিজ ভাই নাটক শেষে বক্তব্যও রেখেছেন।

‘আমি’ হচ্ছে বাংলাদেশ থিয়েটারের ১৭তম প্রযোজনা; বিগত দেড় বছর ধরে নাটকটি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে অভিনীত হচ্ছে এবং আমাদের দেখার দিন ছিল নাটকটির ২৫তম মঞ্চায়ন। নাটকটির রজতজয়ন্তী উদযাপন শেষে খন্দকার শাহ আলম তার লোকজন নিয়ে ওই রাতেই আগরতলায় এ নাটকটি মঞ্চায়নের লক্ষ্যে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তরুণ নাট্যকার মাহবুব আলমের রচিত এ নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন ড. আইরিন পারভীন লোপা এবং এই নাটকে একক অভিনয় করছেন থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার শাহ আলম। ফজলে রাব্বী সুকর্ণের মঞ্চ পরিকল্পনায় নাটকটির আলোকসজ্জায় ছিলেন কলকাতার আলোকশিল্পী জয়ন্ত মুখার্জী এবং আবহ সংগীত করেছেন শেখ জসিম। আসাদুল্লাহ ফারাজী রচিত, মূল চরিত্রে খন্দকার শাহ আলমের অভিনয়ে ‘সী মোরগ’ নাটকটিও শিল্পকলা একাডেমিতে ইতঃপূর্বে দেখেছি। এ নাটকে আমার এককালের সহকর্মী বাংলাদেশ ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক মুজিবুর রহমানও অভিনয় করেছেন। শাহ আলম শুধু মঞ্চ অভিনেতা নন, নাটক রচয়িতা ও নির্দেশকও। পল্লীকবি জসীমউদ্‌দীন রচিত ‘নকশিকাঁথার মাঠ’ অবলম্বনে খন্দকার শাহ আলমের নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় নাটক ‘নকশিকাঁথা’ এর আগে বহুবার মঞ্চায়িত হয়েছে। আবদুল আজিজের নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় মঞ্চায়িত ‘সিরাজ যখন নবাব সিরাজদ্দৌলা’ নাটকের মূল চরিত্রেও খন্দকার শাহ আলম অভিনয় করেছেন।

‘আমি’ নাটকে শাহ আলম একজন গায়ক, একজন নাট্যাভিনেতা অর্থাৎ একজন শিল্পী। শিল্পী রুশদু সংসারজীবনের কঠিন বাস্তবতায় মানসিক দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পুরো নাটকে অসহায়ত্বের হাহাকার ধ্বনি তুলেছেন। নাটকে অনেকগুলো খণ্ডচিত্রকে একজন অভিনেতার অভিনয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখিয়ে শিল্পীর অখণ্ড জীবনের ছাঁচে ঢেলে চিত্রায়িত করা হয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচার তাগিদে কোলের অবুঝ শিশুর কান্না মুখ চেপে থামাতে গিয়ে মায়ের হাতে শিশুটির মৃত্যুর বাস্তব ঘটনা আমরা জানি; এ ঘটনাটিকে একটু পরিবর্তন করে একাত্তরে শিল্পীর অবস্থান দর্শকদের জানানোর সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্যাতনের মাত্রাও দর্শক জানতে পেরেছে। এর পরই দর্শকদের দৃষ্টি নিয়ে গেছে রোহিঙ্গাদের ওপর মায়ানমার সেনাদের অনুরূপ বর্বর নির্যাতনের দিকে। পারমাণবিক বোমার ভয়ে ভীত মানবসমাজ আজ বিপন্ন মানবতায় জর্জরিত; মানবতা ও মানবিকতা মারণাস্ত্রের আঘাতে বিদীর্ণ হওয়ার দুঃসংবাদ মঞ্চ অভিনেতা দর্শকদের জানাতে সপ্তস্বরে উচ্চকিত। অভিনেতার অসহায়ত্ব পরিস্ফুট হয় তার আর্থিক দীনতায়; তার স্ত্রী ও শিশুসন্তানের কোন চাহিদাই মেটানো শিল্পীর পক্ষে সম্ভব হয় না; এমনকি শিশুসন্তানের দুধ কেনার সামর্থ্যও তার নেই। এক্ষেত্রে শিল্পীর আক্ষেপ, তার স্ত্রী শরীরের অবয়ব ঠিক রাখার কথা চিন্তা না করে নিজের সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ালে তার আর্থিক দীনতার নগ্ন চেহারা এভাবে উন্মুক্ত হতো না। বাস্তব জীবনেও আমরা শিল্পীদের আর্থিক অনটনের কথা জানি; অনেক লেখক, কবি, শিল্পীর বৃদ্ধ বয়সে খাবারের জন্য, চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে, সরকারের নিকট হাত পাতার দৃশ্য আমরা পত্র-পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশনে দেখেছি, শুনেছি। এমনি অভাবে স্ত্রী তার সন্তান জান্নাতকে নিয়ে শিল্পীকে ত্যাগ করার পর শিল্পী রুশদু নিজেকে ২৪ ঘণ্টা গৃহে আবদ্ধ করে রেখেছে; তার ভয়, গৃহের রক্ষাকবচ ছেড়ে বাইরে পদার্পণ করলেই বিরাজমান গুম, হত্যা, ধর্ষণ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলবে।

