ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদের নির্বাচন হলো, নির্বাচনের ৩ দিন পূর্বে সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপনীয় বাণিজ্য চুক্তি করল, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হচ্ছে পারস্পরিক বাণিজ্যে দুই দেশের মধ্যে যে গ্যাপ আছে তা পূরণ করা। আমরা আমেরিকায় বছরে গড়পড়তা রপ্তানি করি ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর আমেরিকা থেকে আমদানি করি ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এই ৪ বিলিয়ন ডলারের গ্যাপ পূরণ করার জন্য আমেরিকা থেকে শুধু অধিক পণ্য আমদানি করলে কোন আপত্তি থাকতো না, আপত্তি হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমেরিকার হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদেয় ভর্তুকি ও প্রণোদনা বন্ধ করতে হবে, ভর্তুকি দিতে হলে আমেরিকাকে জানাতে হবে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা আমেরিকান কোম্পানিকেও দিতে হবে, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত কোন পণ্যের মান পরীক্ষা করা যাবে না, বাংলাদেশ আমেরিকা ব্যতীত নতুন করে আর কোন দেশ থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি কিনতে পারবে না, বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বিরোধী কোন ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে না; অর্থাৎ চুক্তির প্রায় প্রতিটি ধারায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

তাড়াহুড়ো করে চুক্তি করায় জনগণের মনে সন্দেহ-সংশয় দানা বেঁধেছে।

একবার স্বাক্ষর হয়ে গেলে তা আর সংশোধন করা যায় না, যদিও বিবেচ্য চুক্তি ৬০ দিনের নোটিশে বাতিল করার শর্ত আছে, কিন্তু আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করার স্বপ্নও কেউ দেখে না। বৃহৎ শক্তি চীনের সঙ্গে চুক্তি করে শ্রীলঙ্কাও ফেঁসে গেছে। চীনের উচ্চ সুদের ঋণে নির্মিত হম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর নিয়ে শ্রীলঙ্কা বিপদে পড়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী হম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর এবং তার সংলগ্ন ১৫ হাজার একর জমি শিল্পাঞ্চল তৈরির জন্য ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছে শ্রীলঙ্কা। বন্দর পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ শ্রীলঙ্কার হাতে না থাকায় এখন চীনের যুদ্ধ জাহাজও হম্বানটোটা বন্দরে ভিড়ছে, শ্রীলঙ্কা বাধা দিতে পারছে না। শ্রীলঙ্কা চাইলেও এই চুক্তি বাতিল করতে পারছে না, কারণ বাতিলের জরিমানা দিতে হলে শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হয়ে যাবে। আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায়ও গোপনীয় চুক্তি করেছে এবং তা ৪৮ বছর মেয়াদি। দেশের ভাগ্য ভালো, ভারতের সঙ্গে এমন গোপনীয় চুক্তি হলে রাজপথ আর বায়তুল মোকাররমের উত্তরপাশ কেঁপে ওঠত।

অন্তর্বর্তী সরকারের শুধু রুটিন কাজ করার কথা থাকলেও তারা চুক্তির পর চুক্তি করে গেছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর সম্মতি ছিল। প্রকৃতপক্ষে এই উভয় দল নির্বাচনে জেতার ব্যাপারে এত বেশি নিশ্চিত ছিল যে, তারা মোহাম্মদ ইউনূসের কোন কথা ও কাজে দ্বিমত করেনি। নির্বাচনে বিএনপির গভীর নিমগ্নতায় অন্তর্বর্তী সরকার দেশটাকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করেছে। নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে কেন অন্তর্বর্তী সরকারকে দেশের স্বার্থ বিরোধী একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে, এই প্রশ্নটি করার ফুরসতও বিএনপির ছিল না। চুক্তি যদি বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে হতো তাহলে ক্ষমতা ছাড়ার দিন চুক্তি করলেও জনগণ তাকে স্বাগত জানাতো। নিজ দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে ড. মোহাম্মদ ইউনূসের সম্পাদিত চুক্তির বাস্তবায়নের দায়-দায়িত্ব এখন বিএনপির। আমেরিকা তাদের নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশের কোন বন্ধু রাষ্ট্রের ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা দিলে তা বাংলাদেশকেও মেনে চলতে হবে, এর ফলে নষ্ট হবে বন্ধুত্ব। এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশ আর নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবক্ষেত্রে আমেরিকাকে সমর্থন করতে হবে।

জাতীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্বের উপর আমেরিকার বিধিসম্মত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য এই চুক্তি। বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নিয়োজিত আমেরিকান কোম্পানিকে তাদের উত্তোলিত তেল-গ্যাস বিদেশে বিক্রির সুযোগ দিতে হবে, অথচ বাংলাদেশ নিয়মিত তেল-গ্যাস আমদানি করছে। ভিয়েতনাম, চীন, শ্রীলঙ্কা, ভারত প্রভৃতি দেশের দর যাচাইপূর্বক আমেরিকা বাংলাদেশ থেকে বস্ত্র কিনে থাকে, কিন্তু আমেরিকার পণ্য কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দর যাচাইয়ের কোন সুযোগ থাকবে না। ইতোমধ্যে আমেরিকা থেকে বোয়িং বিমান ক্রয়ের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। উড়োজাহাজ ক্রয়ে কোন টেন্ডার হয়নি, অন্য কোম্পানির বিমানের সঙ্গে দরের তুলনামূলক যাচাই করা হয়নি, আমেরিকার নির্ধারিত দামেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। শোনা যায়, বাংলাদেশ বিমান প্রতি বছর লোকসান দিচ্ছে, দুর্নীতির আখড়া, অধিক বোয়িং কিনে এর কাজের পরিধি বাড়ানো হলে দুর্নীতিও সমানতালে বাড়বে। শুধু উড়োজাহাজ নয়, একই প্রক্রিয়ায় কিনতে হবে বিভিন্ন রকমের কৃষি পণ্য, কিনতে হবে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি, কিনতে হবে গম, তুলা, সয়াবিন এবং কিনতে হবে প্রতি বছর। আমেরিকান পণ্যের দাম বেশি এবং বেশি দামেই আমাদের কিনতে হবে। এছাড়াও পৃথিবীর অপরপ্রান্তে অবস্থিত আমেরিকা থেকে পণ্য পরিবহণের তুলনামূলক খরচও হবে অনেক বেশি।

চুক্তির আরও শর্ত হচ্ছে যা বাংলাদেশকে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে। চীন থেকে আর কোন অস্ত্র ক্রয় করা যাবে না, কিনতে হলে তা আমেরিকা থেকেই কিনতে হবে; অথচ অস্ত্রসহ চীনের প্রায় সব পণ্যই তুলনামূলক বিচারে সস্তা। এতদিন চীন, ভারত, ব্রাজিল, উজবেকিস্তান প্রভৃতি দেশ থেকে সস্তায় তুলা আমদানি করা হতো, এখন সেই তুলা আমেরিকা থেকে কিনতে হবে; এতে গার্মেন্টসের দাম এত বেশি হবে যে, খোদ আমেরিকাই আর বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য ক্রয়ে আগ্রহ দেখাবে না। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পাল্টা শুল্ক শূন্য হবে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের আরও ২৫০০টি পণ্যের শূন্য শুল্কের সুবিধা দেওয়া হবে; কিন্তু বিনিময়ে বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে ৭১৩২টি পণ্যে।

চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা তাদের পণ্য অধিক হারে কিনতে বাংলাদেশকে বাধ্য করলেও মোহাম্মদ ইউনূসের লক্ষ্য ছিল শুধু আমেরিকার রাজনৈতিক অনুকম্পা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে আমেরিকার ২৯ মিলিয়ন ডলার খরচের কথা ফাঁস করে দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য আমেরিকার সমর্থন অপরিহার্য ছিল, তাই ইউনূস সাহেব যে কোন কিছুর বিনিময়ে ট্রাম্পের অনুকম্পা লাভে উতলা ছিলেন। শত চেষ্টায়ও ট্রাম্পের সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব নয় জেনে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডান হাত ইলন মাস্ককে খুশি করতে তার স্যাটেলাইট ইন্টারনেট স্টারলিংককে বাংলাদেশে আনতে উতলা হয়ে ওঠেন। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের ভাগ্য খারাপ, ইউনূস সাহেবের সঙ্গে কথা বলার কয়েকদিন পরই ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি

ইলন মাস্ক পদত্যাগ করেন।

যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশায় ইলন মাস্কের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের তোড়জোড় ছিল তা ভেস্তে যাওয়ায় অধ্যাপক ইউনূস হতাশ হলেও হতোদ্যম হননি, বিবেচ্য বাণিজ্যিক চুক্তি করে ট্রাম্পের অনুকম্পা পেয়ে যান। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে হলেও তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে আমেরিকার নিকট গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সমর্থ হয়েছেন। ট্রাম্পের কাছে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এবং ফার্স্ট বলেই তুরস্কে সৌদি দূতাবাসে সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে করাত দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরে ফেলে দেওয়ার পরও ট্রাম্প চুপ ছিলেন। এই হত্যার সঙ্গে সৌদি আরবের যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে; যুবরাজ সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকা থেকে চার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র ক্রয়ের প্রস্তাব দেন; প্রস্তাব পেয়েই ট্রাম্পের উক্তি ছিল, খাসোগির হত্যাকারীর অনুসন্ধান করার চেয়ে চার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি আমেরিকার জন্য অনেক বেশি শ্রেয়। তাই ট্রাম্পের কাছে অন্তর্বর্তী সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য বিবেচ্য বাণিজ্য চুক্তি অপরিহার্য ছিল। দুঃখজনক হচ্ছে, ক্ষমতায় আসবে জেনেও

বিএনপি এই চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছিল। কিন্তু বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের সঙ্গে এই সম্মতি সাংঘর্ষিক; কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এই বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলেছে।