উপসম্পাদকীয়, দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, রবিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০১৯
নারী ওয়াজের আকর্ষণীয় উপজীব্য
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী তার বিভিন্ন ওয়াজে নারীদের পর্দা, আচার-আচরণ, সৌন্দর্য, স্বাধীনতা, শিক্ষা, চাকরি ইত্যাদি নিয়ে অনেক কথাই বলেছেন। নারীদের তিনি তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করে ‘তেঁতুল হুজুর’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, তেঁতুল দেখলে মানুষের যেমন জিভে জল আসে, তেমনি নারীদের দেখলে দিলের মধ্যে লালা বাহির হয়। তিনি রসিয়ে রসিয়ে তেঁতুল ও নারী নিয়ে আরও অনেক কথা বলেছেন। দিনে-রাতে মহিলাদের সঙ্গে পড়ালেখা করাসহ মহিলাদের ক্লাসের সামনের বেঞ্চে বসার কারণে, নারীদের রাস্তাঘাটে হাঁটাহাঁটি করার কারণে, মহিলাদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলে কোন পুরুষের, এমনকি বুজুর্গ হলেও দিল ঠিক রাখা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন শফী হুজুর। তার মতে, দিল ঠিক না থাকলে কুখেয়াল আসবেই, কুখেয়াল এলে প্রথমে মনের জেনা হবে, পরে মনের জেনা হতে হতে আসল জেনায় পরিণত হবে। গার্মেন্টসের মেয়ে শ্রমিকদের নিয়েও শফী হুজুর বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘গার্মেন্টসে কেন দিচ্ছেন আপনার মেয়েকে? … কতজনের মধ্যে মত্তলা হচ্ছে আপনার মেয়ে, আপনে তো জানেন না। জেনা কইরা কইরা টাকা রোজগার করতেছে, কী বরকত হবে?’ তিনি নারীদের শিক্ষকতা, ডাক্তারি ইত্যাদি পেশা নিয়েও কটূক্তি করেছেন। শফী হুজুর মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেছেন যে, মেয়েদের ক্লাস ফোর ফাইভ পর্যন্ত পড়ালেই হবে, যাতে স্বামীর টাকা-পয়সার হিসাব রাখতে পারে। তার এ কথামতো কাজ করার জন্য ওয়াজে উপস্থিত ১৫ হাজারের অধিক মুসলমানের নিকট থেকে ওয়াদা তিনি করিয়েও নেন। নব্বই ঊর্ধ্ব বয়সী আল্লামা শফী বলেন, ‘শোনো নারীরা, চার দেয়ালের ভেতরই তোমাদের থাকতে হবে। স্বামীর বাড়িতে বসে তোমরা আসবাবপত্র দেখভাল করবা, শিশু লালন-পালন, পুরুষ শিশুদের যত্ন করবা।’ তিনি মেয়েদের নগ্ন হয়ে ঘোরাফেরা ও কেনাকাটার জন্য বাইরে যেতে নিষেধ করেছেন; তার কথামতো বাজার করবে স্বামী বা ছেলে। ইহুদিদের তৈরি ‘বিধ্বংসী মারণাস্ত্র’ বলে মোবাইল থেকে দূরে থাকতে মুসলমানদের আহ্বান জানিয়েছেন।
শফী হুজুর ওয়াজের মধ্যে শ্রোতাদের কাছে হঠাৎ হঠাৎ জানতে চান—‘এটা সত্য না মিথ্যা?’ সবাই একবাক্যে চিৎকার করে বলে উঠেন—সত্য, সত্য। সব ওয়াজেই প্রায় হুজুরেরা এমন কৌশল অবলম্বন করে থাকেন; এতে শ্রোতাদের ওয়াজের প্রতি মনোযোগ থাকে এবং শ্রোতাদের মধ্যে উত্তেজনা বা জোশের সৃষ্টি হয়। এক নোয়াখাইল্যা হুজুর তো দুয়েক কথা বলেই শ্রোতাদের উচ্চস্বরে তার কথার সত্যতার সম্মতি আদায় করে নেন; শ্রোতারা একটু নিচু স্বরে সম্মতি দিলে হুজুর উচ্চস্বরে ধমক দিয়ে উঠেন, ‘কতা কন্না ক্যান?’ আরেক হুজুর বলেন, ‘চিল্লাই বলেন—ঠিক না বেঠিক?’ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী অন্য কৌশল অবলম্বন করতেন; ওয়াজ থেকে কেউ উঠে যেতে চাইলে তিনি বলে উঠতেন, ‘দেখুন, দেখুন, কিছু লোককে শয়তানে আসর করাতে ওয়াজ না শুনে চলে যেতে চাচ্ছে।’
