ইসলাম ধর্মে খুব বেশি উৎসব বা বিনোদন নেই, আছে মাত্র দুটি ধর্মীয় উৎসব, একটি ইদ-উল ফিতর বা রোজার ইদ, অন্যটি ইদ-উল আযহা, যাকে বকরি বা কুরবানির ইদও বলা হয়। দুটি ইদেই সচরাচর খোলা মাঠে নামাজ পড়া হয়। ইদ-উল ফিতর নামাজ শেষে বাসায় গিয়ে সেমাই খাওয়ার পর বড়দের উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। ইদ-উল আযহায় নামাজ শেষে কুরবানির পশু জবাই করা হয়, দ্রুত রান্নার মাংস খেয়ে প্রবীণেরা বিছানায় বিশ্রাম নেয়। নতুন জামা পরে আনন্দ করে শিশুরা, আর আনন্দ করে গরিব-মিসকিন। গরিব-মিসকিনদের গায়ে নতুন জামা থাকে না, পায়ে স্যান্ডেল থাকে না, থাকে না চুলে সিঁথি বা বিনুনি। এদের আনন্দ মাংস সংগ্রহে। পরিবারের সব সদস্য মাংসের খোঁজে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে। মাংস খাওয়ার আশায় তারা খুশি নয়, মাংস রান্না করে খাবে সেই ব্যবস্থাই তাদের নেই। থাকবে কী করে, তাদের রাত্রিযাপন করতে হয় ফুটপাতে। এরা সব মাংস কম দামে হোটেলে বিক্রি করে দেয়। দামি মাংস বহন করার মধ্যেই তাদের ইদ আনন্দ। এই করুণ চিত্রও ‘ইদ-অর্থনীতির’ অংশ।

ইদ উৎসবে মানুষ প্রচুর খরচ করে এবং প্রচুর খরচে দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়। মানুষ যত বেশি খরচ করে তত বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উদ্ভব হয়। ইদে খরচ করার জন্য সারা বছর ধরে মানুষ সঞ্চয় করে, ইদের কেনাকাটা করার জন্য কর্মজীবীদের ইদ-বোনাস দেওয়া হয়, তার সঙ্গে যোগ হয় প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। শুধু ইদে খরচের জন্য প্রবাসীরা পরিবারের সদস্যদের জন্য অতিরিক্ত অর্থ প্রেরণ করে থাকে। ইদ উপলক্ষ্যে নানা দিক থেকে অর্থের সমাগমে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অতিরিক্ত টাকা হাতে থাকলে মানুষের চাহিদা বেড়ে যায়, ইদে সৃষ্ট অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদনও বেড়ে যায়। উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে বিনিয়োগ বাড়ে, বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান হয়, কর্মসংস্থান হলে বেকার কমে, বেকার কমলে দারিদ্র্য হ্রাস পায়।

‘ঈদ-অর্থনীতি’ হচ্ছে ইদকে কেন্দ্র করে পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ইদ-উল-আযহায় বিপুল সংখ্যক পশু কুরবানি হয়। ২০২৫ সনে ইদ-উল-আযহায় পশু কুরবানি হয়েছে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি; ২০২৪ সনে হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১৮টি পশু। অর্থাৎ ২৪ সনের তুলনায় ২০২৫ সনে কুরবানির সংখ্যা কমেছে ১২ লাখ ৭২ হাজার। ২০২৫ সনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা বিরাজ করায় লক্ষ লক্ষ লোক কর্মহীন হয়ে পড়ে, সরকারের প্রশ্রয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেক মানুষের পক্ষে কুরবানি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এই পশু কুরবানির সঙ্গে দেশের অনেকগুলো সেক্টরের কর্মকাণ্ড জড়িত। কুরবানির জন্য এখন আলাদাভাবে পশুর লালনপালন করা হয়। লালনপালনের জন্য শ্রমিক লাগে, লাগে প্রক্রিয়াজাত খাবার। পশুর খাবার তৈরির জন্য চাষ হয় ভুট্টার, আর ভুট্টাকে প্রক্রিয়া করে পশুখাদ্য প্রস্তুতির জন্য গড়ে ওঠে শিল্পকারখানা। পশুখাদ্য ও পশুস্বাস্থ্য সেবা খাতে বকরি ইদকে কেন্দ্র করে ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার বাজার গড়ে ওঠে। কুরবানির পশুর স্বাস্থ্যসেবা অপরিহার্য হওয়ায় ভেটেরিনারি চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানিগুলোর আয়ও বৃদ্ধি পায়।

দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে কুরবানির পশু সংগ্রহ করে শহরে নিয়ে অধিক মূল্যে যারা বিক্রি করে তারা হচ্ছে ব্যাপারী। মধ্যস্বত্বভোগী এই শ্রেণিটি ইদের সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে বিরাট ভূমিকা পালন করে, পশুর স্থানান্তরে তারা ব্যবহার করে নৌকা-ট্রলার-ট্রাক ইত্যাদি। গরুর হাটে গড়ে ওঠে অজস্র অস্থায়ী দোকান, বিক্রি হয় গরুর খড়ও। অনেক স্কুল-কলেজের মাঠেও কুরবানির ইদ উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয় পশুর হাট, এই হাট থেকে আদায় করা ‘হাসিল’-এর অর্থে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ্য বৃদ্ধি পায়। কুরবানির ইদে সচ্ছলতা আসে মাদ্রাসার। পশুর চামড়ার প্রকৃত হকদার ছিল গরিব-মিসকিন, কিন্তু এখন ভিন্ন চিত্র। নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুরি হাতে মাদ্রাসার ছাত্ররা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, পশু জবাই করে দিয়েই চামড়ার হকদার হয়ে যায়। চামড়ার হকদার পরিবর্তন হওয়ায় ‘ইদ ইকোনমির’ শ্রেণি চরিত্রও পাল্টে গেছে।

ইদকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই বা আড়াই লাখ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটে। এটা জিডিপির প্রায় ৫-৭ শতাংশ। বাংলাদেশে সারা বছর যত পশু জবাই হয়, তার প্রায় অর্ধেকই জবাই হয় কুরবানির ঈদে এবং দেশের মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ সংগ্রহ করা হয় কুরবানির ইদে। চামড়া শিল্পের সঙ্গে ১০ লক্ষ লোকের জীবিকা জড়িত এবং রফতানিতে এর অবদান ৩.৮ শতাংশ। বাংলাদেশে বছরে ৩৫-৪০ কোটি জোড়া জুতা তৈরি হয়। চামড়া দিয়ে তৈরি ব্যাগ, বেল্ট, ওয়ালেট ইত্যাদি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের বার্ষিক আয়ের ৪০ শতাংশই আসে ইদ বাজার থেকে। দুই ইদে ঘরমুখো মানুষের স্রোত বয়ে যায়, লঞ্চ, ট্রেন, বাসের বাড়তি আয় হয়। যাত্রাপথে হোটেল-মোটেলের খাবার খরচে আর্থিক লেনদেনের পরিধি আরও বেড়ে যায়। কোটি মানুষের এই ভ্রমণ ঘিরে যাত্রী পরিবহণ খাতে ঘুরে বেড়ায় হাজার কোটি টাকার লেনদেন। গ্রাম-গঞ্জ-শহরের বাজারগুলোয় ঈদের কেনাকাটার ধুম পড়ে। ইদ উৎসব পর্যটন শিল্পকে চাঙ্গা করে তোলে, ইদের সময়ে ট্রাভেল এজেন্সি, এয়ারলাইনস, হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ভালো ব্যবসা করে। এই সময়ে ভালো ব্যবসা করে বিউটি পার্লার, কসমেটিকস ও গয়নার দোকান। দা-ছুরি-চাপাতি বানিয়ে ব্যবসা করে কামার, ব্যবসা করে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ই-কমার্স ও হোম ডেলিভারি।

ভোগব্যয় বাড়ানোই অর্থনীতির মূল কথা। ইদ-উল ফিতর হচ্ছে ভোগ-কেন্দ্রিক, ফ্রিজ, টেলিভিশন, পোশাক-পরিচ্ছদ, জুতা, টুপি, জায়নামাজ, আতর, ইলেকট্রনিক্স, খাবার, ভ্রমণ ইত্যাদিতে কেবল খরচ হয়। আর ইদ-উল আযহা উৎপাদন-কেন্দ্রিক, এই ইদে খরচ হলেও সেই খরচের বেশিরভাগ গরুর খামার, চামড়া শিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঢোকে, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। ইদ অর্থনীতির ব্যাপক কর্মযজ্ঞে কিছু অর্থ দরিদ্র ও হতদরিদ্রের হাতেও পৌঁছে, ৫০০ কোটি টাকার ফিতরা এবং কম মূল্যের লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, শাড়ির বণ্টন হয় গরিবের হাতে। কিন্তু তাতে ধনী-গরিবের আয়-ব্যয় বৈষম্য দূর হয় না, তবে কিছুদিনের জন্য হলেও গরিবের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে। ক্রয় ক্ষমতা সংকুচিত হলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসে। স্থবিরতা ও বন্ধ্যাত্ব কাটাতে ইদ ও পূজার উৎসব এবং নববর্ষের জাঁকজমকপূর্ণ উদযাপন দেশের অর্থনীতির জীবনীশক্তি হিসেবে কাজ করে।