আমেরিকার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের অসম বাণিজ্য চুক্তির কারণেই সম্ভবত রাশিয়া থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অস্থায়ী ছাড় দেওয়ার অনুমতি চেয়েছিল বিএনপি সরকার। যুক্তরাষ্ট্র ১১ এপ্রিল থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ৬০ দিনের মধ্যে তেল আমদানির অনুমতি দিয়েছে; অথচ কারো কোনো আবেদন ছাড়াই রুশ তেল কেনার অনুমতির মেয়াদ ইরান, কিউবা এবং উত্তর কোরিয়া ব্যতীত বাকি সব দেশের জন্য ১৬ মে পর্যন্ত নবায়ন করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। আমেরিকার সঙ্গে এমন একটি অসম চুক্তি করার পরও চৈনিক বামদের রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না, প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধীদেরও। এমন একটি চুক্তি ভারতের সঙ্গে হলে লং মার্চ হতো, বায়তুল মোকাররমের উত্তর পাশ ভারত বিরোধী স্লোগানে কেঁপে ওঠত, পয়সা দিয়ে কেনা ভারতীয় শাড়ি আর কাশ্মীরের শাল ক্যামেরা আহ্বান করে পোড়ানো হতো।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে অনেকগুলো চুক্তি হয়েছে। চৈনিক বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ডানেরাও সব চুক্তিকে ‘দেশ বিক্রির চুক্তি’ বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার না এলে জানাই যেত না যে, ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত কোনো চুক্তিই দেশ বিরোধী নয়। ১৯৭৪ সনে সম্পাদিত ‘মুজিব-ইন্দিরা মৈত্রী চুক্তি’ নিয়ে গোয়েবলসীয় প্রচারণায় দেশের জনগণও বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, মৈত্রী চুক্তি হচ্ছে ‘গোলামির চুক্তি’, আমিও তাই মনে করতাম। আমার ভুল ভাঙে ১৯৯৩ সনে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ‘বাংলাদেশ- এরা অব শেখ মুজিবুর রহমান’ বইটি পড়ে। মওদুদ আহমেদ বইটিতে ‘মুজিব-ইন্দিরা মৈত্রী চুক্তি’র চুলচেরা বিশ্লেষণপূর্বক দেশের স্বার্থ বিরোধী কিছু নেই মর্মে অভিমত ব্যক্ত করেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে সাংবাদিকেরা বারবার জিজ্ঞেস করে জানতে চেয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে ভারতের সঙ্গে করা কোনো চুক্তি দেশের স্বার্থ বিরোধী কি না। প্রথম প্রথম উত্তর ছিল, চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে; পরবর্তীকালে উত্তর ছিল, দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থেই সব চুক্তি করা হয়েছে, কোনো চুক্তি দেশ বিরোধী নয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারত কিছু চুক্তি একতরফা সিদ্ধান্তে বাতিল করেছে, কারণ এই সকল চুক্তির অধীনে শুধু বাংলাদেশ উপকৃত হচ্ছিল। ভারতের চুক্তি বাতিলের প্রেক্ষিতে সাংবাদিকগণ আবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করেন, ‘ভারত তাদের দেশের স্বার্থ বিরোধী চুক্তি বাতিল করতে পারলে আমরা কেন বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী কোনো চুক্তি বাতিল করছি না?’ কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার কমিটির মাধ্যমে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেও বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী কোনো চুক্তি খুঁজে পায়নি।

তারপরও কিছু লোক ভারতকে দায়ী করে পাকিস্তান ভাঙার জন্য। ভারত দায়ী হলে পাকিস্তান ভাঙার জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি হলো কেন? ভুট্টো তার দলের নেতা আহমাদ রেজা খান কাসুরিকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, কারণ রাজা কাসুরি ভুট্টোর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকায় আসেন।

পাকিস্তান ভাঙার জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর এতই ক্ষেপে গিয়েছিলেন যে, ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করেই তিনি ঘোষণা দেন যে, ‘আমি এই বেজন্মাকে ফাঁসিতে ঝুলাবো’। ভুট্টো যদি তার দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে রাজা কাসুরির মতো ৩রা মার্চের সংসদে যোগ দিতেন, তাহলে আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হয়তো মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন হতো না। অন্যদিকে পাকিস্তানের হামুদুর রহমান কমিশন পাকিস্তান ভাঙার পেছনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অদূরদর্শিতা এবং টিক্কা খানের নেতৃত্বে সংঘটিত গণহত্যা ও নারী ধর্ষণকে দায়ী করেছে। পাকিস্তান বলছে, পাকিস্তান ভাঙার জন্য পাকিস্তান দায়ী, আর বাংলাদেশের কিছু লোক বলে ভারত দায়ী।

