২১ জুলাই, ২০২৫, বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি শোকাবহ দিন। ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ী এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। মাত্র ১২ মিনিট আকাশে ছিল চীনের তৈরি এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধ বিমানটি। দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবক। এই দুর্ঘটনায় সরকারি হিসাবে জুলাই মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিমান থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুনে দগ্ধ হয়েছে শতাধিক এবং দুর্ঘটনায় হতাহতের অধিকাংশই শিশু শিক্ষার্থী। বিমান থেকে জীবিত বেরিয়ে এলেও শেষ পর্যন্ত বিমানের পাইলটও বাঁচতে পারেননি। শিক্ষানবিশ হলেও পাইলট অনভিজ্ঞ নন, এর আগে তার একাধিকবার বিমান উড্ডয়ন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের অভিমত যান্ত্রিক ত্রুটি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মূল কারণ। আবার অনেক মতে পাইলট সম্ভবত অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, নতুবা তার আরও আগে বিমান থেকে বেরিয়ে আসার কথা।

অগ্নিদগ্ধ অনেকের মরদেহ শনাক্ত করা যায়নি, পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হয়েছে। স্কুলের শিক্ষার্থীদের খোঁজ পায়নি পরিবার। বুকভরা বেদনা সত্ত্বেও জীবিত পাওয়ার প্রত্যাশায় সন্তানের ছবি হাতে মা-বাবা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছেন। বিমান বিধ্বস্তের কারণ অনুসন্ধানের নিমিত্তে বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্ট আসার আগেই অনেকে বিভিন্ন সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য দেওয়া শুরু করেছেন। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতির এই ঢাকা শহরে প্রশিক্ষণ বিমান পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কেন তা সাগরের উপরে বা নির্জন এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ছোট্ট এই বাংলাদেশে নির্জন এলাকা খুঁজে পাওয়া যাবে না, পরিবেশ দূষণ হওয়ার আশঙ্কা থাকায় এই দেশের পাহাড় কাটা যায় না, গাছ কাটা নিষেধ, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বাধা আসে, জলাশয় ভরাট করা আইনবিরুদ্ধ, ফসলি জমিতে কারখানা করা যায় না—এত প্রতিবন্ধকতায় যুদ্ধ বিমান দিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার নির্জন জায়গা খুঁজে নেওয়া কঠিন। শুধু প্রশিক্ষণ বিমান কেন, যাত্রীবাহী বিমানও জনবসতির উপর বিধ্বস্ত হতে পারে। বিমানের ওঠা এবং নামার সময় বেশি দুর্ঘটনা হয় বিধায় সব বিমানবন্দর শহর থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিও উঠতে পারে।

২০১৩ সনে চীন থেকে ক্রীত এই বিমানটি পুরনো নকশা ভিত্তিক বিমান, রাশিয়ার মিগ-২১ এর ১৯৫০–৬০ দশকের ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে এই বিমান চীন তৈরি করেছে। প্রযুক্তিগতভাবে পুরোনো হলেও পাকিস্তান এই বিমানের প্রধান ক্রেতা। এক ইঞ্জিন বিশিষ্ট বিধায় নিরাপত্তা ঝুঁকি একটু বেশি, তবে শব্দের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে চলার সক্ষমতা রয়েছে বিমানটির। চীন এই বিমানের উৎপাদক হলেও এখন তারা এই বিমান তৈরি বন্ধ করে দিয়েছে। জাতি হিসেবে আমরা এত গরিব যে, বেশি দামের উন্নত প্রযুক্তির বিমান কেনার সামর্থ্য নেই—এক সময় আমাদের যাত্রীবাহী অধিকাংশ বিমানই ছিল সেকেন্ড হ্যান্ড। রাস্তায় যে সকল গাড়ি দেখি তার বেশিরভাগ রিকন্ডিশনড বা সেকেন্ড হ্যান্ড। যে ‘কার’ জাপানের মসৃণ রাস্তায় চলে না, সে গাড়ি আমাদের ভাঙা রাস্তায় দিব্যি চলে। বাংলাদেশে প্রাইভেট সেক্টরে বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রায় সব প্রিন্টিং মেশিন ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’। আমাদের দারিদ্র্য এত প্রকট যে, অপরিচিত লোকের ব্যবহৃত পোশাক আমরা বাজার থেকে কিনে নির্দ্বিধায় পরি। বিশ্ব দরবারে জাতি হিসেবে আমরা এত বেশি অবহেলিত যে, নামিদামী সব এয়ারলাইন বাংলাদেশ রুটে তাদের পুরাতন বিমানটি ব্যবহার করে। যে রাশিয়ান ট্যাংক ১৯৭৩ সনে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে বিপর্যস্ত সেই ট্যাংকই ১৯৭৪ সনে মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত মিসকিন বাংলাদেশকে দান করেন, সেই ট্যাংক রাস্তায় নামিয়ে ১৯৭৫ সনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। যে বিমানের উৎপাদন চীনই বন্ধ করে দিয়েছে সেই বিমান দিয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ নিতে হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুইদিন ঢুকিনি, শিশুগুলোর মর্মান্তিক মৃত্যু কাহিনী আর নিতে পারছিলাম না। আগুনে দগ্ধ শায়ান পরদিন আবার স্কুলে আসার প্রত্যাশায় স্কুল-ব্যাগটি কাঁধে তুলে নিতে ভুলেনি, কিন্তু হাসপাতালে বাবার হাত ধরে বরাভয় পেলেও মৃত্যু ঠেকানো গেল না। দুই ভাই এক বোন—সবাই শিশু, ফুলের মতো নির্মল, নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ—তিন জনই দগ্ধ হয়ে চিরতরে বিদায় নিলো। এদের মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিতে যাওয়াও অপরাধ। দেখলাম, আগুনে পোড়া দগ্ধ শরীর নিয়ে শিশু রোহান বা আরিয়ান স্কুলের মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে একা হেঁটে যাচ্ছে, আশেপাশে এত মানুষ, কিন্তু কাউকে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে ধরতে দেখলাম না। একটু পরে অবশ্য তাকেও হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। আগুনে ঝলসে মরে যাওয়া টেস্টটিউব-বেবীর মা-বাবার কষ্ট বোধ হয় বিধাতাকেও দুঃখ দিয়েছে। মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আয়মানের গগলস পরা একটি ছবি আমার আমৃত্যু চোখে ভাসবে। নাজিয়া মৃত্যুর মুখে দগ্ধ শরীর নিয়েও আন্টির কাছে প্রথমেই জানতে চেয়েছে ছোট ভাই নাফি সুস্থ কি না; উত্তর শুনে মনে হলো ছোট ভাইয়ের সুস্থ থাকার সংবাদ নাজিয়াকে নিশ্চিত মৃত্যু বরণ করতে সাহসী করেছে।

অনেকগুলো শিশুর শুধু পোড়া মাংসের স্তূপ দেখেছি, আগুনে যখন পুড়ছিল তখনও হয়তো মা মা বলে চিৎকার করছিল, ভেবেছে এক্ষুণি মা এসে তাদের রক্ষা করবে, বাবা আগুন নিবিয়ে দেবে, ভাই কাঁধে তুলে নেবে, বোন পানি ঢালবে। কিন্তু হলো না, শিশুগুলো বাঁচার প্রত্যাশা নিয়ে মরে গেল। সেদিন রাতেই সরকার এবং জাতির অভিভাবকগণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে হলুদ রঙের জুসে ঠোঁট লাগিয়ে ঐকমত্যের বিজয়ী হাসি জাতিকে উপহার দিলেন। লজ্জা আমার, আপনার, সবার। কারণ সরকার প্রধানের মতো শিশুগুলোও হয়তো স্বপ্ন ভালোবাসতো, খেলাচ্ছলে শিশুগুলোও হয়তো আকাশের তারা এনে বন্ধুর খোঁপায় পরিয়ে দিয়েছে, ভেবেছে চাঁদের সুতা-কাটা বুড়িমার কাছে গিয়ে দৈত্য-দানবের অনেক গল্প শুনবে, বরফাচ্ছাদিত হিমালয় পর্বতের চূড়ায় উঠবে, সমুদ্র সৈকত গিয়ে নুড়ি কুড়াবে, বিশ্বের দীর্ঘতম জলপ্রপাত নায়াগ্রা দেখবে, চিকিৎসক হয়ে গাজার শিশুদের সেবা করবে। কিন্তু বিধ্বস্ত বিমানের ভয়াবহ আগুন তাদের অপ্রস্ফুটিত স্বপ্নগুলো তছনছ করে দিল।

শিশু হত্যা পৃথিবীর সর্বত্র হচ্ছে। দুইশত কোটি মুসলমান রাতদিন কান্না করেও গাজায় হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু থামাতে পারছে না। বড়দের হিংসা, বিদ্বেষ আর যুদ্ধের মাঝে পড়ে শিশুরা মরবে কেন? তারা তো কোন দোষ করেনি। আমাদের মতো গরীবদের কেন রণসজ্জায় সজ্জিত হওয়ার বাসনা জাগে? এখনো হতদরিদ্ররা ডাস্টবিন থেকে খাবার খুঁজে খায়, এখনো অসংখ্য পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, অভাবের তাড়নায় হাজার হাজার যুবক নৌকা নিয়ে সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে পানিতে ডুবে মরছে। ‘উম্মাহ’র মুখেই শুনতে হয় ‘মিসকিন’। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ যুদ্ধের ধরণে আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, এখন বোমা মারার চেয়ে নিক্ষিপ্ত বোমা প্রতিহত করার সক্ষমতা দিয়েই শক্তির পরিমাপ হয়। ১৯৭১ সনে মাত্র কয়েকটি বোমা ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে পড়ার পর পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের আকাশ যুদ্ধ থেমে যায়। ১৯৬৫ সনে মাত্র সতের দিন যুদ্ধ করেই পাকিস্তান এবং ভারত ক্লান্ত হয়ে যায়, তড়িঘড়ি যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়, যুদ্ধ আরও কিছুদিন চললে দুই দেশেই দুর্ভিক্ষ হতো। ইরানের অনেক আধুনিক অস্ত্রও যুদ্ধ জয়ের জন্য উপযোগী বিবেচিত হয়নি। আমাদের তো কোন আবিষ্কারই নেই, আমাদের কেন লাগবে সেকেন্ড হ্যান্ড সাবমেরিন, কেন আমাদের শিখতে হবে যুদ্ধের রণকৌশল? যে মানুষদের রক্ষার জন্য সামরিক সক্ষমতা দরকার, সেই মানুষগুলো তো না খেয়েই মরছে।

শিশুদের বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। বহু বছর আগে ইতালির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টিভিতে এসে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে একটি আবেগঘন বক্তব্য রেখেছিলেন। ইতালির রাজধানী রোমে একটি শিশু স্যুয়ারেজ লাইনে পড়ে যায়, রাষ্ট্রের সর্বশক্তি নিয়োগ করেও শিশুটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘জ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম বিকাশ ঘটা সত্ত্বেও নর্দমায় পড়ে যাওয়া একটি শিশু উদ্ধার করার শিক্ষা আমরা এখনো পাইনি, অভিভাবক হিসেবে আমার এই অক্ষমতার জন্য আমি জাতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থী’। ২০০৯ সনে সুইডেনের বিমান বাহিনীর অনুশীলনের সময় যুদ্ধ বিমানের আওয়াজে এক কৃষকের ফার্মের ৩১টি মুরগির বাচ্চা আতঙ্কে মারা যায় এবং কিছু ডিম নষ্ট হয়। কৃষকের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমান বাহিনী থেকে ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হয়, বাচ্চাগুলো বড় হলে কী পরিমাণ ডিম দিতো বা ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বড় হতো সেই দাম হিসাব করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। আর আমরা জনগণ থেকে চাঁদা তুলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ভাবি। কিন্তু জীবনের কি ক্ষতিপূরণ হয়? যে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা জিরো, সেই যুদ্ধের রণকৌশল শিখার দরকার নেই, শিখতে হলে জনবসতি থেকে দূরে শিখুন।

উপদেষ্টা, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা বিশাল কর্মীবহর নিয়ে মাইলস্টোন স্কুল এবং হাসপাতালে আসেন, এসে উদ্ধারকর্মী ও চিকিৎসকদের কাছে খোঁজ-খবর নেন। বলুন তো, এদের আগমনে কী উপকারটা হয়? উপকার তো হয়ই না, বরং এদের আগমনে উদ্ধার কাজ ও চিকিৎসা প্রদানে বিঘ্ন ঘটে। এই করুণ পরিস্থিতিতেও স্বৈরাচার আমলের মতো লাশ গুমের অভিযোগ উঠতে থাকে, লাশের সঠিক হিসাব নিয়ে জনমনে সন্দেহ জাগে। এই বিপর্যয়কর অবস্থায় সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ছাত্র-জনতা। কিন্তু ফার্স্ট এইড হিসেবে কাউকে দগ্ধ শরীরে পানি ঢালতে দেখা গেল না, দেখা গেল না হেলিকপ্টারে করে দগ্ধ শিশুদের হাসপাতালে নিতে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমন্বয়ের অভাব। এমন একটি বিমর্ষ অবস্থায় মাইলস্টোনের ছাত্র সূর্য সতীর্থদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তারপর নিজেকে রক্ষা করেছে। অন্যদিকে শিক্ষিকা মাহরীন চৌধুরী নিজের জীবন দিয়ে বাঁচালেন ২০-২৫টি শিশু। আজ সবার কাছে তিনিই শিক্ষক, তিনিই মা, তিনিই জাতীয় বীর।