বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের কিছুদিন আগের একটি বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে; বক্তব্যটি হচ্ছে দেশের ব্যাংকগুলোর জন্য ভালো ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডি পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার কথা অনুযায়ী দেশের ব্যাংকগুলোর ‘কোর ব্যাংকিং সিস্টেম’ ভারতের। এই অবস্থায় আমাদের নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তিনি। তার অভিমত হচ্ছে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নয়, কার্যকর প্রশিক্ষণ হয় কর্মক্ষেত্রে। তাই বোধ হয় প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে পর্যাপ্ত জ্ঞানী ও দক্ষ প্রশিক্ষক কখনোই ছিল না, এখনো নেই; প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলো হচ্ছে চাকরিরত ও অবসরপ্রাপ্ত অকেজো কর্মকর্তাদের ডাম্পিং কেন্দ্র। শুধু তাই নয়, আশির দশকে আমি নিজেই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশিক্ষণ শাখায় কাজ করেছি, বিভিন্ন বিভাগ থেকে সাধারণত অকেজো কর্মীদের প্রশিক্ষণ একাডেমির জন্য মনোনীত করা হতো। গভর্নরের বক্তব্য অনুযায়ী টেবিল-ওয়ার্কই যদি প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার উৎকৃষ্ট স্থান হয়, তাহলে বিশ্বাস করতে হয়, কোন ব্যাংকেই কর্মের পরিবেশ নেই, তাই দক্ষ ব্যবস্থাপনার আকাল পড়েছে। কর্মের পরিবেশ না থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, ব্যাংকের নির্বাহী প্রধান বা এমডিদের বিবেচনা করা হয় মালিকপক্ষের বেতনভুক অনুগত কর্মচারী হিসেবে। তাই ব্যাংকের মালিককে চেম্বারে ঢুকতে দেখেই এমডি মহোদয় তড়িঘড়ি চেয়ার ছেড়ে মালিকের পা ছুঁয়ে সালাম করেন; অবিশ্বাস্য মনে হলেও কাজটি করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি গভর্নর।

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাজের ধরন আলাদা, কাজ সম্পাদনের প্রক্রিয়া-পদ্ধতিও পৃথক। ১৯৮১ সনে আমাদের ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের কোন একটি শাখায় তিন মাসের অন জব ট্রেনিং ছিল। তখন মনে হয়েছিল, ব্যবসা-বাণিজ্যের ভেতর-বাহির সম্পর্কে বাণিজ্যিক ব্যাংকের টপ ম্যানেজমেন্টের সম্যক ধারণা না থাকলে ব্যাংকিং ব্যবসা ব্যবসায়ীদের চাতুর্যে ওঠে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু এখন দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের। এটা অনস্বীকার্য যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাগণ দক্ষ ও জ্ঞানী, কিন্তু সেই দক্ষতা ও জ্ঞান দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মেরামত করার জন্য যথোপযুক্ত নাও হতে পারে। মনে রাখা দরকার, ডাইরেক্টিভ ইস্যু করা, আর ডাইরেক্টিভের বাস্তবায়ন এক কথা নয়।

বর্তমান গভর্নর বলেছেন বলে নয়, বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য দক্ষ এমডি’র অভাব আগেও ছিল, এখনো আছে। পনের-বিশ বছর আগে কোন কোন প্রাইভেট ব্যাংকের এমডি’র বেতন ছিল ২০ লক্ষ টাকা, এর বাইরে ছিল নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা। চুক্তিবদ্ধ এই বেতন দেশের অর্থনৈতিক বিচারে ছিল অস্বাভাবিক। তখন রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এমডি’রাও তাদের বেতন বৃদ্ধির দাবি তোলে। এই দাবির প্রেক্ষিতে তাদের বেতন সম্ভবত ছয় লক্ষ টাকায় উন্নীত করা হয়েছিল। গভর্নরের কথা অনুযায়ী কর্মক্ষেত্র যদি কর্মবলকে প্রশিক্ষিত করার প্রধান চারণভূমি হয়, তাহলে দক্ষ এমডি’র এত অভাব কেন? কর্মক্ষেত্র বিবেচনায় প্রতিটি ব্যাংকই হওয়ার কথা এক একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। যারা পদোন্নতি পেতে পেতে জেনারেল ম্যানেজার, এএমডি, ডিএমডি হন তাদের দক্ষতা ও ব্যাংকিং জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কেন? ডেপুটি ম্যানেজিং ডাইরেক্টর আর ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের দূরত্ব মাত্র একটি পদ, ম্যানেজিং ডাইরেক্টর দক্ষ হলে ডেপুটি ম্যানেজিং ডাইরেক্টরকে অদক্ষ বিবেচনার কোন কারণ থাকতে পারে না।

