ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির’ প্রকাশ্যে তাদের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছে। কোটা বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আবু সাদিক কায়েম যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি তা কেউ তার ঘোষণা দেওয়ার আগে ঘুণাক্ষরেও জানতো না। সভাপতির পরিচয় প্রকাশের পর ছাত্রলীগের পদধারী এস এম ফরহাদের পরিচয়ও উন্মোচিত হলো, তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি জেনারেল। সারা দেশে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে ছাত্রশিবিরের ছাত্র-ছাত্রীরা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী সেজে মিছিল করেছে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছে, জাতীয় পতাকা মাথায় বেঁধেছে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে আবেগায়িত হয়েছে, পিটানোর জন্য ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবির খুঁজে বেড়িয়েছে। হেলমেট মাথায় দিয়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে ওঠছে। ঘটনা সত্য হলে, ছাত্রলীগের ইমেজ ধ্বংস করার জন্য এর চেয়ে উত্তম কৌশল আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না।
আমরা জানি, ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের আস্তানার খবর দিয়েছে সাদ্দাম হোসেনের ঘনিষ্ঠজন। পশ্চিমবঙ্গের নক্সাল নেতা চারু মজুমদারকে ধরার জন্য সরকারের গোয়েন্দারা নক্সালে নাম লিখিয়েছিল। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদও এভাবে কাজ করে থাকে। মোসাদের নিয়োজিত হিজবুল্লাহর সদস্যদের বিশ্বাসঘাতকতায় একে একে সব নেতাকে হত্যার পর এখন হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতা হতে কেউ আর আগ্রহী হচ্ছেন না। চরমপন্থী রাজনৈতিক নেতারাও ছদ্মনাম, ছদ্মবেশ ধারণ করে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে থাকেন। একাত্তরে স্বাধীনতার পরপর মোহাম্মদ তোয়াহার জীবনের ঝুঁকি বেড়ে গেলে বঙ্গবন্ধু তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। কেবল ছাত্রলীগ বা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কেরা নয়, সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্নাও জামাত-শিবিরের রাজনৈতিক দাবা খেলায় ধরাশায়ী; তিনি এখন বলছেন, ‘আমি যদি বুঝতাম, আমি জামাত-শিবিরের খপ্পরে পড়েছি তাহলে এদের আইনজীবী থাকতাম না’।
রাজনীতির আধুনিক কলাকৌশল রপ্ত করেই শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগকে ধরাশায়ী করেছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন শিবিরের কর্মতৎপরতা কারো চোখেই ধরা পড়েনি। ছদ্মবেশে তারা বিচক্ষণতার সাথে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। যদি জানাজানি হয়ে যেত, সমন্বয়করা জামায়াত বা হিযবুত তাহরির কর্মী তাহলে অভ্যুত্থানে জনসমর্থন ও নেতৃত্বে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বিএনপির লোকজন ভেবেছে তারাই লিডে, বামেরা ভেবেছে তারাই নেতৃত্বে। কিন্তু জামায়াতই যে লিডে ছিলো তা পরিষ্কার হয়ে যায় জামায়াতকে প্রাধান্য দিয়ে সেনাপ্রধানের বক্তব্যে। আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদসহ অনেকের জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ্যে আসার পর আন্দোলনে সক্রিয় থাকা দলনিরপেক্ষ সমন্বয়ক ও ছাত্ররা এখন কিছুটা বিব্রত। কারণ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্ল্যাটফর্মটি অরাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল, আওয়ামী লীগ শত চেষ্টা করেও জামাত-শিবির বা হিজবুত তাহরিরের সংশ্লিষ্টতা জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারেনি। তখন আওয়ামী লীগের কোনো নেতার কথায় কেউ গুরুত্ব দেয়নি, তারা তাদের সব বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছিল।
ছাত্রশিবির অবশ্য বাধ্য হয়ে ছাত্রলীগে নাম লিখিয়েছিল, কারণ তাদের প্রকাশ্যে রাজনীতি করার অধিকার ছিল না। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্র-শিক্ষকের সব সংগঠন একাট্টা হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের রাজনীতি বন্ধ করেছিল। ১৯৮৯ সনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপি’র অঙ্গসংগঠন ছাত্রদলের একজন নেতাকে হত্যার জন্য ছাত্রশিবিরকে দায়ী করে সেখানেও ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এক সময় শিবির দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের বিরোধী পক্ষের বহু ছাত্রের রগ কেটে দিয়েছে; তখন তাদের ‘রগকাটা শিবির’ বলা হতো। তবে ছাত্রশিবির যেমন রগ কেটেছে, তেমনি ছাত্রলীগ এবং ছাত্রদলও বিরোধী পক্ষের ছাত্রদের নিপীড়ন করেছে। যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের ছাত্র সংগঠন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ আমলে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফারহাদকে ছাত্রলীগের ছাত্ররা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে, ছাত্রলীগের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। বিএনপি’র ছাত্রদলের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও ২০০১ সনে ছাত্রদলের কার্যক্রম স্থগিত করে দিয়েছিলেন। হোসেন মোহাম্মদ এরশাদও জাতীয় পার্টির অঙ্গসংগঠন জাতীয় ছাত্র সমাজ নিষিদ্ধ করেছিলেন।