রঙ্গমঞ্চের পরিমিত সাজসজ্জায় শাহ আলম তার একক অভিনয়ে নাটকের বিষয়বস্তু পরিস্ফুট করতে সমর্থ হয়েছেন। সহজাত অভিনয়-নৈপুণ্যে তিনি নাটকের কাহিনীতে গতিময় প্রাণসঞ্চার করেছেন। নাটকে অন্য কোন অভিনেতা বা অভিনেত্রী না থাকায় ঘটনাপ্রবাহে অন্য কোন চরিত্র বাধার সৃষ্টি করতে পারেনি; শাহ আলমকে একাই অদৃশ্য অভিনেতা, অভিনেত্রীদের অবস্থান কল্পনা করে, তাদের কল্পিত ক্রিয়াকে অভিনয়ে রূপ দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে গলার স্বর চরিত্রোপযোগী করে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়েছে। অদৃশ্য চরিত্রের সঙ্গে ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়ায় শাহ আলম নাটকের মূল সুর ব্যাহত হতে দেননি। একাঙ্কিকায় অদৃশ্য ঘটনাকে অখণ্ডভাবে এবং পর্দার অন্তরালের চরিত্রগুলোকে মূর্ত ও জীবন্ত করে দর্শকের সম্মুখে উপস্থাপনের দায়িত্ব ছিল একক অভিনেতা শাহ আলমের ওপর—শাহ আলম তা কৃতিত্বের সঙ্গে পালন করেছেন।

নিঃসঙ্গ হয়ে নির্জন ঘরে শিল্পী ভাবে, আত্মহত্যা তাকে নিষ্কৃতি দেবে; আত্মহত্যার ছুরির আঘাত আসার পূর্বমুহূর্তে শিল্পী তার সন্তানের ডাক শুনতে পায়। মানসিক দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত শিল্পীর হঠাৎ মনে হলো, death in time is the best sentence of life. জীবন সম্পর্কে নেতিবাচক উপলব্ধি এক লহমায় ইতিবাচকে পরিণত হওয়াটার মধ্যে শৈল্পিক সৌকর্য আছে বলে আমার মনে হয়নি। এমন পরিসমাপ্তি গতানুগতিক বলে আমার মনে হয়েছে। অভিনেতা একজন শিল্পী, তার আর্থিক অসচ্ছলতা থাকলেও পরিশীলিত মননের ঘাটতি থাকার কথা নয়; শিল্পীর জন্য খয়েরি রঙের প্যান্ট আর গেঞ্জি কেন নির্বাচন করা হলো তা আমার মতো দর্শকের বোধগম্য হয়নি। মা, বউ আর সন্তান হারিয়ে শেষ মুহূর্তে শিল্পীর মানসিক বৈকল্য হলেও হাত-পা ছুড়ে মাটিতে অনেকক্ষণ গড়াগড়ি ও চিৎকারকে আমার কাছে মেলোড্রামা মনে হয়েছে। অনেকগুলো গান ও ইংরেজি বাক্যের সংযোজন নাটকের আবহ ও সংলাপকে শক্তিশালী করেছে বলে মনে হয়নি। আমি নাটকের কোন বোদ্ধা দর্শক নই। তাই অভিনেতার পোশাক ও নির্দেশকের উপস্থাপনায় দর্শক হিসেবে আমার ভিন্নতর মতামতের গুরুত্ব একেবারেই নেই; দৃশ্যকাব্যের হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনায় সূক্ষ্ম কলাকৌশল নির্দেশক ভালো জানেন।