ভারত মুসলমানদের শত্রু, কারণ ভারত কাশ্মীর দখল করে রেখেছে। ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট’ মোতাবেক কাশ্মীরের তৎকালীন হিন্দু মহারাজা হরি সিং চাইছিলেন স্বাধীন থাকতে। কিন্তু পাকিস্তান কাশ্মীরকে স্বাধীন থাকতে দিল না, ১৯৪৭ সনে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পরপরই পশতুন উপজাতির ছদ্মাবরণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কাশ্মীর আক্রমণ করে বসে। পাকিস্তানকে ঠেকাতে মহারাজা হরি সিং ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করলে ভারত বৈধতার প্রশ্নে স্বাধীন কাশ্মীরে সৈন্য পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। অগত্যা হরি সিং ভারতে যোগ দেন, কিন্তু ততদিনে পাকিস্তান কাশ্মীরের প্রায় অর্ধেক দখল করে নেয়। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে ১৯৪৮ সনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদিত প্রস্তাবে কাশ্মীরে গণভোট, কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানের সেনা প্রত্যাহার এবং ভারতের সামরিক উপস্থিতি ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে আনার উল্লেখ করা হয়। কিন্তু পাকিস্তান কাশ্মীর থেকে সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকার করায় গণভোট আর হয়নি। ১৯৬২ সনে চীন কাশ্মীরের ২০ শতাংশ জায়গা দখল করে তাদের দেশের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে। তাই কাশ্মীর দখলের দায় শুধু ভারতের নয়, এই দায় পাকিস্তান এবং চীনেরও।

ভারতকে সহ্য হয় না, কারণ ভারত পদ্মা নদীর উজানে ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পানি আটক করেছে। এই বাঁধের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে জাতিসংঘে উত্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু দুই দেশের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার উপদেশ দিয়ে অভিযোগটি উইথড্র করতে বাধ্য করা হয়। সারা পৃথিবী চেয়েছে ফারাক্কা বাঁধ হোক, কারণ ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্ন রাখার স্বার্থে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা অপরিহার্য ছিল। সৌদি আরবও জাতিসংঘে জিয়াউর রহমানের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল। ১৯৫১ সন থেকে গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ তৈরির সমীক্ষা শুরু করে ভারত, ১৯৬১ সনে বাঁধ নির্মাণ শুরু এবং ১৯৭০ সনে শেষ। দুঃখজনক হচ্ছে, পাকিস্তান আমলে এই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ হয়নি, বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করা হয়নি, বাঁধের বিরুদ্ধে তওহিদী জনতাও ক্ষেপে ওঠেনি। মাওলানা ভাসানীও ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে লং মার্চ করেছেন বাংলাদেশ আমলে, পাকিস্তান আমলে তিনি কেন সোচ্চার হননি, কেন ঘুমিয়ে ছিলেন, তার উত্তর মেলে না। সিন্ধু নদের উপর ভারতের বাঁধ নির্মাণের পর পাকিস্তান যত চিৎকার করেছে তার একশত ভাগের এক ভাগ চিৎকার করলেও ফারাক্কা বাঁধের ফয়সালা পাকিস্তান আমলেই হয়ে যেত।

১৯৪৭ সনে পাকিস্তান সৃষ্টি পর থেকেই মুসলিম লীগের নেতা-কর্মীদের মুখে দেশ বিক্রির অভিযোগ শোনা গেছে—শেরে বাংলা ফজলুল হক যিনি লাহোরে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ করলেন তিনিই মুসলিম লীগের কাছে হয়ে গেলেন ভারতের দালাল; এই গালির জবাব দিতে গিয়ে বরিশালের ভাষায় শেরে বাংলা বলেছিলেন, ‘চোরার পুত চোরারা, দেশটারে লুইট্যা পুইট্যা খাইয়া আর কিছু রাখছোস যে বেইচ্যা দুইটা পয়সা পাইমু?’ ১৯৪৬ সনে অবিভক্ত বাংলার নির্বাচনে মুসলিম লীগ জয়ী হলো, নেতৃত্ব দিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, সেই সোহরাওয়ার্দী হয়ে গেলেন ‘ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর’। শুধু শেরে বাংলা আর সোহরাওয়ার্দী নন, যারাই মুসলিম লীগ বিরোধী ছিলেন তাদের সকলেই ভারতের দালাল—মাওলানা ভাসানী, বদরুদ্দীন ওমর, আবুল হাশিম, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযোদ্ধা সবাই। শুধু কী তাই, মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ‘জয় বাংলা’ও আজ ভারতের দালাল। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের একজন সদস্য উপদেষ্টা হওয়ার আগে বাংলাদেশে ২৬ লাখ ভারতীয়কে দেখতে পেলেও উপদেষ্টা হওয়ার আর তাদের খুঁজে পাননি।

ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে বলে আমাদের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করা যাবে না, এমন নীতি কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু পাকিস্তান আমলে জনমত গঠনে মুসলিম লীগসহ কিছু সংগঠনের প্রধান পুঁজিই ছিল ভারত বিরোধিতা। বাংলাদেশের হিন্দুরা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে বিধায় কিছু লোক শুধু ভারত নয়, হিন্দু বিরোধীও। এই অপরাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের পর বন্ধ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বন্ধ না হয়ে তা আরও বেড়ে গেছে; কারণ কিছু লোকের ভারত বিরোধিতা মজ্জাগত এবং ভারত বিরোধিতার মধ্যেই তাদের রাজনীতির সকল পুঁজি নিহিত।