প্রকৃতপক্ষে প্রাইভেট ব্যাংকগুলোর ম্যানেজমেন্টে দক্ষতার অভাব নেই, অভাব আছে তার চর্চার। জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ না থাকায় তাদের দক্ষতায় ঘুণে ধরে যায়। ব্যাংকের মালিকপক্ষ চায় অনুগত ম্যানেজমেন্ট, দাসানুদাস মনোবৃত্তি। প্রতিটি ব্যাংকের একটি বোর্ড বা পরিচালক পর্ষদ আছে, ব্যাংকের মালিকপক্ষ থেকে সদস্য নিয়ে এই পরিচালক পর্ষদ গঠিত হয়। এতে কোন আপত্তি থাকার কিছু নেই, কারণ ব্যাংকে যারা মূলধনের জোগান দিয়েছে তারাই ব্যাংক পরিচালনা করবে—এটাই স্বাভাবিক। মালিকপক্ষের লোক দিয়ে নীতি নির্ধারক পরিচালক পর্ষদ বা বোর্ড অব ডাইরেক্টরস গঠিত হয়, কিন্তু এই বোর্ড তাদের কর্মকাণ্ড শুধু নীতি নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না, বোর্ড লোনের অনুমোদন দেয়, খেলাপি ঋণ রিসিডিউল করে, ঋণের সুদ মওকুফ করে, ব্যাংকের পিয়ন থেকে এমডি সকলের নিয়োগ, বদলি সব নিয়ন্ত্রণ করে, ম্যানেজমেন্ট বা এমডি হলো আজ্ঞাবহ কর্মচারী। এই পরিবেশে দক্ষ ব্যবস্থাপক বা দক্ষ এমডি’র কাজটা কী!

এস আলম গ্রুপ এতগুলো ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিল, কিন্তু কীভাবে? হতে পারে, ব্যাংকগুলোর ম্যানেজমেন্টের সবাই ছিল এস আলমের অনুগত, মালিকপক্ষ হিসেবে এস আলম যা চেয়েছে তাই করতে ম্যানেজমেন্ট বাধ্য ছিল, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী করল, তারা কেন গলা তুলে কথা বলল না? ব্যাংক তো কেবল মালিকপক্ষের টাকা দিয়ে হয় না, ব্যাংকে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা জমা থাকে, সেই জমা টাকা দিয়েই ব্যাংকের ব্যবসা চলে। জনগণ এই ব্যাংকগুলোতে টাকা জমা রেখে কী ভুল করেছে? সবগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েই ব্যবসা করছে, ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত। জনগণের টাকা জমা আছে বলেই ব্যাংকগুলোর কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন করে থাকে, বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিনিয়ত পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণপূর্বক সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে থাকে। অনসাইট, অফসাইটসহ নানা ধরনের তদারকি থাকা সত্ত্বেও এস আলম গ্রুপ এতগুলো টাকা ব্যাংক থেকে বের করে নিয়ে গেল, বাংলাদেশ ব্যাংক বুঝতেই পারল না, এই কথা ঘুষ দিয়েও কাউকে বিশ্বাস করানো যাবে না।