আল্লামা শফীর এসব বক্তব্য নিয়ে পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন ও নারীনেত্রী তার বিভিন্ন বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন। নারী শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সংবিধানের পরিপন্থী অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে হেফাজতে ইসলামের আমির আহমদ শফীর বিচার দাবি করেছেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনসহ অনেক জাতীয় ব্যক্তিত্ব। নারীদের সাংবিধানিক অধিকার শিক্ষার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারা করা হচ্ছে বলেও তাদের অভিযোগ। ড. জাফর ইকবাল একটি উপসম্পাদকীয় লিখে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন যে, হুজুরদের এমন বক্তব্য এখন আর মানুষ কানে তুলবে না। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামও শফী হুজুরের মেয়েদের শিক্ষা সম্পর্কিত মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন। মহিলাদের সম্পর্কে এমন নোংরা কথার বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; মহিলাদের জন্য অসম্মানজনক এসব বলার আগে নিজ স্ত্রী, মা, বোনদের কথা ভাবতে তাকে প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানিয়েছেন। যে মায়ের পেট থেকে তার জন্ম হয়েছে সেই মায়ের সম্মানটুকু রক্ষা করে বক্তব্য দেওয়ার জন্যও প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছেন।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে মাওলানা শফীর সমর্থনেও অনেকে বক্তব্য রেখেছেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, আল্লামা শফীর বক্তব্য নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে নয় বরং নারীদের ইজ্জত-আব্রু ও নিরাপত্তার স্বার্থে এসব ওয়াজ। শফী হুজুরের সমর্থকরা তার বক্তব্যের সমর্থনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি খোঁজার চেষ্টাও করেছেন; আমেরিকার জার্নাল ‘ইভলিউশন এন্ড হিউম্যান বিহেভিয়ার’-এর গবেষণামূলক এক নিবন্ধে নাকি লেখা হয়েছে, সুন্দরী নারীর সঙ্গে একটু কথাবার্তা বললেই পুরুষের মুখের লালা নিঃসরণ বেড়ে যায়। কিন্তু আরেক গবেষক তাদের উল্লেখিত জার্নাল তন্নতন্ন করে খুঁজেও পুরুষের লালা নিঃসরণ বিষয়ক একটি শব্দও পাননি। শফী হুজুরের পক্ষে আরও বহু আলেম এ ব্যাপারে বক্তব্য রেখেছেন। নারীদের শিক্ষা নিয়ে কোরআন, হাদিসের নির্দেশনা তুলে ধরেছেন। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর জ্ঞানার্জন ফরজ করলেও এক্ষেত্রে কট্টরপন্থীদের অভিমত হলো—নারীদের জন্য এই জ্ঞান অর্জনের বিধেয় হচ্ছে ইসলামের মৌলিক বিষয়—নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা, এর বাইরে নয়। শফী হুজুরের এসব বক্তব্য আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করা হলেও অনেক আলেমের মতে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সঙ্গতিহীন নয়। তাই ওয়াজ নসিহতে মেয়েদের কথা বারবার আসে, তারা হাদিস কোরআন থেকে উদ্ধৃতি দিয়েই ওয়াজ করে থাকেন। যেমন—একটি সহি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াজ করতে বহু হুজুরকে দেখেছি। উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘আমি (নবী করীম সা.) জাহান্নামের প্রবেশপথে দাঁড়ালাম। দেখলাম, যারা প্রবেশ করছে তাদের অধিকাংশ নারী (বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)।’ এ কথা শোনার পর উপস্থিত মহিলাদের মধ্য থেকে জাযলা নারীদের এমন অবস্থার কারণ জানতে চাইলে নবী করিম (সা.) বললেন যে, স্বামীর প্রতি স্ত্রীরা বেশি অকৃতজ্ঞ ও বেশি অভিশাপ দেয়। একজন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক এবং নারীরা মাসিক ঋতু অবস্থায় সালাত আদায় করতে ও সিয়াম পালন করতে পারে না বলে তাদের দ্বীনের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। সহী আরেকটি হাদিসে মেয়েদের কুকুর আর গাধার সঙ্গে এক কাতারে পরিমাপ করার জন্য হযরত আয়েশা (রা.) সেই হাদিস বাতিল করে দেন। আবু হোরায়রার (রা.) সূত্রে ইমাম মুসলিম ও আহমদের বর্ণনা মতো রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘নামাজরত কোনো ব্যক্তির সামনে দিয়ে নারী, গাধা, কিংবা কুকুর চলাচল করলে নামাজ ভঙ্গ হয়ে যায়’। আয়েশা (রা.) এ ব্যাপারে বলেন, ‘তোমরা কীভাবে গাধা ও কুকুরের সঙ্গে আমাদের তুলনা করলে?’ ইমাম ইবনুল জাওযী (তিনশত গ্রন্থের রচয়িতা যার ওয়াজে তৎকালীন খলিফাও উপস্থিত থাকতেন, তার হাতে তখনকার দিনে বিশ হাজার ইহুদি নাসারা মুসলমান হয়েছিল) এ ব্যাপারে বলেছেন, ‘আয়েশা (রা.) কীভাবে একটা সহীহ বর্ণনাকে বাতিল করে দিলেন?’ কারণ এ হাদিসের বর্ণনাকারী প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী আবু হোরায়রা নবী করিমের (সা.) একজন ঘনিষ্ঠ সেবক ছিলেন; মোট ৫,৩৭৫টি হাদিস তার কাছ থেকে লিপিবদ্ধ হয়েছে। মহিলাদের এভাবে কেন বর্ণনা করা হলো সে ব্যাপারে আবু হোরায়রার (রা.) বর্ণিত আরেকটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে—ঐ হাদীসে ঘোড়া, বাড়িঘর ও নারীদের ‘অশুভ’ গণ্য করা হয়েছে। আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিস হচ্ছে, পুরুষদের জন্য সর্বোত্তম কাতার হলো সামনের কাতার এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট হলো পেছনের কাতার। অন্যদিকে, নারীদের জন্যে সর্বোত্তম হলো পেছনের কাতার এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট হলো সামনের কাতার। শফী হুজুর প্রচুর লেখাপড়া করেছে, তিনি শায়খুল হাদিসও। শুধু শফী হুজুর নন, মাওলানা আবদুর রাজ্জাক মেয়েদের বাজারে যাওয়া নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন তা কোন মানুষের পক্ষে দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করা সম্ভব নয়। মাওলানা সাঈদীর অনেক ওয়াজে আমি ছিলাম; তিনিও খুব নোংরা ভাষায় নারীদের নিয়ে ওয়াজ করতেন। অধিকাংশ শ্রোতা এসব কথা শুনে বেশ আনন্দ পেত। গ্রামের শ্রোতারা ওয়াজকে বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করে। তারা ওয়াজে হাসে, কাঁদে, জিকির করে, চিৎকার করে; তাই হুজুরেরা নারীদের উপজীব্য করে শ্রোতাদের আনন্দ দিয়ে থাকেন। অন্যান্য মোল্লা আলেমেরাও এগুলো জানেন; তাই নারীদের সম্পর্কে ওয়াজে বিরূপ মন্তব্য করা অজ্ঞানতাপ্রসূত নয়।
বাংলাদেশের অনেক আলেম শফী হুজুরের এসব বক্তব্যের কড়া সমালোচনাও করেছেন। অনেকের মতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা.) তার ব্যবসা নিজেই পরিচালনা করতেন। হযরত আয়েশা (রা.) নিজেই যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। মেয়েরা ব্যবসা বা চাকরি করলে আল্লাহর রহমত বা বরকত নেই বলে হুজুর যে মন্তব্য করেছেন তাও সঠিক নয়; স্বামী-স্ত্রীর যৌথ চাকরি বা ব্যবসার বদৌলতে স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার নির্বাহ করার বহু নজির এ সংসার জগতে দেখতে পাওয়া যায়। যাদের ছেলেসন্তান নেই তাদের মেয়েরা আয়-রোজগার না করলে বৃদ্ধ বা কর্মহীন পিতা-মাতাকে শুধু বৃদ্ধাশ্রমে পাঠালে চলবে না, অবিবাহিতা মেয়েদেরও না খেয়ে মরতে হবে। পিতা, মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর বিপক্ষে ইসলাম—ড. জাকির নায়েকের ওয়াজ থেকে শুনেছি। মা-বাবার অসহায় অবস্থায় মেয়েরা যদি কাজেই না লাগলো তাহলে মেয়েসন্তান মানুষ প্রত্যাশা করবে কেন? এ কারণেই কি ইসলামপূর্ব যুগে মেয়ে সন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো? সম্ভবত এ কারণেই আমাদের সমাজে এখনো মেয়ে সন্তানের ভ্রূণ ধ্বংস করা হয়। সহশিক্ষা থাকলে, ছেলেমেয়ে একসঙ্গে চলাফেরা করলে, গার্মেন্টসে বা অন্যত্র মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে চাকরি করলে বেলেল্লাপনা বেড়ে যায়, ছেলেদের জেনা করার আগ্রহ সৃষ্টি হয়, বৃদ্ধদেরও লালা ঝরে, যাদের লালা ঝরে না তারা নপুংসক বা ধ্বজভঙ্গ—হুজুরের এসব কথা সত্য ও বাস্তবসম্মত নয়; বরং আজকাল ছেলেমেয়ের সহজ মেলামেশায় দুই তরফের সম্পর্কটা লালা ঝরার পর্যায়ে থাকে না, সৃষ্টি হয় কাম-রতি বহির্ভূত গাঢ় বন্ধুত্বের, এই বন্ধুত্বে তারা প্রেম-পিরিতের কথা চিন্তাও করে না। একটা জিনিস সত্য যে, কোন কিছু যত ঢেকে রাখা হয় বা গোপন রাখা হয়, তার প্রতি মানুষের তত আগ্রহ বাড়ে। এ কারণে পর্যবেক্ষণে পরিলক্ষিত হয়েছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ন্যুড সেন্টারে লোকজনের আনাগোনা কম। কিন্তু শফী হুজুর হেলিকপ্টারে বসেও নিচে তাকিয়ে শুধু উলঙ্গ নারী দেখতে পেয়েছেন। তিনি মেয়েদের চার দেয়ালের ভেতরে আবদ্ধ থাকতেও বলেছেন, আবার সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পর্দা মেনে ঘরের বাইরে যেতেও উপদেশ দিয়েছেন; তবে সেই পর্দা হবে এমন যাতে হেলিকপ্টারের বাতাসও তা উড়াতে না পারে। নারীদের প্রতি এত এত নির্দেশনা শুধু পুরুষদের লালা ঝরা রোধ করার নিমিত্তে। কিন্তু মানুষ সব সময় ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুসরণ করে না, মানুষ সংযত থাকার কলা-কৌশলও শিখেছে। আমরা এক মাস রোজা রেখে তার অভিজ্ঞতায় বাকি এগারো মাস সংযম সাধনা করি; এই সংযম দেহের সংযম, মনের সংযম, দিলের সংযম, চোখের সংযম, কানের সংযম, লালা না ঝরানোর সংযম। অন্যদিকে লালা শুধু পুরুষের ঝরবে কেন, একজন সুপুরুষ দেখলে নারীরও তো লালা ঝরার কথা। লালা দুইজনের ঝরলে হুজুরদের ওয়াজ অনুসরণে সুন্দর ও আকর্ষণীয় পুরুষের ওপর মেয়েদেরও ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা; তারা সংযত বলে পুরুষের মতো ঝাঁপ দেয় না। তাই পুরুষদেরও পর্দা এমন হওয়া দরকার যা হেলিকপ্টারের বাতাসে সরাতে না পারে। সংযম যারা করে না তারাই শিশু ধর্ষণ করে, গণধর্ষণে মত্ত হয়ে উঠে। মেয়েরা শারীরিকভাবে দুর্বল বলে জোর করে ধর্ষণ করার ঘটনা আদিকাল থেকেই চলে আসছে। এখন প্রচারমাধ্যম মানুষের দুয়ারে চলে আসায় কোন ঘটনা আর গোপন থাকে না। পারস্পরিক সম্মতিতে প্রেম-পিরিতি আগেও ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে—এর বিরুদ্ধে বলে রোধ করা যাবে বলে মনে হয় না।