ইসলামী ছাত্র শিবির ক্যাডারভিত্তিক ছাত্র সংগঠন। ১৯৭১ সনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠনের নাম ছিল ইসলামী ছাত্রসংঘ। তারা মুক্তিযুদ্ধের শুধু বিরোধিতা করেনি, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্তও ছিল। জামায়াত এবং ছাত্রসংঘের সরাসরি অংশগ্রহণ ও তদারকিতে সৃষ্টি হয় রাজাকার, আল-শামস, আল-বদর, যারা মুক্তিযুদ্ধকালীন নয় মাস সারাদেশে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট চালিয়েছে, বিজয়ের পূর্বমুহূর্তে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। মুক্তিযুদ্ধে এমনতর ভূমিকার কারণে জামায়াতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রসংঘও নিষিদ্ধ হয়। জিয়াউর রহমানের আমলে তারা আবার রাজনীতি করার সুযোগ পেয়ে ছাত্রসংঘের নতুন নামকরণ করে ছাত্রশিবির। ২০২৪ সনে এসে কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে দিশেহারা আওয়ামী লীগ সরকার তড়িঘড়ি করে বাম দলগুলোর সুপারিশে আবার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে। পতনোন্মুখ সরকারের এমন সিদ্ধান্তে জামায়াতে ইসলাম ছিল নির্বিকার ও নির্লিপ্ত, তাদের কোনো প্রতিক্রিয়াই ছিল না। তারা নিশ্চিত ছিল আওয়ামী লীগের পতন হবেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের রাজনীতি বন্ধ থাকায় ছাত্রলীগের চেয়ে বিএনপি’র ছাত্রদল বেশি বেনিফিট পেয়েছে। এজন্যই ২০০১ সনে জামায়াতে ইসলাম বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক হওয়া সত্ত্বেও ছাত্রদল ছাত্রশিবিরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ দেয়নি। শিবিরের প্রতি বিএনপি’র ছাত্রদলের অবস্থান এখনো আগের মতোই আছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে এক বৈঠকে ছাত্রশিবিরের অংশ নেওয়ায় বিএনপি’র ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নিন্দা জানিয়েছে। ছাত্রদল জানে, শিবির ছাত্রলীগের ভেতরে অবস্থান করলেও তারা কখনো ছাত্রলীগের শুভাকাঙ্ক্ষী হবে না, তাদের প্রকাশ্যে রাজনীতি না থাকলে ডাকসু নির্বাচনে তারা ছাত্রদলকেই ভোট দেবে। জাতীয় রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামের অবস্থানও একই; আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর জন্য তাদের বিএনপি’কে সমর্থন করতেই হয়। তাই জামায়াতে ইসলাম বা শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে লাভ হয় বিএনপি’র।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে জামায়াতে ইসলামের ঘনিষ্ঠতায় বিএনপি ঈর্ষান্বিত কি না তা বোঝা যাচ্ছে না। বিএনপি যত শীঘ্র সম্ভব নির্বাচন চায়, কিন্তু জামায়াত চায় না। আওয়ামী লীগের আমলে জামায়াত ছিল বেশি নিগৃহীত, নির্বাচনের জন্য তাদের তাৎক্ষণিক প্রস্তুতি নেই, গুছিয়ে নিতে তাদের সময় প্রয়োজন। কিন্তু বিএনপি তাদের মাঠকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, চাঁদাবাজির মাঠ দখলে দলের বদনাম হচ্ছে। এই অবস্থায় বদনাম চরম পর্যায়ে পৌঁছার আগেই বিএনপি নির্বাচন চায়। জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করার চিন্তা-ভাবনা করছে। কিন্তু তারা এখনো দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন করার জন্য বৈধ নয়। তাদের গঠনতন্ত্র সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে ২০০৮ সনের পর তারা আর দলীয়ভাবে নির্বাচন করতে পারেনি। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করলেও হাইকোর্ট ২০১৩ সনে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ‘অবৈধ ও বাতিল’ ঘোষণা করে রায় দেয় এবং সর্বোচ্চ আদালতেও হাইকোর্টের ওই রায় বহাল থাকে। এতদসত্ত্বেও জামায়াতে নির্ভার, কোনো হতাশা নেই। সর্বোচ্চ আদালতের রায় রিভিউ করার সুযোগ থাকলে তাদের নিবন্ধন ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অন্যদিকে সংবিধান পুনর্লিখনে গঠনতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক শর্তের বিলোপও হতে পারে। তাই তারা ক্ষমতায় গিয়ে মদিনা সনদের ভিত্তিতে দেশ শাসন করার আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু ইসলাম ধর্ম গণতন্ত্র মানে না, আইন প্রণয়নে জনপ্রতিনিধিদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা স্বীকার করে না, জনগণ যে সকল ক্ষমতা উৎস তাও নাকচ করে। অন্যদিকে ইসলামে বহুদলীয় গণতন্ত্রও নেই। জামায়াত বা ইসলামপন্থী কোনো দল ক্ষমতায় এলে বাকি সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হওয়ার কথা। তাহলে কি জামায়াতে ইসলাম ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ছাত্রশিবিরের মতো নাজায়েজ গণতন্ত্রে কৌশলী ছদ্মবেশী রাজনীতি করছে?