গল্প, কবিতা, উপন্যাসের রসাস্বাদন হয় পাঠের মাধ্যমে; তাই এসব শিল্পমাধ্যমের চরিত্রগুলোর সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক গড়ে উঠে পরোক্ষভাবে, ঘটনাপ্রবাহ পাঠকের দিব্য চোখে মূর্ত হয়ে উঠে না; অন্যদিকে মঞ্চের সম্মুখে বসে অভিনেতা, অভিনেত্রীর অঙ্গভঙ্গি সংলাপের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উপভোগ করার সুযোগ থাকে বলে দর্শক, শ্রোতার জন্য নাটক আকর্ষণীয় শিল্পমাধ্যম। তবে সংলাপবিহীন নাটকও চমৎকার পরিবেশনায় জনপ্রিয়তা পেয়ে থাকে। একক অভিনয়ের নাটকের সৌন্দর্য এবং সীমাবদ্ধতা—দুটোই একজন অভিনেতা ও নাটকের নির্দেশকের ওপর নির্ভর করে।

বাংলা সাহিত্যে ১৯২৩ সনে রচিত প্রথম একাঙ্ক নাটক মন্মথ রায়ের ‘মুক্তির ডাক’। তবে আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে ১৯৪৪ সনে লেখা নুরুল মোমেনের ‘নেমেসিস’ একাঙ্কিকা সম্পর্কে অনেক শুনেছি। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর এ পর্যন্ত যে ২০টি একক অভিনয়ের নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে তাদের ১৭টিতে অভিনয় করেছেন মেয়ে শিল্পী, বাকি তিনটিতে পুরুষ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৮৯ সনে আবদুল্লাহ আল মামুনের রচনা ও নির্দেশনায় ফেরদৌসী মজুমদারের অভিনীত প্রথম একক অভিনয়ের নাটক ‘কোকিলারা’ মঞ্চায়িত হয়। দুই বা তিন বছর আগে সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বা টাকশালে মোমেনা চৌধুরী অভিনীত একক অভিনয়ের নাটক ‘লাল জমিন’ মঞ্চায়নের ব্যবস্থা করেছিলাম। মোমেনা টাকশালে চাকরি করেছেন বলে সম্মানী ব্যতিরেকে তিনি তার সহকর্মীদের সঙ্গে একটা দিন কাটানোর আগ্রহ নিয়ে তার উক্ত নাটকটির মঞ্চায়ন করেছিলেন। আমার ভয় ছিল, একজনের অভিনয়ে অভিনীত নাটক দেখে কেউ আনন্দ পাবে না; কিন্তু আমার অনুমান সঠিক ছিল না, মোমেনার অভিনীত এ নাটক দেখে সবাই বিমোহিত হয়েছিলেন। টাকশালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান জঙ্গি আক্রমণের ভয়ে বন্ধ ছিল, আমি নির্বাহী প্রধান হয়েই প্রতি বছর দুদিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পুনরায় চালু করি। তবে বেশিরভাগ সহকর্মী ছিলেন বেশি সম্মানীর বিখ্যাত বিখ্যাত গায়ক, গায়িকাকে নিয়ে মঞ্চ মাতানোর পক্ষে। এর মধ্যেও আমরা প্রখ্যাত নাট্যকার মামুনুর রশিদের আরণ্যক নাট্যদলের প্রযোজনায় একটি নাটক মঞ্চায়ন করি এবং তা দর্শক উপভোগ করেন।

আমাদের দেশে ‘একক অভিনয় নাট্য উৎসব’ হয়েছে, দর্শক টিকিট কেটে এ নাটকগুলো উপভোগও করেছে। আজকাল উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে; বিকল্প বিনোদনের মাধ্যম নাট্যশিল্পের কদর বেড়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মঞ্চনাটক দেখার পরিবেশ থাকায় সচেতনতা ও আগ্রহ বৃদ্ধির জন্য প্রচার ও প্রচারণা অপরিহার্য।

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com