মেয়েরা হুজুরের নির্দেশনা মতো ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত পড়লে আমাদের মা-মেয়ে বা স্ত্রীদের চিকিৎসা করানোর জন্য পুরুষ চিকিৎসক ও পুরুষ নার্সের নিকট ধর্ণা দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। তখন কি হুজুরদের মা, বোন, স্ত্রীর আব্রু থাকবে? মেয়েদের আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা করলে তাদের পড়ানোর জন্য ভিন্ন গ্রহ থেকে নিশ্চয়ই ঈমানদার মহিলা শিক্ষক আসার সম্ভাবনা নেই। সর্বোপরি, হুজুরেরাসহ আমরা সবাই বিজ্ঞানের অধিকাংশ আবিষ্কার ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছি। কিন্তু মানবকল্যাণে আবিষ্কৃত সব কিছু তো শুধু পুরুষ আবিষ্কার করেনি। বর্তমান জীবনে অপরিহার্য আবিষ্কারগুলোর ক্ষেত্রে আমরা কি কখনও ব্যবহারের পূর্বে খোঁজ নিয়ে দেখেছি কোনটি পুরুষের এবং কোনটি মেয়েদের আবিষ্কার? যে মেয়েরা আবিষ্কার করেছে তারা নিশ্চয়ই পুরুষ থেকে আলাদা হয়ে পর্দা মেনে গবেষণা করেননি। শফী হুজুরসহ আমরা হাজার হাজার মুসলমান ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড গিয়ে ইহুদি-নাসারা পুরুষ-মহিলা ডাক্তারের চিকিৎসা নিচ্ছি; ইহুদি, নাসারাদের আবিষ্কৃত ওষুধ খাচ্ছি—এগুলোর বিরুদ্ধে কোন ওয়াজ শুনেছি বলে মনে পড়ে না। মেয়েদের বাজারে যাওয়া নিয়ে হুজুরেরা মন্তব্য করলেও খলিফা উমর (রা.)-এর আমলে শিক্ষাগত যোগ্যতার গুণে শিফা বিনতে আবদুল্লাহকে বাজার পরিদর্শক নিয়োগ করা হয়েছিল!
নারীকে উপজীব্য করে ওয়াজ করা কিছু হুজুরের স্বভাবজাত অভ্যাস; এরা নারীর বিরুদ্ধে, নারীর শরীরের কুৎসিত, নোংরা, অশ্লীল বর্ণনা দিয়ে আয়-রোজগার করে থাকে। নারীদের প্রতি ছড়ানো এমন ঘৃণায় জঙ্গিরাও আক্রান্ত। হলি আর্টিজানে মেয়েদের যেসব স্থানে যেভাবে টুকরো টুকরো করা হয়েছে তাতে মনে হয় তারা মেয়েদের প্রতি আক্রোশের বশবর্তী হয়ে এমন নৃশংস কাজ করেছে। ড. জাফর ইকবালের বিশ্বাস—এসব ওয়াজ দ্বারা মেয়েদের শিক্ষা রোধ করা যাবে না। কিন্তু ধর্মের আবরণে দেওয়া এসব ওয়াজের ভক্ত অগণিত। যারা লেখাপড়া জানে না তাদের ধর্মকথা শুনে পুণ্য অর্জনের একটিই পথ—ওয়াজের বয়ান। এই শ্রেণির লোকেরা হুজুরদের ওয়াজের ওপর নির্ভর করে, ওয়াজ মাহফিলে আনন্দসহকারে যোগদান করে, ওয়াজের নির্দেশনামতো জীবন গঠন করে, ওয়াজের নির্দেশনামতো সালিশ ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত প্রদান করে, সমাজ ও সংসারে নারীর অবস্থান নির্ণয় করে।
ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজি শিক্ষাকে হারাম ফতোয়া দেওয়ার কারণে মুসলমানেরা শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক পিছিয়ে পড়েছিল। নারীদের উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার এমন ফতোয়ার স্বেচ্ছাপ্রণোদিত বাস্তবায়ন হলেও প্রতিযোগিতামূলক এ বিশ্বে বাঙালি মুসলমান নারীদের আবার সর্বনাশ হবে। দেওবন্দ দারুল উলুম মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মাদানি শুধু মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন না, দেওবন্দি সংগঠনের সদস্যরা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের পক্ষেও ছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য মাদানি ছিলেন ভারতে একজন অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। এ কারণে তারা দ্বিজাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তান সৃষ্টিরও বিরোধিতা করেছিলেন। মাওলানা মাদানির শিষ্য হচ্ছেন আল্লামা শফী। অহিংস আন্দোলন ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের যারা সমর্থক তাদের একজন একনিষ্ঠ শিষ্যের এমন ওয়াজ বেমানান।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com