পিরোজপুরের চিতলিয়ায় যা ঘটেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, তা একটি ঘোষণা। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারির মৃত্যু হয় ২৪ অক্টোবর সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের বাড়িতে। ৫ আগস্টের পর ঘর পুড়িয়ে দেওয়ায় তিনি পালিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার মরদেহ দুপুর ১২টায় পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনলে গার্ড অব অনারে বাধা দেয় স্থানীয় জামায়াত। পৌর জামায়াত আমির আব্দুর রাজ্জাক তাকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ বলে মাইকিং করান। পরে বিকেল ৫টায় পুলিশ লাইন্সের ভেতরে গোপনে গার্ড অব অনার দিতে হয়। সন্ধ্যায় চিতলিয়ায় খোঁড়া কবর ভরাট করে দেওয়া হয়। কোনো পুরুষ শ্রমিক কবর খুঁড়তে রাজি না হওয়ায় শেষে টর্চ ও মোবাইলের আলোয় তার স্ত্রী, বোন হাসিনা বেগম ও মেয়ে সীমু আক্তার মিলে রাত ১টা ২০ মিনিটে তাকে দাফন করেন। পুলিশ পাহারায় দাফন হলো, জানাজা হলো না। জেলা জামায়াত অবশ্য পরে দায় অস্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে।

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর এই চিত্রই বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা। প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধকেই অস্বীকার করা হয়েছে, মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে পাঠ্যবই থেকে, স্লোগান থেকে, ম্যুরাল ভাঙা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরানো হয়েছে, প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হয়েছে, বাসাবাড়িতে হামলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা সংসদে তালা দেওয়া হয়েছে। পিরোজপুরের ঘটনা একই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত রূপ। যে মানুষটি ২০০৯ সালে সাহস করে মামলা করেছিলেন, যার সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালে রায় দিয়েছিল, আজ তার লাশের ওপর সেই রায়ের প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে। এটা শুধু একজন ব্যক্তির অপমান নয়, এটা ১৯৭১ সালের বিচারপ্রক্রিয়ার ওপরই প্রতিশোধ।

রাষ্ট্রও এখানে সমান দায়ী এবং এই দায় আরও গভীর। মতিয়া চৌধুরী—মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, গেজেটেড বীর মুক্তিযোদ্ধা—২০২৪ সালের অক্টোবরে মারা গেলে তাকে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়নি, যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছিল। তিনি ছিলেন সংসদ উপনেতা, তার মতো ব্যক্তির ক্ষেত্রেও যদি রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রশাসনের মর্জি হয়, তাহলে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার কী হবে? গত দুই বছরে এমন বহু মুক্তিযোদ্ধা নীরবে মারা গেছেন, তাদের অনেকেরই কপালে জোটেনি রাষ্ট্রীয় সম্মান, জুটেছে অপমান। রাষ্ট্রীয় মর্যাদার মানদণ্ড কী? যিনি আওয়ামী লীগ করেছেন, তিনি মুক্তিযোদ্ধা হলেই কি তার সম্মান বাতিল হয়ে যাবে? তাহলে মুক্তিযুদ্ধ কি কোনো দলের সম্পত্তি? এই প্রশ্নের উত্তর না দিলে রাষ্ট্র আর মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দূরত্ব বাড়তেই থাকবে।

পিরোজপুরে প্রশাসনের ভূমিকা ছিল নতজানু ও লজ্জাজনক। ইউএনও পরিবারকে ৫ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে বরফ ছাড়া লাশ পড়ে ছিল, গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে ‘গোপনে’—যেন চুরি করা হচ্ছে। যারা মাইকিং করে কবর ভরাটের উসকানি দিল, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি, গ্রেপ্তার হয়নি। মানিক পশারির মেয়েজামাই ফারুক হোসেনের ভাষ্য—‘আমরা কীভাবে দাফন করব, তার কোনো দায়িত্ব নেয়নি ইউএনও।’ এই নিষ্ক্রিয়তাই জামায়াতকে উৎসাহিত করে। রাষ্ট্র যখন কবরের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তখন রাষ্ট্রের অপরিহার্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। পুলিশ যখন কবর পাহারা দেয়, তখন বুঝতে হবে, আইন নয়, ভয়ই এখন রাষ্ট্র চালাচ্ছে।

বিএনপি সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তার পেছনে একটি রাজনৈতিক অঙ্ক থাকতে পারে। বিএনপি ও জামায়াতের ভোটব্যাংক অনেকটাই ওভারল্যাপ করে। বিএনপি জনপ্রিয় হলে জামায়াতের ভোট কমে, জামায়াত বাড়লে বিএনপির কমে। গত ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিএনপি জিতেছে, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যালঘুদের একচেটিয়া ভোট এবং আওয়ামী লীগের একটি অংশের নীরব সমর্থন ছাড়া তা সম্ভব হতো না। এখন সেই সমীকরণ বদলেছে। আওয়ামী লীগের ভোটারদের ভয়ভীতি কিছুটা কমেছে, আর ভোটকেন্দ্রে যাবে কি না সন্দেহ, অন্যদিকে ব্যাপক চাঁদাবাজি, দখলবাজির অভিযোগে বিএনপির ইমেজ তলানিতে। এই প্রেক্ষিতে বিএনপির কিছু ভোটার হয়তো জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে। এটি বিএনপির জন্য একটি অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে।

তাই বিএনপি একটি ঠান্ডা কৌশল অনুসরণ করছে—জামায়াতকে অপকর্ম করতে সুযোগ দেওয়া। মানিক পশারির কবর ভরাটের মতো অমানবিক ঘটনায় জামায়াতের মুখোশ খুলে গেছে, তাদের ইমেজ নষ্ট হয়েছে। বিএনপি চাইছে, জামায়াত নিজের কর্মে নিজেই বিতর্কিত হোক, যাতে তাদের উগ্রতা দেখে মধ্যপন্থী ভোটাররা আবার বিএনপিমুখী হয়। এটি একটি বিপজ্জনক খেলা। মুক্তিযোদ্ধার কবরকে রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি বানিয়ে বিএনপি আসলে ১৯৭১-কেই বাজি রাখছে, কারণ এই নীরবতা মানে জামায়াতকে রাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে মেনে নেওয়া। ভোটের অঙ্কে মুক্তিযুদ্ধকে বাজি রাখলে, শেষ পর্যন্ত ভোটও থাকে না, মুক্তিযুদ্ধও থাকে না।

মনে রাখতে হবে, মানিক পশারি কোনো দলের ছিলেন না, তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের সাক্ষী। তার নিজের ছোট ভাই চান মিয়া পশারীকে দিয়ে এখন ‘অর্থের বিনিময়ে মিথ্যা সাক্ষ্য’র ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে, মেয়ে সীমু আক্তার বলছেন কবর ভরাটের কথা, আর সেই কবরের পাশে পুলিশ মোতায়েন করে রাষ্ট্র বোঝাচ্ছে, আইন আছে। কিন্তু বিচার কোথায়? আজ যদি তার কবর ভরাটের বিচার না হয়, কাল আপনার-আমার বাবার কবরও নিরাপদ থাকবে না। মুক্তিযুদ্ধকে কবরে পাঠানোর এই মাইকিং বন্ধ না হলে, বাংলাদেশ নামের কবরটিও একদিন ভরাট হয়ে যাবে। সেদিন আর টর্চের আলোয় কবর খোঁড়ার মতো কেউ থাকবে না।