ব্যাংকগুলোর দৈন্যদশা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সৃষ্ট হলেও তখন ব্যাংকগুলো ধসে পড়েনি, জনগণ বুঝতে পারেনি। ব্যাংক ব্যবসায় আস্থা ও বিশ্বাস না থাকলে একদিনেই দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে, অজস্র টাকা দিয়েও দেউলিয়াত্ব ঠেকানো সম্ভব হয় না। এস আলম ব্যাংক থেকে নিয়ম বহির্ভূত ব্যাপক আকারের ঋণ নিলেও ব্যাংকগুলোর উপর আমানতকারীর আস্থা ছিল, সবাই একজোট হয়ে জমা টাকা উত্তোলনের জন্য ব্যাংকে ছুটে আসেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকে সংরক্ষিত বিধিবদ্ধ জমার ঘাটতি হলেও তা ব্যাংকগুলো জরিমানা দিয়ে হলেও পূরণ করেছে, নতুবা ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা আগেই উলঙ্গভাবে দৃশ্যমান হতো। এস আলম নামে-বেনামে একদিনে কথিত লোন নেয়নি, দীর্ঘদিন ধরে নিয়েছে। জানতে ইচ্ছে করে, এস আলম কি কখনো ঋণ খেলাপি ছিল? ছিল না। ঋণ খেলাপি হলে তারা ব্যবসা করল কীভাবে? কোন খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে কোন ব্যাংকই ব্যবসা করার সুযোগ দেয় না। ঋণ খেলাপির জন্য এস আলমের ব্যবসা কখনো বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও শোনা যায়নি। ব্যাংকগুলোর ধস নেমেছে বর্তমান গভর্নরের অসংযত ও অসংলগ্ন কথাবার্তার সূচনাতেই।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এতগুলো লোককে বশীভূত করে এতগুলো অপরাধ করা এস আলমের পক্ষে কীভাবে সম্ভব হলো? বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখ এড়িয়ে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে গৃহীত ঋণ ভিন্ন খাতে সরিয়ে ফেলা কীভাবে সম্ভব হলো? এস আলম তো ব্যাংক থেকে বস্তায় করে টাকা নিয়ে যায়নি, নিয়েছে লোন। যে ব্যাংক ঋণ দিয়েছে সেই ব্যাংকের কর্মকর্তারা চাকরি হারানোর ভয়ে চুপ থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক চুপ থাকল কেন? বাংলাদেশ ব্যাংক বলতে পারে রাজনৈতিক চাপের কথা; কিন্তু রাজনৈতিক চাপবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাংলাদেশে গড়ে তোলা আগামী দিনেও সহজ হবে না। মেরুদণ্ড সোজা না থাকলে স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে বশীভূত করা সব সরকারের আমলেই সম্ভব। সরকার-নিরপেক্ষ হয়ে নির্বাচন কমিশন বা দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে কোন কালেই সম্ভব হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংককে দেশের অর্থ ব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে অর্থমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনতেই হবে। নির্বাচন কমিশন বা দুর্নীতি দমন কমিশন সংবিধানে বিধৃত বিধিবিধান মেনে কাজ করে, তাদের অবস্থান সরকারের কোন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়, কিন্তু তারপরও এই দুইটি সংস্থার সংবিধিবদ্ধ ক্ষমতা প্রয়োগের দুর্বলতা আমরা অতীতে বারবার দেখেছি, এখনো দেখছি। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি সাধারণত রাজস্বনীতির পরিপূরক হয়, মুদ্রানীতির স্বাধীন সত্তা থাকলে রাজস্বনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। বুঝতে হবে রাজস্বনীতি সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত, সরকার কত টাকার ঋণ নেবে তাও সংসদে পাস হয়, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ করার কোন সুযোগ নেই। স্বায়ত্তশাসনের দাবি অনুযায়ী গভর্নরের নিয়োগ সরাসরি প্রেসিডেন্ট দিলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় নথি অর্থমন্ত্রীর কাছেই যাবে।

ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য ব্যাংকের স্বাস্থ্যকর অবস্থা অটুট থাকা খুব জরুরি। ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সুস্থ রাখার বিধিবদ্ধ দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। ব্যাংকের দুর্বলতা জনসম্মুখে প্রচার করার মধ্যে রাজনীতি থাকতে পারে, সফলতার কৃতিত্ব নেই। তথ্যগত বিভ্রান্তির কথা যতই বলা হোক না কেন, এস আলমের নিয়ম বহির্ভূত ব্যাপক আকারের ঋণ থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ আমলে খেলাপি ঋণ এত দ্রুত বৃদ্ধি পায়নি, এতগুলো ব্যাংক একত্রে সিক বা অসুস্থ হয়নি। আওয়ামী লীগ আমলে কেউ যদি তথ্য ট্যুইস্ট করে থাকে তাকে বা তাদেরও শনাক্ত করা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংককে অবাধ স্বাধীনতা না দিয়ে প্রাক্তন গভর্নর অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যদি প্রাথমিক পর্যায়ে একটু হস্তক্ষেপ করতেন তাহলে এতগুলো ব্যাংক দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হতো না। ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগগুলোকে ঢেলে সাজানো দরকার। উপরন্তু আরও বিধ্বংসী অবস্থা যেন ব্যাংকিং সেক্টরে নেমে না আসে সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে কথা বলায় সংযত হতে হবে, জাতীয় স্বার্থেই সব কথা বলতে নেই।